সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্পেন-মরক্কোর কৃত্তিম সংকট সৃষ্টি করে প্রতিশোধ নিয়েছে ইসরায়েল

সম্প্রতি মরক্কো থেকে প্রায় ৬০ হাজার অভিবাসী স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউটায় প্রবেশ করেছিল। এই ঘটনার পেছনে ইসরায়েলের হাত থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন স্পেনের এক মন্ত্রী।

জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন শুক্রবার এক্সে একটি পোস্ট করেন। তাতে তিনি লেখেন, ‘স্পেন, যারা ইসরায়েলকে জ্ঞান দেওয়ার কোনো সুযোগ হাতছাড়া করে না, তারা এখন তাদের অভিবাসন নীতি নিয়ে সংকটের মুখে সেউটায় জরুরি অবস্থা জারি করেছে।’

তিনি আরও লেখেন, ‘আমাদের জ্ঞান দেওয়ার আগে হয়তো তাদের বিশ্বকে ব্যাখ্যা করা উচিত, কেন তারা এখনো আফ্রিকায় ঔপনিবেশিক ছিটমহল ধরে রেখেছে।’

ড্যাননের এই পোস্ট শেয়ার করে স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে মন্তব্য করেন, ‘বেশ, পুরো ব্যাপারটা এখন পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে।’

স্পেনের অনেক রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষক আগেই অভিযোগ করেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ এবং গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের বিরোধিতা করার প্রতিশোধ হিসেবে স্পেনের জন্য সমস্যা তৈরির চেষ্টা করছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র।

বামপন্থী দল রিপাবলিকান লেফট অব কাতালোনিয়ার সংসদীয় মুখপাত্র গ্যাব্রিয়েল রুফিয়ানও দাবি করেন, এই সংকট আসলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থই রক্ষা করছে।

স্পেনের সাংবাদিক হোসে ভিজনার এদিকে ২০১৯ সালের একটি পুরোনো পোস্ট শেয়ার করেন। এটি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর ছেলে ইয়াইর নেতানিয়াহুর করা একটি পোস্ট, যেখানে সেউটায় বিচ্ছিন্নতাবাদে ইসরায়েলের সমর্থনের অভিযোগ তোলা হয়েছিল।

স্পেনের বিখ্যাত অভিনেতা হাভিয়ের বারদেমও একটি ভিডিও শেয়ার করে অভিযোগ করেন, এই সীমান্ত পারাপারের পেছনে ইসরায়েলের হাত রয়েছে।

পর্তুগালের সাবেক মন্ত্রী ও বিশ্লেষক ব্রুনো মাকায়েস বলেন, ঘটনার আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল জড়িত ছিল কি না, তা নিশ্চিত না হলেও ঘটনার পর তারা গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে বর্তমান স্পেন সরকারের বিরুদ্ধে এই ঘটনাকে ব্যবহারের চেষ্টা করছিল তারা।

মরক্কোর ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত সেউটা স্পেনের একটি অঞ্চল। দেশটির উত্তর উপকূলে আরেকটি স্বায়ত্তশাসিত শহর মেলিয়া। এই দুটি জায়গাই ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আফ্রিকার মধ্যে একমাত্র স্থল সীমান্ত।

স্পেন সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এই সপ্তাহে মরক্কো থেকে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ সেউটায় প্রবেশ করে, যাদের মধ্যে প্রায় ৮ হাজার শিশু।

অনলাইনে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, সীমান্তের বেষ্টনী ঘুরে সাঁতরে ছিটমহলে ঢুকছেন অনেকে। কেউ কেউ সাঁতারের পোশাক পরে ও ভাসমান রিং ব্যবহার করে এই বিপজ্জনক যাত্রা করেন।

ফ্রান্স জানায়, তারা স্পেনের সাথে তাদের সীমান্তে নজরদারি বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে ইতালি হুমকি দেয়, ইইউর মুক্ত সীমান্ত ব্যবস্থা থেকে স্পেনকে স্থগিত করা হতে পারে।

তবে শনিবার স্পেন জানায়, প্রায় ৪৮ হাজার অভিবাসী ইতিমধ্যে মরক্কোয় ফিরে গেছে। স্পেনের সেনাবাহিনীর সহায়তায় তাদের ফেরত পাঠানো হয়।

অনলাইনে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, কিছু অভিবাসী সুড়ঙ্গে লুকিয়ে আছেন, আবার কেউ কেউ সেউটার রাস্তায় ঘোরাফেরা করছেন।

