সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মৃত্যুর আগে লেখা মরিয়মের কয়েকটি ‘চিরকুট’ আলোচনায়

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের (১৯) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় হাতে লেখা বেশ কয়েকটি চিরকুট জব্দ করেছে পুলিশ। জাতীয় সংসদের প্যাডসহ বিভিন্ন কাগজে লেখা এসব চিরকুটে ফুটে উঠেছে এক সম্পর্কের টানাপোড়েন। কোথাও গভীর ভালোবাসা, কোথাও বিশ্বাসভঙ্গের বেদনা, আবার কোথাও রয়েছে আক্ষেপ, ক্ষোভ ও আত্মসম্মান রক্ষার দৃঢ় প্রত্যয়।

এসব চিরকুটের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার ইবনে মিজান। এসব চিরকুট প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং সর্বস্তরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

এমপি গাজী নজরুলের বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া হাতে লেখা এসব চিরকুটে উঠে এসেছে সম্পর্কের নানা আবেগঘন অধ্যায়। ভালোবাসার পাশাপাশি চিঠিগুলোতে রয়েছে প্রতারণার অভিযোগ, সম্পর্কের জটিলতা, বিশ্বাসভঙ্গ এবং তীব্র মানসিক কষ্টের বর্ণনা। কোথাও নিজেকে ‘দাবার গুটি’ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার আক্ষেপ, আবার কোথাও প্রতিকূলতার মধ্যেও ভেঙে না পড়ার এবং শেষ পর্যন্ত নিজের অবস্থানে অটুট থাকার প্রত্যয় প্রকাশ পেয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কিছু চিরকুট সাদা কাগজে কালো কালির পাশাপাশি লাল কালি দিয়ে লেখা। এর মধ্যে একটি চিরকুটে ‘বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ’ লেখা প্যাডও রয়েছে।

তবে জব্দ করা চিরকুটগুলো মরিয়ম মৃত্যুর আগে নিজেই লিখেছিলেন কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

হাতে লেখা চিরকুটগুলোতে জীবনের হতাশা ও ক্ষোভের কথা ব্যক্ত করা হয়েছে। একটি চিরকুটে লেখা রয়েছে, ‘সে ছিল অন্য নারীর স্বামী, কাগজে-কলমে অধিকার ছিল তার সতীন-বধূর। আর আমি ছিলাম বোকা! অন্য কারও স্বামীকে বানিয়েছিলাম নিজের শখের পুরুষ! কাউকে অর্ধেক পাওয়ার চেয়ে হারিয়ে ফেলা বেশি সম্মানের। কারণ, ভালোবাসা কখনোই ভাগ করে নেওয়ার বিষয় নয়।’

আরেকটি জাতীয় সংসদের প্যাডে লেখা চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘আমি হেরেছি, তুমি জিতেছো। কারণ আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছো…। দেখা যাক ওই হাসির কারণই হবে তোমার ধ্বংসের কারণ।’

অন্য একটি চিরকুটে লড়াই ও বিশ্বাসের কথা উল্লেখ করে তিনি লেখেন, ‘আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম তার সঙ্গে। তো জিততে পারিনি, হেরে গেলাম ময়দানে। জিতবোই বা কেমনে, যুদ্ধের শেষ প্রান্তে এসে দেখি তুমিই তো ছিলে বিপক্ষ দলের সেনাপতি!’

আরেকটি চিরকুটে লাল কালিতে লেখা সংক্ষিপ্ত একটি বার্তায় নিজের আত্মসম্মানের কথা তুলে ধরা হয়েছে।  তিনে লেখেন, ‘শুধু মায়ায় পড়েছি বলে বারবার তোমার কাছে নত হই। তা না হলে যতোটা সস্তা ভাবছো, ততোটা সস্তা আমি নই…!’

চিঠিগুলোর সঙ্গে ‘১২-০৭-২০২৬’ তারিখ সংবলিত একটি পাতাও পাওয়া গেছে। ওই পাতায় ঘুমানোর আগে করণীয় কয়েকটি ধর্মীয় আমলের তালিকা লেখা রয়েছে।

পাতাটিতে লেখা- ১২-০৭-২০২৬ ঘুমানোর আগে ৬টি আমল: কালেমা পড়ে, দুরুদ শরীফ, ঘুমের দোয়া, আয়াতুল কুরসী, বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম ২১ বার, আস্তাগফিরুল্লাহ ৩ বার, আল্লাহুম্মা বিসমিকা আমুতু ওয়া এহিয়া, দুরুদ শরীফ ১১ বার, ইয়া আরহামার রাহিমিন ১১ বার।

উদ্ধার হওয়া এসব হাতে লেখা পাতায় সম্পর্ক, ভালোবাসা, বিশ্বাসভঙ্গ, আক্ষেপ এবং আত্মসম্মান রক্ষার নানা অনুভূতির প্রকাশ দেখা যায়। একই সঙ্গে একটি লেখায় ভবিষ্যৎ পরিণতি নিয়ে কঠোর সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, গতকাল রোববার রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এলাকার জাতীয় সংসদ ভবনের বিপরীতে অবস্থিত সংসদ সদস্যদের বাসভবন ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর বিল্ডিংয়ের তৃতীয় তলায় ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় সংসদ সদস্য নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগমকে প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। পরে মরিয়মের পিতা মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে আত্মহত্যা প্ররোচনায় মামলা করেন। আজ সোমবার কিছু আনুষ্ঠানিকতার পর তাদের এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জবির দ্বিতীয় সমাবর্তন ২০২৭ সালের ৩০ জানুয়ারি

