শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জলবায়ু বিপর্যয়ের ক্ষতিপূরণ ধনী দেশগুলোকেই দিতে হবে: নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেছেন, যেসব দেশ জলবায়ু সংকটের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী হওয়া সত্ত্বেও এর মারাত্মক প্রভাব সহ্য করছে, সেসব দেশে জলবায়ুজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির দায় ধনী দেশগুলোকেই নিতে হবে।

বৃহস্পতিবার বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।

সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি এখন আর কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়। এটি বাস্তব হয়ে উঠেছে এবং তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে আগামী বছরগুলোতে এ ধরনের দুর্যোগ আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে।

জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহ উপলক্ষে নিউইয়র্কে নেপালের স্থায়ী মিশনে সাক্ষাৎকারটি দেন তিনি।

গত মাসের শেষ দিকে নেপাল তার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দুর্যোগের মুখে পড়ে। নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে উচ্চ পার্বত্য এলাকায় হিমবাহের কারণে ভূমিধসের পর সৃষ্ট সুনামির মতো আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়।

এই দুর্যোগে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি হয়েছে এবং এখনো ৬ হাজার মানুষ নিখোঁজ। অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলার বলে ধারণা করা হচ্ছে।

খানাল বলেন, ‘বিশ্বকে আমরা যা বোঝাতে চাইছি তা হলো—জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি এখন আর তাত্ত্বিক নয়। এটি বাস্তবে পরিণত হয়েছে।’

বিশ্ব আবহাওয়া সংশ্লিষ্টতা গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন (ডব্লিউডব্লিউএ)-এর বিজ্ঞানীরা এই ঘটনাকে একটি ‘সম্মিলিত সংকট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাদের মতে, স্থানীয় ভূতাত্ত্বিক অস্থিতিশীলতার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব একত্র হয়ে এ বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। এর ফলে হিমবাহ সরে যাচ্ছে এবং পারমাফ্রস্ট বা দীর্ঘদিন জমাট থাকা মাটি গলছে।

খানাল বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু ব্যবস্থার বিপর্যয়ে নেপালের অবদান অত্যন্ত সামান্য।

দেশটির ৯০ শতাংশের বেশি বিদ্যুৎ জলবিদ্যুৎ থেকে আসে। নতুন বিক্রি হওয়া গাড়ির ৭০ শতাংশের বেশি বৈদ্যুতিক। বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অবদান মাত্র ০.১ শতাংশ।

তিনি প্রশ্ন করেন, ‘এই সমস্যার জন্য যারা তেমন জড়িত নয়, সেই বোঝা কেন তাদের বহন করতে হবে?’

দুর্যোগের ক্ষতি ৫০০ কোটি ডলার

খানাল জানান, নিউইয়র্কে তার বৈঠকগুলো ফলপ্রসূ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বন্যা-পরবর্তী পুনরুদ্ধারে নতুন করে ৩ কোটি ১০ লাখ ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার এক বৈঠকে জি৭ দেশগুলোও অনানুষ্ঠানিকভাবে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যুক্তরাজ্যও সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।

তবে চ্যালেঞ্জের মাত্রা অনেক বড়। নেপাল সরকারের প্রাথমিক হিসাবে, এই দুর্যোগে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি ডলার।

নেপাল জাতিসংঘের লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড থেকে ২ কোটি ডলার সহায়তা চেয়েছে, যা এই তহবিল থেকে পাওয়ার সর্বোচ্চ সীমা। তবে প্রয়োজনের তুলনায় এটি খুবই সামান্য।

২০২২ সালে পাকিস্তানে ভয়াবহ বন্যার পর এই তহবিল গঠন করা হয়। কিন্তু এখনো তহবিলটি প্রথম অর্থ ছাড় করতে পারেনি এবং এর অর্থের পরিমাণও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ফলে নেপালের পরিস্থিতিকে এই তহবিলের কার্যকারিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে পাঠানো অর্থসহায়তা ও উদ্ধারকারী দল এবং বিদেশে বসবাসরত নেপালিদের সহায়তায় তিনি উৎসাহিত হয়েছেন বলে জানান খানাল। প্রবাসী নেপালিরা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অর্থ পাঠিয়েছেন।

তিনি বলেন, আগে নেপালিরা আন্তর্জাতিক সংস্থা ও স্থানীয় বেসরকারি সংগঠনগুলোকে বেশি অনুদান দিতেন। কিন্তু যুব নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা সাবেক র‌্যাপার ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি বদলেছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জলবায়ু বিপর্যয়ের ক্ষতিপূরণ ধনী দেশগুলোকেই দিতে হবে: নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রকাশিত সময় : ০৫:৩৭:৩৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেছেন, যেসব দেশ জলবায়ু সংকটের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী হওয়া সত্ত্বেও এর মারাত্মক প্রভাব সহ্য করছে, সেসব দেশে জলবায়ুজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির দায় ধনী দেশগুলোকেই নিতে হবে।

বৃহস্পতিবার বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।

সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি এখন আর কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়। এটি বাস্তব হয়ে উঠেছে এবং তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে আগামী বছরগুলোতে এ ধরনের দুর্যোগ আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে।

জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহ উপলক্ষে নিউইয়র্কে নেপালের স্থায়ী মিশনে সাক্ষাৎকারটি দেন তিনি।

গত মাসের শেষ দিকে নেপাল তার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দুর্যোগের মুখে পড়ে। নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে উচ্চ পার্বত্য এলাকায় হিমবাহের কারণে ভূমিধসের পর সৃষ্ট সুনামির মতো আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়।

এই দুর্যোগে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি হয়েছে এবং এখনো ৬ হাজার মানুষ নিখোঁজ। অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলার বলে ধারণা করা হচ্ছে।

খানাল বলেন, ‘বিশ্বকে আমরা যা বোঝাতে চাইছি তা হলো—জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি এখন আর তাত্ত্বিক নয়। এটি বাস্তবে পরিণত হয়েছে।’

বিশ্ব আবহাওয়া সংশ্লিষ্টতা গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন (ডব্লিউডব্লিউএ)-এর বিজ্ঞানীরা এই ঘটনাকে একটি ‘সম্মিলিত সংকট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাদের মতে, স্থানীয় ভূতাত্ত্বিক অস্থিতিশীলতার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব একত্র হয়ে এ বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। এর ফলে হিমবাহ সরে যাচ্ছে এবং পারমাফ্রস্ট বা দীর্ঘদিন জমাট থাকা মাটি গলছে।

খানাল বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু ব্যবস্থার বিপর্যয়ে নেপালের অবদান অত্যন্ত সামান্য।

দেশটির ৯০ শতাংশের বেশি বিদ্যুৎ জলবিদ্যুৎ থেকে আসে। নতুন বিক্রি হওয়া গাড়ির ৭০ শতাংশের বেশি বৈদ্যুতিক। বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অবদান মাত্র ০.১ শতাংশ।

তিনি প্রশ্ন করেন, ‘এই সমস্যার জন্য যারা তেমন জড়িত নয়, সেই বোঝা কেন তাদের বহন করতে হবে?’

দুর্যোগের ক্ষতি ৫০০ কোটি ডলার

খানাল জানান, নিউইয়র্কে তার বৈঠকগুলো ফলপ্রসূ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বন্যা-পরবর্তী পুনরুদ্ধারে নতুন করে ৩ কোটি ১০ লাখ ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার এক বৈঠকে জি৭ দেশগুলোও অনানুষ্ঠানিকভাবে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যুক্তরাজ্যও সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।

তবে চ্যালেঞ্জের মাত্রা অনেক বড়। নেপাল সরকারের প্রাথমিক হিসাবে, এই দুর্যোগে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি ডলার।

নেপাল জাতিসংঘের লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড থেকে ২ কোটি ডলার সহায়তা চেয়েছে, যা এই তহবিল থেকে পাওয়ার সর্বোচ্চ সীমা। তবে প্রয়োজনের তুলনায় এটি খুবই সামান্য।

২০২২ সালে পাকিস্তানে ভয়াবহ বন্যার পর এই তহবিল গঠন করা হয়। কিন্তু এখনো তহবিলটি প্রথম অর্থ ছাড় করতে পারেনি এবং এর অর্থের পরিমাণও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ফলে নেপালের পরিস্থিতিকে এই তহবিলের কার্যকারিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে পাঠানো অর্থসহায়তা ও উদ্ধারকারী দল এবং বিদেশে বসবাসরত নেপালিদের সহায়তায় তিনি উৎসাহিত হয়েছেন বলে জানান খানাল। প্রবাসী নেপালিরা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অর্থ পাঠিয়েছেন।

তিনি বলেন, আগে নেপালিরা আন্তর্জাতিক সংস্থা ও স্থানীয় বেসরকারি সংগঠনগুলোকে বেশি অনুদান দিতেন। কিন্তু যুব নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা সাবেক র‌্যাপার ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি বদলেছে।