রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সময়টা কঠিন যাচ্ছে, তবু আনন্দের জন্য থাকুক একটু সময়

জীবনে কখনো কখনো এমন সময় আসে, যখন চারপাশের সবকিছুই কঠিন মনে হয়। কাজের চাপ, পারিবারিক দুশ্চিন্তা, অসুস্থতা কিংবা প্রিয়জনকে হারানোর শোক—সব মিলিয়ে মন ভার হয়ে থাকে। এমন সময়ে আনন্দ করার কথা ভাবতেও অনেকের অপরাধবোধ হতে পারে। মনে হয়, সমস্যা যতক্ষণ আছে, ততক্ষণ হাসি-আনন্দের সুযোগ কোথায়? অথচ কষ্টের সময়ে একটু হাসি, প্রিয় মানুষের সঙ্গে কিছুটা সময় কিংবা পছন্দের কোনো কাজ মনকে স্বস্তি দিতে পারে। এর অর্থ কষ্টকে অস্বীকার করা নয়; বরং কষ্টের পাশাপাশি আনন্দের জন্যও একটু জায়গা রাখা।

জীবনের সব সমস্যা একসঙ্গে মিটে যাবে না। সব সময় পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণেও থাকে না। তবে, কঠিন সময়ের মধ্যেও ছোট ছোট আনন্দের মুহূর্ত তৈরি করা সম্ভব। কখনো সেই আনন্দ আমাদের দম নেওয়ার সুযোগ দেয়, কখনো কাছের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক আরো দৃঢ় করে, আবার কখনো নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়।

বড় হতে হতে আনন্দের জায়গা কমে যায় কেন?

শৈশবে খেলাধুলা কিংবা মনের আনন্দে কিছু করার জন্য আলাদা কোনো কারণ লাগে না। খেলতে ভালো লাগে বলেই আমরা খেলি। কিন্তু, বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজ, দায়িত্ব ও নানা প্রত্যাশার ভিড়ে সেই অভ্যাস হারিয়ে যেতে থাকে।

একসময় মনে হতে শুরু করে, প্রতিটি কাজেরই কোনো উদ্দেশ্য থাকতে হবে। সময়ের সদ্ব্যবহার মানেই যেন কাজ শেষ করা, নতুন কিছু অর্জন করা কিংবা কোনো সমস্যার সমাধান করা। ফলে নিছক আনন্দের জন্য সময় কাটানোকে অনেকেই কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।

 

অথচ বন্ধুদের সঙ্গে হাসাহাসি করা, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খেলায় মেতে ওঠা কিংবা প্রিয় কোনো শখ নিয়ে ব্যস্ত থাকার মধ্যেও জীবনের প্রয়োজনীয় স্বস্তি রয়েছে। এসব মুহূর্ত আমাদের একঘেয়েমি থেকে বেরিয়ে আসতে, নিজের অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত হতে এবং অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক আরো গভীর করতে সাহায্য করে।

জীবনে দায়িত্ব থাকবে, সমস্যা থাকবে। কিন্তু সব সময় শুধু সেগুলো নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হবে, এমন নয়। একটু বিরতি নিয়ে আনন্দ করার সুযোগ তৈরি করাও নিজের যত্ন নেওয়ার অংশ।

কঠিন সময়েও আনন্দের প্রয়োজন কেন?

আনন্দের গুরুত্ব বোঝাতে একটি অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন ডেভ রেমন্ড। তিনি দীর্ঘ ১৬ বছর যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার জনপ্রিয় ক্রীড়া দলের মাসকট ‘ফিলি ফ্যানাটিক’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন। পরে বক্তা ও পরামর্শক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তার কাজের অন্যতম বিষয় হলো মানুষের জীবনে আনন্দের ভূমিকা।

ডেভের মতে, অবসর বা ছুটির দিনে পাওয়া আনন্দের পাশাপাশি এমন আনন্দেরও প্রয়োজন রয়েছে, যা পরিস্থিতি বুঝে সচেতনভাবে তৈরি করা হয়। অর্থাৎ, পরিস্থিতি কঠিন বলে আনন্দের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে না দিয়ে, সেই সময়ের উপযোগী ছোট কোনো আনন্দের মুহূর্ত তৈরি করা।

