বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পবিত্র কোরআনের দৃষ্টিতে সরল পথ

প্রতিটি মুসলমান দৈনন্দিন মহান আল্লাহর কাছে যে দোয়া করে, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দোয়া হলো সঠিক পথের সন্ধান লাভ করা’। কারণ মানুষ সবকিছু অর্জন করেও যদি সত্য ও ন্যায়ের পথ হারিয়ে ফেলে, তাহলে তার জীবনের চূড়ান্ত সাফল্য অধরাই থেকে যায়। এ জন্যই পবিত্র কোরআনের প্রথম সুরা ফাতিহায় আল্লাহ তাআলা মুমিনদের এই দোয়া করার শিক্ষা দিয়েছেন, যা প্রতিটি মুমিন দৈনিক অনেকবার করে থাকেন। আর তা হলো আমাদের সরল পথ দেখান।’ (সুরা ফাতিহা, আয়াত : ৬)

এ দোয়া কেবল পথ চেনার আবেদন নয়; বরং সত্যকে জানার, তা গ্রহণ করার, সে অনুযায়ী আমল করার এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার ওপর অবিচল থাকার প্রার্থনা। নিম্নের কোরআনে পবিত্র সরল পথে পরিচয় ও তার ওপর অবিচল থাকার কিছু কেৌশল তুলে ধরা হলো

সরল পথ কাকে বলে?:  আরবি সিরাত’ অর্থ পথ এবং মুস্তাকিম’ অর্থ সোজা, সরল ও বক্রতামুক্ত। তবে কোরআনের পরিভাষায় সিরাতুল মুস্তাকিম নিছক একটি নৈতিক ধারণা নয়; এটি আল্লাহর মনোনীত দ্বীন, তাওহিদ, তাঁর আনুগত্য এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নতের সমন্বিত রূপ।

মূলত আল্লাহর হুকুম ও মহানবী (সা.)-এর সুন্নত মোতাবেক আল্লাহর ইবাদতই সরল পথের মূল ভিত্তি। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, আর তোমরা আমারই ইবাদত করো। এটিই সরল পথ।’ (সুরা ইয়াসিন, আয়াত : ৬১)

ইমাম তাবারি (রহ.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, আল্লাহর ইবাদতকে একনিষ্ঠভাবে তাঁর জন্য নির্দষ্টি করা, তাঁর আনুগত্য করা এবং শয়তানের অবাধ্যতামূলক নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করাই সঠিক দ্বীন ও সরল পথ। (তাফসিরে তাবারি)

অর্থাত্ সিরাতুল মুস্তাকিমের সূচনা তাওহিদ থেকে। আল্লাহকে একমাত্র উপাস্য হিসেবে বিশ্বাস করা, ইবাদত তাঁর জন্য নিবেদিত করা এবং তাঁর বিধান মেনে চলা এর অপরিহার্য ভিত্তি।
সিরাতুল মুস্তাকিমের তাত্পর্য বোঝাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি চমত্কার উপমা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আল্লাহ তাআলা এভাবে সোজা পথের একটি উদাহরণ দিয়েছেন-রাস্তার দু’ধারে দুটি প্রাচীর। প্রাচীর দুটিতে আছে অনেকগুলো খোলা দরজা। এগুলোতে পর্দা ঝুলানো রয়েছে। একজন আহ্বানকারী রাস্তার মাথায় দাঁড়িয়ে আহ্বান করছেন। অন্য এক আহ্বানকারী পথের উপর থেকে ডাকছেন। আর আল্লাহ তাআলা শানি্তময় আবাসের দিকে ডাকছেন। তিনি যাকে ইচ্ছা সোজা পথের হিদায়াত দান করেন’- (সুরা ইউনুস ২৫)। রাস্তার দু’পাশে দরজাগুলো হল আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত সীমাসমূহ। সুতরাং কোনো ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত সীমালঙ্ঘন করলে তাতে (দরজার) পর্দা সরে যায়। আর উপর থেকে যে আহ্বায়ক আহ্বান করছেন তিনি হলেন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে উপদেশদাতা! (তিরমিজি, হাদিস : ২৮৫৯)
এই উপমা আমাদের শেখায়, কোনো অবস্থাতেই দ্বীনের মেৌলিক নির্দেশনা ও আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা থেকে বিচু্যত হওয়ার সুযোগ নেই।

