মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬, ২২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তাড়া প্রবণতা মানুষের মজ্জাগত স্বভাব

মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

خُلِقَ الۡاِنۡسَانُ مِنۡ عَجَلٍ ؕ سَاُورِیۡكُمۡ اٰیٰتِیۡ فَلَا تَسۡتَعۡجِلُوۡنِ

সরল অনুবাদ :
‘মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে তাড়াহুড়ার প্রবণতা দিয়ে। অচিরেই আমি তোমাদের আমার নিদর্শনাবলী দেখাব। সুতরাং তোমরা তাড়াহুড়া কোরো না।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ৩৭)

সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা :
মহানবী (সা.) যখন দুনিয়া বা আখেরাতের শাস্তি সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করতেন, তখন কাফেররা তা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত।

তারা বলত, বেশ তো সেই শাস্তি এখনই নিয়ে এসো না! আয়াতে তাদের জবাব দেওয়া হয়েছে। (তাফসিরে তাওজিহুল কোরআন)
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা মানব জাতির ত্বরা প্রবণতার বর্ণনাও দিয়েছেন যে, মানুষ সৃষ্টিগত ভাবেই তাড়া প্রবণ। কিন্তু আল্লাহ তাআলা অত্যাচারীদের অবকাশ দিয়ে থাকেন। তারপর যখন তাদের পাকড়াও করেন তখন আর ছাড় দেন না।

এজন্যেই তিনি বলেন, আমি তোমাদের আমার নিদর্শনাবলী দেখাবো। তাদের শাস্তি কত কঠোর তা তোমরা অবশ্যই দেখতে পাবে। তোমরা অপেক্ষা করতে থাকে এবং আমাকে তাদের শাস্তির ব্যাপারে ত্বরা করতে বলো না। (তাফসিরে মাআরিফুল কোরআন)
তাড়া প্রবণতার মানে হচ্ছে, কোন কাজ সময়ের পূর্বেই করা।

এটা স্বাভাবিক দৃষ্টিতে নিন্দনীয়। কোরআনের অন্যত্রও একে মানুষের দুর্বলতারূপে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘মানুষ অত্যন্ত ত্বরাপ্রবন।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ১১) আলোচ্য আয়াতের উদ্দেশ্য হল, মানুষের মজ্জায় যেসব দুর্বলতা নিহিত আছে, তন্মধ্যে এক প্রকার দুর্বলতা হচ্ছে তাড়া প্রবণতা। স্বভাবগত ও মজ্জাগত বিষয়কে আরবরা এভাবেই ব্যক্ত করে।

(কুরতুবি,তাফসিরে জাকারিয়া)
যেহেতু মানুষের প্রকৃতিই হল তাড়াহুড়ো করা, সেহেতু তারা নবীর সঙ্গেও আজাব চাওয়ার ব্যাপারেও ঠাট্টা করে তাড়াহুড়া করতে শুরু করে। তারা বলত, তোমার আল্লাহকে বলো, আমাদের উপর যেন অতি শীঘ্রই আজাব অবতীর্ণ করা হয়। আল্লাহ বললেন, তাড়াহুড়া কোরো না, আমি অবশ্যই তোমাদের আমার নির্দশনাবলী দেখাব। এখানে নির্দশন বলতে আজাবও হতে পারে আবার মহানবী (সা.)-এর সত্যতার দলিল-প্রমাণাদিও হতে পারে। (তাফসিরে আহসানুল বায়ান)

শিক্ষা ও বিধান
১. মানুষ স্বভাবগতভাবেই তাড়াহুড়াপ্রবণ। মানুষ দ্রুত ফলাফল চায়, অপেক্ষা করতে চায় না, সব কিছু তাড়াতাড়ি পেতে চায়। তাই এই দুর্বলতাকে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

২. আল্লাহ তাআলা সময়মতো সবকিছু ঘটান—কখনো আগেও না, দেরিতেও না। যে ব্যক্তি ধৈর্য ধরে, সে-ই শেষ পর্যন্ত সফল হয়।

৩. আল্লাহর নিদর্শন অবশ্যই প্রকাশ পাবে। তা দুনিয়াতে কিংবা আখিরাতে। তাই অবিশ্বাস বা সন্দেহে না পড়ে, আল্লাহর প্রতিশ্রুতির ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখা উচিত।

৪. অনেক সময় মানুষ কোনো চিন্তা-ভাবনা না করে দ্রুতই শাস্তি, ফলাফল বা সিদ্ধান্ত পেতে চায়—এটি সঠিক নয়। বরং জীবনের প্রতিটি বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করে, সময় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

৫. আল্লাহর আল্লাহর পরিকল্পনা সর্বোত্তম। আমরা যা দেরি মনে করি, সেটাই হয়তো আমাদের জন্য উত্তম সময়। তাই নিজের ইচ্ছার চেয়ে আল্লাহর সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

৬. অনেক সময় দোয়া কবুল হতে দেরি হয়, বিপদ দূর হতে সময় লাগে—এগুলোই পরীক্ষা। তাই ধৈর্য ধরে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখলে প্রতিদান অবশ্যই পাওয়া যাবে। (ইনশাআল্লাহ)

