যুদ্ধ অবসান ও কৌশলগত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া বিষয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) সাইডলাইনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে পরোক্ষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে আল-জাজিরা।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ জানান, মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধি দলের মাঝে মধ্যস্থতাকারীরা ‘দফায় দফায় যাতায়াত করেছেন’।
তিনি আরো বলেন, “তারা সফলভাবে এক দফা আলোচনা সম্পন্ন করেছেন এবং আমরা আশা করি এটি গঠনমূলক ও আশাব্যাঞ্জক প্রমাণিত হবে। মধ্যস্থতাকারীরা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন।”
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্যই আরো সরাসরি জানান, উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে তিন ঘণ্টার একটি বৈঠক করেছেন।
জাতিসংঘে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “খুবই ভালো ও ফলপ্রসূ বৈঠক হয়েছে।” তিনি আরো জানান, কোনো চুক্তির দিকে এগোনোর ক্ষেত্রে বর্তমানে ‘যথেষ্ট গতিশীলতা’ রয়েছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। পরবর্তীতে ট্রাম্প বলেন, আলোচনা চলমান রয়েছে এবং তার বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত একটি সমঝোতা অর্জিত হবে।
আল-জাজিরার তেহরান প্রতিবেদক তৌহিদ আসাদি জানান, কয়েক সপ্তাহ ধরে কোনো সরাসরি যোগাযোগ না থাকার পর ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ও মার্কিন দূত উইটকফের মধ্যে একটি বৈঠক হয়েছে বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে।
আসাদি জানান, “আমেরিকান পক্ষের অনুরোধ ও জোরের ভিত্তিতে এই সর্বশেষ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। এর লক্ষ্য ছিল ইরানের বার্তা ও শর্তগুলো পৌঁছে দেওয়া, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার বিষয়টি।
ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, ওই শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে- মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করা এবং তেহরান যাকে ‘প্রতিরোধ ফ্রন্ট’ বলে অভিহিত করে, সেই ফ্রন্টে চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটানো।
আসাদি আরো জানান, ওয়াশিংটন যদি ইরানের শর্ত ও প্রতিশ্রুতিগুলো মেনে নয়, তাহলে ভবিষ্যতের কূটনৈতিক আলোচনার জন্য আরও সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে জানায় ইরানের একটি নিরাপত্তা সূত্র।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে ইরানের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, নিউ ইয়র্কে ইরানের প্রতিনিধিদল কূটনীতি চালিয়ে যাওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা নিয়ে এসেছে এবং এই জাতিসংঘ সম্মেলনকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় ফেরার একটি ‘সুযোগ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
ওই কর্মকর্তা জানান, গত ১৬ সেপ্টেম্বর ইরান মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে তাদের সর্বশেষ প্রস্তাব জমা দিয়েছে এবং শত্রুতা বন্ধে সম্ভাব্য চুক্তির বিস্তারিত বিষয়গুলো নিউ ইয়র্কে আলোচনা করা যেতে পারে।
ওই কর্মকর্তা আরো জানান, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমিয়ে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নিলে তেহরান সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুুলে দিতে পারে।
আঞ্চলিক শক্তিগুলোর উত্তেজনা হ্রাসের প্রচেষ্টা
পরোক্ষ এই আলোচনার পাশাপাশি উপসাগরীয় ও অন্যান্য আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর অংশগ্রহণে বড় ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে।
কাতার জানায়, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার উত্তেজনা হ্রাস করতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ নৌচলাচল নিশ্চিত করতে ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বাড়াতে তারা পাকিস্তানের সঙ্গে কাজ করছে।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুলরহমান বিন জিসিম আল থানিও মঙ্গলবার নিউ ইয়র্কে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে বৈঠক করেন।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বৈঠকে তারা আঞ্চলিক পরিস্থিতি, উত্তেজনা হ্রাসের উপায় ও সংলাপের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির নানা উপায় নিয়ে আলোচনা করেন।
ওমানও হরমুজ প্রণালি নিয়ে কূটনীতিতে জড়িতে রয়েছে। এর আগে তারা প্রণালি দিয়ে নৌচলাচল সহজ করার লক্ষ্যে তেহরানের সঙ্গে বিভিন্ন সামুদ্রিক ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছিল।
মঙ্গলবার ট্রাম্প ইরান ও আঞ্চালিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করার জন্য উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্য দেশগুলোর পাশাপাশি তুরস্ক, জর্ডান, সিরিয়া ও ইরাকের শীর্ষ নেতা ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন।
রয়টার্স জানায়, বিবেচনাধীন বিষয়গুলোর মধ্যে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিয়ে একটি অভিন্ন নিরাপত্তা কাঠামো গঠনের কাতারি প্রস্তাবও রয়েছে। আঞ্চলিক একটি সূত্র জানায়, তেহরান বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।
কাতার এই প্রস্তাবটি এখনো প্রকাশ্যে আনেনি।
ট্রাম্পের হুমকির পর এই আলোচনা
এর আগে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প একদিকে যেমন একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছিলেন, অন্যদিকে সামরিক সংঘাতের নতুন হুমকিও দিয়েছিলেন।
ট্রাম্প বলেন, তাকে ইরানকে ‘পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়ার’ মতো একটি চুক্তিতে পৌঁছানো কিংবা দেশটিকে ‘ধ্বংস করে দেওয়ার’ পথে হাটার মধ্যে একটি বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি আরো বলেন, পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করা ও সন্ত্রাসবাদে ইরানি মদদ বন্ধ করার বিনিময়ে ওয়াশিংটন এর আগে তেহরানকে “পূর্ণ অর্থনৈতিক সহযোগিতার’ প্রস্তাব দিয়েছিল।
এর জবাবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ এবং খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স এক বিবৃতিতে ট্রাম্পের হুমকিকে তাদের ‘কৌশলগত দুর্বলতার’ প্রমাণ বলে অভিহিত করে। তারা জানায়, যেকোনো পরবর্তী হামলার জবাবে আরো ‘তীব্র, কঠোর ও অপ্রত্যাশিত আঘাত’ হানতে ইরান প্রস্তুত রয়েছে।
গত জুনের সমঝোতা স্মারক ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই মার্কিন কর্মকর্তারা বারবার বলে আসছেন, আলোচনাগুলো অগ্রগতি লাভ করছে। আগস্টের শুরুতে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, দুই পক্ষ একটি সম্ভাব্য চুক্তির রূপরেখায় পৌঁছেছে। পরবর্তীতে তিনি হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনা ‘ভালোভাবেই এগিয়ে চলেছে’ বলে মন্তব্য করেন, যদিও উল্লেখযোগ্য মতপার্থক্য এখনো রয়ে গেছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে তিনি আবারও আশা প্রকাশ করেছিলেন, যুদ্ধ এখন ‘শেষের দিকে’ রয়েছে।
মার্কিন সামরিক চাপ ও বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ শিথিল করার শর্ত সাপেক্ষ তেহরান হরমুজ প্রনালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে অনড় রয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন দূত উইটকফ জানান, মঙ্গলবারের পরোক্ষ আলোচনার পর মধ্যস্থতাকারীরা তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন।

রিপোর্টারের নাম 
























