নতুন বছরে পা রেখেছে পৃথিবী। নতুন বছরকে বরণ করার নানা আয়োজন নিয়ে লিখেছেন আশিক জামান
নতুন বছরের প্রথম দিন যেভাবে যাবে, বাকি জীবনও সেভাবে যাবে বলে মনে করেন অনেকে। সে অনুযায়ী তারা বিভিন্ন রেওয়াজ পালন করেন। যেমন ঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার সংস্কৃতি চালু আছে বাঙালিদের মধ্যে। ইংরেজি নববর্ষেও নিজের ঘর-চারপাশ পরিষ্কার রাখার রেওয়াজ মেনে চলেন অনেকে। সঙ্গে থাকে যার যার সাধ্যমতো ভালো খাওয়া। বিশ্বাস করা হয় এসব মেনে চলার সঙ্গে জড়িত মানুষের ভাগ্য ও সংস্কৃতি। সারা দুনিয়ার মানুষ আতশবাজি পুড়িয়ে, ঢাকঢোল পিটিয়ে, হৈ-হুল্লোড় করে, উৎসব আয়োজনে খ্রিস্টাব্দের নতুন বছরকে স্বাগত জানায়। আগে এক সময় ২৫ মার্চ, আবার ২৫ ডিসেম্বরসহ বিভিন্ন তারিখে বছরের শুরু ধরা হতো। বিবিসি জানাচ্ছে, এর কারণটা ছিল মূলত রোমান পেগান উৎসব এবং দুই হাজার বছরেরও বেশি আগে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার যে ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকা চালু করেছিলেন তার সূত্র ধরে।
যেভাবে জানুয়ারি
বিবিসি থেকে জানা যাচ্ছে, ষোড়শ শতকে পোপ গ্রেগরি ত্রয়োদশ গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করেন এবং ক্যাথলিক দেশগুলোতে ওই সময় থেকে পহেলা জানুয়ারিকে নতুন বছরের শুরু হিসাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হয়। আমরা এখন যে ক্যালেন্ডার অনুসরণ করি বা যেটি ইংরেজি বর্ষপঞ্জি হিসেবে চেনেন অনেকে, সেটাই ‘গ্রেগরিয়ান’ ক্যালেন্ডার। ইতালি, স্পেন এবং পর্তুগালের মতো ক্যাথলিক দেশগুলো তখন দ্রুত এ নতুন ক্যালেন্ডার গ্রহণ করে। তবে প্রোটেস্ট্যান্ট এবং অর্থোডক্স খ্রিস্টান প্রধান দেশগুলো এটি বেশ দেরিতে গ্রহণ করে। ইংল্যান্ড যে দেশটি পোপের কর্র্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল এবং প্রোটেস্ট্যান্ট সম্প্রদায়কে গ্রহণ করেছিল, তারা ১৭৫২ সালের আগপর্যন্ত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করেনি। এর আগপর্যন্ত তারা ২৫ মার্চকে নববর্ষের প্রথম দিন হিসেবে উদযাপন করত। সে বছর ব্রিটেনের পার্লামেন্টের একটি আইন ব্রিটিশদের ইউরোপের বাকি অংশের সঙ্গে একীভূত করেছিল। এর আগে ১৬৯৯ সালে জার্মানির বিভিন্ন প্রোটেস্ট্যান্ট অধ্যুষিত রাজ্যগুলো নতুন এই বর্ষপঞ্জি গ্রহণ করে। ব্রিটেনের পর ১৭৫৩ সালে সুইডেন, ১৮৭৩ সালে জাপান, ১৯১২ সালে চীন, ১৯১৮ সালে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র এবং ইউরোপের সবশেষ দেশ হিসেবে গ্রিস ১৯২৩ সালে এই গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করে। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খ্রিস্টান প্রধান নয় এমন দেশও গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার করতে শুরু করে। বর্তমানে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে আর ঠিক এ কারণেই আমরা প্রতি বছরের পহেলা জানুয়ারি সারা বিশ্বে আতশবাজি পোড়ানোর উদযাপন দেখি।
সর্বজনীন গ্রেগরিয়ান
গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির সবচেয়ে বড় দিক হলো এটি সর্বজনীন, যেখানে তারিখগুলো কখনো দিন পরিবর্তন করে না। তবে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে, এমন অনেক দেশেরই তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যগত বা ধর্মীয় ক্যালেন্ডারও রয়েছে। যেমন বাংলাদেশের নিজস্ব বাংলা ১২ মাসের পঞ্জিকা রয়েছে। দেশটি ১৪০০ বছরের বেশি সময় ধরে প্রতি বছর এপ্রিলের মাঝামাঝি বাংলা নববর্ষ পালন করে আসছে। একইভাবে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মিয়নামার এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে থাকে। এ ছাড়া ১৯১২ সালে চীন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করলেও তাদের নিজস্ব চন্দ্র বর্ষপঞ্জিও অনুসরণ করে এবং প্রতি বছর চীনসহ বিভিন্ন দেশে চীনা নববর্ষ উদযাপন অব্যাহত রেখেছে। আবার ইথিওপিয়ার বাসিন্দারা সেপ্টেম্বর মাসে এনকুটাটাশ নামে নিজেদের ঐতিহ্য অনুযায়ী নববর্ষ উদযাপন করে।
রীতি
যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয় প্রথা হলো নতুন বছরের আগের রাতে প্রিয়জনকে চুমু দেওয়া। এর মধ্য দিয়ে নিশ্চয়ই তারা ভাবে যে, পারস্পরিক হৃদ্যতা ও সম্পর্ক আরও গভীর হবে। এ ছাড়া স্পেনে মনে করা হয়, রাত ১২টা পর্যন্ত ১২টি আঙুর খেলে তাদের জীবনে সমৃদ্ধি আসবে। তবে ১২টার ঘণ্টা বাজার আগেই যদি সব আঙুর খাওয়া না যায়, তাহলে বুঝতে হবে জীবনে কাক্সিক্ষত প্রাপ্তি আসবে না। আর প্রতিটি আঙুর খেতে হবে এক ঘণ্টা পরপর। আর যদি সময়মতো সব আঙুর খেতে পারেন, তাহলে বুঝবেন আপনার জীবনে প্রেম আসছে। গ্রিসে সদর দরজার বাইরে পেঁয়াজ ঝোলানোর রীতিকে নতুনের শুরুর সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হয়। তাদের ধারণা, পেঁয়াজের পুরনো খোসা ছাড়িয়ে নিলে যেমন নতুন খোসা আসে, জীবনও তেমনি। গ্রিক ঐতিহ্যে জানা যায়, অভিভাবকরা নববর্ষের দিন তাদের সন্তানদের
মাথায় পেঁয়াজের ছোঁয়া দিয়ে ঘুম থেকে জাগান। এস্তোনিয়ায় নববর্ষের দিনটি খেয়ে উদযাপন করা হয়। যথাসম্ভব বেশি খাওয়ার রীতি চালু আছে সেখানে। তবে কেউ কেউ খাবারের সংখ্যা মেনে চলেন। যেমন তারা তিন, সাত বা ১৩ ধরনের খাবার খান। জার্মানরা জ্যামভর্তি ডোনাট খায়, যাকে বলা হয় সৌভাগ্যের প্রতীক। নববর্ষের দিনে পেস্ট্রি খাওয়া তাদের ঐতিহ্য। তুরস্কের লোকেরা বিশ্বাস করে যে, বাড়ির সামনে ডালিম থ্যাঁতলে নতুন বছরকে বরণ করলে ফলপ্রসূ কিছু ঘটবে। কারণ ডালিম বা আনার সমৃদ্ধির প্রতিনিধিত্ব করে। তুরস্কে বিয়েতেও ডালিমের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়। অনেক সংস্কৃতিতে এ বিশ্বাস আছে যে, নববর্ষে গোল খাবার খাওয়া সমৃদ্ধি নিয়ে আসে। ইতালিতে মসুর ডাল যেমন। এ ফসল তাদের গোলাকার মুদ্রার প্রতিনিধিত্ব করে। ফিলিপাইনেও নতুন বছরে প্রাচুর্য নিশ্চিত করতে ১২টি গোল ফল খাওয়ার প্রথা রয়েছে। কলম্বিয়ায় প্রথা অনুযায়ী, পরিবারের প্রতিটি সদস্যের খাটের নিচে তিনটি আলু রাখা হয়। একটি আলুর খোসা ছাড়ানো থাকে, দ্বিতীয় আলুটি খোসাসহ থাকে এবং তৃতীয় আলুটি থাকে অর্ধেক খোসা ছাড়ানো। রাতে প্রত্যেক ব্যক্তি চোখ বন্ধ করে সেই আলু বের করেন। যার হাতে যে আলুটি আসে সেই অনুযায়ী তার বছরের ভবিষ্যদ্বাণী হয়। ভবিষ্যৎ ব্যক্তির ভাগ্যে আর্থিক সংগ্রাম কেমন হবে তা নাকি নির্ধারণ করে সেই আলুগুলো। যদিও অনেক দেশে নববর্ষকে বরণের খাদ্য-সম্পর্কিত ঐতিহ্য রয়েছে। তবে আয়ারল্যান্ডের ঐতিহ্য খাওয়ার সঙ্গে জড়িত নয়। আইরিশরা তাদের বাড়ির দেয়ালে বড়দিনের রুটি ছুড়ে দেয়। তারা মনে করে, রুটিতে ও মাখনে থাকা ভালো শক্তি ঘরের ভেতর আসতে চাওয়া খারাপ শক্তিকে তাড়িয়ে