ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ১২ মার্চ বেলা ১১টায় বসবে। ওইদিন সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে অধিবেশন আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
সোমবার জাতীয় সংসদ সচিবালয় থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের (১) দফায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে অধিবেশন আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রপতি।
সংবিধান অনুযায়ী গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। প্রথা অনুযায়ী প্রথম অধিবেশনেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণের মধ্য দিয়ে সংসদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে।
বিগত সংসদের স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের অবর্তমানে সংসদ অধিবেশন কিভাবে শুরু হবে বা প্রথম অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন, সেটি নিয়েও নানা আলোচনা দেখা যাচ্ছে।
সংসদ বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, বর্তমানে বিগত সংসদের স্পিকার কিংবা ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোন ব্যক্তিকে দিয়ে অধিবেশন শুরু করাতে হবে।
সংসদ অধিবেশন শুরু হবে কীভাবে?
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভ করার পর এরই মধ্যে সরকার গঠন করেছে বিএনপি।
নির্বাচনের পরদিন গত ১৩ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নামে গেজেট প্রকাশিত হয়েছে।
বিএনপি সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, আইনে বেধে দেওয়া সময়ের দুইদিন আগেই ১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। সোমবার বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এই সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেছেন।
বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধান ও জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী পূর্ববর্তী সংসদের স্পিকার কিংবা ডেপুটি স্পিকারের উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার কথা।
২০২৪ সালের সাত জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন শিরীন শারমিন চৌধুরী। আর ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন শামসুল হক টুকু।
ছাত্র জনতার গণ অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সংসদের স্পিকারের পদত্যাগ ও ডেপুটি স্পিকারের কারান্তরীণ থাকায় সংসদের প্রথম অধিবেশন কিভাবে পরিচালিত হবে সেটি নিয়েও নানা প্রশ্ন সামনে আসছে।
সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন সম্পর্কে বলা আছে, কোনো সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকে সংসদ-সদস্যদের মধ্য হইতে সংসদ একজন স্পিকার ও একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করিবেন, এবং এই দুই পদের যে কোনটি শূন্য হইলে সাত দিনের মধ্যে কিংবা ওই সময়ে সংসদ বৈঠকরত না থাকিলে পরবর্তী প্রথম বৈঠকে তাহা পূর্ণ করিবার জন্য সংসদ-সদস্যদের মধ্য হইতে একজনকে নির্বাচিত করিবেন।
সংবিধানে আরো বলা আছে, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের পদ শূন্য ডেপুটি স্পিকার, তার পদও শূন্য হলে বা কোনো কারণে তারা দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য এই দায়িত্ব পালন করবেন।
তবে, জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী প্রথম অধিবেশন পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রপতি কাউকে মনোনীত করতে পারেন।
আবার সংবিধানে একটি অনুচ্ছেদ বলা আছে, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের পদ শূন্য হলেও পরবর্তী উত্তরাধিকারী দায়িত্বভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তারা স্বীয় পদে বহাল আছেন বলে গণ্য হবেন।
সংসদ বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিন বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিগত সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার দুইজনই অনুপস্থিত। যে কারণে একটা সংসদ অধিবেশন ডাকার পর কী হবে সেটা নিয়ে একটা সংকট আছে। কেননা এটা ব্যতিক্রমী একটা ঘটনা।
তার মতে, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার দুইজনের একজনও যদি না থাকে তাহলে রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোন ব্যক্তি অধিবেশন পরিচালনা করতে পারেন কার্যপ্রণালী বিধির (৫) ধারা অনুযায়ী।
মহিউদ্দিন বলেন, এটা যদি অনুসরণ করা হয়, তাহলে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে মনোনয়ন আসতে হবে। এক্ষেত্রে হয়তো রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রী যেভাবে বলবেন হয়তো সেভাবেই হবে।
শুরুতেই স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন
স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুসরণ করে সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করান।
বিএনপি-জামায়াত-এনসিপিসহ অন্যান্য নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ বাক্য পাঠ করেন। ওইদিন বিকেলে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, আগামী মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসবে। ওই অধিবেশনেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করা হবে।
এক্ষেত্রে সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করার ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট কিছু বিধানও রয়েছে বলে জানাচ্ছেন গবেষক ও বিশ্লেষকরা।
অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিগত সংসদের স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তির সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু করাতে হবে। তারপর ওই অধিবেশনেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে।
সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনো সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকে সংসদ সদস্যদের মধ্য হইতে সংসদ একজন স্পিকার ও একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করবে।
নিয়ম অনুযায়ী কোনো একজন সংসদ সদস্য স্পিকার হিসাবে কারো নাম প্রস্তাব করে সংসদ সচিবালয়ের সচিবকে নোটিশ করবেন। অন্য একজন সংসদ সদস্যকে সেই প্রস্তাবে সমর্থন জানাতে হবে। যার নাম প্রস্তাব করা হবে, তিনি স্পিকার হিসাবে দায়িত্ব পালনে সম্মত আছেন, এমন বিবৃতিও নোটিশের সাথে দিতে হবে।
এরপর এটি সংসদ সদস্যদের মধ্যে ভোটাভুটিতে যাবে।
অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিন বলছিলেন, যদি স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে একাধিক প্রার্থী না থাকে তাহলে কণ্ঠভোটের মাধ্যমেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন।
সাধারণত স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর তার সভাপতিত্বে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়ে থাকে।
নিয়ম অনুযায়ী, এই নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর অধিবেশন মুলতবী ঘোষণা করা হবে। সেই সময়ে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পাঠ করাবেন রাষ্ট্রপতি। তারা শপথ নেওয়ারই তাদের সভাপতিত্বে শুরু হবে পরবর্তী সংসদের কার্যক্রম।
বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানে বলা আছে, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত বা পদশূন্য না হওয়া পর্যন্ত তারা তাদের পদে বহাল থাকবে। পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংসদ গঠন না হওয়া পর্যন্ত তারা আগের পদেই বহাল থাকবে।
নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে পরবর্তী সংসদ অধিবেশন শুরু হলে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের শপথগ্রহণের মাধ্যমে পূর্ববর্তী স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের কার্যকালের অবসান ঘটবে।
বিদ্যমান সংবিধানে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার দুটি পদই সরকারি দল থেকে নির্বাচিত হয়। তবে রাষ্ট্র ব্যবস্থা সংস্কারে যে জুলাই সনদ করা হয়েছে সেখানে বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার পদ রাখার কথা বলা হয়েছে।

ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 
























