শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ১৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুই পা নেই, হাতে ভর করে এগিয়ে চলেছে জান্নাতুলের স্বপ্ন

জন্ম থেকেই নেই দুই পা। ফলে অন্যদের মতো স্বাভাবিকভাবে হাঁটা বা ইচ্ছেমতো ছুটে বেড়ানো কখনো হয়ে ওঠেনে তার জীবনের অংশ। তবে, শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাকে কখনোই থামিয়ে রাখতে পারেনি সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে। হাজারো প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করে উচ্চ শিক্ষর স্বপ্ন বুকে লালন করে দুই হাতের ওপর ভর করে এগিয়ে চলেছেন ১৯ বছর বয়সী জান্নাতুল ফেরদৌস।

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার পূর্ণিমাগাঁতী ইউনিয়নের ভেংরি গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তান জান্নাতুল। ভেংরি দাখিল মাদ্রাসা থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জনের পর বর্তমানে হামিদা পাইলট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের মানবিক বিভাগে পড়ালেখা করছেন তিনি। তার শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে বড় বাধা এখন দারিদ্র্য।

জানা গেছে, প্রতিদিন কলেজে যেতে প্রায় সাত কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয় জান্নাতুলকে। যাতায়াতে খরচ হয় প্রায় ১২০ টাকা। রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করা বাবা জাহাঙ্গীর হোসেনের পক্ষে প্রতিদিন এই খরচ বহন করা সম্ভব নয়। ফলে মাসে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় দিন কলেজে যেতে পারেন জান্নাতুল। বাকি সময় ঘরে বসেই চালিয়ে যান পড়ালেখা।

সাহসী শিক্ষার্থী জান্নাতুল বলেন, “আমি দুই হাতের ওপর ভর দিয়ে চলাফেরা করি। নিয়মিত কলেজে যেতে খুব কষ্ট হয়। বাবার পক্ষে প্রতিদিন যাতায়াতের খরচ দেওয়া সম্ভব নয়। তাই অনেক ক্লাসই করতে পারি না। যদি একটি তিন চাকার স্কুটি পেতাম, তাহলে প্রতিদিন কলেজে যেতে পারতাম। আমি শুধু পড়ালেখা চালিয়ে যেতে চাই।”

মেয়ের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে চোখ ভিজে আসে মা সাহারা খাতুনের। তিনি বলেন, “মেয়ের কষ্ট সহ্য করতে পারি না। অর্থের অভাবে ওর জন্য কিছুই করতে পারছি না। একজন মা হিসেবে এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে। সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষ যদি পাশে দাঁড়ান, তাহলে আমার মেয়েটা তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে।”

জান্নাতুল ফেরদৌস

আবেগাপ্লুত বাবা জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, “আমি দিনমজুর মানুষ। সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হয়। মেয়েটা খুব মেধাবী। ওর ইচ্ছা অনেক বড়, কিন্তু অভাবের কাছে আমি অসহায়। যদি কেউ একটি স্কুটির ব্যবস্থা করে দিতেন, তাহলে আমার মেয়েটা নিয়মিত কলেজে যেতে পারত।”

হামিদা পাইলট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, “জান্নাতুল অত্যন্ত মেধাবী ও অধ্যবসায়ী একজন শিক্ষার্থী। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনোই তার শেখার আগ্রহ কমাতে পারেনি। কলেজের পক্ষ থেকে আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করছি। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ এগিয়ে এলে তার শিক্ষাজীবন আরো সহজ হবে।”

দ্য বার্ড সেফটি হাউজের চেয়ারম্যান ও পরিবেশকর্মী মামুন বিশ্বাস বলেন, “একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন যেন অর্থের অভাবে থেমে না যায়। সবাই মিলে পাশে দাঁড়ালে জান্নাতুলের মতো আরো অনেক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ আলোকিত হবে। বর্তমানে তার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন প্রায় দেড় লাখ টাকা মূল্যের একটি তিন চাকার স্কুটি।”রাইজিংবিডি.কম

