রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পরকীয়া কি মানসিক রোগ, কী বলছে বিজ্ঞান?

বর্তমানে অনেক মানুষ পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ছে। এই প্রবণতা আগের থেকে বেড়েছে বহুগুণ।

সামাজে অনেকে এটিকে ‘মানসিক সমস্যা’ মনে করে। তবে এটা কি মানুষের সহজাত স্বভাব, নাকি একধরনের মানসিক সমস্যা? চলুন, জেনে নেওয়া যাক এ বিষয়ে বিজ্ঞান কী বলে।
দাম্পত্য সম্পর্কের বাইরে অন্য কারো সঙ্গে আবেগীয় বা শারীরিক সম্পর্কে জড়ালেই তাকে সরাসরি ‘মানসিক রোগী’ বানিয়ে দেওয়া বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সম্পূর্ণ ভুল। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, পরকীয়া মূলত একটি সম্পর্কগত ও সামাজিক আচরণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আইসিডি ১১ অনুযায়ী, কোনো আচরণকে মানসিক রোগ হিসেবে চিহ্নিত করতে হলে ব্যক্তির তীব্র মানসিক কষ্ট, অনিয়ন্ত্রিত আচরণ বা দৈনন্দিন জীবনে চরম ব্যাঘাত ঘটার মতো বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড থাকতে হয়। তাই পরকীয়ায় জড়ালেই কাউকে মানসিক বলা যায় না। কেউ পরকীয়ায় জড়িয়েছেন বলেই তাকে মানসিক রোগী বলা চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সঠিক নয়।

তাহলে কখন মানসিক সমস্যার বিষয়টি সামনে আসতে পারে?

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে যৌন বা সম্পর্কগত আচরণ এতটাই পুনরাবৃত্তিমূলক ও নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে যে তা ব্যক্তির জীবন ও সম্পর্কের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলে।

আইসিডি১১-এ ধরনের নির্দিষ্ট পরিস্থিতির জন্য কম্পালসিভ সেক্সুয়াল বিহেভিয়ার ডিসঅর্ডার (সিএসবিডি) নামে একটি মানসিক-আচরণগত রোগের শ্রেণি রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, আগের ‘ইকসেসিভ সেক্সুয়াল ড্রাইভ’ ধারণাটিকে আইসিডি১১-এ পুনর্গঠন করেকম্পালসিভ সেক্সুয়াল বিহেভিয়ার ডিসঅর্ডার হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।
তবে সিএসবিডি আর পরকীয়া এক জিনিস নয়। পরকীয়ার ঘটনা ঘটলেই কারো সিএসবিডি আছে—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।

পরকীয়ার পেছনে কী কী কারণ থাকতে পারে?

একটি সম্পর্কে অন্য কারো সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে।

যেমন—দাম্পত্য বা সম্পর্কের দীর্ঘদিনের সমস্যা, আবেগীয় দূরত্ব ও যোগাযোগের ঘাটতি, সম্পর্কের প্রতি অসন্তুষ্টি, নতুনত্ব বা উত্তেজনার প্রতি আকর্ষণ, ব্যক্তিগত মূল্যবোধ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়, সম্পর্কের বাইরে আবেগীয় ঘনিষ্ঠতা তৈরি হওয়া, কিছু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণহীন যৌন আচরণ বা অন্য কোনো মানসিক সমস্যার উপস্থিতি। তবে এসব কারণের কোনো একটিকেই সব পরকীয়ার ক্ষেত্রে দায়ী করা যায় না।
‘মানসিক রোগ’ বলে দাগিয়ে দেওয়া কেন ঠিক নয়?

মানসিক রোগ একটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আইসিডি ১১ হলো রোগ ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার আন্তর্জাতিক শ্রেণিবিন্যাস ব্যবস্থা, যেখানে নির্দিষ্ট রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়।

তাই কারো ব্যক্তিগত সম্পর্কের সিদ্ধান্ত বা ভুল আচরণকে সরাসরি ‘মানসিক রোগ’ বলা যেমন বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়, তেমনি প্রকৃত মানসিক সমস্যার সম্ভাবনাকেও একেবারে অস্বীকার করা উচিত নয়।

কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন?

যদি কোনো ব্যক্তির যৌন বা সম্পর্কগত আচরণ বারবার ঘটে, নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয় এবং এর কারণে নিজের পড়াশোনা, কাজ, পরিবার, সম্পর্ক বা দৈনন্দিন জীবনে উল্লেখযোগ্য সমস্যা তৈরি হয়, তাহলে একজন যোগ্য মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আইসিডি ১১-এর ক্লিনিক্যাল গাইডলাইনও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের মাধ্যমে সঠিক মূল্যায়ন ও রোগ নির্ণয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়।

পরকীয়া নিজে কোনো মানসিক রোগ নয়। এটি মূলত একটি সম্পর্কগত ও ব্যক্তিগত আচরণ। তবে এর পেছনে কখনো কখনো মানসিক বা আচরণগত সমস্যা থাকতে পারে। তাই কাউকে শুধু পরকীয়ায় জড়িত থাকার কারণে ‘মানসিক রোগী’ বলা ঠিক নয়। প্রয়োজন হলে তার আচরণ, মানসিক অবস্থা ও জীবনে এর প্রভাব বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা উচিত।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

পরকীয়া কি মানসিক রোগ, কী বলছে বিজ্ঞান?