ধরা যাক, পরিবারের একজন সদস্য হাসপাতালে ভর্তি। স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের অন্য সদস্যদের মনেও দুশ্চিন্তা থাকবে। এমন পরিস্থিতিতে কিছুক্ষণ গল্প করা কিংবা একসঙ্গে হাসার সুযোগ তৈরি হলে তা দুশ্চিন্তা পুরোপুরি দূর না করলেও কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। আবার প্রিয়জনকে হারিয়ে শোকাহত কারো পাশে এমনভাবে থাকা, যাতে তিনি কিছুক্ষণের জন্য হলেও মানসিক ভার থেকে বিরতি পান, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

ডেভ এমন এক পরিবারের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন, যারা কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। তাদের কাছে তিনি পোশাক ও সাজসজ্জাসহ উপস্থিত হয়েছিলেন। পরে পরিবারের সদস্যরা জানান, তার উপস্থিতি তাদের অনেকটা স্বস্তি দিয়েছিল; যেন কার্যকর ওষুধের মতো কাজ করেছিল সেই আনন্দের মুহূর্ত।

এই অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, আনন্দ সব সময় কষ্ট দূর করে দেয় না। তবে কষ্টের পাশাপাশি একটু স্বস্তি পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। কঠিন বাস্তবতা মেনে নিয়েও মানুষ হাসতে পারে, ভালো লাগার কিছু খুঁজে নিতে পারে এবং অন্যের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিতে পারে।

হাসি ও খেলাধুলা মানসিকভাবে কীভাবে সাহায্য করে?

প্রাপ্তবয়স্কদের খেলাধুলাপ্রবণ মনোভাব নিয়ে করা গবেষণাতেও আনন্দের কিছু ইতিবাচক দিক উঠে এসেছে। ২০১৩ সালে চ্যাং ও তার সহকর্মীদের একটি গবেষণা এবং একই বছর ম্যাগনুসন ও বার্নেটের গবেষণায় খেলাধুলাপ্রবণতা ও মানসিক সুস্থতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

এসব গবেষণার ফল অনুযায়ী, খেলাধুলাপ্রবণ মনোভাব মানুষের মেজাজ ভালো রাখতে, মানসিক চাপ সামলাতে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সহায়তা করতে পারে। প্রতিকূলতার মুখে মানসিক নমনীয়তা ও দৃঢ়তা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা থাকতে পারে।

তবে, এর অর্থ এই নয় যে হাসি বা খেলাধুলা সব সমস্যার সমাধান কিংবা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক কষ্ট দূর করার একমাত্র উপায়। বরং এগুলো কঠিন সময় সামলানোর সহায়ক উপায়গুলোর একটি হতে পারে।

জীবন যত কঠিন হয়, নিজের জন্য তত বেশি সচেতনভাবে স্বস্তির মুহূর্ত তৈরি করা প্রয়োজন হতে পারে। কখনো সেই মুহূর্ত আসতে পারে প্রিয় গান শুনে, কখনো বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে, আবার কখনো সন্তানদের সঙ্গে একটু খেলাধুলা করে।

মন ভার হলে খুঁজে নিন ছোট্ট একটি অবলম্বন

কখনো কখনো পরিস্থিতি এতটাই কঠিন মনে হয় যে, কীভাবে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন, তা বুঝে উঠতে পারেন না। এমন সময়ে সব সমস্যার সমাধান একসঙ্গে করার কথা না ভেবে ছোট একটি পদক্ষেপ দিয়ে শুরু করা যেতে পারে।

ডেভ রেমন্ড এ ধরনের ছোট অবলম্বনকে তুলনা করেছেন পাহাড়ে ওঠার সময় আঙুল রাখার মতো ছোট একটি খাঁজের সঙ্গে।

পর্বতারোহীরা যেমন এমন খাঁজ ধরে নিজেদের ভারসাম্য বজায় রাখেন, তেমনি জীবনের কঠিন সময়েও ছোট কোনো ভালো লাগা পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার শক্তি দিতে পারে।