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

দুই পা নেই, হাতে ভর করে এগিয়ে চলেছে জান্নাতুলের স্বপ্ন

প্রকাশিত সময় : ১২:২৫:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

জন্ম থেকেই নেই দুই পা। ফলে অন্যদের মতো স্বাভাবিকভাবে হাঁটা বা ইচ্ছেমতো ছুটে বেড়ানো কখনো হয়ে ওঠেনে তার জীবনের অংশ। তবে, শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাকে কখনোই থামিয়ে রাখতে পারেনি সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে। হাজারো প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করে উচ্চ শিক্ষর স্বপ্ন বুকে লালন করে দুই হাতের ওপর ভর করে এগিয়ে চলেছেন ১৯ বছর বয়সী জান্নাতুল ফেরদৌস।

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার পূর্ণিমাগাঁতী ইউনিয়নের ভেংরি গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তান জান্নাতুল। ভেংরি দাখিল মাদ্রাসা থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জনের পর বর্তমানে হামিদা পাইলট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের মানবিক বিভাগে পড়ালেখা করছেন তিনি। তার শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে বড় বাধা এখন দারিদ্র্য।

জানা গেছে, প্রতিদিন কলেজে যেতে প্রায় সাত কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয় জান্নাতুলকে। যাতায়াতে খরচ হয় প্রায় ১২০ টাকা। রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করা বাবা জাহাঙ্গীর হোসেনের পক্ষে প্রতিদিন এই খরচ বহন করা সম্ভব নয়। ফলে মাসে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় দিন কলেজে যেতে পারেন জান্নাতুল। বাকি সময় ঘরে বসেই চালিয়ে যান পড়ালেখা।

সাহসী শিক্ষার্থী জান্নাতুল বলেন, “আমি দুই হাতের ওপর ভর দিয়ে চলাফেরা করি। নিয়মিত কলেজে যেতে খুব কষ্ট হয়। বাবার পক্ষে প্রতিদিন যাতায়াতের খরচ দেওয়া সম্ভব নয়। তাই অনেক ক্লাসই করতে পারি না। যদি একটি তিন চাকার স্কুটি পেতাম, তাহলে প্রতিদিন কলেজে যেতে পারতাম। আমি শুধু পড়ালেখা চালিয়ে যেতে চাই।”

মেয়ের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে চোখ ভিজে আসে মা সাহারা খাতুনের। তিনি বলেন, “মেয়ের কষ্ট সহ্য করতে পারি না। অর্থের অভাবে ওর জন্য কিছুই করতে পারছি না। একজন মা হিসেবে এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে। সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষ যদি পাশে দাঁড়ান, তাহলে আমার মেয়েটা তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে।”

জান্নাতুল ফেরদৌস

আবেগাপ্লুত বাবা জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, “আমি দিনমজুর মানুষ। সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হয়। মেয়েটা খুব মেধাবী। ওর ইচ্ছা অনেক বড়, কিন্তু অভাবের কাছে আমি অসহায়। যদি কেউ একটি স্কুটির ব্যবস্থা করে দিতেন, তাহলে আমার মেয়েটা নিয়মিত কলেজে যেতে পারত।”

হামিদা পাইলট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, “জান্নাতুল অত্যন্ত মেধাবী ও অধ্যবসায়ী একজন শিক্ষার্থী। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনোই তার শেখার আগ্রহ কমাতে পারেনি। কলেজের পক্ষ থেকে আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করছি। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ এগিয়ে এলে তার শিক্ষাজীবন আরো সহজ হবে।”

দ্য বার্ড সেফটি হাউজের চেয়ারম্যান ও পরিবেশকর্মী মামুন বিশ্বাস বলেন, “একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন যেন অর্থের অভাবে থেমে না যায়। সবাই মিলে পাশে দাঁড়ালে জান্নাতুলের মতো আরো অনেক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ আলোকিত হবে। বর্তমানে তার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন প্রায় দেড় লাখ টাকা মূল্যের একটি তিন চাকার স্কুটি।”রাইজিংবিডি.কম