২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর হাইভোল্টেজ ম্যাচে ফুটবলপ্রেমীরা সাক্ষী হলেন এক রুদ্ধশ্বাস থ্রিলারের। মাঠে তখন পর্তুগাল আর ক্রোয়েশিয়ার মধ্যকার বারুদঠাসা লড়াই। গতি, কৌশল আর স্নায়ুযুদ্ধের সেই দ্বৈরথে শেষ পর্যন্ত রোমাঞ্চকর এক জয় তুলে নিয়েছে পর্তুগাল। তবে ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পর মাঠের সেই উত্তেজনা যেন রূপ নিয়েছে তীব্র ক্ষোভ আর বিতর্কে। আর এই সবকিছুর কেন্দ্রে আছেন একজনই, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।
খেলার প্রথমার্ধ ছিল সম্পূর্ণ অচলাবস্থা। কোনো দলই একে অপরকে এক চুল ছাড় দিতে রাজি ছিল না। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে আসতেই চিত্রনাট্য রূপ নেয় চরম উত্তেজনায়। ৫৩তম মিনিটে অভিজ্ঞ ইভান পেরিসিচের দুর্দান্ত এক গোলে স্তব্ধ হয়ে যায় পর্তুগিজ শিবির, লিড নেয় ক্রোয়েশিয়া। পিছিয়ে পড়ে যখন পর্তুগাল খাদের কিনারায়, ঠিক তখনই পেনাল্টির সুবাদে ম্যাচে ফেরার সুযোগ পায় তারা। স্পট কিক থেকে গোল করে দলকে সমতায় ফেরান ৪১ বছর বয়সী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এটিই তার ক্যারিয়ারের প্রথম গোল।

তবে নাটকের আসল অংশ তখনো বাকি ছিল। ম্যাচের ভাগ্য যখন টাইব্রেকারের দিকে ঝুলছে, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে আসেন গনসালো রামোস। যোগ করা সময়ে ডাইভিং হেডে বল জালে জড়িয়ে পুরো স্টেডিয়ামকে উল্লাসে ভাসিয়ে দেন তিনি। ২-১ ব্যবধানের এই অবিশ্বাস্য জয়ে শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করে পর্তুগাল, যেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে পরাশক্তি স্পেন।
কিন্তু ম্যাচের আসল নাটকটি মঞ্চস্থ হয় খেলা শেষের পর, যখন ম্যাচসেরার (ম্যান অব দ্য ম্যাচ) পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। পুরো পর্তুগাল দল যখন উদযাপনে ব্যস্ত, তখন সবাইকে চমকে দিয়ে ম্যাচসেরার ট্রফিটি তুলে দেওয়া হয় ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর হাতে। আর এই একটি সিদ্ধান্তেই যেন পুরো ফুটবলবিশ্বে আগুন জ্বলে উঠেছে। খোদ পর্তুগিজ সমর্থকদের একাংশও এই সিদ্ধান্তে চোখ কপালে তুলেছেন।
ফুটবলপ্রেমীদের ক্ষোভের কারণটাও অবশ্য অমূলক নয়। মাঠের পরিসংখ্যান বলছে, পেনাল্টির ওই একটি শট ছাড়া পুরো ম্যাচে রোনালদো ছিলেন কার্যত নিষ্ক্রিয়। ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণভাগের কড়া পাহারায় বেশির ভাগ সময়ই তাকে বলের সন্ধানে ঘুরতে হয়েছে। এমনকি ম্যাচের সবচেয়ে চড়া উত্তেজনার মুহূর্তে, যখন দলের সবচেয়ে বেশি গোল দরকার, তখনই তাকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হয়। সাইডলাইনে বসে সতীর্থদের জয় উদযাপন দেখা একজন ফুটবলার কীভাবে ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় হন, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন চলছে তীব্র ট্রোল ও সমালোচনা।
এক সমর্থক ক্ষোভ উগরে দিয়ে লিখেছেন, ‘দুঃখিত, কিন্তু এটা কী দেখলাম! পুরো ম্যাচে তিনি আসলে পেনাল্টি মারা ছাড়া কী করেছেন?’
আরেকজনের সরাসরি মন্তব্য, ‘এটা সম্পূর্ণ অর্থহীন এবং হাস্যকর একটি সিদ্ধান্ত!
পুরো ফুটবল ব্যবস্থার সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলে একজন লিখেছেন, ‘ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে এই ম্যাচের সেরা ঘোষণা করাটা পুরো ফুটবল ব্যবস্থার জন্যই লজ্জাজনক।‘
অনেকের মতেই, পেনাল্টির গোল কোনো একক কৃতিত্বের পরিচয় বহন করে না। বরং পুরো ম্যাচজুড়ে উইং কাঁপানো রাফায়েল লেয়াও, ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণী গোল করা গনসালো রামোস কিংবা পোস্টের নিচে চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়ানো গোলরক্ষক দিওগো কস্তাই ছিলেন এই পুরস্কারের আসল দাবিদার।
এক ভক্তের কথায় ফুটে উঠেছে সেই আক্ষেপ, ‘এই ম্যাচে আমার মতে দিওগো কস্তা বা গনসালো রামোস ম্যাচসেরা হওয়ার যোগ্য ছিল’
আরেকজন তো সোজাসুজি বলেই দিয়েছেন, ‘সত্যি বলতে, এই পুরস্কার মোটেও তার প্রাপ্য ছিল না। স্রেফ নামের জোরে দেওয়া হয়েছে।’
পর্তুগাল পরের রাউন্ডে উঠেছে ঠিকই, কিন্তু মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়েও এখন আলোচনার তুঙ্গে কোটি টাকার সেই প্রশ্ন, ফুটবল কি সত্যিই পারফরম্যান্সের বিচার করে, নাকি কেবলই ব্র্যান্ড ভ্যালুর মোহে অন্ধ?

রিপোর্টারের নাম 






















