সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সম্পর্কের দূরত্ব কমাতে যে বিষয়গুলো জরুরি

সম্পর্কে ভালোবাসা থাকলেই সব সময় সম্পর্ক সুন্দর থাকে না। সময়ের সঙ্গে মতপার্থক্য, ভুল বোঝাবুঝি, অর্থনৈতিক চাপ, ঘরের কাজ, সন্তান লালন-পালন কিংবা ব্যক্তিগত চাহিদা নিয়ে দম্পতিদের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে। কখনো কখনো একই বিষয় নিয়ে বারবার ঝগড়া হতে হতে সম্পর্কের মধ্যে দূরত্বও তৈরি হয়।

তবে সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, মতবিরোধ থাকা মানেই সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়ার পথে—এমন নয়। বরং সঙ্গীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তার অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করা, পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা এবং সমস্যা নিয়ে গঠনমূলকভাবে আলোচনা করার অভ্যাস সম্পর্ককে ভালো রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণাতেও দেখা গেছে, সুখী ও অসুখী—উভয় ধরনের দম্পতির মধ্যেই তর্ক-বিতর্ক হয়; মূল পার্থক্য তৈরি হয় তারা সেই মতবিরোধ কীভাবে সামলান, তার ওপর।

যে বিষয় নিয়ে ঝগড়া হয়

নতুন সম্পর্কে প্রথম ঝগড়াটি যদি হয় ঘরের কাজ বা নোংরা থালা-বাসন নিয়ে, ভবিষ্যতেও একই ধরনের বিষয় নিয়ে মতবিরোধ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, দম্পতিরা যেসব বিষয় নিয়ে ঝগড়া করেন, সেগুলো সম্পর্কের দীর্ঘ সময়জুড়েই প্রায় একই থাকে। এসব সমস্যাকে ‘চিরস্থায়ী’ বা ‘অমীমাংসিত’ সমস্যা বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে অবস্থিত দম্পতি থেরাপি প্রতিষ্ঠান ‘দ্য গটম্যান ইনস্টিটিউট’-এর গবেষণা পরিচালক ও মনোবিজ্ঞানী ক্যারি কোল বলেন, এসব সমস্যার মধ্যে অর্থকড়ি, সন্তান লালন-পালন, ক্ষমতার ভারসাম্য বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার যেমন থাকতে পারে, তেমনি ঘর পরিষ্কার রাখার মতো ছোটখাটো বিষয়ও থাকতে পারে।

মতবিরোধ সবসময় খারাপ নয়

সম্পর্কে মতপার্থক্য থাকা নিজেই কোনো খারাপ লক্ষণ নয়। একে অপরের প্রয়োজন বোঝা এবং তাতে সাড়া দেওয়ার প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ হিসেবেও মতবিরোধ দেখা দিতে পারে। সুখী ও অসুখী—দুই ধরনের দম্পতির মধ্যেই তর্ক-বিতর্ক হয়। মূল পার্থক্য তৈরি হয় তর্কের সময় এবং তর্কের বাইরেও একে অপরের সঙ্গে তাঁরা কীভাবে আচরণ করেন, তার ওপর। গঠনমূলক তর্কে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, কৌতূহল ও সহমর্মিতার সঙ্গে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হয়। এ ধরনের আলোচনা সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে পারে।

যে চার আচরণ ক্ষতিকর

গবেষণার ভিত্তিতে ক্যারি কোল এমন চারটি আচরণের কথা উল্লেখ করেছেন, যা সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ইঙ্গিত দিতে পারে। এগুলো হলো—সমালোচনা, অবজ্ঞা, আত্মরক্ষামূলক মনোভাব এবং ‘স্টোনওয়ালিং’ বা আলোচনা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া। কোল বলেন, এই চারটি আচরণ একটি সম্পর্ককে ধ্বংস করে দিতে পারে। তবে দম্পতিরা চাইলে এসব আচরণ পরিবর্তন করাও সম্ভব। পৃথক গবেষণায় দেখা গেছে, সঙ্গীর কাছ থেকে ক্রমাগত সমালোচনা অকাল মৃত্যুর একটি উল্লেখযোগ্য কারণের সঙ্গেও সম্পর্কিত। আক্রমণাত্মক ও বৈরী মনোভাবের পাশাপাশি এ ধরনের আচরণকে ‘ধ্বংসাত্মক’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এগুলো শেষ পর্যন্ত বিবাহবিচ্ছেদের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

