ইসলামী শরিয়ত মোহরের সর্বনিম্ন পরিমাণ নির্ধারণ করে দিলেও সর্বোচ্চ পরিমাণ স্বামীর সামর্থ্যের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। তবে ইসলাম মোহর নিয়ে প্রতিযোগিতা, অহেতুক উচ্চ মোহর নির্ধারণ থেকে নিরুৎসাহ করেছে। নিম্নে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
বিয়ে শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান।
ইসলাম বিয়ে ও সাংসারিক জীবনের প্রতি উৎসাহিত করেছে এবং সংসারবিমুখতাকে নিরুৎসাহ করেছে। সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য বিয়ে করা আবশ্যক। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে যারা আইয়িম (সঙ্গীহীন) তাদের বিয়ে সম্পাদন করো এবং তোমাদের দাস ও দাসীদের মধ্যে যারা সৎ তাদেরও। তারা অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘বিয়ে আমার সুন্নত, যে আমার সুন্নত অনুযায়ী আমল করে না সে আমার (উম্মতের) অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৮৪৬)
মোহর অপরিহার্য
বিয়ের অপরিহার্য অনুষঙ্গ মোহর। শরিয়তের দৃষ্টিতে মোহর ছাড়া বিয়ে শুদ্ধ নয়। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আর তোমরা নারীদেরকে তাদের মোহর স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে প্রদান করবে; সন্তুষ্ট চিত্তে তারা মোহরের কিছু অংশ ছেড়ে দিলে তোমরা তা স্বচ্ছন্দে ভোগ করবে।
(সুরা : নিসা, আয়াত : ৪)
মোহর নির্ধারণের ভিত্তি
ইসলামী শরিয়ত মোহর নির্ধারণের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয়কে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে। তাহলো—
১. পারস্পরিক বোঝাপড়া : বর ও কনে অথবা তাদের অভিভাবকরা পরস্পরের বোঝাপড়া ও সম্মতির ভিত্তিতে যে মোহর নির্ধারণ করবে শরিয়ত তা অনুমোদন করে। শর্ত হলো, তা শরিয়ত নির্ধারিত সর্বনিম্ন মোহরের চেয়ে কম হতে পারবে না। হানাফি মাজহাব অনুসারে সর্বনিম্ন মোহর ১০ দিরহাম।
২. কনের বংশ মর্যাদা : যদি বর-কনে অথবা তাদের অভিভাবকরা বিয়েতে কোনো মোহর নির্ধারণ ছাড়াই বিয়ে সম্পন্ন করে, তবে মেয়ে ‘মোহরে মেছেল’ বা উপযুক্ত মোহর লাভ করবে। আর তা নির্ধারিত হবে কনের স্ববংশীয় নারীদের মোহরের অনুরূপ। স্ববংশীয় নারী বলতে নিজের বোন, চাচাতো বোন ও ফুফি উদ্দেশ্য।
৩. বরের সামর্থ্য : উল্লিখিত দুটি ভিত্তির সঙ্গে ইসলাম বরের সামর্থ্যকেও ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে। নিম্নোক্ত হাদিস থেকে যা অনুমান করা যায়—আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.)-এর কাছে এক ব্যক্তি উপস্থিত হয়ে বলল, আমি একজন আনসারি নারীকে বিয়ে করেছি। নবী (সা.) তাকে বললেন, …কী পরিমাণের বিনিময়ে তুমি তাকে বিয়ে করছ? লোকটি বলল, চার উকিয়ার বিনিময়ে। তখন নবী (সা.) তাকে বললেন, চার উকিয়ার বিনিময়ে! মনে হয় তোমরা পাহাড়ের পার্শ্বদেশ থেকে রৌপ্য খুঁড়ে এনে থাকো। আমাদের কাছে এমন কিছু নেই যা দিয়ে তোমাকে দান করতে পারি। তবে আমি তোমাকে শিগগিরই একটি যুদ্ধাভিযানে পাঠিয়ে দিচ্ছি, যার লব্ধ গনিমত থেকে তুমি একাংশ লাভ করতে পারবে।
(সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৪২৪)
মোহর নির্ধারণে শরয়ি দৃষ্টিকোণ
