সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘আগে সবাই ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থন করতো, এবার সবাই কুরাসাওয়ের’

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মঞ্চে যখন জার্মানির বিপক্ষে মাঠে নামবে কুরাসাও, তখন সেটি হবে দেশটির ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় মুহূর্ত। আর সেই ম্যাচটি বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে তাহিথ চংয়ের জন্য। কারণ পুরো স্কোয়াডে তিনিই একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি কুরাসাওতে জন্মগ্রহণ করেছেন।বর্তমানে ২৬ বছর বয়সী এই উইঙ্গার ছোটবেলার একটি বড় সময় কাটিয়েছেন ক্যারিবীয় দ্বীপ কুরাসাওয়ে। পরে ফুটবল ক্যারিয়ার গড়তে পাড়ি জমান নেদারল্যান্ডসে। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে ডাচ জাতীয় দলের হয়ে খেললেও সিনিয়র পর্যায়ে তিনি বেছে নেন নিজের জন্মভূমি কুরাসাওকেই।

২০২৫ সালে কুরাসাও জাতীয় দলে অভিষেক হয় চংয়ের। আর প্রথম বছরেই তিনি দেশকে নিয়ে যান ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপে। এবার বিশ্বমঞ্চে আইভরিকোস্ট, ইকুয়েডর ও জার্মানির বিপক্ষে খেলবে কুরাসাও।

ফিফাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চং বলেন, ‘কুরাসাওকে বেছে নেওয়ার কারণ খুব সহজ। এটা আমার কাছে সবসময় বাড়ির মতো মনে হয়েছে। প্রতি ছুটি, প্রতি গ্রীষ্মেই আমি সেখানে ফিরে যাই। যখন সুযোগ এলো, তখন আমি এমন জায়গাকেই বেছে নিয়েছি যেটা আমার নিজের বাড়ি বলে মনে হয়।’

শৈশবের স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমি কুরাসাওতেই জন্মেছি এবং ছোটবেলায় সেখানে ফুটবল খেলেছি। জাতীয় দলের সঙ্গে যখন আমরা দেশে ফিরি, তখন যে হোটেলে থাকি সেটি আমার স্কুলের ঠিক বিপরীতে। আমার বয়স তখন ছয় বা সাত বছর ছিল।’নিজের দাদির প্রসঙ্গ তুলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন চং। তিনি জানান, ৯৬ বছর বয়সী তার দাদি প্রথমবারের মতো মাঠে বসে তাকে খেলতে দেখেছিলেন, ‘তিনি সবসময় টিভিতে আমার খেলা দেখতেন, কিন্তু বয়সের কারণে ভ্রমণ করতে পারতেন না। ঘরের মাঠের ম্যাচে তিনি এসেছিলেন। ম্যাচ শেষে আমি তার সঙ্গে দেখা করি। দুই মাস পর তিনি মারা যান। সেই স্মৃতি এখনো আমার কাছে খুব বিশেষ।’

বিশ্বকাপ দেখার প্রথম স্মৃতিও ভাগ করে নিয়েছেন চং। তার ভাষায়, ২০০৬ বিশ্বকাপ ফাইনালই তাকে ফুটবলের প্রেমে ফেলেছিল, ‘ফ্রান্স আর ইতালির সেই ফাইনাল, জিদানের হেডবাট—সব এখনো মনে আছে। আমি ফ্রান্সকে সমর্থন করছিলাম। ফ্রান্স হারার পর আমি কেঁদেছিলাম। এরপর বাবাকে বলেছিলাম, আমি ফুটবল খেলতে চাই।’

চং মনে করেন, কুরাসাওয়ের বিশ্বকাপে খেলা শুধু ফুটবল নয়, বরং পুরো দেশের পরিচয় তুলে ধরার সুযোগ। তিনি বলেন, ‘অনেক মানুষ এখনো কুরাসাও সম্পর্কে খুব বেশি জানে না। আমি ইংল্যান্ডে থাকি, সেখানে খুব কম মানুষই কুরাসাওকে চেনে। আমরা চাই বিশ্বকাপের মাধ্যমে মানুষ আমাদের দেশ ও ইতিহাস সম্পর্কে জানুক।’

দলের ভেতরের সংস্কৃতি নিয়েও কথা বলেন তিনি, ‘আমাদের দলে সবাই পরিবারের মতো। এখানে কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা নেই। জাতীয় দলে এলে মনে হয় আপনি নিজের ঘরেই ফিরেছেন।’বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ নিয়ে চংয়ের অনুভূতি, ‘এটা শুধু আমার জন্য নয়, পুরো দলের জন্য স্বপ্নপূরণ। আমরা হয়তো বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে ছোট দেশ। অনেক খেলোয়াড় দীর্ঘ সময় ধরে এই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেছে।’

কুরাসাও বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়ার পর দ্বীপজুড়ে উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি, ‘মনে হয় পাঁচ মাস ধরেই দ্বীপটা ঘুমায়নি। আগে বিশ্বকাপে সবাই ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করত। এবার সবাই কুরাসাওয়ের জন্য থাকবে। এটা দারুণ এক অনুভূতি।’

ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী চং মনে করেন, কুরাসাও ফুটবলের উন্নতির জন্য তরুণদের ওপর জোর দিতে হবে। তার মতে, উন্নত অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে আগামী ২০-৩০ বছরে কুরাসাও নিয়মিত বিশ্বকাপ খেলতে পারে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে শুধু ফুটবল নয়, বিভিন্ন খেলাতেই প্রচুর প্রতিভা আছে। সঠিক সুযোগ ও অবকাঠামো পেলে কুরাসাওয়ের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হতে পারে।’
Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

