বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্ত্রীর আয় বেশি হলে সমস্যা নাকি সম্ভাবনা

এই শহুরে বাস্তবতায় স্বামী-স্ত্রী দুইজনেই আয় করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। সকাল কিংবা বিকালের চা-নাশতার টেবিলে হিসাব-নিকাশ চলে—কে অফিসে আগে বের হবে, কার মিটিং কখন, আর আজকের খরচটা কে সামলাবে। একসময় যে পরিবারে স্বামীর আয়ই ছিল একমাত্র ভিত্তি, সেখানে এখন ছবিটা বদলেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, স্ত্রী কর্পোরেট চাকরিতে, ফ্রিল্যান্সিংয়ে বা উদ্যোক্তা হিসেবে বেশি আয় করছেন—আর এই পরিবর্তন অনেক দম্পতির জীবনে নতুন প্রশ্ন, নতুন দ্বিধা এবং নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
অর্থনীতিবিদ বার্টেন্ড ক্যামেনিকা দেখিয়েছেন, ‘‘যেসব পরিবারে স্ত্রী স্বামীর চেয়ে বেশি আয় করেন, সেখানে অনেক পুরুষ মানসিকভাবে অস্বস্তি অনুভব করেন’’।–কারণটা খুব সরল—শৈশব থেকে শেখানো একটি ধারণা: পুরুষ মানে প্রধান উপার্জনকারী। অন্যদিকে পিউ রিসার্স সেন্টারের তথ্য বলছে, আধুনিক প্রজন্মে এই ধারণা ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। তরুণ দম্পতিরা এখন বেশি সমতা ভিত্তিক সম্পর্ককে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করছে।

আয়ের পরিবর্তন, মানসিকতার পরীক্ষা
লিঙ্গভিত্তিক ধারণা—“পুরুষই প্রধান উপার্জনকারী”। বাস্তবতা কিন্তু তা আর নেই। এই পরিবর্তন যদি মানসিকভাবে গ্রহণ করা না যায়, তাহলে সম্পর্কের মধ্যে অস্বস্তি, প্রতিযোগিতা বা আত্মসম্মানের সংকট তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে কিছু পুরুষের মধ্যে পরিবার চালানোর ভূমিকা নিয়ে চাপ তৈরি হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে নারীরা নিজেদের সাফল্য প্রকাশে দ্বিধা বোধ করেন, যাতে সম্পর্কের টানাপোড়েন না বাড়ে।

সমস্যাটা আয়ে নাকি ধারণায়
আয় নিজে কখনও সমস্যা নয়। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন সম্পর্কের ভেতরে ‘কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ’—এই তুলনা ঢুকে পড়ে। একটি সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত অংশীদারত্ব, প্রতিযোগিতা নয়। কিন্তু বাস্তবে অনেক পরিবারে দেখা যায়, আয় বেশি হলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিয়েও টানাপোড়েন শুরু হয়। কোথায় টাকা খরচ হবে, বড় সিদ্ধান্ত কে নেবে—এসব জায়গায় অদৃশ্য ক্ষমতার লড়াই তৈরি হয়।

করণীয়: নতুন সমতার ভাষা শেখা
আয়ের পার্থক্য নিয়ে লজ্জা বা অহংকার না রেখে খোলাখুলি কথা বলা জরুরি।
পুরোনো সামাজিক স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী নয়, বরং বাস্তবতার ভিত্তিতে দায়িত্ব ভাগ করা দরকার। কে রান্না করবে, কে বিল পরিশোধ করবে, কে সঞ্চয় পরিকল্পনা করবে—এসব এখন লিঙ্গ নয়, দক্ষতা ও সময়ের ভিত্তিতে ঠিক হওয়া উচিত।
আর্থিক অবদান যাই হোক, সম্পর্কের মর্যাদা সমান। একজন বেশি আয় করলেও অন্যজনের শ্রম, আবেগ ও অবদানকে ছোট করা সম্পর্ককে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে। আয় কম মানেই কম মূল্য—এই ধারণা ভাঙা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ হিসেবে মূল্য নির্ধারিত হয় অবদান, চরিত্র ও সম্পর্কের যত্ন দিয়ে, শুধু টাকার অঙ্ক দিয়ে নয়।
দম্পতি যদি একসাথে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করে—বাড়ি, সন্তান, সঞ্চয় বা ভ্রমণ—তাহলে আয়ের পার্থক্য ‘আমার-তোমার’ থেকে ‘আমাদের’ হয়ে যায়। বর্তমান সমাজে অনেক পরিবারেই স্ত্রী বেশি আয় করছেন। এটা কোনো ব্যতিক্রম নয়, বরং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনে নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বেড়েছে, আর সেই সঙ্গে বদলেছে সম্পর্কের কাঠামোও।
কিন্তু এই পরিবর্তন সফল হবে কি না, তা নির্ভর করছে একটাই জিনিসের ওপর—মানসিক প্রস্তুতি। টাকা নয়, বরং মনোজগতে সমতা না এলে আয়ের সমতা সম্পর্ককে স্থিতিশীল করতে পারে না। দম্পতির গন্তব্য এক, এই যাত্রায়  দুইজন মানুষ একে অপরের পাশে হাঁটে—কখনও একজনের পা একটু এগিয়ে থাকে, কখনও অন্যজনের। গুরুত্বপূর্ণ হলো হাঁটা বন্ধ না হওয়া।

