বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নির্যাতন থামছেই না, ‘রাগ করতে করতে ক্লান্ত’ পাকিস্তানি তারকারা

নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতা ও নির্যাতনের একের পর এক ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছেন পাকিস্তানের তারকারা। সম্প্রতি দেশটিতে পাঁচ বছরের এক শিশু ও ৪৫ বছর বয়সী এক নারীর নৃশংস হত্যাকাণ্ড ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছে।

এসব ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়ে দ্রুত বিচার ও জবাবদিহির দাবি তুলেছেন দেশটির একাধিক অভিনেতা, গায়ক ও তারকা।

সম্প্রতি খাইবার পাখতুনখাওয়ার হারিপুরে নিখোঁজ হওয়ার কয়েক দিন পর পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় তিন কিশোরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, তাদের একজন শিশুটিকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে।

অন্যদিকে রাওয়ালপিন্ডিতে ৪৫ বছর বয়সী হিনা জাভেদকে নিজের অ্যাপার্টমেন্টে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তার দুই হাত পেছনে বাঁধা ছিল। এ ঘটনায় তার স্বামী ও এক গৃহকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পাশাপাশি তার শ্বশুরকেও তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে।

পরপর এসব ঘটনায় পাকিস্তানের বিনোদন অঙ্গনের তারকারা প্রশ্ন তুলেছেন, আর কত নারী ও শিশুর প্রাণ গেলে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

অভিনেতা আহসান খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনাগুলো নিয়মিত ঘটে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

গায়িকা আইমা বেগও একই ধরনের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, প্রতিটি ভুক্তভোগী শুধু সংবাদ শিরোনাম নন; তারা কারও সন্তান, পরিবারের সদস্য ও প্রিয়জন। তাদের চলে যাওয়ায় স্বজনদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়, সেটিও বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

অভিনেত্রী মরিয়ম নাফিস নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিভিন্ন নির্যাতনের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত হ্যাশট্যাগ তুলে ধরে তিনি জানতে চান, পাকিস্তানে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আসলে কী করা হচ্ছে।

অভিনেত্রী নাদিয়া জামিল বলেন, বিষয়টি নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি এ ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে কথা বলে আসছেন। তার ভাষায়, পাকিস্তানে এটি এখন ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধী ভুক্তভোগীর পরিচিত বা কাছের মানুষ হওয়ায় কেউই পুরোপুরি নিরাপদ নয়।

দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও জানিয়েছেন বেশ কয়েকজন তারকা। অভিনেত্রী ঝালাই সারহাদি মনে করেন, ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধ বন্ধে অপরাধীদের কঠোর শাস্তিই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

র‍্যাপার তালহা ইউনুস শুধু নিন্দা জানিয়ে থেমে না থেকে তদন্ত ও বিচারব্যবস্থায় সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এমন তদন্ত প্রয়োজন যা প্রভাবিত করা যাবে না, জবাবদিহির আওতায় থাকা পুলিশ কর্মকর্তা, সক্রিয় প্রসিকিউশন এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

নিজের ক্ষোভের কথা জানিয়ে তালহা ইউনুস বলেন, তিনি ‘রাগ করতে করতে ক্লান্ত’। বারবার ‘ন্যায়বিচার হবে’ শুনেও শেষ পর্যন্ত মানুষ এসব ঘটনা ভুলে যায়- এমন বাস্তবতার পরিবর্তন চান তিনি।

অভিনেত্রী সাবিনা ফারুক মনে করেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে সাধারণ মানুষকেও রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে হবে। তার মতে, ধর্ষক ও খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে এ ধরনের ঘটনা বন্ধ হবে না।

টেলিভিশন উপস্থাপিকা শাইস্তা লোধিও পাকিস্তানের নারীদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন।

অভিনেত্রী সারওয়াত গিলানির মতে, শিশুদের নিরাপদ রাখা পুরো সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। প্রযুক্তিকে দোষারোপ না করে ছেলেদের ছোটবেলা থেকেই নিজেদের কাজের জন্য জবাবদিহির শিক্ষা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

অভিনেত্রী আয়েশা ওমর বলেন, নারীদের ওপর নির্যাতন বন্ধে পুরুষদের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। নারীদের পাশাপাশি শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

অভিনেত্রী জারা নূর আব্বাস বলেন, ‘আমরা সবাই এই অপরাধের অংশ।’ তার মতে, নির্যাতনের ঘটনা সামনে আসার পরও যারা নীরব থাকেন, তারাও কোনো না কোনোভাবে দায় এড়াতে পারেন না।

পাকিস্তানে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে তারকাদের এমন প্রতিবাদ অবশ্য নতুন নয়। চলতি আগস্টেই করাচিতে এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দেশটির তারকারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। জুনেও শিশু হত্যা ও এক চিকিৎসকের ওপর অ্যাসিড হামলার মতো ঘটনায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

শিশু অধিকারবিষয়ক সংগঠন সাহিলের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত পাকিস্তানে শিশু নির্যাতনের ১ হাজার ৯১৪টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১৫টি শিশু যৌন নির্যাতন, ৫৫৮টি অপহরণ, ১০১টি নিখোঁজ এবং ৩৫টি বাল্যবিবাহের ঘটনা রয়েছে।