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

তাড়া প্রবণতা মানুষের মজ্জাগত স্বভাব

প্রকাশিত সময় : ১২:৫৬:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬

মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

خُلِقَ الۡاِنۡسَانُ مِنۡ عَجَلٍ ؕ سَاُورِیۡكُمۡ اٰیٰتِیۡ فَلَا تَسۡتَعۡجِلُوۡنِ

সরল অনুবাদ :
‘মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে তাড়াহুড়ার প্রবণতা দিয়ে। অচিরেই আমি তোমাদের আমার নিদর্শনাবলী দেখাব। সুতরাং তোমরা তাড়াহুড়া কোরো না।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ৩৭)

সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা :
মহানবী (সা.) যখন দুনিয়া বা আখেরাতের শাস্তি সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করতেন, তখন কাফেররা তা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত।

তারা বলত, বেশ তো সেই শাস্তি এখনই নিয়ে এসো না! আয়াতে তাদের জবাব দেওয়া হয়েছে। (তাফসিরে তাওজিহুল কোরআন)
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা মানব জাতির ত্বরা প্রবণতার বর্ণনাও দিয়েছেন যে, মানুষ সৃষ্টিগত ভাবেই তাড়া প্রবণ। কিন্তু আল্লাহ তাআলা অত্যাচারীদের অবকাশ দিয়ে থাকেন। তারপর যখন তাদের পাকড়াও করেন তখন আর ছাড় দেন না।

এজন্যেই তিনি বলেন, আমি তোমাদের আমার নিদর্শনাবলী দেখাবো। তাদের শাস্তি কত কঠোর তা তোমরা অবশ্যই দেখতে পাবে। তোমরা অপেক্ষা করতে থাকে এবং আমাকে তাদের শাস্তির ব্যাপারে ত্বরা করতে বলো না। (তাফসিরে মাআরিফুল কোরআন)
তাড়া প্রবণতার মানে হচ্ছে, কোন কাজ সময়ের পূর্বেই করা।

এটা স্বাভাবিক দৃষ্টিতে নিন্দনীয়। কোরআনের অন্যত্রও একে মানুষের দুর্বলতারূপে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘মানুষ অত্যন্ত ত্বরাপ্রবন।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ১১) আলোচ্য আয়াতের উদ্দেশ্য হল, মানুষের মজ্জায় যেসব দুর্বলতা নিহিত আছে, তন্মধ্যে এক প্রকার দুর্বলতা হচ্ছে তাড়া প্রবণতা। স্বভাবগত ও মজ্জাগত বিষয়কে আরবরা এভাবেই ব্যক্ত করে।

(কুরতুবি,তাফসিরে জাকারিয়া)
যেহেতু মানুষের প্রকৃতিই হল তাড়াহুড়ো করা, সেহেতু তারা নবীর সঙ্গেও আজাব চাওয়ার ব্যাপারেও ঠাট্টা করে তাড়াহুড়া করতে শুরু করে। তারা বলত, তোমার আল্লাহকে বলো, আমাদের উপর যেন অতি শীঘ্রই আজাব অবতীর্ণ করা হয়। আল্লাহ বললেন, তাড়াহুড়া কোরো না, আমি অবশ্যই তোমাদের আমার নির্দশনাবলী দেখাব। এখানে নির্দশন বলতে আজাবও হতে পারে আবার মহানবী (সা.)-এর সত্যতার দলিল-প্রমাণাদিও হতে পারে। (তাফসিরে আহসানুল বায়ান)

শিক্ষা ও বিধান
১. মানুষ স্বভাবগতভাবেই তাড়াহুড়াপ্রবণ। মানুষ দ্রুত ফলাফল চায়, অপেক্ষা করতে চায় না, সব কিছু তাড়াতাড়ি পেতে চায়। তাই এই দুর্বলতাকে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

২. আল্লাহ তাআলা সময়মতো সবকিছু ঘটান—কখনো আগেও না, দেরিতেও না। যে ব্যক্তি ধৈর্য ধরে, সে-ই শেষ পর্যন্ত সফল হয়।

৩. আল্লাহর নিদর্শন অবশ্যই প্রকাশ পাবে। তা দুনিয়াতে কিংবা আখিরাতে। তাই অবিশ্বাস বা সন্দেহে না পড়ে, আল্লাহর প্রতিশ্রুতির ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখা উচিত।

৪. অনেক সময় মানুষ কোনো চিন্তা-ভাবনা না করে দ্রুতই শাস্তি, ফলাফল বা সিদ্ধান্ত পেতে চায়—এটি সঠিক নয়। বরং জীবনের প্রতিটি বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করে, সময় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

৫. আল্লাহর আল্লাহর পরিকল্পনা সর্বোত্তম। আমরা যা দেরি মনে করি, সেটাই হয়তো আমাদের জন্য উত্তম সময়। তাই নিজের ইচ্ছার চেয়ে আল্লাহর সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

৬. অনেক সময় দোয়া কবুল হতে দেরি হয়, বিপদ দূর হতে সময় লাগে—এগুলোই পরীক্ষা। তাই ধৈর্য ধরে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখলে প্রতিদান অবশ্যই পাওয়া যাবে। (ইনশাআল্লাহ)