প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের মাধ্যমে দেশের কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সংস্কারের পর অর্থনৈতিক সংস্কারের যে প্রত্যাশা দেশের মানুষের ছিল, নতুন বাজেটে তার প্রতিফলন
শুক্রবার (১২ জুন) দুপুরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এ কথা বলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “এই বাজেটের মাধ্যমে আমরা যে মৌলিক অর্থনৈতিক সংস্কারের আশা করেছিলাম, তা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে বলে মনে করি না। রাজনৈতিক সংস্কারের পর অর্থনৈতিক সংস্কার আসবে, এমন প্রত্যাশা ছিল। বাজেটে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ রয়েছে। কিছু পণ্যে কর কমানো হয়েছে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। তবে আমাদের আশঙ্কা, এসব উদ্যোগের বড় একটি অংশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
‘‘দেশের অর্থনীতি বর্তমানে তিনটি বড় সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকিং খাতের নাজুক অবস্থা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংকট এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের অভাব। অথচ বাজেটে এসব সংকট নিরসনে সুস্পষ্ট কোনো কর্মপরিকল্পনা নেই,’’ যোগ করেন তিনি।
দ্রব্যমূল্য ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রসঙ্গ তুলে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, “সারা দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য যেভাবে বেড়েছে, তা সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। একইসঙ্গে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিও নজিরবিহীন। এত স্বল্প সময়ে এত বড় পরিমাণে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ঘটনা অতীতে খুব কমই দেখা গেছে।”
দুর্নীতিকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সমস্যা উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে দুর্নীতি। এই বাজেট কীভাবে দুর্নীতি কমাবে বা বন্ধ করবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। বড় বাজেট মানেই বড় দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়। উন্নয়ন প্রকল্প, খাল খনন, বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি কিংবা বিশেষ বরাদ্দের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে।”
“অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্যে আমরা দেখতে পাইনি কীভাবে ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ পুনরুদ্ধার করা হবে। ব্যাংক খাতকে শক্তিশালী করার জন্যও কার্যকর কোনো পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়নি। বাংলাদেশে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান সংকট রয়েছে। ব্যাংকিং খাত এমনিতেই দুর্বল অবস্থায় আছে। এই পরিস্থিতিতে আমানতকারীদের আস্থা নষ্ট হলে তার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়বে। বাজেটে সেই আস্থা পুনরুদ্ধারের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই।
জ্বালানি খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “অতীতে যেসব অসম ও বিতর্কিত চুক্তি হয়েছে, সেগুলো থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসা হবে, তার কোনো রূপরেখা বাজেটে নেই। ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়টি উল্লেখ করা হলেও সংকট সমাধানের বাস্তব পরিকল্পনা অনুপস্থিত। পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি কীভাবে হবে, সে বিষয়ে বাজেটে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। সরকারকে বড় অঙ্কের ঘাটতি পূরণে বিদেশি ঋণ ও দেশীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হবে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমবে, বিনিয়োগ হ্রাস পাবে এবং কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে।”
এনসিপির পক্ষ থেকে বিকল্প অর্থনৈতিক প্রস্তাবনা উপস্থাপনের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা শুধু সমালোচনা করছি না। আমরা বিকল্প প্রস্তাবনাও দিচ্ছি। আমাদের ছায়া বাজেটে অর্থনীতির বিভিন্ন সংকট উত্তরণের সুপারিশ রয়েছে। সংসদের ভেতরে ও বাইরে আমরা এসব বিষয় তুলে ধরব।”
আগামীকালের বিভাগীয় মহাসমাবেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “গণভোটের রায় অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়ন এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণের দাবিতে আমরা সারা দেশে কর্মসূচি পালন করছি। আগামীকাল চট্টগ্রামে ১১ দলীয় জোটের বিভাগীয় মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। আমরা আশা করছি জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণে সমাবেশ সফল হবে।”
আদ-দ্বীন হাসপাতালকে কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং কার্যক্রম স্থগিতের প্রসঙ্গ টেনে নাহিদ ইসলাম বলেন, “কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে অবশ্যই তদন্ত ও বিচার হতে হবে। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো প্রতিষ্ঠানকে চাপের মুখে ফেলা উচিত নয়।”
চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যা নিয়েও কথা বলেন এনসিপি আহ্বায়ক। তিনি বলেন, “সামান্য বৃষ্টিতেই চট্টগ্রাম নগরী পানির নিচে চলে যায়। এটি নগরবাসীর অন্যতম বড় দুর্ভোগ। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা।”
সরকার জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে এগিয়ে আসবে এবং দেশের অর্থনৈতিক সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 

