ছিটমহলে পৌঁছাতে গিয়ে অন্তত ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কী কারণে এই পারাপারের স্রোত শুরু হলো, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এর আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে। ২০২১ সালের মে মাসে পশ্চিম সাহারা নিয়ে স্পেন ও মরক্কোর কূটনৈতিক বিরোধের মধ্যে প্রায় ৮ হাজার মরক্কান নাগরিক সেউটায় প্রবেশ করেছিলেন। সে সময় স্পেন অভিযোগ করেছিল, মরক্কো অভিবাসীদের চাপ হিসেবে ব্যবহার করছে। জবাবে মরক্কোর এক মন্ত্রী বলেছিলেন, কূটনৈতিক বিরোধের প্রতিক্রিয়া হিসেবে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা তাদের জন্য যৌক্তিক ছিল।

কিছু বিশ্লেষক এবার মরক্কোকেও দোষারোপ করছেন। তাদের মতে, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সম্প্রতি আলজেরিয়া সফরে ক্ষুব্ধ হয়েছে মরক্কো সরকার। আলজেরিয়া স্পেনের সবচেয়ে বড় গ্যাস সরবরাহকারী দেশ।

বার্সেলোনার পম্পেউ ফাব্রা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লরেনজো গাব্রিয়েলি সেউটায় অভিবাসন নিয়ে গবেষণা করেন। নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন, ‘এক দিনে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের মরক্কো-স্পেন সীমান্ত পার হওয়া, মরক্কোর সম্পৃক্ততা ছাড়া সম্ভব নয়।’

সেউটার প্রেসিডেন্ট হুয়ান হেসুস ভিভাস এই অভিবাসনকে স্পেনের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানান।

স্পেনে মরক্কোর রাষ্ট্রদূত কারিমা বেনইয়াইচ বলেন, ‘আমরা সবসময় সবার জন্য বৈধ, সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ অভিবাসনকে অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছি।’

তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই সীমান্ত পারাপার মরক্কো সরকারের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই ঘটেছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পরিস্থিতিকে ‘বিপর্যয়’ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ক্ষমতায় না থাকলে আমাদের দেশ এমন মাত্রায় আক্রান্ত হবে, যার তুলনায় স্পেনের ঘটনাকে সামান্যই মনে হবে।’

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

বিতর্ক আরও উস্কে দিতে পারে আর্জেন্টিনার নতুন জার্সি

স্পেন-মরক্কোর কৃত্তিম সংকট সৃষ্টি করে প্রতিশোধ নিয়েছে ইসরায়েল

প্রকাশিত সময় : ০৫:৩৮:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬
সম্প্রতি মরক্কো থেকে প্রায় ৬০ হাজার অভিবাসী স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউটায় প্রবেশ করেছিল। এই ঘটনার পেছনে ইসরায়েলের হাত থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন স্পেনের এক মন্ত্রী।

জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন শুক্রবার এক্সে একটি পোস্ট করেন। তাতে তিনি লেখেন, ‘স্পেন, যারা ইসরায়েলকে জ্ঞান দেওয়ার কোনো সুযোগ হাতছাড়া করে না, তারা এখন তাদের অভিবাসন নীতি নিয়ে সংকটের মুখে সেউটায় জরুরি অবস্থা জারি করেছে।’

তিনি আরও লেখেন, ‘আমাদের জ্ঞান দেওয়ার আগে হয়তো তাদের বিশ্বকে ব্যাখ্যা করা উচিত, কেন তারা এখনো আফ্রিকায় ঔপনিবেশিক ছিটমহল ধরে রেখেছে।’

ড্যাননের এই পোস্ট শেয়ার করে স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে মন্তব্য করেন, ‘বেশ, পুরো ব্যাপারটা এখন পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে।’

স্পেনের অনেক রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষক আগেই অভিযোগ করেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ এবং গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের বিরোধিতা করার প্রতিশোধ হিসেবে স্পেনের জন্য সমস্যা তৈরির চেষ্টা করছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র।

বামপন্থী দল রিপাবলিকান লেফট অব কাতালোনিয়ার সংসদীয় মুখপাত্র গ্যাব্রিয়েল রুফিয়ানও দাবি করেন, এই সংকট আসলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থই রক্ষা করছে।

স্পেনের সাংবাদিক হোসে ভিজনার এদিকে ২০১৯ সালের একটি পুরোনো পোস্ট শেয়ার করেন। এটি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর ছেলে ইয়াইর নেতানিয়াহুর করা একটি পোস্ট, যেখানে সেউটায় বিচ্ছিন্নতাবাদে ইসরায়েলের সমর্থনের অভিযোগ তোলা হয়েছিল।