সেটি হতে পারে এমন কোনো গান, যা শুনলে মন ভালো হয়। হতে পারে প্রিয় বন্ধুকে ফোন করা, পরিবারের সঙ্গে কিছুক্ষণ সময় কাটানো কিংবা শৈশবের পছন্দের কোনো কাজে ফিরে যাওয়া। কারো জন্য বাইরে একটু হাঁটা, কারো জন্য বই পড়া, আবার কারো জন্য হাসির কোনো অনুষ্ঠান দেখা স্বস্তির কারণ হতে পারে।

ছোট এসব কাজ পরিস্থিতি বদলে দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে, সামান্য বিরতি মনকে কিছুটা হালকা করতে পারে। একইভাবে অন্য কারো মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করলেও নিজের ভালো লাগার সুযোগ তৈরি হয়। অন্যের পাশে দাঁড়ানো এবং আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে দুজনই উপকৃত হতে পারেন।

বড় হয়েও আনন্দে থাকার ৬টি সহজ উপায়

১. শৈশবের পছন্দের কাজে ফিরে যান
ছোটবেলায় কোন কাজটি করতে সবচেয়ে ভালো লাগত, মনে করার চেষ্টা করুন। ছবি আঁকা, গল্পের বই পড়া, গান শোনা, খেলাধুলা কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা—যে কাজটি একসময় আনন্দ দিত, সেটির জন্য আবার একটু সময় রাখুন। ছোটবেলার সব অভ্যাস ফিরিয়ে আনতে হবে না; নিজের ভালো লাগার সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হওয়াই মূল কথা।

২. নতুন কিছু চেষ্টা করুন
নতুন কোনো শখ তৈরি করতে পারেন। বাগান করা, রান্না শেখা, ছবি তোলা কিংবা নতুন কোনো খেলা—যেকোনো কিছুই হতে পারে। শুরুতেই ভালো করতে হবে, এমন চাপ নেবেন না। শেখার প্রক্রিয়াটিকে উপভোগ করার চেষ্টা করুন। ভুল করা কিংবা অনভিজ্ঞ থাকাও নতুন কিছু শেখার স্বাভাবিক অংশ।

৩. আনন্দের উপকরণ হাতের কাছে রাখুন
কোনো কাজ শুরু করা যত সহজ হবে, সেটি করার সম্ভাবনাও তত বাড়বে। বই পড়তে চাইলে বইটি কাছে রাখুন, ছবি আঁকতে চাইলে প্রয়োজনীয় উপকরণ গুছিয়ে রাখুন। পছন্দের কোনো খেলা বা সৃজনশীল কাজের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস হাতের কাছে থাকলে ব্যস্ততার মধ্যেও সময় বের করা সহজ হয়।

৪. আনন্দের জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখুন
অবসর পেলেই আনন্দ করব; এমন ভাবনা অনেক সময় বাস্তবায়িত হয় না। তাই প্রতিদিন বা সপ্তাহে নিজের পছন্দের কাজের জন্য নির্দিষ্ট কিছু সময় রাখুন। কাজের বৈঠক কিংবা জরুরি দায়িত্বের মতোই এই সময়টুকুকেও গুরুত্ব দিন। আনন্দের জন্য সময় রাখা সময় নষ্ট করা নয়; বরং নিজের সুস্থতার যত্ন নেওয়া।

৫. প্রকৃতির কাছে যান
প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো একঘেয়ে রুটিন থেকে কিছুটা বিরতি নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। বাড়ির ছাদে গাছের যত্ন নেওয়া, পার্কে হাঁটা কিংবা খোলা জায়গায় কিছুক্ষণ বসে থাকাও হতে পারে ভালো লাগার উপায়। সম্ভব হলে প্রতিদিন অল্প কিছু সময় বাইরে কাটান। এতে শরীর নড়াচড়া করার পাশাপাশি মন ও চিন্তাভাবনাকেও সতেজ হওয়ার সুযোগ দেওয়া যায়।

৬. দৈনন্দিন কাজে একটু আনন্দ যোগ করুন
আনন্দের জন্য সব সময় আলাদা আয়োজন প্রয়োজন হয় না। কাজের ফাঁকে সহকর্মীর সঙ্গে মজার গল্প, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ছোট কোনো খেলা কিংবা বন্ধুর সঙ্গে হঠাৎ আড্ডা—এসবও হতে পারে আনন্দের উপলক্ষ। সুযোগ থাকলে দৈনন্দিন রুটিনে সামান্য পরিবর্তন আনুন। ছোট্ট কোনো উদ্যোগও একঘেয়েমি কাটাতে সাহায্য করতে পারে।

