শ্রাবণের আকাশ মেঘলা হতেই ক্যাফের কাচঘেরা টেবিলে তরুণের বাড়তি ভিড়। কারও হাতে চায়ের কাপ, কারও নজর মোবাইল ফোনের রঙিন পর্দায়।
সামাজিক মাধ্যমের ভার্চুয়াল দেয়ালে ভেসে উঠছে স্মৃতির কোলাজ আর ভালোবাসার ডিজিটাল বার্তা– আজ বন্ধু দিবস।
১৯৩০ সালে ‘হলমার্ক কার্ডস’-এর প্রতিষ্ঠাতা জোয়েস হলের বাণিজ্যিক উদ্যোগ থেকে প্রচার লাভ করে এই দিন। এটি ২০১১ সালে জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়। তবে আন্তর্জাতিক বন্ধু দিবস দুটি ভিন্ন দিনে উদযাপন করা হয়ে থাকে।
জাতিসংঘের সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী ৩০ জুলাই এবং বাংলাদেশ ও ভারতে আগস্ট মাসের প্রথম রোববার। তবে ২০২৬ সালের অতি-সংযুক্ত প্রযুক্তিনির্ভর যুগে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছে, বার্ষিক এই উদযাপনের ভিড়ে বন্ধুত্বের মূল সুর কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর অ্যালগরিদমের চক্রব্যূহে আটকে গেছে?
নব্বইয়ের দশকের দৃশ্যপট ছিল ভিন্ন। প্রযুক্তির উপস্থিতি নেই। তখন সম্পর্কের গভীরতা তৈরি হতো নিবিড় উপস্থিতিতে।
বিকেল নামলেই গলির মোড়ে বা খেলার মাঠে বাইসাইকেলের চেনা বেল, পুরো পাড়ার জন্য একটা ল্যান্ডফোনের রিসিভার ধরার তাড়া, কিংবা ব্যাকুল হয়ে ডাকপিয়নের পথ চেয়ে বসে থাকার ভেতরে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। বন্ধু দিবসের আগের রাতে জেগে খুব যত্ন করে সুতো পেঁচিয়ে ‘ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ড’ বানানোর খাঁটি আবেগ ছিল। কোনো ভুল বোঝাবুঝি হলে ‘ইনস্ট্যান্ট ব্লক’ বা ‘আনফলো’ করার সুযোগ ছিল না। মন কষাকষি মেটাতে মুখোমুখি দাঁড়াতেই হতো। সেই অপ্রতুলতার যুগে ধৈর্যের শক্তিতেই গড়ে উঠত জীবনভর টিকে থাকার বন্ধন।
প্রযুক্তির অসীম ছোঁয়ায় সেই ছবিটা এখন আমূল বদলে গেছে। মানবসমাজ আজ ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ‘কানেক্টেড’ বা যুক্ত হলেও একই সঙ্গে মানব ইতিহাস মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে সবচেয়ে বড় একাকিত্বের। আড্ডার জায়গা দখল করে নিয়েছে এআই-চালিত মেসেজিং অ্যাপ, রিলস শেয়ারিং আর সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম।
আজকের তরুণ প্রজন্মের সামাজিক মাধ্যমের প্রোফাইলে বন্ধুর সংখ্যা শত বা হাজার ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু সেই দীর্ঘ তালিকার পেছনে প্রায়ই ঢেকে থাকে এক গভীর নিঃসঙ্গতা। শারীরিক ও মানসিক সংকটের মুহূর্তে পাশে পাওয়ার মতো একজন অকৃত্রিম মানুষ না পাওয়ার অভিজ্ঞতা এখন ঘরে ঘরে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে বৃদ্ধি পাওয়া এই একাকিত্বকে একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক ও মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকার এই প্রবণতা প্রতিদিন ১৫টি সিগারেট খাওয়ার মতোই শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর!
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজের চাপ ও পারিবারিক ব্যস্ততা এসে পড়ে। এটা স্বাভাবিক। সেখানে মন খুলে কথা বলার মতো একজন বন্ধু খানিকটা স্বস্তি দেয়। কিন্তু ২০২৬ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সোশ্যাল মিডিয়ার অতি-সংযুক্তির দরুণ সেই পরিবর্তন আরও যান্ত্রিক রূপ নিয়েছে। এখন জন্মদিনে একটি তৈরি করা ডিজিটাল শুভেচ্ছা পাঠানো বা পোস্টে লাইক দেওয়াতেই বন্ধুত্বের দায় শেষ বলে মনে করা হয়। কিন্তু আশি-নব্বইয়ের দশকের মতো মুখোমুখি বসে মন খুলে কথা বলা কিংবা দীর্ঘ সময় ফোনের ওপার থেকে সহমর্মিতা পাওয়ার যে মানসিকভাবে নিরাপদ আশ্রয়, তা কোনো ইমোজি, জিআইএফ বা ভার্চুয়াল রিঅ্যাকশন দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।
তবে সময়ের এই পরিবর্তনের সবটুকুই নেতিবাচক নয়। ২০২৬ সালের প্রযুক্তির কল্যাণে নব্বইয়ের দশকের মতো ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে চিরতরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ভয় নেই। সীমানার ওপারে থাকা বন্ধুর সঙ্গে ভিডিওতে বা কলে এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলা যায়। পাশাপাশি তার বিপদের দিনে প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বন্ধুদের পাশে দাঁড়ানোর নতুন সুযোগও তৈরি হয়েছে।
বাণিজ্য, সময় ও মাধ্যমের রূপান্তর ঘটলেও বন্ধুত্বের মৌলিক সত্যটি একই রয়ে গেছে। কাউকে কোনো দ্বিধা বা বিচার ছাড়াই মনের কথা বলতে পারা এবং নিঃশর্ত আশ্রয় দেওয়া; কৃত্রিম পর্দায় শত শত ফলোয়ারের ভিড়ে হারিয়ে না গিয়ে বহুকাল কথা না-হওয়া পুরোনো বন্ধুকে হঠাৎ ফোন দিয়ে শুধুই জিজ্ঞেস করা– ‘বন্ধু, কেমন আছিস?’ এই একটি প্রশ্নই স্মার্টফোনের নীল আলো পার হয়ে মানুষে মানুষে হৃৎস্পন্দনের সাধারণ ও অকৃত্রিম টানটুকু শেষ পর্যন্ত সম্পর্কের মূল জয়কে টিকিয়ে রাখে।

রিপোর্টারের নাম 
