মোহর নির্ধারণের ক্ষেত্রে শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি হলো তা স্ত্রীর সম্মান ও স্বামীর সামর্থ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ ক্ষেত্রে সহজতার পথ অবলম্বন করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘অধিক বরকতময় বিয়ে সেটি যার মোহর সহজ হয়।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২৪৫২৯)
আবুল আজফা সুলামি (রহ.) থেকে বর্ণিত, একবার উমর (রা.) আমাদের উদ্দেশ্যে ভাষণে বলেন, সাবধান! তোমরা নারীদের মোহর নির্ধারণে সীমা লঙ্ঘন কোরো না। কারণ যদি তা দুনিয়ার মর্যাদার বস্তু হতো এবং আল্লাহর কাছে পরহেজগারীর বস্তু হতো, তবে তোমাদের চেয়ে নবী (সা.) এর যোগ্যতম ব্যক্তি। অথচ তিনি তাঁর স্ত্রীদের কারো মোহর এবং তাঁর কন্যাদের কারো মোহর ১২ উকিয়ার অধিক ধার্য করেননি। (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ২১০৬)
হাদিসের আলোকে ইবনে কুদামা (রহ.) বলেন, মোহর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মোহরের চেয়ে বেশি হওয়া অনুত্তম। কেননা মোহর বেশি হলে স্বামী হয়তো তা আদায়ে অক্ষম হবে এবং সে দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
(আল মুগনি : ৬/৬৮২)
উচ্চ মোহর নিষিদ্ধ নয়
ইসলামী শরিয়ত মোহরের সর্বনিম্ন পরিমাণ নির্ধারণ করে দিলেও সর্বোচ্চ পরিমাণ নির্ধারণ করে দেয়নি। ফকিহরা এ বিষয়ে একমত যে মোহরের সর্বোচ্চ কোনো সীমা নেই। কেননা সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারক কোনো দলিল কোরআন ও সুন্নাহে পাওয়া যায় না, বরং পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত থেকে ধারণা মেলে নারীর মোহর বিপুল পরিমাণে হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যদি এক স্ত্রীর স্থলে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করা স্থির করো এবং তাদের একজনকে অগাধ অর্থও দিয়ে থাকো, তবু তা থেকে কিছুই ফিরিয়ে নিয়ো না।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২০)
‘তাদের একজনকে অগাধ অর্থও দিয়ে থাকো’ বাক্যটি ইঙ্গিত করে নারীদের মোহর বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সম্পত্তি হতে পারে। তাই কোনো স্বামীর সামর্থ্য থাকলে সে স্ত্রীকে যত খুশি মোহর দিতে পারে।
(আল ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু : ৯/৬৭৬৩; আল মুসতাদরাক আলা মাজমুউইল ফাতাওয়া : ৪/১৮৬)
উচ্চ মোহর নিরুৎসাহ করা হয় কেন
উচ্চ মোহর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা ও শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এ জন্য পূর্বসূরি আলেমরা উচ্চ মোহর নির্ধারণের ব্যাপারে নিরুৎসাহ করেছেন। ইবনুল কাইয়িম জাওজি (রহ.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই বিয়েতে মোহর নির্ধারণে বাড়াবাড়ি করা (উচ্চ মোহর দাবি করা) মাকরুহ। কেননা তা বিয়ের বরকত নষ্ট করে এবং বিয়েকে কঠিন করে। (জাদুল মাআদ : ৫/১৭৬)
আল্লামা ইবনুল আরাবি (রহ.) বলেছেন, মানুষ মোহর নিয়ে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ও গর্বে লিপ্ত হয়েছে। এমনকি একজন নারীর মোহর এক লাখ মুদ্রায় পৌঁছেছে। অথচ খুব কম মানুষই হালাল উপায়ে তা অর্জন করতে পারে। (আহকামুল কোরআন)
উচ্চ মোহরের প্রবণতা ও তার ক্ষতি