একে অপরের কথা শুনুন

সম্পর্ক ভালো রাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘প্রতিক্রিয়াশীলতা’—অর্থাৎ সঙ্গী আপনার কথা শুনছেন, আপনাকে সমর্থন করছেন এবং আপনাকে বোঝার চেষ্টা করছেন—এমন অনুভূতি থাকা। সঙ্গীর কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া শুধু দাম্পত্য সন্তুষ্টি বাড়ায় না, শরীরের প্রদাহ কমানো এবং শারীরিক স্বাস্থ্য ও আয়ু বাড়াতেও সহায়তা করতে পারে। সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহযোগিতাও দীর্ঘমেয়াদি সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করে। বিবাহিত দম্পতিদের ওপর চালানো ২০ বছরব্যাপী এক গবেষণায় দেখা গেছে, যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং ঘরের কাজ সমানভাবে ভাগ করে নেওয়ার সঙ্গে বেশি দাম্পত্য সুখ ও কম বিবাদের সম্পর্ক রয়েছে। দম্পতিরা কীভাবে তর্ক করেন, তার প্রভাব তাঁদের ঘুমের ওপরও পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, ধ্বংসাত্মক তর্ক-বিতর্ক ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। অন্যদিকে গঠনমূলক আলোচনা ভালো ঘুমের সহায়ক হতে পারে।

থেরাপিতে ফিরতে পারে সহমর্মিতা

অসুখী সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিক্ত ও বিদ্বেষপূর্ণ তর্ক থেকে সদয় ও সহযোগিতামূলক আলোচনায় ফিরে আসা কঠিন মনে হতে পারে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, থেরাপির মাধ্যমে এটি সম্ভব। দম্পতি থেরাপি গ্রহণকারীদের প্রায় ৭০ শতাংশের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়। এটি সম্পর্কের সমস্যা সমাধান, দাম্পত্য সন্তুষ্টি বাড়ানো, মানসিক চাপ বা সংকট মোকাবিলা এবং আবেগীয় ঘনিষ্ঠতা দৃঢ় করতে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি ব্যক্তির নিজস্ব মানসিক বা শারীরিক স্বাস্থ্যগত সমস্যার উন্নতিতেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে। ইলিনয়ের ইভান্সটনে অবস্থিত নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ফ্যামিলি ইনস্টিটিউটের সাইকোলজির ক্লিনিক্যাল প্রফেসর ও কাপল থেরাপিস্ট জে লেবো বলেন, থেরাপিতে আসা অধিকাংশ দম্পতির মধ্যেই পারস্পরিক সহমর্মিতা হারিয়ে যায়। তাই থেরাপির একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো সেই সহমর্মিতা ফিরিয়ে আনা। থেরাপি কাজ করছে কি না, তার একটি লক্ষণ হলো দম্পতির কথা বলা ও শোনার দক্ষতা বাড়া। সম্পর্ক সংকটের সময় অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সম্পর্কের উন্নতির জন্য ‘আমার সঙ্গীর কী কী সমস্যা আছে?’—এভাবে না ভেবে ‘আমাদের মধ্যে আসলে কী ঘটছে?’—এই প্রশ্নের দিকে মনোযোগ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

‘আরও বলুন’ বলার অভ্যাস

ক্যারি কোলের মতে, দম্পতিদের মধ্যে আশার একটি লক্ষণ হলো একজন সঙ্গী যখন অন্যজনকে বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছি কেন তোমার এমনটা মনে হচ্ছে।’ এর অর্থ হলো, তিনি সঙ্গীর দৃষ্টিভঙ্গিকে নিজের মতের চেয়ে ভিন্ন হলেও গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করছেন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো একে অপরের প্রতি কৌতূহল থাকা। সঙ্গীর বক্তব্যের সঙ্গে একমত না হলেও যদি কেউ বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাকে আরও বলুন’ বা ‘আপনার এমন মনে হলো কেন?’—তাহলে সেখানে সম্পর্ক উন্নত করার সুযোগ থাকে। লেবোর মতে, মানুষ যদি নিজেদের সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হন, তাহলে ভালো ফলাফল পাওয়ার জোরালো প্রমাণ রয়েছে।

