বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘ক্যাম্পাসে না ফেরার শর্তে’ পুলিশ পাহারায় চুয়েট ছাড়লেন ভিসি

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে ঘিরে টানা প্রায় ৩০ ঘণ্টার অবরুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান হয়েছে। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে উপাচার্যসহ ১১ জনকে উদ্ধার করে ক্যাম্পাস থেকে বের করে নিয়ে গেছে প্রশাসন। উপাচার্যকে আর ক্যাম্পাসে প্রবেশ না করার শর্তে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা, পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম, রাউজান উপজেলার সহকারী কমিশনারসহ (ভূমি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার পর উপাচার্যকে মুক্তি দিতে সম্মত হন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। পরে কঠোর পুলিশ পাহারায় তাদের ক্যাম্পাস থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়।

দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ থাকাকালে উপাচার্যসহ ভেতরে অবস্থানরত কয়েকজনের শারীরিক অসুস্থতার খবরও সামনে আসে। ফলে অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে তাদের ক্যাম্পাস থেকে বের করা হয়।

এর আগে আজ বিকেল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার চুয়েট ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। উপাচার্যকে উদ্ধারের বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘একজন সম্মানিত শিক্ষক আমাদের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছেন, চিকিৎসার জন্য বলেছেন। তাকে আমরা নিয়ে যেতে এসেছি। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হবে।’

পরে জেলা প্রশাসক আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আহনাফ শাহরিয়ার অর্ণব ও গালিব। তারা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং ক্যাম্পাসের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রশাসনের ভূমিকা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলেন।

অর্ণব বলেন, ‘এখানে চট্টগ্রামের সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রশাসনের মানুষজন উপস্থিত আছেন। আমরা জানতে চাই, আপনারা কখন আমাদের নিরাপত্তার জন্য থাকবেন? আপনারা কি শুধু সেই ভিসিকে বের করে নিয়ে যেতে এসেছেন, যিনি বহিষ্কৃত সন্ত্রাসীদের নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছেন। আমরা শিক্ষার্থীরা কি আপনাদের সন্তানতুল্য নই?’

তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পাসে না এসেই তিনি আমাদের শিক্ষকদের নানাভাবে হয়রানি ও হুমকি দেওয়া শুরু করেছিলেন। বিষয়গুলো আমাদের কাছে পৌঁছালে শিক্ষার্থী হিসেবে আমরা শিক্ষকদের এই অসম্মান মেনে নিতে পারিনি। এরপর তিনি আরও একধাপ এগিয়ে প্রশাসনিক ক্ষমতার বলে শিক্ষকদের পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও বেতন-ভাতা বন্ধ করে দেন। এই পর্যায়ে এসে আমরা আর তাকে এই ক্যাম্পাসে দেখতে চাইনি।’

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলার পর জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ভবনের ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে তল্লাশি চালিয়ে উপাচার্যসহ ১১ জনকে বের করে আনা হয়। উপাচার্য ছাড়াও তাদের মধ্যে চুয়েট ছাত্রদল সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ, যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. আরাফাত রহমান রানা ও ছাত্রদল নেতা বিপ্লব ছিলেন বলে জানা গেছে। পরে তাদের কঠোর পুলিশ পাহারায় ক্যাম্পাস থেকে নিয়ে যাওয়া হয়।

উপাচার্যকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের শর্ত ছিল, তিনি যেন আর চুয়েট ক্যাম্পাসে প্রবেশ না করেন। এ শর্তে তাকে ক্যাম্পাস থেকে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় বলে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে চুয়েটে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের মধ্যে অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি থেকে সরে আসেননি।

গতকাল সোমবার সকালে ক্যাম্পাসে প্রবেশের পর নতুন উপাচার্যকে পদত্যাগের আলটিমেটাম দেন আন্দোলনকারীরা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পদত্যাগ না করায় তাকে প্রশাসনিক ভবন-২-এ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। আজ সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের উপস্থিতিতে তাকে ক্যাম্পাস থেকে নিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে এ পরিস্থিতির অবসান ঘটে।

উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে চুয়েটে কয়েক সপ্তাহ ধরে অচলাবস্থা চলছে। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি ও স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