উচ্চ মোহর নির্ধারণের প্রবণতা তৈরি হওয়ায় সমাজ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আলেমদের দৃষ্টিতে এমন কয়েকটি ক্ষতি হলো—
১. বিয়ে কঠিন হওয়া : ইসলাম বিয়েকে সহজ করতে চায়। অথচ উচ্চ মোহরের প্রবণতা যুবকদের বিয়ের সামর্থ্যকে সংকীর্ণ করছে, বিয়েকে কঠিন করে তুলছে। ফলে যুবকরা বিলম্বে বিয়ে করতে বাধ্য হচ্ছে, যা সমাজের নৈতিক স্খলন বৃদ্ধি করছে।
২. অর্থবিত্তকে প্রাধান্য দেওয়া : রাসুলুল্লাহ (সা.) পাত্র-পাত্রী নির্ধারণে দ্বিনদারিকে প্রাধান্য দিতে বলেছেন; কিন্তু উচ্চ মোহরের প্রবণতার ফলে পাত্র ও পাত্রী নির্বাচনে অর্থবিত্তকেই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
৩. মোহর আদায় না করা : বর্তমানে বহু যুবক সামাজিক চাপে অথবা কনে পক্ষের চাপে পড়ে সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে উচ্চ মোহর দিয়ে বিয়ে করে। এই মোহর আদায়ে না আছে তার সামর্থ্য, না আছে তার ইচ্ছা। অথচ শরিয়তের দৃষ্টিতে মোহর আদায় করা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং তা ওয়াজিব। মোহর আদায় না করা এবং মোহরের ব্যাপারে মিথ্যাচার করা মারাত্মক গুনাহের কাজ। ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, নবী (সা.) ছাড়া অন্য কারো জন্য কোনো নারীকে মোহর ছাড়া বিয়ে করা বৈধ নয়, মোহর দেওয়া ওয়াজিব। মোহর নির্ধারণে মিথ্যাচার করাও বৈধ নয়। (তাফসিরে কুরতুবি : ৬/৪৪)
৪. প্রতারণার মাধ্যম হওয়া : উচ্চ মোহরের প্রবণতা বিয়েকে প্রতারণার মাধ্যমে পরিণত করেছে, বিশেষত সমাজের উচ্চ শ্রেণিতে। সম্প্রতি জাতীয় গণমাধ্যমে এমন একাধিক নারীর সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, যাদের কাজই হলো প্রতারণার মাধ্যমে বিয়ে করে উচ্চ পরিমাণে মোহর হাতিয়ে নেওয়া।
৫. অসন্তোষ নিয়ে জীবন যাপন করা : ইসলাম দাম্পত্য জীবনকে ‘ভালোবাসা, দয়া ও সহানুভূতির মাধ্যম’ বলেছে (সুরা : রোম, আয়াত : ২১); কিন্তু সামাজিক চাপে স্বামী যখন সামর্থ্যের বাইরে উচ্চ মোহর দিয়ে বিয়ে করে তখন দাম্পত্য জীবন তার কাছে বোঝা মনে হয়। অন্যদিকে কখনো কখনো স্ত্রীও উচ্চ মোহরকে নিজের রক্ষাকবচ ভেবে স্বামীর প্রতি বেপরোয়া আচরণ করতে থাকে।
উচ্চ মোহর রক্ষাকবচ নয়
বর্তমান সমাজে বহু মেয়ের পরিবার উচ্চ মোহরকে মেয়ের দাম্পত্য জীবনের জন্য রক্ষাকবচ মনে করে। তারা ভাবে বেশি পরিমাণে মোহর নির্ধারণ করলে মেয়েকে সহজে তালাক দিতে পারবে না। অথচ এমনও হয় কখনো কখনো মেয়ে অতিষ্ঠ হয়ে স্বামীর কাছে তালাক প্রত্যাশা করে অথচ মোহরের ভয়ে স্বামী তাকে তালাক দেয় না। প্রকৃত পক্ষে উচ্চ মোহর মেয়ে বা তার দাম্পত্য জীবনের নিরাপত্তা দিতে পারে না। দাম্পত্য জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ছেলের উত্তম গুণাবলি ও সচ্চরিত্র। এ জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা যে ব্যক্তির দ্বিনদারি ও নৈতিক চরিত্রে সন্তুষ্ট আছ, তোমাদের নিকট সে ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব করলে তবে তার সঙ্গে (মেয়ের) বিয়ে দাও। তা যদি না করো, তাহলে পৃথিবীতে ফিতনা-ফ্যাসাদ ও চরম বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।’
(জামে তিরমিজি, হাদিস : ১০৮৪)
আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।

রিপোর্টারের নাম 
























