মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফুটবলের জাদুকর লিওনেল মেসি

কানসাসের জাদুকরী রাত

কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামের ডাগআউট। স্কোরবোর্ডে জ্বলজ্বল করছে ৩-০। আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ তখন শেষের পথে। বোর্ডের লাল রঙে ভেসে উঠল লিওনেল মেসির জার্সি নম্বর। মাঠ ছাড়ছেন অধিনায়ক। ডাগআউটে দাঁড়িয়ে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি তখন আবেগ সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। দৃশ্যটা মনে করিয়ে দিচ্ছিল কাতার বিশ্বকাপে মেক্সিকো ম্যাচের সেই মুহূর্তকে, যেখানে মেসির গোলের পর কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন পাবলো আইমার। এবার স্কালোনি নিজেই অশ্রু লুকানোর চেষ্টা করছিলেন। মেসিকে বুকে টেনে নিয়ে কানে কানে বললেন কৃতজ্ঞতার কিছু কথা।

 

ম্যাচ শেষে স্কালোনির সরল স্বীকারোক্তি, “২০ বছর ধরে বিশ্বের সেরা, অথচ ৩৮ বছর বয়সেও সে আমাদের অবাক করে যাচ্ছে। আর্জেন্টিনার সমর্থক না হলেও তাকে শ্রদ্ধা করতেই হবে।

রেকর্ডবুক ওলট-পালটের রাত

ঐতিহাসিক এই ২০০তম ম্যাচটিকে মেসি স্মরণীয় করে রাখলেন বিশ্বকাপে নিজের প্রথম হ্যাটট্রিক দিয়ে। এই তিন গোলের হাত ধরে তিনি ছুঁয়ে ফেললেন বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা মিরোস্লাভ ক্লোসেকে। ৩৮ বছর বয়সেও মাঠের সেই চিরচেনা চপলতা দেখে বোঝার উপায় নেই যে সময় গড়িয়েছে। ম্যাচ শেষে হাসতে হাসতে মেসি বলেন, “আমি খুব ভালো অনুভব করছি।”

মেসির এই জাদুকরী পারফরম্যান্সের রাতে আড়ালে পড়ে গেলেন অন্য সব তারকারা। সেনেগালের বিপক্ষে কিলিয়ান এমবাপ্পের জোড়া গোল কিংবা ইরাকের বিপক্ষে এরলিং হালান্ডের গোল সবকিছুকে ছাপিয়ে শিরোনামে শুধুই মেসি।
নরওয়ে ক্যাম্প থেকে হালান্ড ইনস্টাগ্রামে সেলফি পোস্ট করে লিখলেন, ‘Messi is a madman.’ আর সাবেক সতীর্থ জাভি বিস্মিত হয়ে বললেন, “শারীরিকভাবে এখনও সে কতটা ফিট, পায়ের নড়াচড়াও আগের মতোই দ্রুত। এটা কীভাবে সম্ভব?”

শঙ্কা উড়িয়ে রূপকথার প্রত্যাবর্তন

২০২২ সালে কাতারে বিশ্বজয়ের পর অনেকেই ভেবেছিলেন এটাই মেসির শেষ। ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়ার পর গুঞ্জন উঠেছিল, এমএলএস-ই হয়তো তার ক্যারিয়ারের শেষ স্টেশন। কিন্তু মেসি সব সমীকরণ উল্টে দিলেন। এমএলএস কাপ জয়, এমভিপি হওয়া, গোল্ডেন বুট জেতা থেকে শুরু করে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে দক্ষিণ আমেরিকার সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া, সবখানেই ছিল তার রাজত্ব।

এই বিশ্বকাপের ঠিক আগে হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু নিবিড় পুনর্বাসন শেষে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে মাঠে নামার মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গোল বানিয়ে জানান দিলেন তিনি প্রস্তুত।

 

ঈশ্বর এবং পাড়ার বন্ধু

আর্জেন্টিনা দলে মেসি শুধু একজন মহাতারকা নন, তিনি ড্রেসিংরুমের এক পরম আশ্রয়। আলজেরিয়া ম্যাচের পর সতীর্থদের মুখে একটাই বিস্ময়, “ছোট্ট মানুষটা কী দারুণভাবে লড়ছে!” স্কালোনির ভাষায়, “দলের সবাই তাকে একদিকে ঈশ্বরের মতো দেখে, আবার পাড়ার এক সাধারণ বন্ধুর মতোও ভালোবাসে।”

২০৩০ বিশ্বকাপের সময় মেসির বয়স হবে ৪২। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, বর্তমান ফর্ম বলছে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। ২০১৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার পর এক ইংরেজ ধারাভাষ্যকার বলেছিলেন, “নিশ্চয়ই এটাই লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ।”

ভুল প্রমাণিত হয়েছে সেই ভবিষ্যদ্বাণী। ফুটবলের সবচেয়ে বড় বিস্ময় এখনও মঞ্চ ছাড়েননি। লিওনেল মেসি এখনও আছেন, এবং আগের মতোই দুর্দান্ত।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