বরং সর্বাবস্থায় কোরআন সুন্নাহকে মজবুত ভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, হে মুমিনগণ! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর, তাঁর রাসুলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা এখতিয়ারধারী তাদেরও।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৫৯)
প্রশ্ন জাগতে পারে, এখানে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পরে কাদের কথা উলে্লখ করা হয়েছে? এর উত্তর পবিত্র কোরআনের আরেকটি আয়াতে এসেছে। ইরশাদ হয়েছে, যারা আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করবে, তারা সেই সকল লোকের সঙ্গে থাকবে, যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন, অর্থাত্ নবীগণ, সিদ্দীকগণ, শহীদগণ ও সত্কর্মশীলগণের সঙ্গে। কতই না উত্তম সঙ্গী তারা!’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৬৯)

এই আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, যারা মহান আল্লাহ ও তঁার রাসুলের দেখানো সরল পথের অনুসারী হবে, সব পরিস্থতিতে তার ওপর অবিচল থাকতে হবে। সুরা ফাতিহার যে আয়াতের মাধ্যমে মহান আল্লাহর কাছে সঠিক পথের দিশা চায়, তা নিছক একটি বাক্য নয়, বরং এই আয়াতে লুকিয়ে আছে, মানুষের গোটা জীবনের শিক্ষা, যে শিক্ষা তাকে আমৃতু্য কোরআন সুন্নাহ মোতাবেক পরিচালিত হওয়ার শিক্ষা দেয়। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সরল পথের অনুসারী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

পবিত্র কোরআনের দৃষ্টিতে সরল পথ

প্রকাশিত সময় : ০৯:১১:৪৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
প্রতিটি মুসলমান দৈনন্দিন মহান আল্লাহর কাছে যে দোয়া করে, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দোয়া হলো সঠিক পথের সন্ধান লাভ করা’। কারণ মানুষ সবকিছু অর্জন করেও যদি সত্য ও ন্যায়ের পথ হারিয়ে ফেলে, তাহলে তার জীবনের চূড়ান্ত সাফল্য অধরাই থেকে যায়। এ জন্যই পবিত্র কোরআনের প্রথম সুরা ফাতিহায় আল্লাহ তাআলা মুমিনদের এই দোয়া করার শিক্ষা দিয়েছেন, যা প্রতিটি মুমিন দৈনিক অনেকবার করে থাকেন। আর তা হলো আমাদের সরল পথ দেখান।’ (সুরা ফাতিহা, আয়াত : ৬)

এ দোয়া কেবল পথ চেনার আবেদন নয়; বরং সত্যকে জানার, তা গ্রহণ করার, সে অনুযায়ী আমল করার এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার ওপর অবিচল থাকার প্রার্থনা। নিম্নের কোরআনে পবিত্র সরল পথে পরিচয় ও তার ওপর অবিচল থাকার কিছু কেৌশল তুলে ধরা হলো

সরল পথ কাকে বলে?:  আরবি সিরাত’ অর্থ পথ এবং মুস্তাকিম’ অর্থ সোজা, সরল ও বক্রতামুক্ত। তবে কোরআনের পরিভাষায় সিরাতুল মুস্তাকিম নিছক একটি নৈতিক ধারণা নয়; এটি আল্লাহর মনোনীত দ্বীন, তাওহিদ, তাঁর আনুগত্য এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নতের সমন্বিত রূপ।