দুজনের আগ্রহও জরুরি

জে লেবোর মতে, থেরাপির সাফল্যের ক্ষেত্রে দম্পতিদের আগ্রহ ও মানসিক প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের সেরা কাপল থেরাপিস্টের কাছে গেলেও যদি দম্পতিদের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে কাজ করার আগ্রহ বা চেষ্টা না থাকে, তাহলে ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা কম। অন্যদিকে দম্পতির আগ্রহ ও মানসিক প্রস্তুতি ভালো থাকলে থেরাপিস্ট খুব দক্ষ না হলেও পরিস্থিতি অনেকটা সামাল দেওয়া সম্ভব। তাই সম্পর্ক উন্নত করার ক্ষেত্রে নিজেদের আগ্রহ ও চেষ্টা বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।

আলাদা হলেও থেরাপির উপকার

যেসব দম্পতি আলাদা হয়ে যাচ্ছেন, তারাও কাপল থেরাপির মাধ্যমে উপকৃত হতে পারেন। এটি বিচ্ছেদের পরিস্থিতি এবং এর ফলে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর পড়তে পারে এমন প্রভাব সামলাতে সাহায্য করতে পারে। পাশাপাশি বিচ্ছেদের প্রক্রিয়াটি কম তিক্ত করা এবং সন্তান থাকলে তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় একে অপরকে সহযোগিতা করাও সহজ হতে পারে। লেবোর মতে, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া বা বিবাহবিচ্ছেদ অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক হলেও এসব মুহূর্তে নিজের সম্পর্কে অনেক কিছু শেখার সুযোগ থাকে। মনোযোগ দিয়ে অন্যের কথা শোনা এবং সহমর্মিতা দেখানোর মতো দক্ষতা শুধু সংকটে থাকা দম্পতিদেরই নয়, সুখী সম্পর্ককেও আরও ভালো করতে পারে।

সম্পর্ক ভালো রাখতে তাই শুধু ভালোবাসা নয়, প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মনোযোগ দিয়ে শোনা, সহমর্মিতা এবং একে অপরের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার অভ্যাস। মতবিরোধ থাকবেই, তবে সেটিকে কীভাবে সামলানো হচ্ছে, সেটিই সম্পর্কের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সম্পর্কের দূরত্ব কমাতে যে বিষয়গুলো জরুরি

প্রকাশিত সময় : ০৬:২৮:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

সম্পর্কে ভালোবাসা থাকলেই সব সময় সম্পর্ক সুন্দর থাকে না। সময়ের সঙ্গে মতপার্থক্য, ভুল বোঝাবুঝি, অর্থনৈতিক চাপ, ঘরের কাজ, সন্তান লালন-পালন কিংবা ব্যক্তিগত চাহিদা নিয়ে দম্পতিদের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে। কখনো কখনো একই বিষয় নিয়ে বারবার ঝগড়া হতে হতে সম্পর্কের মধ্যে দূরত্বও তৈরি হয়।

তবে সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, মতবিরোধ থাকা মানেই সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়ার পথে—এমন নয়। বরং সঙ্গীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তার অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করা, পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা এবং সমস্যা নিয়ে গঠনমূলকভাবে আলোচনা করার অভ্যাস সম্পর্ককে ভালো রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণাতেও দেখা গেছে, সুখী ও অসুখী—উভয় ধরনের দম্পতির মধ্যেই তর্ক-বিতর্ক হয়; মূল পার্থক্য তৈরি হয় তারা সেই মতবিরোধ কীভাবে সামলান, তার ওপর।

যে বিষয় নিয়ে ঝগড়া হয়

নতুন সম্পর্কে প্রথম ঝগড়াটি যদি হয় ঘরের কাজ বা নোংরা থালা-বাসন নিয়ে, ভবিষ্যতেও একই ধরনের বিষয় নিয়ে মতবিরোধ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, দম্পতিরা যেসব বিষয় নিয়ে ঝগড়া করেন, সেগুলো সম্পর্কের দীর্ঘ সময়জুড়েই প্রায় একই থাকে। এসব সমস্যাকে ‘চিরস্থায়ী’ বা ‘অমীমাংসিত’ সমস্যা বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে অবস্থিত দম্পতি থেরাপি প্রতিষ্ঠান ‘দ্য গটম্যান ইনস্টিটিউট’-এর গবেষণা পরিচালক ও মনোবিজ্ঞানী ক্যারি কোল বলেন, এসব সমস্যার মধ্যে অর্থকড়ি, সন্তান লালন-পালন, ক্ষমতার ভারসাম্য বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার যেমন থাকতে পারে, তেমনি ঘর পরিষ্কার রাখার মতো ছোটখাটো বিষয়ও থাকতে পারে।

