কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী ছেলে ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় শোক ও ক্ষোভে ফুঁসছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। অপ্রতিমের মৃত্যুতে শোক প্রকাশের পাশাপাশি পরিবার ও অভিভাবকদের দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিনেতা ও উপস্থাপক শাহরিয়ার নাজিম জয়।
অপ্রতিমের মৃত্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে জয় বলেন, কোনো বীভৎস ঘটনার পর মানুষ আবেগপ্রবণ হয়ে ফেসবুক কিংবা গণমাধ্যমে সরব হয়ে ওঠে। তখন রাষ্ট্রকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। তবে রাষ্ট্রের দায়িত্বের পাশাপাশি সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের দেখভাল এবং সঠিক পথে পরিচালনার প্রাথমিক দায়িত্ব পরিবারেরই বলে মনে করেন তিনি।
জয় লিখেছেন, ‘রাষ্ট্র কিন্তু আলাদা কিছু নয়। আমাদের মতো কোটি কোটি মানুষের সমষ্টি মাত্র। রাষ্ট্রের দায়িত্বের বাইরেও নিজের প্রাথমিক দায়িত্ব সব নাগরিককে নিজেরই নিতে হয়। আর আমাদের মতো দেশে তো পুরোপুরি নিতে হয়।’
পরিবারের পরিবর্তিত কাঠামোর প্রসঙ্গ টেনে জয় বলেন, একসময় পরিবারের বড় সদস্যদের মধ্যে এমন কেউ থাকতেন, যাকে পরিবারের সবাই ভয় ও শ্রদ্ধা করতেন। পরিবারের কোনো সদস্য অপরাধ করলে তাকে শাসন করার জন্য পুলিশের অপেক্ষা করতে হতো না। ওই অভিভাবকই যথেষ্ট ছিলেন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার বেড়ে যাওয়ায় পারিবারিক শাসন ও নজরদারি অনেক ক্ষেত্রে কমে গেছে বলে মনে করেন জয়। তার ভাষায়, এখন পরিবারের অভিভাবকরা জীবিকা নির্বাহ, সংসারের নানা দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে অনেক সময় সন্তানের দিকে প্রয়োজনীয় নজর দিতে পারেন না।
তিনি আরও বলেন, অনেক পরিবারে সন্তানের কোনো খারাপ দিক অন্য স্বজন জানতে পারলে নিজেদের ছোট হওয়ার আশঙ্কায় বিষয়টি গোপন করা হয়। ফলে সমস্যা তৈরি হলেও তা শুরুতেই সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয় না।
অপ্রতিমের প্রসঙ্গ তুলে জয় লিখেছেন, ‘একটি ১৩ বছরের শিশু বা কিশোর বড় বড় মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করা, আইফোন ব্যবহার করা, ভিডিও টিকটক করে টাকা-পয়সার লেনদেনে জড়িয়ে যাওয়া, যখন তখন যেখানে সেখানে চলে যাওয়ার সাহস হওয়া-সব কিছুই ধীরে ধীরে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে নিয়ে গেছে।’
অপ্রতিমের জীবনযাপন নিয়ে এসব বিষয় কীভাবে সামনে এলো, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা চলছে। তবে জয় তার বক্তব্যে মূলত এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের অভিভাবকদের আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাই তুলে ধরেছেন।
অপ্রতিমের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন জয়। তিনি লিখেছেন, ‘মৃত্যুর পর রাষ্ট্রের দোষ। ওর দোষ। তার দোষ। দোষ আসলে কারোরই না। আবার দোষ সবার। প্রতিদিন আমরা দোষ করে করে দোষের বোঝা পাহাড় সমতুল্য করে ফেলছি। তাই কোনো না কোনো বীভৎস দিনে আমরা হারিয়ে ফেলেছি আমাদের সন্তানকে।’
পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করে জয় বলেন, হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পুলিশ দ্রুত কাজ করতে পারে। তবে সন্তানকে সঠিক পথে পরিচালনা করার দায়িত্ব পরিবারকেই নিতে হবে। দুর্ঘটনা বা অপরাধ ঘটে যাওয়ার পর রাষ্ট্রের সহযোগিতা পাওয়া গেলেও হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
এ প্রসঙ্গে ‘ফ্যামিলি পুলিশ’র প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন জয়। তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের ফ্যামিলিগুলোতে কোনো গার্জিয়ান নাই। একজন ফ্যামিলি পুলিশ নাই। যার কথায়, যার হুঙ্কারে পুরো ফ্যামিলি কেঁপে ওঠে। যার প্রতি শ্রদ্ধায় সবাই অবনত থাকে।’
জয়ের মতে, পরিবারে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও অনেক সময় সেগুলোকে পারিবারিক বিষয় হিসেবে দেখা হয়। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের ভেতর থেকেই দায়িত্বশীল কাউকে কঠোরভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
অপ্রতিমের মৃত্যুকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন না জয়। বরং কিশোরদের নিয়ে আরও বেশি কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তার আশঙ্কা, কিশোরদের সঠিক পথে পরিচালনা করা না গেলে তাদের অনেকেই ভবিষ্যতে বিপথগামী হয়ে সমাজের জন্য আরও বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
স্ট্যাটাসের শেষ দিকে জয় লিখেছেন, ‘কিশোর বাঁচান। দেশ বাঁচান। ফ্যামিলি প্রধান কঠোর হোন। আবারও বলছি, বর্তমান সময়ের একক পরিবারগুলোর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে উই নিড ফ্যামিলি পুলিশ।’

রিপোর্টারের নাম 





















