ইসরায়েলের বিপক্ষে আয়ারল্যান্ডের বিতর্কিত নেশনস লিগের ম্যাচটি রোববার অনুষ্ঠিত হবে। শনিবার সকালে হাঙ্গেরিতে চার ঘণ্টার বৈঠকের পর দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে ভোটাভুটিতে ‘উল্লেখযোগ্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা’ ম্যাচ খেলার পক্ষে মত দেওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আয়ারল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান ডেভিড কুরেল জানিয়েছেন, একজন খেলোয়াড় কোচ হেইমির হলগ্রিমসনের কাছে এই ম্যাচ খেলতে অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন এবং দল থেকে সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ওই খেলোয়াড় হিসেবে গোলরক্ষক গ্যাভিন বাজুনুর নাম এসেছে।
তবে কুরেল নামটি নিশ্চিত করেননি। হলগ্রিমসনও বাজুনুর নাম অস্বীকার করেননি।
কুরেল জানিয়েছেন, রোববার ইসরায়েলের বিপক্ষে ম্যাচে আয়ারল্যান্ডের খেলোয়াড়েরা কালো বাহুবন্ধনী পরবেন। সংঘাতে নিহতদের স্মরণে এই প্রতীকী উদ্যোগ নেওয়া হবে। ম্যাচ শুরুর আগের আনুষ্ঠানিকতার কিছু অংশেও আয়ারল্যান্ড অংশ নেবে না। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিরতির বাকি সময়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে খেলোয়াড়দের নির্ধারিত কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রাখার অনুরোধও জানানো হয়েছে।
শনিবার সকালে নির্ধারিত সংবাদ সম্মেলন ও অনুশীলন পিছিয়ে দেওয়া হয়। পরে হাঙ্গেরির দেব্রেসেনে দলের হোটেলে চার ঘণ্টার বৈঠকের পর বিকেলে সংবাদ সম্মেলন ও অনুশীলন অনুষ্ঠিত হয়।
পরে সংবাদ সম্মেলনে কুরেল বলেন, ‘আশা করি আপনারা বুঝতে পারছেন, এটি আমাদের জন্য খুব কঠিন সময়।’
তিনি জানান, আগের দিন প্রিস্তিনায় দলের মধ্যে প্রায় দুই ঘণ্টা আলোচনা হয়েছিল। সেখানেও শেষ পর্যন্ত হাঙ্গেরিতে এসে ম্যাচ খেলার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল।
কুরেল বলেন, ‘আজ সকালে একজন খেলোয়াড় প্রধান কোচের কাছে এই ম্যাচ খেলতে অস্বস্তির কথা জানান এবং দল থেকে সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেন। স্বাভাবিকভাবেই, এই নতুন পরিস্থিতি নিয়ে বাকি খেলোয়াড়দের ভাবার জন্য সময়ের প্রয়োজন হয়।’
এরপর আরও চার ঘণ্টা আলোচনা হয়। বেশির ভাগ আলোচনা খেলোয়াড়দের মধ্যেই হয়েছে। কিছু সময় কোচিং স্টাফ ও ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারাও আলোচনায় অংশ নেন।
কুরেল বলেন, ‘অনেক ধরনের মতামত উঠে এসেছে। ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে আমরা প্রত্যেকের নিজস্ব মত প্রকাশের অধিকারকে পুরোপুরি সম্মান করেছি।’
শেষ দেড় ঘণ্টায় খেলোয়াড়দের মধ্যে ভোটাভুটি হয়। কুরেলের ভাষায়, ‘ম্যাচ খেলা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে উল্লেখযোগ্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া গেছে। এর ভিত্তিতে আইরিশ ফুটবলের পক্ষ থেকে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, পরিকল্পনা অনুযায়ী ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে।’
এই সিদ্ধান্তের পেছনে দেশে ক্রমবর্ধমান চাপও রয়েছে। ফিলিস্তিনিদের প্রতি আয়ারল্যান্ডে ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। দেশটির বিভিন্ন মহল থেকে ইসরায়েলের বিপক্ষে নির্ধারিত দুই ম্যাচ বর্জনের দাবি উঠেছে। প্রথম ম্যাচটি রোববার, আর দ্বিতীয় ম্যাচটি ৪ অক্টোবর সার্বিয়ার বাক্কা তোপোলায় আয়ারল্যান্ডের ‘ঘরের মাঠের’ ম্যাচ হিসেবে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