মৃত্যুর আগে লেখা মরিয়মের কয়েকটি ‘চিরকুট’ আলোচনায়

প্রকাশিত সময় : ০৫:৩২:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের (১৯) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় হাতে লেখা বেশ কয়েকটি চিরকুট জব্দ করেছে পুলিশ। জাতীয় সংসদের প্যাডসহ বিভিন্ন কাগজে লেখা এসব চিরকুটে ফুটে উঠেছে এক সম্পর্কের টানাপোড়েন। কোথাও গভীর ভালোবাসা, কোথাও বিশ্বাসভঙ্গের বেদনা, আবার কোথাও রয়েছে আক্ষেপ, ক্ষোভ ও আত্মসম্মান রক্ষার দৃঢ় প্রত্যয়।

এসব চিরকুটের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার ইবনে মিজান। এসব চিরকুট প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং সর্বস্তরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

এমপি গাজী নজরুলের বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া হাতে লেখা এসব চিরকুটে উঠে এসেছে সম্পর্কের নানা আবেগঘন অধ্যায়। ভালোবাসার পাশাপাশি চিঠিগুলোতে রয়েছে প্রতারণার অভিযোগ, সম্পর্কের জটিলতা, বিশ্বাসভঙ্গ এবং তীব্র মানসিক কষ্টের বর্ণনা। কোথাও নিজেকে ‘দাবার গুটি’ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার আক্ষেপ, আবার কোথাও প্রতিকূলতার মধ্যেও ভেঙে না পড়ার এবং শেষ পর্যন্ত নিজের অবস্থানে অটুট থাকার প্রত্যয় প্রকাশ পেয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কিছু চিরকুট সাদা কাগজে কালো কালির পাশাপাশি লাল কালি দিয়ে লেখা। এর মধ্যে একটি চিরকুটে ‘বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ’ লেখা প্যাডও রয়েছে।

তবে জব্দ করা চিরকুটগুলো মরিয়ম মৃত্যুর আগে নিজেই লিখেছিলেন কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

হাতে লেখা চিরকুটগুলোতে জীবনের হতাশা ও ক্ষোভের কথা ব্যক্ত করা হয়েছে। একটি চিরকুটে লেখা রয়েছে, ‘সে ছিল অন্য নারীর স্বামী, কাগজে-কলমে অধিকার ছিল তার সতীন-বধূর। আর আমি ছিলাম বোকা! অন্য কারও স্বামীকে বানিয়েছিলাম নিজের শখের পুরুষ! কাউকে অর্ধেক পাওয়ার চেয়ে হারিয়ে ফেলা বেশি সম্মানের। কারণ, ভালোবাসা কখনোই ভাগ করে নেওয়ার বিষয় নয়।’

আরেকটি জাতীয় সংসদের প্যাডে লেখা চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘আমি হেরেছি, তুমি জিতেছো। কারণ আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছো…। দেখা যাক ওই হাসির কারণই হবে তোমার ধ্বংসের কারণ।’

অন্য একটি চিরকুটে লড়াই ও বিশ্বাসের কথা উল্লেখ করে তিনি লেখেন, ‘আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম তার সঙ্গে। তো জিততে পারিনি, হেরে গেলাম ময়দানে। জিতবোই বা কেমনে, যুদ্ধের শেষ প্রান্তে এসে দেখি তুমিই তো ছিলে বিপক্ষ দলের সেনাপতি!’

আরেকটি চিরকুটে লাল কালিতে লেখা সংক্ষিপ্ত একটি বার্তায় নিজের আত্মসম্মানের কথা তুলে ধরা হয়েছে।  তিনে লেখেন, ‘শুধু মায়ায় পড়েছি বলে বারবার তোমার কাছে নত হই। তা না হলে যতোটা সস্তা ভাবছো, ততোটা সস্তা আমি নই…!’

চিঠিগুলোর সঙ্গে ‘১২-০৭-২০২৬’ তারিখ সংবলিত একটি পাতাও পাওয়া গেছে। ওই পাতায় ঘুমানোর আগে করণীয় কয়েকটি ধর্মীয় আমলের তালিকা লেখা রয়েছে।

পাতাটিতে লেখা- ১২-০৭-২০২৬ ঘুমানোর আগে ৬টি আমল: কালেমা পড়ে, দুরুদ শরীফ, ঘুমের দোয়া, আয়াতুল কুরসী, বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম ২১ বার, আস্তাগফিরুল্লাহ ৩ বার, আল্লাহুম্মা বিসমিকা আমুতু ওয়া এহিয়া, দুরুদ শরীফ ১১ বার, ইয়া আরহামার রাহিমিন ১১ বার।

উদ্ধার হওয়া এসব হাতে লেখা পাতায় সম্পর্ক, ভালোবাসা, বিশ্বাসভঙ্গ, আক্ষেপ এবং আত্মসম্মান রক্ষার নানা অনুভূতির প্রকাশ দেখা যায়। একই সঙ্গে একটি লেখায় ভবিষ্যৎ পরিণতি নিয়ে কঠোর সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, গতকাল রোববার রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এলাকার জাতীয় সংসদ ভবনের বিপরীতে অবস্থিত সংসদ সদস্যদের বাসভবন ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর বিল্ডিংয়ের তৃতীয় তলায় ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় সংসদ সদস্য নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগমকে প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। পরে মরিয়মের পিতা মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে আত্মহত্যা প্ররোচনায় মামলা করেন। আজ সোমবার কিছু আনুষ্ঠানিকতার পর তাদের এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।