গত শনিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হকারদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন। ওইদিন দুপুরে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে তিনি এ নির্দেশ দেন।
বৈঠকে স্থানীয় সরকার বিভাগ, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে দ্রুত বিকল্প স্থান নির্ধারণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, উচ্ছেদ হওয়া হকারদের এমন জায়গায় পুনর্বাসন করতে হবে যেখানে তারা স্বাচ্ছন্দ্য ও উৎসাহের সঙ্গে ব্যবসা করতে পারবেন।
সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মিরপুর-১ এলাকা এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মতিঝিল, বায়তুল মোকাররম, পল্টন ও গুলিস্তানসহ কয়েকটি এলাকার সড়ক থেকে কয়েক শতাধিক দোকান উচ্ছেদ করা হয়।
বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, উচ্ছেদ হওয়া হকারদের বিকল্প জায়গার ব্যবস্থা করে দেবে সরকার।
উল্লেখ্য, ১০ এপ্রিল ‘প্রধানমন্ত্রী সমীপে’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। যাতে বিকল্প ব্যবস্থা না করে হকার উচ্ছেদ করার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী স্বীয় বিবেচনায় এবং তাঁর বিচক্ষণতার কারণে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
হকার উচ্ছেদ কোনো সমাধান নয়। এমনিতেই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা সংকটাপন্ন। সরকারের হিসাব অনুযায়ী সারা দেশে হকারের সংখ্যা ছয় লাখের বেশি। এর মধ্যে ঢাকা শহরেই হকারের সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ।
এর মধ্যে মাত্র ১ লাখ ৩০ হাজার হকার সমিতির সদস্য। বাকি ২ লাখ ৭০ হাজার হকার ভ্রাম্যমাণ। কিন্তু আমাদের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে হকারের সংখ্যা ২০ লাখের কম নয়। এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে উচ্ছেদ করলে মুহূর্তের মধ্যেই তারা কর্মহীন হয়ে পড়বেন। এদের পরিবার এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা অন্তত ১ কোটি। হকার উচ্ছেদের ফলে এই বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী গভীর আর্থিক সংকটে পড়বে।
তাছাড়া এই হকারদের কারণে দেশে শতাধিক বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এদের পণ্যের প্রধান বিক্রেতা হলো হকাররা।
হকার উচ্ছেদ করলে এরকম শতাধিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এসব বন্ধ হয়ে যাবে। এটি দেশের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। জীবন জীবিকার জন্য এরা বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে। এর ফলে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। তাই এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ খুবই জরুরি ছিল।
তিনি সঠিকভাবেই সমস্যার সমাধানের পথ বলে দিয়েছেন। হকার উচ্ছেদ না করে অন্যান্য দেশের মতো তাদের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনতে পারলে একদিকে যেমন হকারদের নিয়ে চলমান সমস্যার সমাধান হবে অন্যদিকে রাষ্ট্রের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে। যুক্তরাজ্য, সিংগাপুর, থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের মতো হকার নিয়ে সমস্যায় ছিল। কিন্তু তারা উচ্ছেদের মাধ্যমে তাদের ব্যবসা বন্ধ করেনি বরং হকারদের একটি সঠিক শৃঙ্খলা এবং ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে সমস্যার সমাধান করেছে।
হকার নিয়ে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে থাইল্যান্ড। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক একসময় হকারদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিল। শহরে প্রতিদিন তীব্র যানজট সৃষ্টি হতো। টুরিস্ট নির্ভর এই দেশটির পর্যটন ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল হকারদের কারণে। হকাররা পুলিশ এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের ঘুষ দিয়ে যেখানে সেখানে পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসত। পর্যটকদের নানানরকম হয়রানি করা হতো। এমনকি অপরাধের ঘটনাও ঘটত। কিন্তু যেহেতু তাদের কোনো নিবন্ধন ছিল না তাই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এক জায়গায় অপরাধ করে তারা অন্য জায়গায় গিয়ে বসত। এটি থাইল্যান্ডের পর্যটনের জন্য রীতিমতো হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এরকম অবস্থায় সরকার হকারদের নিয়ে কাজ শুরু করে। ব্যাংককের সব হকারের তালিকা তৈরির কাজ করা হয় সবার আগে। এরপর হকারদের জন্য নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়। ১০০ বাথ দিয়ে নিবন্ধন করার কাজ চলে প্রায় এক মাস ধরে।