মতবিরোধ সবসময় খারাপ নয়

সম্পর্কে মতপার্থক্য থাকা নিজেই কোনো খারাপ লক্ষণ নয়। একে অপরের প্রয়োজন বোঝা এবং তাতে সাড়া দেওয়ার প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ হিসেবেও মতবিরোধ দেখা দিতে পারে। সুখী ও অসুখী—দুই ধরনের দম্পতির মধ্যেই তর্ক-বিতর্ক হয়। মূল পার্থক্য তৈরি হয় তর্কের সময় এবং তর্কের বাইরেও একে অপরের সঙ্গে তাঁরা কীভাবে আচরণ করেন, তার ওপর। গঠনমূলক তর্কে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, কৌতূহল ও সহমর্মিতার সঙ্গে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হয়। এ ধরনের আলোচনা সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে পারে।

যে চার আচরণ ক্ষতিকর

গবেষণার ভিত্তিতে ক্যারি কোল এমন চারটি আচরণের কথা উল্লেখ করেছেন, যা সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ইঙ্গিত দিতে পারে। এগুলো হলো—সমালোচনা, অবজ্ঞা, আত্মরক্ষামূলক মনোভাব এবং ‘স্টোনওয়ালিং’ বা আলোচনা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া। কোল বলেন, এই চারটি আচরণ একটি সম্পর্ককে ধ্বংস করে দিতে পারে। তবে দম্পতিরা চাইলে এসব আচরণ পরিবর্তন করাও সম্ভব। পৃথক গবেষণায় দেখা গেছে, সঙ্গীর কাছ থেকে ক্রমাগত সমালোচনা অকাল মৃত্যুর একটি উল্লেখযোগ্য কারণের সঙ্গেও সম্পর্কিত। আক্রমণাত্মক ও বৈরী মনোভাবের পাশাপাশি এ ধরনের আচরণকে ‘ধ্বংসাত্মক’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এগুলো শেষ পর্যন্ত বিবাহবিচ্ছেদের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

একে অপরের কথা শুনুন

সম্পর্ক ভালো রাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘প্রতিক্রিয়াশীলতা’—অর্থাৎ সঙ্গী আপনার কথা শুনছেন, আপনাকে সমর্থন করছেন এবং আপনাকে বোঝার চেষ্টা করছেন—এমন অনুভূতি থাকা। সঙ্গীর কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া শুধু দাম্পত্য সন্তুষ্টি বাড়ায় না, শরীরের প্রদাহ কমানো এবং শারীরিক স্বাস্থ্য ও আয়ু বাড়াতেও সহায়তা করতে পারে। সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহযোগিতাও দীর্ঘমেয়াদি সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করে। বিবাহিত দম্পতিদের ওপর চালানো ২০ বছরব্যাপী এক গবেষণায় দেখা গেছে, যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং ঘরের কাজ সমানভাবে ভাগ করে নেওয়ার সঙ্গে বেশি দাম্পত্য সুখ ও কম বিবাদের সম্পর্ক রয়েছে। দম্পতিরা কীভাবে তর্ক করেন, তার প্রভাব তাঁদের ঘুমের ওপরও পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, ধ্বংসাত্মক তর্ক-বিতর্ক ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। অন্যদিকে গঠনমূলক আলোচনা ভালো ঘুমের সহায়ক হতে পারে।