কষ্টকে অস্বীকার নয়, আনন্দকেও জায়গা দিন

আনন্দ করা মানে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে হালকাভাবে নেওয়া নয়। খেলাধুলা কিংবা হাসাহাসি করার অর্থ দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া নয়। বরং দায়িত্ব ও দুশ্চিন্তার পাশাপাশি নিজের ভালো থাকার জন্যও কিছুটা সময় রাখা জরুরি।

নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করতে পারেন; এই সপ্তাহে কোন বিষয়টি আপনাকে একটু হাসিয়েছে? কার সঙ্গে সময় কাটালে মন ভালো হয়? ক্লান্ত লাগলে কোন কাজটি আপনাকে স্বস্তি দেয়? কঠিন কোনো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেলে আজ নিজের জন্য ছোট্ট কী করতে পারেন? কিংবা অন্য কারো দিনটা একটু ভালো করার জন্য কী করা সম্ভব?

উত্তরগুলো খুব বড় কিছু হতে হবে না। হয়তো প্রিয়জনকে একটি ফোন করা, পছন্দের গান শোনা কিংবা কিছুক্ষণ বাইরে হাঁটতে যাওয়াই যথেষ্ট।

জীবনের কষ্ট ও কঠিন বাস্তবতাকে স্বীকার করার পাশাপাশি আনন্দের জন্যও জায়গা রাখা সম্ভব। সব দুশ্চিন্তা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে আজই ছোট কোনো ভালো লাগার মুহূর্ত তৈরি করুন। কারণ, জীবন কঠিন হলেও তার মধ্যে হাসি, আনন্দ ও সুন্দর সম্পর্কের জায়গা ফুরিয়ে যায় না।

* সাইকোলজি টুডে অবলম্বনে

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সময়টা কঠিন যাচ্ছে, তবু আনন্দের জন্য থাকুক একটু সময়

প্রকাশিত সময় : ০৫:২৬:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

জীবনে কখনো কখনো এমন সময় আসে, যখন চারপাশের সবকিছুই কঠিন মনে হয়। কাজের চাপ, পারিবারিক দুশ্চিন্তা, অসুস্থতা কিংবা প্রিয়জনকে হারানোর শোক—সব মিলিয়ে মন ভার হয়ে থাকে। এমন সময়ে আনন্দ করার কথা ভাবতেও অনেকের অপরাধবোধ হতে পারে। মনে হয়, সমস্যা যতক্ষণ আছে, ততক্ষণ হাসি-আনন্দের সুযোগ কোথায়? অথচ কষ্টের সময়ে একটু হাসি, প্রিয় মানুষের সঙ্গে কিছুটা সময় কিংবা পছন্দের কোনো কাজ মনকে স্বস্তি দিতে পারে। এর অর্থ কষ্টকে অস্বীকার করা নয়; বরং কষ্টের পাশাপাশি আনন্দের জন্যও একটু জায়গা রাখা।

জীবনের সব সমস্যা একসঙ্গে মিটে যাবে না। সব সময় পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণেও থাকে না। তবে, কঠিন সময়ের মধ্যেও ছোট ছোট আনন্দের মুহূর্ত তৈরি করা সম্ভব। কখনো সেই আনন্দ আমাদের দম নেওয়ার সুযোগ দেয়, কখনো কাছের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক আরো দৃঢ় করে, আবার কখনো নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়।

বড় হতে হতে আনন্দের জায়গা কমে যায় কেন?

