রক্তক্ষয়ী সেই আন্দোলনের ৬৪ বছর পেরিয়েছে। এরমধ্যে স্বাধীন হয়েছে বাংলাদেশ। পরিবর্তন এসেছে শিক্ষাব্যবস্থায়। বিনামূল্যে পাঠ্যবই, উপবৃত্তি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষার সম্প্রসারণসহ নানান উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রণয়ন করা হয়েছে ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’।
তবুও দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল শিক্ষাব্যবস্থার প্রশ্নে এখনো রয়ে গেছে মৌলিক চ্যালেঞ্জ। ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতির অনেক লক্ষ্য ও সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষার স্তর অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণ ও শিক্ষাআইন প্রণয়নেও কোনো অগ্রগতি নেই। টেকসই, যুগোপযোগী ও সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাও অধরা।
স্বাধীন বাংলাদেশে একের পর এক সরকার ক্ষমতায় এসেছে। শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বুলি আওড়ালেও কার্যকর শিক্ষানীতি মেলেনি। সুপারিশ বাস্তবায়নে অনীহা, শিক্ষা আইন প্রণয়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং বারবার পরিবর্তিত শিক্ষাক্রমের কারণে শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমেই ভেঙে পড়ছে।
বিএনপি সরকার অবশ্য নতুন শিক্ষানীতি করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। তবে সরকারে বসার প্রায় ৮ মাস হলেও শিক্ষানীতি প্রণয়নে কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। সরকারকে বারবার তাগিদ দিলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখছেন না শিক্ষাবিদরা। এ নিয়ে হতাশ তারা।
শরীফ কমিশনের শিক্ষানীতিতে ক্ষোভে ফেটে পড়েন শিক্ষার্থীরা
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খান একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করে। কমিশনের নেতৃত্বে ছিলন এস এম শরীফ। এটি শরীফ কমিশন নামেও পরিচিত।
কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিভিন্ন সুপারিশ নিয়ে পূর্ব-পাকিস্তানে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ছিল, প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় শিক্ষার সুযোগ সংকুচিত হবে এবং সাধারণ মানুষের শিক্ষার খরচ বাড়বে।
তৎকালীন সময়ে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নসহ বিভিন্ন ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠন শরীফ কমিশনের সুপারিশের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে। ১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে চলে বিক্ষোভ। ১৭ সেপ্টেম্বর সারাদেশে হরতালের ডাক দেওয়া হয়।
সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিছিল বের করা হলে পুলিশ লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও গুলি চালায়। এতে ছাত্রনেতা বাবুল, গোলাম মোস্তফা ও ওয়াজিউল্লাহসহ অনেকে নিহত হন। পরে আন্দোলনের চাপে শরীফ কমিশনের সুপারিশ স্থগিত করা হয়।
সেই সময়ের আন্দোলনে শিক্ষার সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক, শিক্ষার ব্যয়, উচ্চশিক্ষার সুযোগ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার মতো বিষয় সামনে এসেছিল। অর্থাৎ, শিক্ষা কেমন হবে- এ প্রশ্নটিই আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
স্বাধীন দেশে বারবার শিক্ষানীতি, হয়নি বাস্তবায়ন
স্বাধীনতার পরও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে একাধিক কমিশন ও কমিটি কাজ করেছে। ১৯৭২ সালে ড. কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনের প্রতিবেদনে স্বাধীন বাংলাদেশের উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। তবে অধিকাংশ সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি।
এরপর বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা কমিশন ও কমিটি গঠন করা হয়েছে। ২০১০ সালে প্রণয়ন করা হয় জাতীয় শিক্ষানীতি। এতে প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, মাদরাসা শিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার মানোন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
নীতিতে সময়ের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের সুযোগও রাখা হয়েছিল। একই সঙ্গে একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান ও স্বীকৃতির জন্য অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল গঠনের কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু নীতি প্রণয়নের পরও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
কেমন শিক্ষানীতি চান বিশেষজ্ঞরা
দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবায়নযোগ্য শিক্ষানীতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী জাগো নিউজকে বলেন, শিক্ষানীতি মানে শুধু পাঠ্যক্রম বা কারিকুলাম পরিবর্তন নয়। টেকসই শিক্ষানীতির সঙ্গে অর্থায়ন, শিক্ষক, অবকাঠামো, মূল্যায়ন ও বাস্তবায়নের কাঠামোটা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, বিএনপি সরকার জীবনমুখী শিক্ষানীতি করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। জীবনমুখী শিক্ষানীতি মানে শহর ও গ্রামের বৈষম্য কমাতে হবে। শিক্ষকের মান ও মর্যাদা শিক্ষানীতির কেন্দ্রে রাখতে হবে। শিক্ষাকে শুধু পরীক্ষার ফলনির্ভর না করে জ্ঞান, চিন্তা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান ও ব্যবহারিক দক্ষতা তৈরির দিকে নিতে হবে। এর সঙ্গে মূল্যায়ন পদ্ধতিরও সামঞ্জস্য থাকতে হবে। পাশাপাশি সমন্বিত একটি শিক্ষা আইন করতে হবে। সেটিকে কার্যকর রাখতে হবে।
টেকসই শিক্ষানীতি প্রণয়নে কী করা উচিত
১৯৬২ সালে শিক্ষার্থীরা যে ক্ষোভ নিয়ে রাজপথে নেমেছিলেন, তা ছিল শিক্ষাকে মানুষের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি। স্বাধীনতার পর সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই বিভিন্ন সময়ে শিক্ষানীতি প্রণয়ন হয়েছে। কিন্তু নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
নতুন শিক্ষানীতির পাশাপাশি আগের নীতিগুলোর কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়েছে, কোনোটি হয়নি এবং কেন হয়নি, সেটারও মূল্যায়ন জরুরি বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।
তিনি বলেন, টেকসই শিক্ষানীতির প্রথম শর্ত ধারাবাহিকতা। সরকার কিংবা শিক্ষামন্ত্রী পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষার মৌলিক কাঠামো বারবার বদলে গেলে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। হ্যাঁ, কোনো পরিবর্তন প্রয়োজন? তাহলে শিক্ষাবিদ, গবেষক ও অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে করা জরুরি।
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, যে শিক্ষানীতি গ্রহণ করা হবে, তার সঙ্গে বাস্তবায়নের সময়সীমা ও অর্থায়নের পরিকল্পনা থাকতে হবে। কোন সিদ্ধান্ত কত বছরে বাস্তবায়িত হবে, এর জন্য কত টাকা প্রয়োজন এবং অগ্রগতি কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে- এসব স্পষ্ট না থাকলে শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে।
শিক্ষানীতি নিয়ে সরকারের ভাবনা
নির্বাচনি ইশতেহারে বিএনপি জীবনমুখী শিক্ষানীতি করার ঘোষণা দিয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষানীতি প্রণয়ন দীর্ঘমেয়াদি কাজ। তারপরও আমরা এ নিয়ে কাজ করতে চাই। জাতিকে একটি টেকসই শিক্ষানীতি উপহার দিতে চাই। শিগগির এ বিষয়ে দৃশ্যমান কাজ শুরু হবে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, বিএনপি সরকার একটি শিক্ষানীতি করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সেই শিক্ষানীতি হবে জীবনমুখী। শিক্ষার সব স্তরে জোর দেওয়া হবে। প্রাথমিক শিক্ষায় জোর দেওয়া হবে বেশি। মৌলিক মূল্যবোধ শিক্ষায় গুরুত্বারোপ করা হবে।
তিনি বলেন, শিক্ষায় খেলাধুলা থাকবে, আনন্দময় করা হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজমান সব নৈরাজ্য দূর করতে হবে। নিম্ন ও মধ্যপর্যায়ে চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়াই বিএনপির শিক্ষানীতির মূল লক্ষ্য হবে।

ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 
