‘আগে সবাই ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থন করতো, এবার সবাই কুরাসাওয়ের’

প্রকাশিত সময় : ০১:১১:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মঞ্চে যখন জার্মানির বিপক্ষে মাঠে নামবে কুরাসাও, তখন সেটি হবে দেশটির ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় মুহূর্ত। আর সেই ম্যাচটি বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে তাহিথ চংয়ের জন্য। কারণ পুরো স্কোয়াডে তিনিই একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি কুরাসাওতে জন্মগ্রহণ করেছেন।বর্তমানে ২৬ বছর বয়সী এই উইঙ্গার ছোটবেলার একটি বড় সময় কাটিয়েছেন ক্যারিবীয় দ্বীপ কুরাসাওয়ে। পরে ফুটবল ক্যারিয়ার গড়তে পাড়ি জমান নেদারল্যান্ডসে। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে ডাচ জাতীয় দলের হয়ে খেললেও সিনিয়র পর্যায়ে তিনি বেছে নেন নিজের জন্মভূমি কুরাসাওকেই।

২০২৫ সালে কুরাসাও জাতীয় দলে অভিষেক হয় চংয়ের। আর প্রথম বছরেই তিনি দেশকে নিয়ে যান ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপে। এবার বিশ্বমঞ্চে আইভরিকোস্ট, ইকুয়েডর ও জার্মানির বিপক্ষে খেলবে কুরাসাও।

ফিফাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চং বলেন, ‘কুরাসাওকে বেছে নেওয়ার কারণ খুব সহজ। এটা আমার কাছে সবসময় বাড়ির মতো মনে হয়েছে। প্রতি ছুটি, প্রতি গ্রীষ্মেই আমি সেখানে ফিরে যাই। যখন সুযোগ এলো, তখন আমি এমন জায়গাকেই বেছে নিয়েছি যেটা আমার নিজের বাড়ি বলে মনে হয়।’

শৈশবের স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমি কুরাসাওতেই জন্মেছি এবং ছোটবেলায় সেখানে ফুটবল খেলেছি। জাতীয় দলের সঙ্গে যখন আমরা দেশে ফিরি, তখন যে হোটেলে থাকি সেটি আমার স্কুলের ঠিক বিপরীতে। আমার বয়স তখন ছয় বা সাত বছর ছিল।’নিজের দাদির প্রসঙ্গ তুলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন চং। তিনি জানান, ৯৬ বছর বয়সী তার দাদি প্রথমবারের মতো মাঠে বসে তাকে খেলতে দেখেছিলেন, ‘তিনি সবসময় টিভিতে আমার খেলা দেখতেন, কিন্তু বয়সের কারণে ভ্রমণ করতে পারতেন না। ঘরের মাঠের ম্যাচে তিনি এসেছিলেন। ম্যাচ শেষে আমি তার সঙ্গে দেখা করি। দুই মাস পর তিনি মারা যান। সেই স্মৃতি এখনো আমার কাছে খুব বিশেষ।’

বিশ্বকাপ দেখার প্রথম স্মৃতিও ভাগ করে নিয়েছেন চং। তার ভাষায়, ২০০৬ বিশ্বকাপ ফাইনালই তাকে ফুটবলের প্রেমে ফেলেছিল, ‘ফ্রান্স আর ইতালির সেই ফাইনাল, জিদানের হেডবাট—সব এখনো মনে আছে। আমি ফ্রান্সকে সমর্থন করছিলাম। ফ্রান্স হারার পর আমি কেঁদেছিলাম। এরপর বাবাকে বলেছিলাম, আমি ফুটবল খেলতে চাই।’

চং মনে করেন, কুরাসাওয়ের বিশ্বকাপে খেলা শুধু ফুটবল নয়, বরং পুরো দেশের পরিচয় তুলে ধরার সুযোগ। তিনি বলেন, ‘অনেক মানুষ এখনো কুরাসাও সম্পর্কে খুব বেশি জানে না। আমি ইংল্যান্ডে থাকি, সেখানে খুব কম মানুষই কুরাসাওকে চেনে। আমরা চাই বিশ্বকাপের মাধ্যমে মানুষ আমাদের দেশ ও ইতিহাস সম্পর্কে জানুক।’

দলের ভেতরের সংস্কৃতি নিয়েও কথা বলেন তিনি, ‘আমাদের দলে সবাই পরিবারের মতো। এখানে কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা নেই। জাতীয় দলে এলে মনে হয় আপনি নিজের ঘরেই ফিরেছেন।’বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ নিয়ে চংয়ের অনুভূতি, ‘এটা শুধু আমার জন্য নয়, পুরো দলের জন্য স্বপ্নপূরণ। আমরা হয়তো বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে ছোট দেশ। অনেক খেলোয়াড় দীর্ঘ সময় ধরে এই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেছে।’

কুরাসাও বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়ার পর দ্বীপজুড়ে উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি, ‘মনে হয় পাঁচ মাস ধরেই দ্বীপটা ঘুমায়নি। আগে বিশ্বকাপে সবাই ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করত। এবার সবাই কুরাসাওয়ের জন্য থাকবে। এটা দারুণ এক অনুভূতি।’

ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী চং মনে করেন, কুরাসাও ফুটবলের উন্নতির জন্য তরুণদের ওপর জোর দিতে হবে। তার মতে, উন্নত অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে আগামী ২০-৩০ বছরে কুরাসাও নিয়মিত বিশ্বকাপ খেলতে পারে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে শুধু ফুটবল নয়, বিভিন্ন খেলাতেই প্রচুর প্রতিভা আছে। সঠিক সুযোগ ও অবকাঠামো পেলে কুরাসাওয়ের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হতে পারে।’