শৈশবে খেলাধুলা কিংবা মনের আনন্দে কিছু করার জন্য আলাদা কোনো কারণ লাগে না। খেলতে ভালো লাগে বলেই আমরা খেলি। কিন্তু, বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজ, দায়িত্ব ও নানা প্রত্যাশার ভিড়ে সেই অভ্যাস হারিয়ে যেতে থাকে।

একসময় মনে হতে শুরু করে, প্রতিটি কাজেরই কোনো উদ্দেশ্য থাকতে হবে। সময়ের সদ্ব্যবহার মানেই যেন কাজ শেষ করা, নতুন কিছু অর্জন করা কিংবা কোনো সমস্যার সমাধান করা। ফলে নিছক আনন্দের জন্য সময় কাটানোকে অনেকেই কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।

 

অথচ বন্ধুদের সঙ্গে হাসাহাসি করা, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খেলায় মেতে ওঠা কিংবা প্রিয় কোনো শখ নিয়ে ব্যস্ত থাকার মধ্যেও জীবনের প্রয়োজনীয় স্বস্তি রয়েছে। এসব মুহূর্ত আমাদের একঘেয়েমি থেকে বেরিয়ে আসতে, নিজের অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত হতে এবং অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক আরো গভীর করতে সাহায্য করে।

জীবনে দায়িত্ব থাকবে, সমস্যা থাকবে। কিন্তু সব সময় শুধু সেগুলো নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হবে, এমন নয়। একটু বিরতি নিয়ে আনন্দ করার সুযোগ তৈরি করাও নিজের যত্ন নেওয়ার অংশ।

কঠিন সময়েও আনন্দের প্রয়োজন কেন?

আনন্দের গুরুত্ব বোঝাতে একটি অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন ডেভ রেমন্ড। তিনি দীর্ঘ ১৬ বছর যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার জনপ্রিয় ক্রীড়া দলের মাসকট ‘ফিলি ফ্যানাটিক’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন। পরে বক্তা ও পরামর্শক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তার কাজের অন্যতম বিষয় হলো মানুষের জীবনে আনন্দের ভূমিকা।

ডেভের মতে, অবসর বা ছুটির দিনে পাওয়া আনন্দের পাশাপাশি এমন আনন্দেরও প্রয়োজন রয়েছে, যা পরিস্থিতি বুঝে সচেতনভাবে তৈরি করা হয়। অর্থাৎ, পরিস্থিতি কঠিন বলে আনন্দের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে না দিয়ে, সেই সময়ের উপযোগী ছোট কোনো আনন্দের মুহূর্ত তৈরি করা।

ধরা যাক, পরিবারের একজন সদস্য হাসপাতালে ভর্তি। স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের অন্য সদস্যদের মনেও দুশ্চিন্তা থাকবে। এমন পরিস্থিতিতে কিছুক্ষণ গল্প করা কিংবা একসঙ্গে হাসার সুযোগ তৈরি হলে তা দুশ্চিন্তা পুরোপুরি দূর না করলেও কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। আবার প্রিয়জনকে হারিয়ে শোকাহত কারো পাশে এমনভাবে থাকা, যাতে তিনি কিছুক্ষণের জন্য হলেও মানসিক ভার থেকে বিরতি পান, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

ডেভ এমন এক পরিবারের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন, যারা কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। তাদের কাছে তিনি পোশাক ও সাজসজ্জাসহ উপস্থিত হয়েছিলেন। পরে পরিবারের সদস্যরা জানান, তার উপস্থিতি তাদের অনেকটা স্বস্তি দিয়েছিল; যেন কার্যকর ওষুধের মতো কাজ করেছিল সেই আনন্দের মুহূর্ত।

এই অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, আনন্দ সব সময় কষ্ট দূর করে দেয় না। তবে কষ্টের পাশাপাশি একটু স্বস্তি পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। কঠিন বাস্তবতা মেনে নিয়েও মানুষ হাসতে পারে, ভালো লাগার কিছু খুঁজে নিতে পারে এবং অন্যের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিতে পারে।

হাসি ও খেলাধুলা মানসিকভাবে কীভাবে সাহায্য করে?

