বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৭৩ মুসলিম পরিবারের বাড়ি ভাঙা ‘অবৈধ’

ভারতের আসাম রাজ্যের গোয়ালপাড়ায় ৭৩টি বাঙালি মুসলিম পরিবারের বাড়ি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়ার ঘটনায় আসাম প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন গুয়াহাটি হাইকোর্ট। আদালতের পর্যবেক্ষণ, ব্যক্তিগত কৃষিজমিতে তৈরি বাড়িগুলো ভেঙে ফেলার প্রশাসনিক পদক্ষেপ ‘প্রাথমিকভাবে অবৈধ ও অননুমোদিত বলে প্রতীয়মান’ হচ্ছে। একই সঙ্গে এতে স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের নীতি লঙ্ঘিত হয়েছে বলেও পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন আদালত।

অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৭ সেপ্টেম্বর গোয়ালপাড়া জেলা প্রশাসন ৭৩টি পরিবারের বাড়ি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেয়। তার মাত্র দু’দিন আগে (৫ সেপ্টেম্বর) সার্কেল অফিসারের পক্ষ থেকে বাসিন্দাদের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। নোটিশে বলা হয়, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কৃষিজমিতে তৈরি বাড়ি সরিয়ে না নিলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রশাসনের ওই নোটিশে আসাম ভূমি ও রাজস্ব সংক্রান্ত ১৮৮৬ সালের বিধান এবং ২০০৫ সালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনের উল্লেখ করা হয়েছিল।

এই নোটিশকে চ্যালেঞ্জ করে ২১ জন বাসিন্দা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। তাদের অভিযোগ, প্রশাসনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল বা নিজেদের বক্তব্য জানানোর পর্যাপ্ত সুযোগ তাদের দেওয়া হয়নি।

মামলার শুনানিতে আদালত ২০১৫ সালের আসাম ভূমি পুনঃশ্রেণীকরণ ও হস্তান্তর আইনের কথাও উল্লেখ করে। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে কোনো ব্যক্তি নিজের এক বিঘা পর্যন্ত কৃষিজমি দুই তলা পর্যন্ত বাড়ি নির্মাণে ব্যবহার করলে আলাদা অনুমতির প্রয়োজন নেই।

এছাড়া আদালত প্রশ্ন তোলেন- এত অল্প সময়ের নোটিশ দিয়ে এবং বাসিন্দাদের বক্তব্য শোনার সুযোগ না দিয়েই কীভাবে এত বড় ধরনের উচ্ছেদ বা ধ্বংসের পদক্ষেপ নেওয়া হলো? সেই সঙ্গে প্রশাসনের কাছে আদালত জানতে চেয়েছে, ঠিক কী ধরনের ‘আসন্ন বিপদ’ তৈরি হয়েছিল যার কারণে বাড়িগুলো দ্রুত ভেঙে ফেলা অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল।

গত ১১ সেপ্টেম্বরের আদেশে আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করে যে, প্রশাসনের পেশ করা নথি থেকে আপাতদৃষ্টিতে এমন কোনো আসন্ন বিপদের পরিস্থিতি স্পষ্ট হচ্ছে না। সেই কারণে আদালত ইঙ্গিত দিয়েছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনের ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

আসাম ভূমি ও রাজস্ব সংক্রান্ত ১৮৮৬ সালের বিধান এবং ২০০৫ সালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনে প্রসঙ্গ তুলে আদালত জানায়, সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো প্রথম নজরে অবৈধ এবং অননুমোদিত বলে মনে হচ্ছে। বাসিন্দাদের বক্তব্য জানানোর সুযোগ না দেওয়ায় স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের নীতিও লঙ্ঘিত হয়েছে বলে মনে করছে আদালত।

আদালতের আরও প্রশ্ন, কোনো ব্যক্তিগত জমিতে এত কঠোর ক্ষমতা প্রয়োগের মতো এমন কী জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল? নোটিশগুলোতেও কোনো আসন্ন বিপদের স্পষ্ট উল্লেখ ছিল না বলেও আদালত জানায়। ফলে বাড়িগুলো ভেঙে ফেলার পিছনে ঠিক কী ধরনের আসন্ন বিপদ ছিল, তা ব্যাখ্যা করে প্রশাসনকে রিপোর্ট জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

১১ সেপ্টেম্বরের আদেশে আদালত জানায়, প্রশাসনের পক্ষ থেকে পেশ করা নথি ও নির্দেশাবলী পর্যালোচনা করে এমন কোনো আসন্ন বিপদের পরিস্থিতি চোখে পড়েনি, যার কারণে এই ধরনের ধ্বংস অভিযান চালানো জরুরি ছিল।

আদালতের পর্যবেক্ষণ, একনজরে দেখলে মনে হচ্ছে, বাড়িঘর ভাঙার জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনের ক্ষমতা ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালে আসামে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় একাধিক উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি অভিযান বাংলাভাষী মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় হওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে।

গোয়ালপাড়ায় ৭৩টি মুসলিম পরিবারের বাড়ি ভাঙার ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া আদৌ মানা হয়েছিল কি না- হাইকোর্টের পরবর্তী শুনানিতে তারই উত্তর খুঁজবে আদালত।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