দেবে। তাই তারা দেয়ালে রুটি ছুড়ে মারে। চেক প্রজাতন্ত্রে নববর্ষের সময় আপেল দুই ভাগে ভাগ করে দেখে মাঝখানে কী আকৃতি দেখা যাচ্ছেÑ যদি তারার মতো হয়, তাহলে ভাগ্যে আছে সুখ আর সুস্বাস্থ্য। তবে ক্রসের মতো দেখা গেলে স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তিত থাকতে হবে। ব্রাজিল নববর্ষের আগের পোশাক নির্বাচন নিয়ে অনেক রীতি আছে। অনেকে সৌভাগ্য এবং শান্তির জন্য তারা সাদা পোশাক পরে। এ ছাড়া মানানসই ওই পোশাক উৎকৃষ্ট মানের হতে হয়! ফিলিপাইনে প্রাচুর্যের প্রতীক হলো মুদ্রাকৃতির গোলাকার চিহ্ন। এ কারণেই তারা নতুন বছরে পলকা ডট নকশার জামা পরে। তারা গোলাকার বস্তু সংগ্রহ করে বা গোলাকার খাবার খায়। ইতালিতে অনেকে নববর্ষের প্রাক্কালে লাল অন্তর্বাস পরার ঐতিহ্য মেনে চলে। লাল অন্তর্বাস তাদের কাছে আবেগ এবং ভালোবাসার প্রতিনিধি। কলম্বিয়ার ঐতিহ্য অনুসারে, বছরের প্রথম দিনে একটি খালি লাগেজ বহন করা হয়। তারা বিশ্বাস করে যে, এর ফলে নতুন বছরে আরও বেশি ভ্রমণ করতে পারবে তারা। বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য ওই খালি ব্যাগ হাতে কয়েক কদম হেঁটেও আসে তারা।
আমরা ধন্য!
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অবশ্য নববর্ষকে বরণের এক মন্ত্র দিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘প্রান্তরের মধ্যে পুণ্যনিকেতনে নববর্ষের প্রথম নির্মল আলোকের দ্বারা আমাদের অভিষেক হইল। আমাদের নবজীবনের অভিষেক। মানবজীবনের যে মহোচ্চ সিংহাসনে বিশ্ববিধাতা আমাদিগকে বসিতে স্থান দিয়াছেন তাহা আজ আমরা নবগৌরবে অনুভব করিব। আমরা বলিব, হে ব্রহ্মাণ্ডপতি, এই যে অরুণরাগরক্ত নীলাকাশের তলে আমরা জাগ্রত হইলাম আমরা ধন্য! এই যে চিরপুরাতন অন্নপূর্ণা বসুন্ধরাকে আমরা দেখিতেছি আমরা ধন্য। এই যে গীতগন্ধবর্ণস্পন্দনে আন্দোলিত বিশ্ব সরোবরের মাঝখানে আমাদের চিত্তশতদল জ্যোতিঃপরিপ্লাবিত অনন্তের দিকে উদ্ভিন্ন হইয়া উঠিতেছে আমরা ধন্য। অদ্যকার প্রভাতে এই যে জ্যোতির্ধারা আমাদের উপর বর্ষিত হইতেছে ইহার মধ্যে তোমার অমৃত আছে, তাহা ব্যর্থ হইবে না, তাহার আমরা গ্রহণ করিব; এই যে বৃষ্টিধৌত বিশাল পৃথিবীর বিস্তীর্ণ শ্যামলতা ইহার মধ্যে তোমার অমৃত ব্যাপ্ত হইয়া আছে তাহা ব্যর্থ হইবে না, তাহা আমরা গ্রহণ করিব। এই যে নিশ্চল মহাকাশ আমাদের মস্তকের উপর তাহার স্থির হস্ত স্থাপন করিয়াছে তাহা তোমারই অমৃতভারে নিস্তব্ধ তাহা ব্যর্থ হইবে না, তাহা আমরা গ্রহণ করিব।’ ‘এই মহিমান্বিত জগতের অদ্যকার নববর্ষ দিন আমাদের জীবনের মধ্যে যে গৌরব বহন করিয়া আনিল, এই পৃথিবীতে বাস করিবার গৌরব, আলোকে বিচরণ করিবার গৌরব, এই আকাশতলে আসীন হইবার গৌরব তাহা যদি পরিপূর্ণভাবে চিত্তের মধ্যে গ্রহণ করি তবে আর বিষাদ নাই, নৈরাশ্য নাই, ভয় নাই, মৃত্যু নাই।’ পশ্চিম আর প্রাচ্যের নববর্ষ বরণের রীতিতে অবশ্যই পার্থক্য আছে। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন, প্রকৃতির অংশ হিসেবে নতুন বছরকে বরণ করা প্রাচ্যের দর্শন। পশ্চিমেও দেখা গেছে পরিবেশ, প্রকৃতির অনেক প্রভাব রয়েছে বর্ষবরণে। আধুনিক যুগে অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে। আবার নতুন নতুন কিছু প্রকরণ যুক্ত হয়েছে, যা হয়তো ভবিষ্যতে ঐতিহ্য হিসেবে পালিত হবে।

ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 




