ফুটবলের জাদুকর লিওনেল মেসি

প্রকাশিত সময় : ০৮:১৪:৩৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

কানসাসের জাদুকরী রাত

কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামের ডাগআউট। স্কোরবোর্ডে জ্বলজ্বল করছে ৩-০। আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ তখন শেষের পথে। বোর্ডের লাল রঙে ভেসে উঠল লিওনেল মেসির জার্সি নম্বর। মাঠ ছাড়ছেন অধিনায়ক। ডাগআউটে দাঁড়িয়ে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি তখন আবেগ সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। দৃশ্যটা মনে করিয়ে দিচ্ছিল কাতার বিশ্বকাপে মেক্সিকো ম্যাচের সেই মুহূর্তকে, যেখানে মেসির গোলের পর কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন পাবলো আইমার। এবার স্কালোনি নিজেই অশ্রু লুকানোর চেষ্টা করছিলেন। মেসিকে বুকে টেনে নিয়ে কানে কানে বললেন কৃতজ্ঞতার কিছু কথা।

 

ম্যাচ শেষে স্কালোনির সরল স্বীকারোক্তি, “২০ বছর ধরে বিশ্বের সেরা, অথচ ৩৮ বছর বয়সেও সে আমাদের অবাক করে যাচ্ছে। আর্জেন্টিনার সমর্থক না হলেও তাকে শ্রদ্ধা করতেই হবে।

রেকর্ডবুক ওলট-পালটের রাত

ঐতিহাসিক এই ২০০তম ম্যাচটিকে মেসি স্মরণীয় করে রাখলেন বিশ্বকাপে নিজের প্রথম হ্যাটট্রিক দিয়ে। এই তিন গোলের হাত ধরে তিনি ছুঁয়ে ফেললেন বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা মিরোস্লাভ ক্লোসেকে। ৩৮ বছর বয়সেও মাঠের সেই চিরচেনা চপলতা দেখে বোঝার উপায় নেই যে সময় গড়িয়েছে। ম্যাচ শেষে হাসতে হাসতে মেসি বলেন, “আমি খুব ভালো অনুভব করছি।”

মেসির এই জাদুকরী পারফরম্যান্সের রাতে আড়ালে পড়ে গেলেন অন্য সব তারকারা। সেনেগালের বিপক্ষে কিলিয়ান এমবাপ্পের জোড়া গোল কিংবা ইরাকের বিপক্ষে এরলিং হালান্ডের গোল সবকিছুকে ছাপিয়ে শিরোনামে শুধুই মেসি।
নরওয়ে ক্যাম্প থেকে হালান্ড ইনস্টাগ্রামে সেলফি পোস্ট করে লিখলেন, ‘Messi is a madman.’ আর সাবেক সতীর্থ জাভি বিস্মিত হয়ে বললেন, “শারীরিকভাবে এখনও সে কতটা ফিট, পায়ের নড়াচড়াও আগের মতোই দ্রুত। এটা কীভাবে সম্ভব?”

শঙ্কা উড়িয়ে রূপকথার প্রত্যাবর্তন

২০২২ সালে কাতারে বিশ্বজয়ের পর অনেকেই ভেবেছিলেন এটাই মেসির শেষ। ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়ার পর গুঞ্জন উঠেছিল, এমএলএস-ই হয়তো তার ক্যারিয়ারের শেষ স্টেশন। কিন্তু মেসি সব সমীকরণ উল্টে দিলেন। এমএলএস কাপ জয়, এমভিপি হওয়া, গোল্ডেন বুট জেতা থেকে শুরু করে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে দক্ষিণ আমেরিকার সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া, সবখানেই ছিল তার রাজত্ব।

এই বিশ্বকাপের ঠিক আগে হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু নিবিড় পুনর্বাসন শেষে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে মাঠে নামার মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গোল বানিয়ে জানান দিলেন তিনি প্রস্তুত।

 

ঈশ্বর এবং পাড়ার বন্ধু

আর্জেন্টিনা দলে মেসি শুধু একজন মহাতারকা নন, তিনি ড্রেসিংরুমের এক পরম আশ্রয়। আলজেরিয়া ম্যাচের পর সতীর্থদের মুখে একটাই বিস্ময়, “ছোট্ট মানুষটা কী দারুণভাবে লড়ছে!” স্কালোনির ভাষায়, “দলের সবাই তাকে একদিকে ঈশ্বরের মতো দেখে, আবার পাড়ার এক সাধারণ বন্ধুর মতোও ভালোবাসে।”

২০৩০ বিশ্বকাপের সময় মেসির বয়স হবে ৪২। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, বর্তমান ফর্ম বলছে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। ২০১৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার পর এক ইংরেজ ধারাভাষ্যকার বলেছিলেন, “নিশ্চয়ই এটাই লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ।”

ভুল প্রমাণিত হয়েছে সেই ভবিষ্যদ্বাণী। ফুটবলের সবচেয়ে বড় বিস্ময় এখনও মঞ্চ ছাড়েননি। লিওনেল মেসি এখনও আছেন, এবং আগের মতোই দুর্দান্ত।