৭৩ মুসলিম পরিবারের বাড়ি ভাঙা ‘অবৈধ’

প্রকাশিত সময় : ০৯:৪২:৪২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভারতের আসাম রাজ্যের গোয়ালপাড়ায় ৭৩টি বাঙালি মুসলিম পরিবারের বাড়ি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়ার ঘটনায় আসাম প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন গুয়াহাটি হাইকোর্ট। আদালতের পর্যবেক্ষণ, ব্যক্তিগত কৃষিজমিতে তৈরি বাড়িগুলো ভেঙে ফেলার প্রশাসনিক পদক্ষেপ ‘প্রাথমিকভাবে অবৈধ ও অননুমোদিত বলে প্রতীয়মান’ হচ্ছে। একই সঙ্গে এতে স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের নীতি লঙ্ঘিত হয়েছে বলেও পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন আদালত।

অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৭ সেপ্টেম্বর গোয়ালপাড়া জেলা প্রশাসন ৭৩টি পরিবারের বাড়ি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেয়। তার মাত্র দু’দিন আগে (৫ সেপ্টেম্বর) সার্কেল অফিসারের পক্ষ থেকে বাসিন্দাদের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। নোটিশে বলা হয়, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কৃষিজমিতে তৈরি বাড়ি সরিয়ে না নিলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রশাসনের ওই নোটিশে আসাম ভূমি ও রাজস্ব সংক্রান্ত ১৮৮৬ সালের বিধান এবং ২০০৫ সালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনের উল্লেখ করা হয়েছিল।

এই নোটিশকে চ্যালেঞ্জ করে ২১ জন বাসিন্দা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। তাদের অভিযোগ, প্রশাসনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল বা নিজেদের বক্তব্য জানানোর পর্যাপ্ত সুযোগ তাদের দেওয়া হয়নি।

মামলার শুনানিতে আদালত ২০১৫ সালের আসাম ভূমি পুনঃশ্রেণীকরণ ও হস্তান্তর আইনের কথাও উল্লেখ করে। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে কোনো ব্যক্তি নিজের এক বিঘা পর্যন্ত কৃষিজমি দুই তলা পর্যন্ত বাড়ি নির্মাণে ব্যবহার করলে আলাদা অনুমতির প্রয়োজন নেই।

এছাড়া আদালত প্রশ্ন তোলেন- এত অল্প সময়ের নোটিশ দিয়ে এবং বাসিন্দাদের বক্তব্য শোনার সুযোগ না দিয়েই কীভাবে এত বড় ধরনের উচ্ছেদ বা ধ্বংসের পদক্ষেপ নেওয়া হলো? সেই সঙ্গে প্রশাসনের কাছে আদালত জানতে চেয়েছে, ঠিক কী ধরনের ‘আসন্ন বিপদ’ তৈরি হয়েছিল যার কারণে বাড়িগুলো দ্রুত ভেঙে ফেলা অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল।

গত ১১ সেপ্টেম্বরের আদেশে আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করে যে, প্রশাসনের পেশ করা নথি থেকে আপাতদৃষ্টিতে এমন কোনো আসন্ন বিপদের পরিস্থিতি স্পষ্ট হচ্ছে না। সেই কারণে আদালত ইঙ্গিত দিয়েছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনের ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

আসাম ভূমি ও রাজস্ব সংক্রান্ত ১৮৮৬ সালের বিধান এবং ২০০৫ সালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনে প্রসঙ্গ তুলে আদালত জানায়, সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো প্রথম নজরে অবৈধ এবং অননুমোদিত বলে মনে হচ্ছে। বাসিন্দাদের বক্তব্য জানানোর সুযোগ না দেওয়ায় স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের নীতিও লঙ্ঘিত হয়েছে বলে মনে করছে আদালত।

আদালতের আরও প্রশ্ন, কোনো ব্যক্তিগত জমিতে এত কঠোর ক্ষমতা প্রয়োগের মতো এমন কী জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল? নোটিশগুলোতেও কোনো আসন্ন বিপদের স্পষ্ট উল্লেখ ছিল না বলেও আদালত জানায়। ফলে বাড়িগুলো ভেঙে ফেলার পিছনে ঠিক কী ধরনের আসন্ন বিপদ ছিল, তা ব্যাখ্যা করে প্রশাসনকে রিপোর্ট জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

১১ সেপ্টেম্বরের আদেশে আদালত জানায়, প্রশাসনের পক্ষ থেকে পেশ করা নথি ও নির্দেশাবলী পর্যালোচনা করে এমন কোনো আসন্ন বিপদের পরিস্থিতি চোখে পড়েনি, যার কারণে এই ধরনের ধ্বংস অভিযান চালানো জরুরি ছিল।

আদালতের পর্যবেক্ষণ, একনজরে দেখলে মনে হচ্ছে, বাড়িঘর ভাঙার জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনের ক্ষমতা ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালে আসামে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় একাধিক উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি অভিযান বাংলাভাষী মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় হওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে।

গোয়ালপাড়ায় ৭৩টি মুসলিম পরিবারের বাড়ি ভাঙার ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া আদৌ মানা হয়েছিল কি না- হাইকোর্টের পরবর্তী শুনানিতে তারই উত্তর খুঁজবে আদালত।