মুফতি আতাউর রহমান:
কোরআন ও হাদিসের ভাষ্য মতে, জাদুবিদ্যার মূল উত্স শয়তান ও মন্দ জিন। তারাই মানব সমাজে জাদুবিদ্যার প্রসার ঘটিয়েছিল। জাদুকরদের সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আরো এই যে, কতিপয় মানুষ কতক জিনের শরণাপন্ন হতো, ফলে তারা জিনদের অহঙ্কার বাড়িয়ে দিত।’ (সুরা জিন, আয়াত : ৬)
আয়েশা (রা.) বলেন, লোকজন নবী (সা.) -কে জ্যোতিষদের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করল (যারা তত্কালীন যুগে জাদুও চর্চা করত)। তিনি বললেন, তারা মূলত কিছুই নয়। তারা জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রাসুল! কখনো কখনো তারা তো এমন কিছু কথাও বলে ফেলে যা সত্য হয়।
এতে নবী (সা.) বললেন, এসব কথা সত্য। জিনরা এসব কথা প্রথম শোনে, (মনে রেখে) পরে এদের দোসরদের কানে মুরগির মতো করকর ধ্বনিতে নিক্ষেপ করে দেয়। এরপর এসব জ্যোতিষী সামান্য সত্যের সাথে শত মিথ্যার মিশ্রণ ঘটায়। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭৫৬১)
গবেষক আলেমরা একমত যে, জাদু শেখা, শেখানো এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রাখা হারাম। আল্লামা ইবনে কুদামা (রহ.) লেখেন, নিশ্চয়ই জাদু শেখা এবং তা শেখানো হারাম। এই বিষয়ে আলেমদের কোনো মতভিন্নতা নেই। (আল মুগনি : ১০/১০৬)
ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক ও ইমাম আহমদ (রহ.)-সহ বেশির ভাগ ইমামের মতে জাদুবিদ্যা চর্চা করা কুফরি। তারা নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারা দলিল পেশ করেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সুলাইমান কুফরি করেনি, কিন্তু শয়তানগুলো কুফরি করেছে। তারা মানুষকে যাদু শিক্ষা দিয়েছে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১০২)
জাদু নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ
কোরআন ও হাদিসে জাদুর ভয়াবহতা নানাভাবে তুলে ধরা হয়েছে। যেমন :
১. জাদু ধ্বংসাত্মক : রাসুলুল্লাহ (সা.) জাদু থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা ধ্বংসাত্মক বিষয় পরিহার কোরো। তা হলো, আল্লাহর সঙ্গে শিরিক ও জাদু।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৭৬৪)
২. জাদু কুফরি : মহানবী (সা.) জাদুকরের কাছে যাওয়া ও তার কথা সত্যায়ন করাকে কুফরি বলেছেন। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো কোনো (জাদুকর ও) জ্যোতিষীর কাছে গেল এবং তার কথা সত্যায়ন করল, সে মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি অবতীর্ণ বিষয়গুলো অস্বীকার করল।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৬৩৯)
৩. জাদু মন্দ কাজে উদ্বুদ্ধ করে : জাদুবিদ্যা অর্জন করলে তা মানুষকে মন্দ কাজে উদ্বুদ্ধ করে। যেমন পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদের (হারুত-মারুত) উভয়ের কাছ থেকে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যা বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে তা শিক্ষা করত, অথচ আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া তারা কারো কোনো ক্ষতি সাধন করতে পারত না। তারা যা শিক্ষা করত তা তাদের ক্ষতি সাধন করত এবং কোনো উপকারে আসত না; আর তারা নিশ্চিতভাবে জানত যে ব্যক্তি তা ক্রয় করে পরকালে তার কোনো অংশ নেই। তা কত নিকৃষ্ট যার বিনিময়ে তারা স্বীয় আত্মাকে বিক্রি করেছে, যদি তারা জানত!’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১০২)
৪. জাদু দণ্ডনীয় অপরাধ : ইসলামের দৃষ্টিতে জাদু দণ্ডনীয় অপরাধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যাদুকরের শাস্তি হলো তরবারির আঘাতে মৃত্যুদণ্ড।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৪৬০)
ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলেন, যাদু যদি কুফরির পর্যায়ভুক্ত হয় তবে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। আর কুফরির চেয়ে নিম্নতর হলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যাবে না। (সুনানে তিরমিজি)
৫. জাদু আমল নষ্ট করে : জাদুর সঙ্গে সম্পৃক্ত আমল নিষ্ফল করে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি গণকের কাছে যাবে তার ৪০ দিনের আমল গ্রহণ করা হয় না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২২৩০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে জাদু দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন। তখন তিনি আল্লাহর কাছে বার বার দোয়া করতেন। দোয়ার বরকতে আল্লাহ তাঁকে জাদুর প্রভাব থেকে মুক্ত করেন। হাদিসে এসেছে, একটি কূপ থেকে একটি সুতো বের করা হয় যাতে ১১টি গিট ছিল। জিবরাইল (আ.) সুরা নাস ও ফালাকের ১১টি আয়াত তিলাওয়াত করেন এবং ১১টি গিট খোলেন। ফলে তিনি জাদু মুক্ত হন। (সহিহ বুখারি ও নাসায়ি)
আল্লাহ সবাইকে জাদুচর্চা থেকে দূরে রাখুন এবং জাদুকরের ক্ষতি থেকে রক্ষা করুন। আমিন।

ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 
