স্পেনের বিখ্যাত অভিনেতা হাভিয়ের বারদেমও একটি ভিডিও শেয়ার করে অভিযোগ করেন, এই সীমান্ত পারাপারের পেছনে ইসরায়েলের হাত রয়েছে।

পর্তুগালের সাবেক মন্ত্রী ও বিশ্লেষক ব্রুনো মাকায়েস বলেন, ঘটনার আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল জড়িত ছিল কি না, তা নিশ্চিত না হলেও ঘটনার পর তারা গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে বর্তমান স্পেন সরকারের বিরুদ্ধে এই ঘটনাকে ব্যবহারের চেষ্টা করছিল তারা।

মরক্কোর ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত সেউটা স্পেনের একটি অঞ্চল। দেশটির উত্তর উপকূলে আরেকটি স্বায়ত্তশাসিত শহর মেলিয়া। এই দুটি জায়গাই ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আফ্রিকার মধ্যে একমাত্র স্থল সীমান্ত।

স্পেন সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এই সপ্তাহে মরক্কো থেকে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ সেউটায় প্রবেশ করে, যাদের মধ্যে প্রায় ৮ হাজার শিশু।

অনলাইনে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, সীমান্তের বেষ্টনী ঘুরে সাঁতরে ছিটমহলে ঢুকছেন অনেকে। কেউ কেউ সাঁতারের পোশাক পরে ও ভাসমান রিং ব্যবহার করে এই বিপজ্জনক যাত্রা করেন।

ফ্রান্স জানায়, তারা স্পেনের সাথে তাদের সীমান্তে নজরদারি বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে ইতালি হুমকি দেয়, ইইউর মুক্ত সীমান্ত ব্যবস্থা থেকে স্পেনকে স্থগিত করা হতে পারে।

তবে শনিবার স্পেন জানায়, প্রায় ৪৮ হাজার অভিবাসী ইতিমধ্যে মরক্কোয় ফিরে গেছে। স্পেনের সেনাবাহিনীর সহায়তায় তাদের ফেরত পাঠানো হয়।

অনলাইনে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, কিছু অভিবাসী সুড়ঙ্গে লুকিয়ে আছেন, আবার কেউ কেউ সেউটার রাস্তায় ঘোরাফেরা করছেন।

ছিটমহলে পৌঁছাতে গিয়ে অন্তত ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কী কারণে এই পারাপারের স্রোত শুরু হলো, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এর আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে। ২০২১ সালের মে মাসে পশ্চিম সাহারা নিয়ে স্পেন ও মরক্কোর কূটনৈতিক বিরোধের মধ্যে প্রায় ৮ হাজার মরক্কান নাগরিক সেউটায় প্রবেশ করেছিলেন। সে সময় স্পেন অভিযোগ করেছিল, মরক্কো অভিবাসীদের চাপ হিসেবে ব্যবহার করছে। জবাবে মরক্কোর এক মন্ত্রী বলেছিলেন, কূটনৈতিক বিরোধের প্রতিক্রিয়া হিসেবে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা তাদের জন্য যৌক্তিক ছিল।

কিছু বিশ্লেষক এবার মরক্কোকেও দোষারোপ করছেন। তাদের মতে, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সম্প্রতি আলজেরিয়া সফরে ক্ষুব্ধ হয়েছে মরক্কো সরকার। আলজেরিয়া স্পেনের সবচেয়ে বড় গ্যাস সরবরাহকারী দেশ।

বার্সেলোনার পম্পেউ ফাব্রা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লরেনজো গাব্রিয়েলি সেউটায় অভিবাসন নিয়ে গবেষণা করেন। নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন, ‘এক দিনে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের মরক্কো-স্পেন সীমান্ত পার হওয়া, মরক্কোর সম্পৃক্ততা ছাড়া সম্ভব নয়।’

সেউটার প্রেসিডেন্ট হুয়ান হেসুস ভিভাস এই অভিবাসনকে স্পেনের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানান।

স্পেনে মরক্কোর রাষ্ট্রদূত কারিমা বেনইয়াইচ বলেন, ‘আমরা সবসময় সবার জন্য বৈধ, সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ অভিবাসনকে অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছি।’

তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই সীমান্ত পারাপার মরক্কো সরকারের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই ঘটেছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পরিস্থিতিকে ‘বিপর্যয়’ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ক্ষমতায় না থাকলে আমাদের দেশ এমন মাত্রায় আক্রান্ত হবে, যার তুলনায় স্পেনের ঘটনাকে সামান্যই মনে হবে।’

সূত্র: মিডল ইস্ট আই