এরপর সরকার থেকে সব হকারের জন্য কার্ড চালু করে। নিবন্ধিত হকারদের জন্য এলাকা এবং বসার জায়গা সরকারিভাবে নির্ধারিত করে দেওয়া হয়। সরকারের পক্ষ থেকে হকারদের বসার সময়সূচি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। প্রতি মাসে হকারদের ১০০ বাথ করে সরকারি ফি নির্ধারণ করা হয়, (যা এখন মাসিক দেড় হাজার বাথ।) এভাবেই থাইল্যান্ড একদিকে যেমন হকারদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় এনেছে তেমনি তাদের আয় বৃদ্ধি করার সুযোগ করে দিয়েছে।
তাদের বসার সুনির্দিষ্ট সময়সূচি থাকায় সেখানে যানজটের সমস্যা দূর হয়েছে। এখন থাইল্যান্ডের স্ট্রিট মার্কেটগুলো পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় স্থান। আর অনেকেই এখন হকারিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে।
একটি সঠিক পরিকল্পনা এবং তার সঠিক বাস্তবায়ন যে একটি সমস্যাকে সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত করতে পারে থাইল্যান্ডের হকার পুনর্বাসন কর্মসূচি তার একটি উদাহরণ। এখন অনেক দেশেই পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য স্ট্রিট ফুড এবং মার্কেট চালু করেছে। সিঙ্গাপুরের নাইট মার্কেট এখন পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। হকার নিয়ে বড় ধরনের সমস্যায় পড়েছিল লন্ডন। ইস্ট লন্ডনে বাংলাদেশি, ভারতীয় এবং পাকিস্তানি নাগরিকদের বসতি একসময় বাড়তে থাকে। জীবিকার তাগিদে এদের অনেকেই বিভিন্ন পণ্য নিয়ে হোয়াইট চ্যাপেলের ফুটপাতে বসতে শুরু করেন। প্রথম দিকে লন্ডন পুলিশ অসহায় এবং দুস্থ ভেবে তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে।
কিন্তু আস্তে আস্তে গোটা হোয়াইট চ্যাপেলের দুই পাশ হকারে ভরে যায়। লন্ডন পুলিশ একসময় কঠোর হয়। তাদের উচ্ছেদের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু বাদ সাধেন টাওয়ার হ্যালমেটের মেয়র। তিনি পুলিশ প্রশাসন এবং সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে উচ্ছেদের বদলে তাদের শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে আসেন। এখন এই এলাকার ফুটপাতে হকার আছে কিন্তু তাতে ফুটপাতে চলাচলে সমস্যা হচ্ছে না। তাদের কাছ থেকে সরকার ট্যাক্স পাচ্ছে।
কাজেই হকার সমস্যা বাংলাদেশের জন্য একক কোনো সমস্যা নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই সমস্যা সমাধানে সফল হয়েছে। কেউই হকারদের নির্মূল করেনি বরং তাদের কাঠামোর মধ্যে এনেছে।
বাংলাদেশে হকাররা অবহেলিত। সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ আত্মকর্মসংস্থানের জন্য এ ধরনের কাজ বেছে নেন। বিশেষ করে যারা নিজে কিছু একটা করতে চান, কিন্তু পুঁজি নেই তারাই হকার হয়ে নিজেদের ব্যবসা শুরু করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু এই পেশার কোনো সরকারি স্বীকৃতি নেই।
এটিকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। বিভিন্ন জায়গায় হকাররা নিজেদের খেয়ালখুশি এবং সুবিধা অনুযায়ী বসেন। তাদের ওপর প্রথম নজর পড়ে পুলিশের। গুলিস্তানে একাধিক হকারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুলিশকে সপ্তাহে পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয় তাদের। এরপর এই হকাররা ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের দৃষ্টিতে পড়েন। বিভিন্ন স্থানে হকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকায় সপ্তাহে অন্তত ১০ হাজার টাকা চাঁদা দিয়ে তাদের ব্যবসা করতে হয়। অর্থাৎ মাসে শুধু চাঁদাই দিতে হয় অন্তত ৪০ হাজার টাকা।
এই টাকা সরকার পায় না, পায় পুলিশ ও স্থানীয় নেতারা। তারপরও তারা জীবিকার তাগিদে তাদের ব্যবসা করতে বাধ্য হন। আর এখানেই সরকারের নজরদারি দরকার। সরকার যদি হকারদের একটি নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসেন, তাহলে তাদের প্রকৃত তালিকা তৈরি করা সম্ভব। সিটি করপোরেশন হকারদের নিবন্ধন ফি ধার্য করতে পারে।
১ হাজার টাকা এককালীন নিবন্ধন ফি হলে কোনো হকার তাতে আপত্তি করবে না। সরকার ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থান তাদের জন্য নির্ধারণ করে দিতে পারে। যেখানে তাদের বসার একটি নির্দিষ্ট সময় এবং স্থান নির্দিষ্ট করা থাকবে। এর বিনিময়ে সরকার বা সিটি করপোরেশন তাদের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা বা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি নিতে পারে সার্ভিস চার্জ হিসেবে। হকাররা আনন্দচিত্তে এই ফি দেবে। তবে শর্ত হলো- এর বিনিময়ে পুলিশ এবং প্রভাবশালীদের চাঁদাবাজি বন্ধ করবে সরকার। এভাবেই হকারদের উচ্ছেদ না করে তাদের একটি সুশৃঙ্খল কর্মসংস্থানের আওতায় আনা সম্ভব। এতে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান বাড়বে, তেমনি সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কারা কোন উদ্দেশ্যে হকার উচ্ছেদের এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তা খতিয়ে দেখা দরকার। প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন অনুযায়ী দ্রুত হকার পুনর্বাসনের পরিকল্পিত এবং আধুনিক উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। এতে লাভ হবে বাংলাদেশের।