প্রাপ্তবয়স্কদের খেলাধুলাপ্রবণ মনোভাব নিয়ে করা গবেষণাতেও আনন্দের কিছু ইতিবাচক দিক উঠে এসেছে। ২০১৩ সালে চ্যাং ও তার সহকর্মীদের একটি গবেষণা এবং একই বছর ম্যাগনুসন ও বার্নেটের গবেষণায় খেলাধুলাপ্রবণতা ও মানসিক সুস্থতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

এসব গবেষণার ফল অনুযায়ী, খেলাধুলাপ্রবণ মনোভাব মানুষের মেজাজ ভালো রাখতে, মানসিক চাপ সামলাতে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সহায়তা করতে পারে। প্রতিকূলতার মুখে মানসিক নমনীয়তা ও দৃঢ়তা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা থাকতে পারে।

তবে, এর অর্থ এই নয় যে হাসি বা খেলাধুলা সব সমস্যার সমাধান কিংবা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক কষ্ট দূর করার একমাত্র উপায়। বরং এগুলো কঠিন সময় সামলানোর সহায়ক উপায়গুলোর একটি হতে পারে।

জীবন যত কঠিন হয়, নিজের জন্য তত বেশি সচেতনভাবে স্বস্তির মুহূর্ত তৈরি করা প্রয়োজন হতে পারে। কখনো সেই মুহূর্ত আসতে পারে প্রিয় গান শুনে, কখনো বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে, আবার কখনো সন্তানদের সঙ্গে একটু খেলাধুলা করে।

মন ভার হলে খুঁজে নিন ছোট্ট একটি অবলম্বন

কখনো কখনো পরিস্থিতি এতটাই কঠিন মনে হয় যে, কীভাবে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন, তা বুঝে উঠতে পারেন না। এমন সময়ে সব সমস্যার সমাধান একসঙ্গে করার কথা না ভেবে ছোট একটি পদক্ষেপ দিয়ে শুরু করা যেতে পারে।

ডেভ রেমন্ড এ ধরনের ছোট অবলম্বনকে তুলনা করেছেন পাহাড়ে ওঠার সময় আঙুল রাখার মতো ছোট একটি খাঁজের সঙ্গে।

পর্বতারোহীরা যেমন এমন খাঁজ ধরে নিজেদের ভারসাম্য বজায় রাখেন, তেমনি জীবনের কঠিন সময়েও ছোট কোনো ভালো লাগা পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার শক্তি দিতে পারে।

সেটি হতে পারে এমন কোনো গান, যা শুনলে মন ভালো হয়। হতে পারে প্রিয় বন্ধুকে ফোন করা, পরিবারের সঙ্গে কিছুক্ষণ সময় কাটানো কিংবা শৈশবের পছন্দের কোনো কাজে ফিরে যাওয়া। কারো জন্য বাইরে একটু হাঁটা, কারো জন্য বই পড়া, আবার কারো জন্য হাসির কোনো অনুষ্ঠান দেখা স্বস্তির কারণ হতে পারে।

ছোট এসব কাজ পরিস্থিতি বদলে দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে, সামান্য বিরতি মনকে কিছুটা হালকা করতে পারে। একইভাবে অন্য কারো মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করলেও নিজের ভালো লাগার সুযোগ তৈরি হয়। অন্যের পাশে দাঁড়ানো এবং আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে দুজনই উপকৃত হতে পারেন।

বড় হয়েও আনন্দে থাকার ৬টি সহজ উপায়

১. শৈশবের পছন্দের কাজে ফিরে যান
ছোটবেলায় কোন কাজটি করতে সবচেয়ে ভালো লাগত, মনে করার চেষ্টা করুন। ছবি আঁকা, গল্পের বই পড়া, গান শোনা, খেলাধুলা কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা—যে কাজটি একসময় আনন্দ দিত, সেটির জন্য আবার একটু সময় রাখুন। ছোটবেলার সব অভ্যাস ফিরিয়ে আনতে হবে না; নিজের ভালো লাগার সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হওয়াই মূল কথা।

২. নতুন কিছু চেষ্টা করুন
নতুন কোনো শখ তৈরি করতে পারেন। বাগান করা, রান্না শেখা, ছবি তোলা কিংবা নতুন কোনো খেলা—যেকোনো কিছুই হতে পারে। শুরুতেই ভালো করতে হবে, এমন চাপ নেবেন না। শেখার প্রক্রিয়াটিকে উপভোগ করার চেষ্টা করুন। ভুল করা কিংবা অনভিজ্ঞ থাকাও নতুন কিছু শেখার স্বাভাবিক অংশ।

