দ্বিতীয় পর্ব: রেললাইন ধরে হাঁটা।
কিছু পথের গন্তব্য যতটা মনে থাকে, তার চেয়ে অনেক বেশি মনে থাকে সেই পথের সঙ্গীরা। আজ এত বছর পরে সিরাজগঞ্জের ভাঙাবাড়ি নামক স্থানে আনোয়ারা ম্যাডামের বাড়ির ঠিকানা স্পষ্ট করে বলতে পারব না।
কিন্তু সেখানে যাওয়ার রেললাইনটি, আর সেই রেললাইন ধরে পাশাপাশি হেঁটে যাওয়া তিনটি ছোট্ট ছেলেকে আজও স্পষ্ট দেখতে পাই। একজন আমি।একজন প্রদীপ। আরেকজন শামীম।
দুপুরের খাবার শেষ হলেই যেন আমাদের ছোট্ট অভিযাত্রা শুরু হয়ে যেত। মুকুল ফৌজ অফিস থেকে প্রদীপকে নিয়ে, বাহিরগোলা থেকে শামীমকে সঙ্গে নিয়ে আমরা রওনা দিতাম ভাঙাবাড়ির দিকে। উদ্দেশ্য ছিল আনোয়ারা ম্যাডামের কাছে পড়তে যাওয়া। কিন্তু সত্যি বলতে কী, আমাদের কাছে পড়ার চেয়ে পথটাই ছিল অনেক বেশি আকর্ষণীয়।
রেললাইন আমাদের কাছে শুধু লোহার দুটি সমান্তরাল দণ্ড ছিল না। সেটিই ছিল আমাদের সবচেয়ে প্রিয় হাঁটার রাস্তা, সবচেয়ে বড় খেলার মাঠ, আর সবচেয়ে বিস্ময়কর আবিষ্কারের জগৎ। আমরা কখনো একটি লাইনের ওপর ভারসাম্য রেখে হাঁটতাম। কে আগে না পড়ে শেষ পর্যন্ত যেতে পারে, সেই নীরব প্রতিযোগিতা চলত।
কখনো রেললাইনের পাথর কুড়িয়ে দূরে ছুড়ে মারতাম। কখনো আকাশের মেঘ দেখে গল্প বানাতাম। পথের প্রতিটি মুহূর্তই ছিল নতুন আনন্দে ভরা। কিন্তু সবচেয়ে বড় উত্তেজনা ছিল ট্রেনের অপেক্ষা।
দূর থেকে যখন রেলের লোহার গায়ে কাঁপুনি উঠত, আমরা কান পেতে শুনতাম। তারপর হঠাৎ করেই ভেসে আসত সেই পরিচিত শব্দ— ঝক… ঝক… ঝক… ।
আমাদের চোখ জ্বলে উঠত আনন্দে। নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে আমরা অপেক্ষা করতাম। বিশাল ট্রেনটি গর্জন তুলে সামনে দিয়ে চলে যেত। তার সঙ্গে বাতাসও যেন ছুটে যেত। মনে হতো, পৃথিবীর সব শক্তি একসঙ্গে আমাদের পাশ দিয়ে চলে গেল। এরপর শুরু হতো আরেকটি খেলা। আমরা ছোট্ট একটি পয়সা রেললাইনের ওপর রেখে দিতাম।
ট্রেন চলে যাওয়ার পর দৌড়ে গিয়ে সেটি খুঁজে বের করতাম। কী আশ্চর্য! গোল পয়সাটি তখন একেবারে চ্যাপ্টা হয়ে চকচকে চাকতির মতো হয়ে যেত। আমরা তখন জানতাম—ট্রেন জাদু করতে পারে।
ভাঙাবাড়ি ম্যাডামের বাড়িতে পৌঁছে পড়াশোনা হতো ঠিকই। কিন্তু ফেরার পথেও গল্প শেষ হতো না। কে কত ভালো দৌড়াতে পারে, কার ঘুড়ি বেশি উঁচুতে উড়বে—এসব নিয়েই চলত অন্তহীন আলোচনা। বন্ধুত্ব তখন খুব সহজ ছিল। কোনো প্রতিযোগিতা ছিল না। কোনো হিসাব ছিল না।
একটি আম ভাগ করে খাওয়া, একটি কলম ধার দেওয়া, কিংবা একসঙ্গে হাঁটতে পারাটাই ছিল বন্ধুত্বের সবচেয়ে বড় সংজ্ঞা।
আজও যখন কোথাও রেললাইনের ওপর দিয়ে ট্রেন ছুটে যায়, আমি অজান্তেই থেমে যাই। মনে হয়, একটু পরেই হয়তো তিনটি ছোট্ট ছেলে দৌড়ে যাবে সেই চ্যাপ্টা পয়সাটি খুঁজে আনতে। লোহার চাকার সেই পরিচিত শব্দ কানে এলেই দেখতে পাই—তিনটি ছোট্ট ছেলে রেললাইনের ধারে দাঁড়িয়ে আছে। একজনের হাতে বই, আরেকজনের পকেটে একটি পয়সা, তৃতীয়জনের চোখে অফুরন্ত কৌতূহল। ট্রেনটা গর্জন তুলে চলে যায়। বাতাস স্তব্ধ হয়। তারপর তারা তিনজন হেসে হেসে দৌড়ে যায় রেললাইনের ওপর।
কেউ একজন চিৎকার করে ওঠে— “পেয়েছি…! পেয়েছি…!”
আর আমি এগিয়ে না গিয়েই দূর থেকেই দাঁড়িয়ে দেখি—-।
বন্ধুত্বেরও বোধহয় একটি নিজস্ব রেললাইন আছে। সমান্তরাল দুটি লাইন যেমন পাশাপাশি বহুদূর চলে, সত্যিকারের বন্ধুত্বও তেমনি স্মৃতির ভেতর পাশাপাশি বেঁচে থাকে। আমি আজও কখনো কখনো সেই রেললাইনে ফিরে যাই। হয়তো সেখানে এখন আর কোনো পয়সা নেই।
তবু আমার মনে হয়, বিকেলের শেষ আলোয় তিনটি ছোট্ট ছায়া এখনো হেঁটে যাচ্ছে। আমি শুধু দূর থেকে তাদের দেখি। ডাকি না। কারণ কিছু স্মৃতিকে ফিরে পাওয়ার চেয়ে, অক্ষত অবস্থায় বেঁচে থাকতে দেওয়াই সবচেয়ে বড় ভালোবাসা।

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

