সূত্র : ডন

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

নির্যাতন থামছেই না, ‘রাগ করতে করতে ক্লান্ত’ পাকিস্তানি তারকারা

প্রকাশিত সময় : ১০:২৪:২২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬
নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতা ও নির্যাতনের একের পর এক ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছেন পাকিস্তানের তারকারা। সম্প্রতি দেশটিতে পাঁচ বছরের এক শিশু ও ৪৫ বছর বয়সী এক নারীর নৃশংস হত্যাকাণ্ড ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছে।

এসব ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়ে দ্রুত বিচার ও জবাবদিহির দাবি তুলেছেন দেশটির একাধিক অভিনেতা, গায়ক ও তারকা।

সম্প্রতি খাইবার পাখতুনখাওয়ার হারিপুরে নিখোঁজ হওয়ার কয়েক দিন পর পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় তিন কিশোরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, তাদের একজন শিশুটিকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে।

অন্যদিকে রাওয়ালপিন্ডিতে ৪৫ বছর বয়সী হিনা জাভেদকে নিজের অ্যাপার্টমেন্টে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তার দুই হাত পেছনে বাঁধা ছিল। এ ঘটনায় তার স্বামী ও এক গৃহকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পাশাপাশি তার শ্বশুরকেও তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে।

পরপর এসব ঘটনায় পাকিস্তানের বিনোদন অঙ্গনের তারকারা প্রশ্ন তুলেছেন, আর কত নারী ও শিশুর প্রাণ গেলে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

অভিনেতা আহসান খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনাগুলো নিয়মিত ঘটে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

গায়িকা আইমা বেগও একই ধরনের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, প্রতিটি ভুক্তভোগী শুধু সংবাদ শিরোনাম নন; তারা কারও সন্তান, পরিবারের সদস্য ও প্রিয়জন। তাদের চলে যাওয়ায় স্বজনদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়, সেটিও বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

অভিনেত্রী মরিয়ম নাফিস নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিভিন্ন নির্যাতনের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত হ্যাশট্যাগ তুলে ধরে তিনি জানতে চান, পাকিস্তানে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আসলে কী করা হচ্ছে।

অভিনেত্রী নাদিয়া জামিল বলেন, বিষয়টি নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি এ ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে কথা বলে আসছেন। তার ভাষায়, পাকিস্তানে এটি এখন ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধী ভুক্তভোগীর পরিচিত বা কাছের মানুষ হওয়ায় কেউই পুরোপুরি নিরাপদ নয়।

দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও জানিয়েছেন বেশ কয়েকজন তারকা। অভিনেত্রী ঝালাই সারহাদি মনে করেন, ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধ বন্ধে অপরাধীদের কঠোর শাস্তিই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

র‍্যাপার তালহা ইউনুস শুধু নিন্দা জানিয়ে থেমে না থেকে তদন্ত ও বিচারব্যবস্থায় সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এমন তদন্ত প্রয়োজন যা প্রভাবিত করা যাবে না, জবাবদিহির আওতায় থাকা পুলিশ কর্মকর্তা, সক্রিয় প্রসিকিউশন এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

নিজের ক্ষোভের কথা জানিয়ে তালহা ইউনুস বলেন, তিনি ‘রাগ করতে করতে ক্লান্ত’। বারবার ‘ন্যায়বিচার হবে’ শুনেও শেষ পর্যন্ত মানুষ এসব ঘটনা ভুলে যায়- এমন বাস্তবতার পরিবর্তন চান তিনি।

অভিনেত্রী সাবিনা ফারুক মনে করেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে সাধারণ মানুষকেও রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে হবে। তার মতে, ধর্ষক ও খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে এ ধরনের ঘটনা বন্ধ হবে না।

টেলিভিশন উপস্থাপিকা শাইস্তা লোধিও পাকিস্তানের নারীদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন।

অভিনেত্রী সারওয়াত গিলানির মতে, শিশুদের নিরাপদ রাখা পুরো সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। প্রযুক্তিকে দোষারোপ না করে ছেলেদের ছোটবেলা থেকেই নিজেদের কাজের জন্য জবাবদিহির শিক্ষা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

অভিনেত্রী আয়েশা ওমর বলেন, নারীদের ওপর নির্যাতন বন্ধে পুরুষদের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। নারীদের পাশাপাশি শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

অভিনেত্রী জারা নূর আব্বাস বলেন, ‘আমরা সবাই এই অপরাধের অংশ।’ তার মতে, নির্যাতনের ঘটনা সামনে আসার পরও যারা নীরব থাকেন, তারাও কোনো না কোনোভাবে দায় এড়াতে পারেন না।

পাকিস্তানে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে তারকাদের এমন প্রতিবাদ অবশ্য নতুন নয়। চলতি আগস্টেই করাচিতে এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দেশটির তারকারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। জুনেও শিশু হত্যা ও এক চিকিৎসকের ওপর অ্যাসিড হামলার মতো ঘটনায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

শিশু অধিকারবিষয়ক সংগঠন সাহিলের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত পাকিস্তানে শিশু নির্যাতনের ১ হাজার ৯১৪টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১৫টি শিশু যৌন নির্যাতন, ৫৫৮টি অপহরণ, ১০১টি নিখোঁজ এবং ৩৫টি বাল্যবিবাহের ঘটনা রয়েছে।

সূত্র : ডন