হলগ্রিমসন বলেন, একজন খেলোয়াড়ই দল থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বাকি সবাই আজ অনুশীলন করছে। অবশ্য এই ঘটনার কারণে পরিস্থিতির ভারসাম্য বদলে গেছে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা এখনো চলছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাইনি। তবে আমরা ম্যাচটি খেলছি, ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে। আজ অনুশীলন হবে এবং আজ রাতে, এমনকি আগামীকালও আরও আলোচনা হতে পারে।’
হলগ্রিমসনের ভাষায়, ‘এই মুহূর্তে কেউই স্বস্তিতে নেই। এমন কোনো পদক্ষেপ নেই, যেটিতে সবাই একমত হবে। তাই আমাদের এমন একটি সমাধান খুঁজে বের করতে হবে, যাতে দল হিসেবে আমাদের ক্ষতি, একটি দেশ হিসেবে আয়ারল্যান্ডের ক্ষতি এবং ভবিষ্যতে আইরিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ক্ষতি যতটা সম্ভব কমানো যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘ম্যাচটি না খেললে কী ধরনের পরিণতি হবে, আমরা জানি না। সামনে দুটি পথ, আর এটি এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে কোনো পথই সহজ নয়।’
শুক্রবারের বৈঠকেই খেলোয়াড়েরা গণমাধ্যমের কার্যক্রম থেকে সরে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছিলেন বলে জানান কুরেল। তাঁর ভাষায়, ‘তারা বুঝতে পেরেছিল, ফুটবল নিয়ে নয়, বরং নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে এই পরিবেশে তারা অস্বস্তি বোধ করছে।’
এর আগে বৃহস্পতিবার কসোভোর কাছে ১-০ গোলে হারের পর আয়ারল্যান্ডের মিডফিল্ডার জেসন নাইট বলেছিলেন, খেলোয়াড়েরা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন এবং তাঁর মনে হয় ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত নয়।
আয়ারল্যান্ডের কোচ হলগ্রিমসন এর আগে বলেছিলেন, ‘আমরা গণহত্যার সঙ্গে খেলছি না, আমরা গণহত্যার বিরুদ্ধে খেলছি। আমরা ইসরায়েলের বিপক্ষে খেলছি, ইসরায়েলের সঙ্গে খেলছি না।’ তাঁর এই মন্তব্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় ইসরায়েল ফুটবল ফেডারেশন। তারা আইসল্যান্ডের কোচকে ‘বোকামি, অজ্ঞতা ও ভণ্ডামির’ জন্য অভিযুক্ত করে।
আয়ারল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন অবশ্য ম্যাচ বর্জনের দাবিতে রাজি হয়নি। তাদের যুক্তি, ম্যাচ বর্জন করলে ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থার কাছ থেকে কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে। ২০২৮ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের সহ-আয়োজক আয়ারল্যান্ড। সেই প্রতিযোগিতার ম্যাচ হবে ইংল্যান্ড, ওয়েলস ও স্কটল্যান্ডেও।
এদিকে ১৬০ জনের বেশি আইরিশ ক্রীড়াবিদ একটি খোলা চিঠিতে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
গত সপ্তাহে ডাবলিনে দলের হোটেলের বাইরে বিক্ষোভও হয়েছে। খেলোয়াড়দের ম্যাচ বর্জনের আহ্বান জানানো হয় সেখানে। আইরিশ শ্রমিক সংগঠন সিপটু ডাবলিনের লিফি নদীর পাশে একটি বিশাল পোস্টারও টানিয়েছে। সেখানে খেলোয়াড়দের উদ্দেশে লেখা ছিল, ‘নিজ বিবেকের কথা শুনুন’ এবং ‘গণহত্যার সঙ্গে খেলবেন না’।
আয়ারল্যান্ডের সাবেক কোচ ব্রায়ান কারও বলেছেন, ম্যাচ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ‘আইরিশ জনগণের সম্মান হারিয়েছে’।
কার বলেন, ‘আইরিশ জনগণ এবং ফুটবলপ্রেমী দর্শকেরা ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হোক, তা চান না। গত এক বছরে তারা নিজেদের মতামত স্পষ্ট করেছে। গত নভেম্বরে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন নীতিগত কারণে ইসরায়েলকে প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দেওয়ার অনুরোধ নিয়ে ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থার কাছে গিয়েছিল। অথচ এখন তারা সেই নীতির বিপরীত অবস্থান নিয়েছে।’

স্পোর্টস ডেস্ক/ ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম 