সূত্র: জার্নাল অফ ম্যারিজ অ্যান্ড ফ্যামিলি অবলম্বনে

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

স্ত্রীর আয় বেশি হলে সমস্যা নাকি সম্ভাবনা

প্রকাশিত সময় : ১০:৩২:১০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

এই শহুরে বাস্তবতায় স্বামী-স্ত্রী দুইজনেই আয় করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। সকাল কিংবা বিকালের চা-নাশতার টেবিলে হিসাব-নিকাশ চলে—কে অফিসে আগে বের হবে, কার মিটিং কখন, আর আজকের খরচটা কে সামলাবে। একসময় যে পরিবারে স্বামীর আয়ই ছিল একমাত্র ভিত্তি, সেখানে এখন ছবিটা বদলেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, স্ত্রী কর্পোরেট চাকরিতে, ফ্রিল্যান্সিংয়ে বা উদ্যোক্তা হিসেবে বেশি আয় করছেন—আর এই পরিবর্তন অনেক দম্পতির জীবনে নতুন প্রশ্ন, নতুন দ্বিধা এবং নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
অর্থনীতিবিদ বার্টেন্ড ক্যামেনিকা দেখিয়েছেন, ‘‘যেসব পরিবারে স্ত্রী স্বামীর চেয়ে বেশি আয় করেন, সেখানে অনেক পুরুষ মানসিকভাবে অস্বস্তি অনুভব করেন’’।–কারণটা খুব সরল—শৈশব থেকে শেখানো একটি ধারণা: পুরুষ মানে প্রধান উপার্জনকারী। অন্যদিকে পিউ রিসার্স সেন্টারের তথ্য বলছে, আধুনিক প্রজন্মে এই ধারণা ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। তরুণ দম্পতিরা এখন বেশি সমতা ভিত্তিক সম্পর্ককে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করছে।

আয়ের পরিবর্তন, মানসিকতার পরীক্ষা
লিঙ্গভিত্তিক ধারণা—“পুরুষই প্রধান উপার্জনকারী”। বাস্তবতা কিন্তু তা আর নেই। এই পরিবর্তন যদি মানসিকভাবে গ্রহণ করা না যায়, তাহলে সম্পর্কের মধ্যে অস্বস্তি, প্রতিযোগিতা বা আত্মসম্মানের সংকট তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে কিছু পুরুষের মধ্যে পরিবার চালানোর ভূমিকা নিয়ে চাপ তৈরি হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে নারীরা নিজেদের সাফল্য প্রকাশে দ্বিধা বোধ করেন, যাতে সম্পর্কের টানাপোড়েন না বাড়ে।

সমস্যাটা আয়ে নাকি ধারণায়
আয় নিজে কখনও সমস্যা নয়। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন সম্পর্কের ভেতরে ‘কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ’—এই তুলনা ঢুকে পড়ে। একটি সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত অংশীদারত্ব, প্রতিযোগিতা নয়। কিন্তু বাস্তবে অনেক পরিবারে দেখা যায়, আয় বেশি হলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিয়েও টানাপোড়েন শুরু হয়। কোথায় টাকা খরচ হবে, বড় সিদ্ধান্ত কে নেবে—এসব জায়গায় অদৃশ্য ক্ষমতার লড়াই তৈরি হয়।

করণীয়: নতুন সমতার ভাষা শেখা
আয়ের পার্থক্য নিয়ে লজ্জা বা অহংকার না রেখে খোলাখুলি কথা বলা জরুরি।
পুরোনো সামাজিক স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী নয়, বরং বাস্তবতার ভিত্তিতে দায়িত্ব ভাগ করা দরকার। কে রান্না করবে, কে বিল পরিশোধ করবে, কে সঞ্চয় পরিকল্পনা করবে—এসব এখন লিঙ্গ নয়, দক্ষতা ও সময়ের ভিত্তিতে ঠিক হওয়া উচিত।
আর্থিক অবদান যাই হোক, সম্পর্কের মর্যাদা সমান। একজন বেশি আয় করলেও অন্যজনের শ্রম, আবেগ ও অবদানকে ছোট করা সম্পর্ককে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে। আয় কম মানেই কম মূল্য—এই ধারণা ভাঙা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ হিসেবে মূল্য নির্ধারিত হয় অবদান, চরিত্র ও সম্পর্কের যত্ন দিয়ে, শুধু টাকার অঙ্ক দিয়ে নয়।
দম্পতি যদি একসাথে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করে—বাড়ি, সন্তান, সঞ্চয় বা ভ্রমণ—তাহলে আয়ের পার্থক্য ‘আমার-তোমার’ থেকে ‘আমাদের’ হয়ে যায়। বর্তমান সমাজে অনেক পরিবারেই স্ত্রী বেশি আয় করছেন। এটা কোনো ব্যতিক্রম নয়, বরং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনে নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বেড়েছে, আর সেই সঙ্গে বদলেছে সম্পর্কের কাঠামোও।
কিন্তু এই পরিবর্তন সফল হবে কি না, তা নির্ভর করছে একটাই জিনিসের ওপর—মানসিক প্রস্তুতি। টাকা নয়, বরং মনোজগতে সমতা না এলে আয়ের সমতা সম্পর্ককে স্থিতিশীল করতে পারে না। দম্পতির গন্তব্য এক, এই যাত্রায়  দুইজন মানুষ একে অপরের পাশে হাঁটে—কখনও একজনের পা একটু এগিয়ে থাকে, কখনও অন্যজনের। গুরুত্বপূর্ণ হলো হাঁটা বন্ধ না হওয়া।

সূত্র: জার্নাল অফ ম্যারিজ অ্যান্ড ফ্যামিলি অবলম্বনে