প্রকাশিত সময় : ০৬:০১:২০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬

বর্তমানে অনেক মানুষ পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ছে। এই প্রবণতা আগের থেকে বেড়েছে বহুগুণ।

সামাজে অনেকে এটিকে ‘মানসিক সমস্যা’ মনে করে। তবে এটা কি মানুষের সহজাত স্বভাব, নাকি একধরনের মানসিক সমস্যা? চলুন, জেনে নেওয়া যাক এ বিষয়ে বিজ্ঞান কী বলে।
দাম্পত্য সম্পর্কের বাইরে অন্য কারো সঙ্গে আবেগীয় বা শারীরিক সম্পর্কে জড়ালেই তাকে সরাসরি ‘মানসিক রোগী’ বানিয়ে দেওয়া বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সম্পূর্ণ ভুল। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, পরকীয়া মূলত একটি সম্পর্কগত ও সামাজিক আচরণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আইসিডি ১১ অনুযায়ী, কোনো আচরণকে মানসিক রোগ হিসেবে চিহ্নিত করতে হলে ব্যক্তির তীব্র মানসিক কষ্ট, অনিয়ন্ত্রিত আচরণ বা দৈনন্দিন জীবনে চরম ব্যাঘাত ঘটার মতো বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড থাকতে হয়। তাই পরকীয়ায় জড়ালেই কাউকে মানসিক বলা যায় না। কেউ পরকীয়ায় জড়িয়েছেন বলেই তাকে মানসিক রোগী বলা চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সঠিক নয়।

তাহলে কখন মানসিক সমস্যার বিষয়টি সামনে আসতে পারে?

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে যৌন বা সম্পর্কগত আচরণ এতটাই পুনরাবৃত্তিমূলক ও নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে যে তা ব্যক্তির জীবন ও সম্পর্কের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলে।

আইসিডি১১-এ ধরনের নির্দিষ্ট পরিস্থিতির জন্য কম্পালসিভ সেক্সুয়াল বিহেভিয়ার ডিসঅর্ডার (সিএসবিডি) নামে একটি মানসিক-আচরণগত রোগের শ্রেণি রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, আগের ‘ইকসেসিভ সেক্সুয়াল ড্রাইভ’ ধারণাটিকে আইসিডি১১-এ পুনর্গঠন করেকম্পালসিভ সেক্সুয়াল বিহেভিয়ার ডিসঅর্ডার হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।
তবে সিএসবিডি আর পরকীয়া এক জিনিস নয়। পরকীয়ার ঘটনা ঘটলেই কারো সিএসবিডি আছে—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।

পরকীয়ার পেছনে কী কী কারণ থাকতে পারে?

একটি সম্পর্কে অন্য কারো সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে।

যেমন—দাম্পত্য বা সম্পর্কের দীর্ঘদিনের সমস্যা, আবেগীয় দূরত্ব ও যোগাযোগের ঘাটতি, সম্পর্কের প্রতি অসন্তুষ্টি, নতুনত্ব বা উত্তেজনার প্রতি আকর্ষণ, ব্যক্তিগত মূল্যবোধ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়, সম্পর্কের বাইরে আবেগীয় ঘনিষ্ঠতা তৈরি হওয়া, কিছু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণহীন যৌন আচরণ বা অন্য কোনো মানসিক সমস্যার উপস্থিতি। তবে এসব কারণের কোনো একটিকেই সব পরকীয়ার ক্ষেত্রে দায়ী করা যায় না।
‘মানসিক রোগ’ বলে দাগিয়ে দেওয়া কেন ঠিক নয়?

মানসিক রোগ একটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আইসিডি ১১ হলো রোগ ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার আন্তর্জাতিক শ্রেণিবিন্যাস ব্যবস্থা, যেখানে নির্দিষ্ট রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়।

তাই কারো ব্যক্তিগত সম্পর্কের সিদ্ধান্ত বা ভুল আচরণকে সরাসরি ‘মানসিক রোগ’ বলা যেমন বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়, তেমনি প্রকৃত মানসিক সমস্যার সম্ভাবনাকেও একেবারে অস্বীকার করা উচিত নয়।

কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন?

যদি কোনো ব্যক্তির যৌন বা সম্পর্কগত আচরণ বারবার ঘটে, নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয় এবং এর কারণে নিজের পড়াশোনা, কাজ, পরিবার, সম্পর্ক বা দৈনন্দিন জীবনে উল্লেখযোগ্য সমস্যা তৈরি হয়, তাহলে একজন যোগ্য মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আইসিডি ১১-এর ক্লিনিক্যাল গাইডলাইনও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের মাধ্যমে সঠিক মূল্যায়ন ও রোগ নির্ণয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়।

পরকীয়া নিজে কোনো মানসিক রোগ নয়। এটি মূলত একটি সম্পর্কগত ও ব্যক্তিগত আচরণ। তবে এর পেছনে কখনো কখনো মানসিক বা আচরণগত সমস্যা থাকতে পারে। তাই কাউকে শুধু পরকীয়ায় জড়িত থাকার কারণে ‘মানসিক রোগী’ বলা ঠিক নয়। প্রয়োজন হলে তার আচরণ, মানসিক অবস্থা ও জীবনে এর প্রভাব বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা উচিত।