থেরাপিতে ফিরতে পারে সহমর্মিতা

অসুখী সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিক্ত ও বিদ্বেষপূর্ণ তর্ক থেকে সদয় ও সহযোগিতামূলক আলোচনায় ফিরে আসা কঠিন মনে হতে পারে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, থেরাপির মাধ্যমে এটি সম্ভব। দম্পতি থেরাপি গ্রহণকারীদের প্রায় ৭০ শতাংশের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়। এটি সম্পর্কের সমস্যা সমাধান, দাম্পত্য সন্তুষ্টি বাড়ানো, মানসিক চাপ বা সংকট মোকাবিলা এবং আবেগীয় ঘনিষ্ঠতা দৃঢ় করতে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি ব্যক্তির নিজস্ব মানসিক বা শারীরিক স্বাস্থ্যগত সমস্যার উন্নতিতেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে। ইলিনয়ের ইভান্সটনে অবস্থিত নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ফ্যামিলি ইনস্টিটিউটের সাইকোলজির ক্লিনিক্যাল প্রফেসর ও কাপল থেরাপিস্ট জে লেবো বলেন, থেরাপিতে আসা অধিকাংশ দম্পতির মধ্যেই পারস্পরিক সহমর্মিতা হারিয়ে যায়। তাই থেরাপির একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো সেই সহমর্মিতা ফিরিয়ে আনা। থেরাপি কাজ করছে কি না, তার একটি লক্ষণ হলো দম্পতির কথা বলা ও শোনার দক্ষতা বাড়া। সম্পর্ক সংকটের সময় অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সম্পর্কের উন্নতির জন্য ‘আমার সঙ্গীর কী কী সমস্যা আছে?’—এভাবে না ভেবে ‘আমাদের মধ্যে আসলে কী ঘটছে?’—এই প্রশ্নের দিকে মনোযোগ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

‘আরও বলুন’ বলার অভ্যাস

ক্যারি কোলের মতে, দম্পতিদের মধ্যে আশার একটি লক্ষণ হলো একজন সঙ্গী যখন অন্যজনকে বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছি কেন তোমার এমনটা মনে হচ্ছে।’ এর অর্থ হলো, তিনি সঙ্গীর দৃষ্টিভঙ্গিকে নিজের মতের চেয়ে ভিন্ন হলেও গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করছেন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো একে অপরের প্রতি কৌতূহল থাকা। সঙ্গীর বক্তব্যের সঙ্গে একমত না হলেও যদি কেউ বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাকে আরও বলুন’ বা ‘আপনার এমন মনে হলো কেন?’—তাহলে সেখানে সম্পর্ক উন্নত করার সুযোগ থাকে। লেবোর মতে, মানুষ যদি নিজেদের সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হন, তাহলে ভালো ফলাফল পাওয়ার জোরালো প্রমাণ রয়েছে।

দুজনের আগ্রহও জরুরি

জে লেবোর মতে, থেরাপির সাফল্যের ক্ষেত্রে দম্পতিদের আগ্রহ ও মানসিক প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের সেরা কাপল থেরাপিস্টের কাছে গেলেও যদি দম্পতিদের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে কাজ করার আগ্রহ বা চেষ্টা না থাকে, তাহলে ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা কম। অন্যদিকে দম্পতির আগ্রহ ও মানসিক প্রস্তুতি ভালো থাকলে থেরাপিস্ট খুব দক্ষ না হলেও পরিস্থিতি অনেকটা সামাল দেওয়া সম্ভব। তাই সম্পর্ক উন্নত করার ক্ষেত্রে নিজেদের আগ্রহ ও চেষ্টা বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।

আলাদা হলেও থেরাপির উপকার

যেসব দম্পতি আলাদা হয়ে যাচ্ছেন, তারাও কাপল থেরাপির মাধ্যমে উপকৃত হতে পারেন। এটি বিচ্ছেদের পরিস্থিতি এবং এর ফলে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর পড়তে পারে এমন প্রভাব সামলাতে সাহায্য করতে পারে। পাশাপাশি বিচ্ছেদের প্রক্রিয়াটি কম তিক্ত করা এবং সন্তান থাকলে তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় একে অপরকে সহযোগিতা করাও সহজ হতে পারে। লেবোর মতে, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া বা বিবাহবিচ্ছেদ অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক হলেও এসব মুহূর্তে নিজের সম্পর্কে অনেক কিছু শেখার সুযোগ থাকে। মনোযোগ দিয়ে অন্যের কথা শোনা এবং সহমর্মিতা দেখানোর মতো দক্ষতা শুধু সংকটে থাকা দম্পতিদেরই নয়, সুখী সম্পর্ককেও আরও ভালো করতে পারে।

সম্পর্ক ভালো রাখতে তাই শুধু ভালোবাসা নয়, প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মনোযোগ দিয়ে শোনা, সহমর্মিতা এবং একে অপরের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার অভ্যাস। মতবিরোধ থাকবেই, তবে সেটিকে কীভাবে সামলানো হচ্ছে, সেটিই সম্পর্কের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।