প্রকাশিত সময় :
১১:১৫:৫৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬
৬
কোরবানির ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম সমাজে নানা ধরনের ধর্মীয় জিজ্ঞাসা দেখা দেয়। এর মধ্যে একটি অন্যতম প্রচলিত প্রশ্ন হলো—স্ত্রীর দেনমোহর বা মোহরানা বাকি রেখে স্বামী কোরবানি দিতে পারবেন কি না? কিংবা দেনমোহর বাকি থাকলে স্বামীর ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয় কি না?
ইসলামি আইন ও ফিকাহ শাস্ত্রের আলোকে এই বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা রয়েছে। শরীয়তের দৃষ্টিতে দেনমোহর ও কোরবানি সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। দেনমোহর হচ্ছে স্ত্রীর প্রাপ্য অধিকার (হক), আর কোরবানি হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা একটি আর্থিক ইবাদত।
দেনমোহর কি কোরবানির বাধা?
যতদিন পর্যন্ত স্বামী তাঁর স্ত্রীর দেনমোহর পুরোপুরি পরিশোধ না করেন, ততদিন তা স্বামীর ওপর ‘ঋণ’ হিসেবেই গণ্য থাকে। তবে ফিকহের বিখ্যাত কিতাব ‘বাদায়েউস সানায়ে’ ও ‘রদ্দুল মুহতার’-এর বর্ণনা অনুযায়ী, এই ঋণকে এক ধরনের বিশেষ বা দুর্বল ঋণ (দাইনে জইফ) বলা হয়। যেহেতু এটি কোনো ব্যবসায়িক লেনদেন বা সরাসরি ধন-সম্পদ বিনিময়ের মাধ্যমে তৈরি হয়নি, তাই এই ঋণ স্বামীর মালিকানাধীন বর্তমান নগদ অর্থ বা সম্পদের ওপর সরাসরি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে না।
সহজ কথায়, স্ত্রীর দেনমোহর বাকি থাকলেও স্বামীর কোরবানি দেওয়া সম্পূর্ণ জায়েজ। তবে এ ক্ষেত্রে স্বামীর ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে কি না, তা মূলত দুটি অবস্থার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়:
প্রথমত: দেনমোহর বাকি থাকা সত্ত্বেও যদি কোরবানির দিনগুলোতে (১০ থেকে ১২ জিলহজ) জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় খরচের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ (সাড়ে সাত তোলা সোনা বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা অথবা সমমূল্যের নগদ অর্থ ও সম্পদ) মালিকানা স্বামীর কাছে থাকে, তবে তাঁর ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব।
দ্বিতীয়ত: স্ত্রীর দেনমোহরের দাবি যদি তাৎক্ষণিক হয় এবং তা পরিশোধ করার পর বা হিসাব থেকে বাদ দেওয়ার পর স্বামীর কাছে আর কোনো অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ উদ্বৃত্ত না থাকে, তবে তাঁর ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে না। অর্থাৎ, এই অবস্থায় কোরবানি না করলে তিনি গুনাহগার হবেন না।
ফিকহ শাস্ত্রের প্রমাণ
ইসলামি ফিকাহর নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ বাদায়েউস সানায়ে (২য় খণ্ড, ৩৯২ পৃষ্ঠা)-এ উল্লেখ করা হয়েছে যে, যে ঋণ সম্পদের বিনিময়ে নয়—যেমন মোহরানা, তা কোরবানিদাতার সামর্থ্য বা নিসাবের ওপর সরাসরি বাধা সৃষ্টি করে না। একই ধরনের ব্যাখ্যা পাওয়া যায় বিখ্যাত ফতোয়া গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার (৯ম খণ্ড, ৪৫৩ পৃষ্ঠা)-এ।
ইসলামি চিন্তাবিদদের পরামর্শ
ইসলামি চিন্তাবিদ ও আলেমদের মতে, দেনমোহর বাকি রেখে কোরবানি দিলে কোরবানি নিশ্চিতভাবেই আদায় হয়ে যাবে। তবে সামর্থ্য থাকার পরও স্ত্রীর দেনমোহর বছরের পর বছর আটকে রাখা মোটেও উচিত নয়। কোরবানির মতো ত্যাগ ও মহিমান্বিত ইবাদতের প্রস্তুতির পাশাপাশি স্ত্রীর প্রাপ্য অধিকার দ্রুত পরিশোধ করে দেওয়ার ব্যাপারেও স্বামীদের সমানভাবে সচেতন ও আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন।