একই সঙ্গে এতে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া, আন্তর্জাতিক সহায়তায় নির্বিঘ্ন উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়ন এবং প্রতি বছর উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির (সিডিপি) কাছে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান টিবিএসকে বলেন, তারা দীর্ঘ দিন ধরেই প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত সময়ের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য সুখবর হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্ধিত এই সময়কে অবকাঠামো ও লজিস্টিকস খাতের উন্নয়ন এবং যেসব দেশের সঙ্গে প্রয়োজন সেখানে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের কাজে অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে।
অন্যদিকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির বিশেষ ফেলো ফাহমিদা খাতুন জানান, কেবল উত্তরণের সময়সীমা বাড়ালেই অর্থনীতি আরও প্রতিযোগিতাসক্ষম হবে না। তিনি টিবিএসকে বলেন, ‘বাণিজ্য, রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং ও অবকাঠামো খাতে কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন।’
পরবর্তীতে ইউএন-সিডিপি আবেদনটি ইতিবাচকভাবে বিবেচনার সুপারিশ করে এবং জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) গত ২১ জুলাই সাধারণ পরিষদকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুপারিশ পাঠায়।
এই সময় বৃদ্ধির ফলে সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন সহযোগী ও বাজারগুলোর নিয়ম সাপেক্ষে অতিরিক্ত প্রস্তুতিমূলক সময়েও এলডিসি-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং বাণিজ্য সুবিধাগুলো বজায় রাখার সুযোগ পাবে বাংলাদেশ।
তবে অর্থনীতিবিদ ও বাণিজ্য বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, অতিরিক্ত এই সময় পাওয়া মানেই উত্তরণের চ্যালেঞ্জগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাধান হয়ে যাবে না। সংশোধিত সময়সীমার আগেই বাংলাদেশকে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
১৯৭৫ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের এলডিসি তালিকাভুক্ত হয়েছিল বাংলাদেশ। পরবর্তীতে কৃষি, শিল্প উন্নয়ন, পোশাক রপ্তানি, রেমিট্যান্স, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের অগ্রগতি দেশটিকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনে সহায়তা করে।
সে সময় কোভিড-১৯ মহামারির অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় বাংলাদেশকে স্বাভাবিক তিন বছরের পরিবর্তে পাঁচ বছরের প্রস্তুতিমূলক সময় দেওয়া হয়েছিল। ফলে চূড়ান্ত উত্তরণের জন্য ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর নির্ধারিত ছিল।
উত্তরণ হলে যেসব চ্যালেঞ্জে পড়তে পারত
এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ বেশ কয়েকটি প্রধান রপ্তানি গন্তব্যে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা পেয়ে থাকে। উত্তরণের পর এসব ব্যবস্থার পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়তে পারে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও জাপানের মতো বাজারে পণ্যের দামের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
এই পরিবর্তনের মাত্রা ও সময় নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য অংশীদারদের নিজস্ব নীতি এবং তাদের দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার ওপর।
বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক জাতিসংঘ সম্মেলনের (আঙ্কটাড) ২০২৫ সালের এক বিশ্লেষণে প্রাক্কলন করা হয়েছিল যে, বাণিজ্য সুবিধাগুলো হারালে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি প্রায় ৩২ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে; তবে এটি একটি সম্ভাব্য প্রভাবের ধারণা, কোনো নিশ্চিত ফলাফল নয়।
বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তফা আবিদ খান টিবিএসকে বলেন, ‘এএলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ায় সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করবে। বিশেষ করে মেধাস্বত্ব (আইপি) সংক্রান্ত ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আরও তিন বছর সময় পাবে। বাংলাদেশ এখনো কোনো এফটিএ বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করতে পারেনি। ফলে এ ধরনের চুক্তি সম্পাদনের জন্যও বাড়তি সময় পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের সুযোগ বাড়বে।’
এই বাণিজ্য বিশ্লেষক বলেন, ‘বর্তমান ব্যবস্থায় ব্যবসা-বাণিজ্য চলতে থাকলে আমরা এমনিতেই অনেক সুবিধা হারাব। তাই প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের জন্য যে অতিরিক্ত সময় পাওয়া গেলো, সেটি আমাদের কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে। এই সময়টি সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে সামনে আমাদের সমস্যাগুলো অনেকটাই কমে আসবে। তবে সময় পেয়েও যদি তা কাজে লাগাতে না পারি, তাহলে আবার একই জায়গায় ফিরে যেতে হবে।’
তৈরি পোশাক, ওষুধশিল্প ও অর্থায়নে ঝুঁকি
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ অর্জনকারী পোশাক খাত অগ্রাধিকারমূলক শুল্কের পরিবর্তনের কারণে বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছে। ক্রেতাদের জন্য কার্যকর দাম বেড়ে গেলে তা ক্রয়াদেশ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এসব ঝুঁকি কমাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, পণ্যের মানোন্নয়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এছাড়া সম্ভাব্য পরিবর্তনের মুখে পড়বে ওষুধ শিল্পও। এলডিসি হিসেবে আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব বিধিমালার অধীনে কিছু বিশেষ ছাড় পেয়ে থাকে বাংলাদেশ। উত্তরণের পর প্রযোজ্য বিধিমালার পরিবর্তন প্যাটেন্টযুক্ত ওষুধ উৎপাদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং গবেষণা ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
উন্নয়ন অর্থায়নও উদ্বেগের আরেকটি ক্ষেত্র। উত্তরণের পর এলডিসি-নির্দিষ্ট কিছু সহায়তা ও সহজ শর্তের ঋণ ব্যবস্থার পরিবর্তন হতে পারে; যদিও এই তালিকা থেকে বের হওয়ার অর্থ এই নয় যে সব অনুদান বা সহজ শর্তের ঋণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।
তাই অবকাঠামো, জ্বালানি ও সামাজিক উন্নয়নে অর্থায়নের জন্য অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো এবং টেকসই ঋণ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
২০২৯ এর আগে সংস্কার প্রয়োজন
বিশ্ব বাণিজ্য, ভূরাজনৈতিক সংঘাত, জ্বালানি সরবরাহ এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির দুর্বলতার অনিশ্চয়তার মধ্যে অতিরিক্ত সময় চেয়েছিল সরকার। অন্যান্য চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং আর্থিক খাতের সংস্কার।
আগামী তিন বছরে বাংলাদেশকে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ প্রধান রপ্তানি গন্তব্যগুলোর সঙ্গে বিকল্প বাজার সুবিধার পথ খুঁজতে হবে এবং বাণিজ্য আলোচনা এগিয়ে নিতে হবে। ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমাতে এবং রপ্তানি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বাড়াতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বন্দর ও কাস্টমস সেবার উন্নয়নও অপরিহার্য হবে।
পোশাকের পাশাপাশি দেশকে ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল পণ্য ও ইলেকট্রনিক্স রপ্তানি সম্প্রসারণ করতে হবে।
এছাড়াও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূর করা, নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ এবং দক্ষ কর্মীবাহিনী গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এই মেয়াদ বৃদ্ধি বাংলাদেশকে প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত সময় দিচ্ছে ঠিকই, তবে এর সুফল নির্ভর করবে সরকার ও বেসরকারি খাত কতটা দক্ষতার সঙ্গে এই সময়কে কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে এবং আরও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে কাজে লাগায় তার ওপর।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, উত্তরণের পর শুল্ক ও অন্যান্য বাণিজ্য সুবিধার সম্ভাব্য পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিতে এই বর্ধিত সময়ে প্রধান প্রধান রপ্তানি বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশকে আগেভাগেই আলোচনা শুরু করা উচিত।
রপ্তানিকারকদেরও আরও ভালোভাবে প্রস্তুত হতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দেশের উচিত তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ওষুধ, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, চামড়া, হালকা প্রকৌশল, পাটজাত পণ্য এবং তথ্যপ্রযুক্তিতে বৈচিত্র্য আনা।’
করের আওতা বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, ব্যবসার খরচ কমানো এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ওপরও জোর দেন ফাহমিদা।
তিনি বলেন, স্পষ্ট সময়সীমা ও পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সরকারের উচিত একটি সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করা। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রতি ছয় মাস পর পর এই অগ্রগতি পর্যালোচনা ও প্রকাশ করা উচিত।

ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 