মূলত আল্লাহর হুকুম ও মহানবী (সা.)-এর সুন্নত মোতাবেক আল্লাহর ইবাদতই সরল পথের মূল ভিত্তি। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, আর তোমরা আমারই ইবাদত করো। এটিই সরল পথ।’ (সুরা ইয়াসিন, আয়াত : ৬১)

ইমাম তাবারি (রহ.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, আল্লাহর ইবাদতকে একনিষ্ঠভাবে তাঁর জন্য নির্দষ্টি করা, তাঁর আনুগত্য করা এবং শয়তানের অবাধ্যতামূলক নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করাই সঠিক দ্বীন ও সরল পথ। (তাফসিরে তাবারি)

অর্থাত্ সিরাতুল মুস্তাকিমের সূচনা তাওহিদ থেকে। আল্লাহকে একমাত্র উপাস্য হিসেবে বিশ্বাস করা, ইবাদত তাঁর জন্য নিবেদিত করা এবং তাঁর বিধান মেনে চলা এর অপরিহার্য ভিত্তি।
সিরাতুল মুস্তাকিমের তাত্পর্য বোঝাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি চমত্কার উপমা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আল্লাহ তাআলা এভাবে সোজা পথের একটি উদাহরণ দিয়েছেন-রাস্তার দু’ধারে দুটি প্রাচীর। প্রাচীর দুটিতে আছে অনেকগুলো খোলা দরজা। এগুলোতে পর্দা ঝুলানো রয়েছে। একজন আহ্বানকারী রাস্তার মাথায় দাঁড়িয়ে আহ্বান করছেন। অন্য এক আহ্বানকারী পথের উপর থেকে ডাকছেন। আর আল্লাহ তাআলা শানি্তময় আবাসের দিকে ডাকছেন। তিনি যাকে ইচ্ছা সোজা পথের হিদায়াত দান করেন’- (সুরা ইউনুস ২৫)। রাস্তার দু’পাশে দরজাগুলো হল আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত সীমাসমূহ। সুতরাং কোনো ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত সীমালঙ্ঘন করলে তাতে (দরজার) পর্দা সরে যায়। আর উপর থেকে যে আহ্বায়ক আহ্বান করছেন তিনি হলেন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে উপদেশদাতা! (তিরমিজি, হাদিস : ২৮৫৯)
এই উপমা আমাদের শেখায়, কোনো অবস্থাতেই দ্বীনের মেৌলিক নির্দেশনা ও আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা থেকে বিচু্যত হওয়ার সুযোগ নেই।

বরং সর্বাবস্থায় কোরআন সুন্নাহকে মজবুত ভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, হে মুমিনগণ! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর, তাঁর রাসুলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা এখতিয়ারধারী তাদেরও।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৫৯)
প্রশ্ন জাগতে পারে, এখানে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পরে কাদের কথা উলে্লখ করা হয়েছে? এর উত্তর পবিত্র কোরআনের আরেকটি আয়াতে এসেছে। ইরশাদ হয়েছে, যারা আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করবে, তারা সেই সকল লোকের সঙ্গে থাকবে, যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন, অর্থাত্ নবীগণ, সিদ্দীকগণ, শহীদগণ ও সত্কর্মশীলগণের সঙ্গে। কতই না উত্তম সঙ্গী তারা!’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৬৯)

এই আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, যারা মহান আল্লাহ ও তঁার রাসুলের দেখানো সরল পথের অনুসারী হবে, সব পরিস্থতিতে তার ওপর অবিচল থাকতে হবে। সুরা ফাতিহার যে আয়াতের মাধ্যমে মহান আল্লাহর কাছে সঠিক পথের দিশা চায়, তা নিছক একটি বাক্য নয়, বরং এই আয়াতে লুকিয়ে আছে, মানুষের গোটা জীবনের শিক্ষা, যে শিক্ষা তাকে আমৃতু্য কোরআন সুন্নাহ মোতাবেক পরিচালিত হওয়ার শিক্ষা দেয়। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সরল পথের অনুসারী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।