৩. আনন্দের উপকরণ হাতের কাছে রাখুন
কোনো কাজ শুরু করা যত সহজ হবে, সেটি করার সম্ভাবনাও তত বাড়বে। বই পড়তে চাইলে বইটি কাছে রাখুন, ছবি আঁকতে চাইলে প্রয়োজনীয় উপকরণ গুছিয়ে রাখুন। পছন্দের কোনো খেলা বা সৃজনশীল কাজের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস হাতের কাছে থাকলে ব্যস্ততার মধ্যেও সময় বের করা সহজ হয়।

৪. আনন্দের জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখুন
অবসর পেলেই আনন্দ করব; এমন ভাবনা অনেক সময় বাস্তবায়িত হয় না। তাই প্রতিদিন বা সপ্তাহে নিজের পছন্দের কাজের জন্য নির্দিষ্ট কিছু সময় রাখুন। কাজের বৈঠক কিংবা জরুরি দায়িত্বের মতোই এই সময়টুকুকেও গুরুত্ব দিন। আনন্দের জন্য সময় রাখা সময় নষ্ট করা নয়; বরং নিজের সুস্থতার যত্ন নেওয়া।

৫. প্রকৃতির কাছে যান
প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো একঘেয়ে রুটিন থেকে কিছুটা বিরতি নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। বাড়ির ছাদে গাছের যত্ন নেওয়া, পার্কে হাঁটা কিংবা খোলা জায়গায় কিছুক্ষণ বসে থাকাও হতে পারে ভালো লাগার উপায়। সম্ভব হলে প্রতিদিন অল্প কিছু সময় বাইরে কাটান। এতে শরীর নড়াচড়া করার পাশাপাশি মন ও চিন্তাভাবনাকেও সতেজ হওয়ার সুযোগ দেওয়া যায়।

৬. দৈনন্দিন কাজে একটু আনন্দ যোগ করুন
আনন্দের জন্য সব সময় আলাদা আয়োজন প্রয়োজন হয় না। কাজের ফাঁকে সহকর্মীর সঙ্গে মজার গল্প, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ছোট কোনো খেলা কিংবা বন্ধুর সঙ্গে হঠাৎ আড্ডা—এসবও হতে পারে আনন্দের উপলক্ষ। সুযোগ থাকলে দৈনন্দিন রুটিনে সামান্য পরিবর্তন আনুন। ছোট্ট কোনো উদ্যোগও একঘেয়েমি কাটাতে সাহায্য করতে পারে।

কষ্টকে অস্বীকার নয়, আনন্দকেও জায়গা দিন

আনন্দ করা মানে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে হালকাভাবে নেওয়া নয়। খেলাধুলা কিংবা হাসাহাসি করার অর্থ দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া নয়। বরং দায়িত্ব ও দুশ্চিন্তার পাশাপাশি নিজের ভালো থাকার জন্যও কিছুটা সময় রাখা জরুরি।

নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করতে পারেন; এই সপ্তাহে কোন বিষয়টি আপনাকে একটু হাসিয়েছে? কার সঙ্গে সময় কাটালে মন ভালো হয়? ক্লান্ত লাগলে কোন কাজটি আপনাকে স্বস্তি দেয়? কঠিন কোনো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেলে আজ নিজের জন্য ছোট্ট কী করতে পারেন? কিংবা অন্য কারো দিনটা একটু ভালো করার জন্য কী করা সম্ভব?

উত্তরগুলো খুব বড় কিছু হতে হবে না। হয়তো প্রিয়জনকে একটি ফোন করা, পছন্দের গান শোনা কিংবা কিছুক্ষণ বাইরে হাঁটতে যাওয়াই যথেষ্ট।

জীবনের কষ্ট ও কঠিন বাস্তবতাকে স্বীকার করার পাশাপাশি আনন্দের জন্যও জায়গা রাখা সম্ভব। সব দুশ্চিন্তা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে আজই ছোট কোনো ভালো লাগার মুহূর্ত তৈরি করুন। কারণ, জীবন কঠিন হলেও তার মধ্যে হাসি, আনন্দ ও সুন্দর সম্পর্কের জায়গা ফুরিয়ে যায় না।

* সাইকোলজি টুডে অবলম্বনে