‘ক্যাম্পাসে না ফেরার শর্তে’ পুলিশ পাহারায় চুয়েট ছাড়লেন ভিসি

প্রকাশিত সময় : ০৮:৫৯:০৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে ঘিরে টানা প্রায় ৩০ ঘণ্টার অবরুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান হয়েছে। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে উপাচার্যসহ ১১ জনকে উদ্ধার করে ক্যাম্পাস থেকে বের করে নিয়ে গেছে প্রশাসন। উপাচার্যকে আর ক্যাম্পাসে প্রবেশ না করার শর্তে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা, পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম, রাউজান উপজেলার সহকারী কমিশনারসহ (ভূমি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার পর উপাচার্যকে মুক্তি দিতে সম্মত হন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। পরে কঠোর পুলিশ পাহারায় তাদের ক্যাম্পাস থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়।

দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ থাকাকালে উপাচার্যসহ ভেতরে অবস্থানরত কয়েকজনের শারীরিক অসুস্থতার খবরও সামনে আসে। ফলে অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে তাদের ক্যাম্পাস থেকে বের করা হয়।

এর আগে আজ বিকেল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার চুয়েট ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। উপাচার্যকে উদ্ধারের বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘একজন সম্মানিত শিক্ষক আমাদের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছেন, চিকিৎসার জন্য বলেছেন। তাকে আমরা নিয়ে যেতে এসেছি। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হবে।’

পরে জেলা প্রশাসক আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আহনাফ শাহরিয়ার অর্ণব ও গালিব। তারা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং ক্যাম্পাসের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রশাসনের ভূমিকা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলেন।

অর্ণব বলেন, ‘এখানে চট্টগ্রামের সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রশাসনের মানুষজন উপস্থিত আছেন। আমরা জানতে চাই, আপনারা কখন আমাদের নিরাপত্তার জন্য থাকবেন? আপনারা কি শুধু সেই ভিসিকে বের করে নিয়ে যেতে এসেছেন, যিনি বহিষ্কৃত সন্ত্রাসীদের নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছেন। আমরা শিক্ষার্থীরা কি আপনাদের সন্তানতুল্য নই?’

তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পাসে না এসেই তিনি আমাদের শিক্ষকদের নানাভাবে হয়রানি ও হুমকি দেওয়া শুরু করেছিলেন। বিষয়গুলো আমাদের কাছে পৌঁছালে শিক্ষার্থী হিসেবে আমরা শিক্ষকদের এই অসম্মান মেনে নিতে পারিনি। এরপর তিনি আরও একধাপ এগিয়ে প্রশাসনিক ক্ষমতার বলে শিক্ষকদের পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও বেতন-ভাতা বন্ধ করে দেন। এই পর্যায়ে এসে আমরা আর তাকে এই ক্যাম্পাসে দেখতে চাইনি।’

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলার পর জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ভবনের ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে তল্লাশি চালিয়ে উপাচার্যসহ ১১ জনকে বের করে আনা হয়। উপাচার্য ছাড়াও তাদের মধ্যে চুয়েট ছাত্রদল সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ, যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. আরাফাত রহমান রানা ও ছাত্রদল নেতা বিপ্লব ছিলেন বলে জানা গেছে। পরে তাদের কঠোর পুলিশ পাহারায় ক্যাম্পাস থেকে নিয়ে যাওয়া হয়।

উপাচার্যকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের শর্ত ছিল, তিনি যেন আর চুয়েট ক্যাম্পাসে প্রবেশ না করেন। এ শর্তে তাকে ক্যাম্পাস থেকে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় বলে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে চুয়েটে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের মধ্যে অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি থেকে সরে আসেননি।

গতকাল সোমবার সকালে ক্যাম্পাসে প্রবেশের পর নতুন উপাচার্যকে পদত্যাগের আলটিমেটাম দেন আন্দোলনকারীরা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পদত্যাগ না করায় তাকে প্রশাসনিক ভবন-২-এ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। আজ সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের উপস্থিতিতে তাকে ক্যাম্পাস থেকে নিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে এ পরিস্থিতির অবসান ঘটে।

উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে চুয়েটে কয়েক সপ্তাহ ধরে অচলাবস্থা চলছে। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি ও স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।