বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রোজা ও কিয়ামুল লাইল যখন ফলহীন থেকে যায়

রমজান আত্মশুদ্ধির মাস। এ মাসে রোজা ও কিয়ামুল লাইল শুধু আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়, বরং তা অন্তরের পরিবর্তন, চরিত্রের পরিশুদ্ধি ও তাকওয়া অর্জনের মাধ্যম। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সব ইবাদত সমান ফল বয়ে আনে না। ইবাদতের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে নিয়ত, খালিসত্ব ও আমলের শুদ্ধতার ওপর।

তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সতর্ক করেছেন; কেবল ক্ষুধার্ত থাকা বা রাত জাগলেই প্রকৃত সওয়াব পাওয়া যায় না। এই প্রেক্ষাপটে আবু হুরাইরাহ (রা.) বর্ণিত হাদিসটি গভীর তাৎপর্য বহন করে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم صلى الله عليه وسلم رُبَّ صَائِمٍ لَيْسَ لَهُ مِنْ صِيَامِهِ إِلَّا الْجُوعُ وَرُبَّ قَائِمٍ لَيْسَ لَهُ مِنْ قِيَامِهِ إِلَّا السَّهَرُ
আবু হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কত রোজাদার আছে যাদের রোজার বিনিময়ে ক্ষুধা ছাড়া আর কিছুই জোটে না। কত নামাজ আদায়কারী আছে যাদের রাত জাগরণ ছাড়া আর কিছুই জোটে না।

(ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৬৯০)
এই হাদিস আমাদের সামনে এক কঠিন সত্য তুলে ধরে। রোজা যদি মানুষকে মিথ্যা, গীবত, অন্যায় ও অসচ্চরিত্র থেকে বিরত রাখতে না পারে, তবে সে রোজা কেবল দেহের কষ্টে সীমাবদ্ধ থাকে। অন্য হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মন্দ কাজ পরিত্যাগ করে না, তার পানাহার ত্যাগ করার কোনো প্রয়োজন আল্লাহর নেই। অর্থাৎ রোজার উদ্দেশ্য কেবল উপবাস নয়, বরং আত্মসংযম ও নৈতিক সংশোধন।

একইভাবে রাতভর নামাজ আদায় করাও তখনই ফলপ্রসূ, যখন তা একনিষ্ঠতা, বিনয় ও আল্লাহভীতির সঙ্গে সম্পন্ন হয়। যদি অন্তরে অহংকার, লোকদেখানো মানসিকতা বা গুনাহের প্রতি উদাসীনতা থেকে যায়, তবে সেই কিয়াম কেবল নিদ্রাহীনতার কষ্টে পরিণত হয়।

এ হাদিস আমাদের আমলের গুণগত মান নিয়ে ভাবতে শেখায়। বাহ্যিক ইবাদতের আড়ালে অন্তর যেন শূন্য না থাকে। রোজা যেন আমাদের ভাষাকে সংযত করে, দৃষ্টি ও আচরণকে পবিত্র করে, অন্তরে আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা জাগ্রত করে।

তাহলেই রোজা ক্ষুধা নয়, হয়ে উঠবে রহমত; আর রাতের ইবাদত হবে নিছক জাগরণ নয়, বরং নূর ও নাজাতের পথ।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

রোজা ও কিয়ামুল লাইল যখন ফলহীন থেকে যায়

প্রকাশিত সময় : ১১:১৩:২০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬

রমজান আত্মশুদ্ধির মাস। এ মাসে রোজা ও কিয়ামুল লাইল শুধু আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়, বরং তা অন্তরের পরিবর্তন, চরিত্রের পরিশুদ্ধি ও তাকওয়া অর্জনের মাধ্যম। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সব ইবাদত সমান ফল বয়ে আনে না। ইবাদতের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে নিয়ত, খালিসত্ব ও আমলের শুদ্ধতার ওপর।

তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সতর্ক করেছেন; কেবল ক্ষুধার্ত থাকা বা রাত জাগলেই প্রকৃত সওয়াব পাওয়া যায় না। এই প্রেক্ষাপটে আবু হুরাইরাহ (রা.) বর্ণিত হাদিসটি গভীর তাৎপর্য বহন করে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم صلى الله عليه وسلم رُبَّ صَائِمٍ لَيْسَ لَهُ مِنْ صِيَامِهِ إِلَّا الْجُوعُ وَرُبَّ قَائِمٍ لَيْسَ لَهُ مِنْ قِيَامِهِ إِلَّا السَّهَرُ
আবু হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কত রোজাদার আছে যাদের রোজার বিনিময়ে ক্ষুধা ছাড়া আর কিছুই জোটে না। কত নামাজ আদায়কারী আছে যাদের রাত জাগরণ ছাড়া আর কিছুই জোটে না।

(ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৬৯০)
এই হাদিস আমাদের সামনে এক কঠিন সত্য তুলে ধরে। রোজা যদি মানুষকে মিথ্যা, গীবত, অন্যায় ও অসচ্চরিত্র থেকে বিরত রাখতে না পারে, তবে সে রোজা কেবল দেহের কষ্টে সীমাবদ্ধ থাকে। অন্য হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মন্দ কাজ পরিত্যাগ করে না, তার পানাহার ত্যাগ করার কোনো প্রয়োজন আল্লাহর নেই। অর্থাৎ রোজার উদ্দেশ্য কেবল উপবাস নয়, বরং আত্মসংযম ও নৈতিক সংশোধন।

একইভাবে রাতভর নামাজ আদায় করাও তখনই ফলপ্রসূ, যখন তা একনিষ্ঠতা, বিনয় ও আল্লাহভীতির সঙ্গে সম্পন্ন হয়। যদি অন্তরে অহংকার, লোকদেখানো মানসিকতা বা গুনাহের প্রতি উদাসীনতা থেকে যায়, তবে সেই কিয়াম কেবল নিদ্রাহীনতার কষ্টে পরিণত হয়।

এ হাদিস আমাদের আমলের গুণগত মান নিয়ে ভাবতে শেখায়। বাহ্যিক ইবাদতের আড়ালে অন্তর যেন শূন্য না থাকে। রোজা যেন আমাদের ভাষাকে সংযত করে, দৃষ্টি ও আচরণকে পবিত্র করে, অন্তরে আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা জাগ্রত করে।

তাহলেই রোজা ক্ষুধা নয়, হয়ে উঠবে রহমত; আর রাতের ইবাদত হবে নিছক জাগরণ নয়, বরং নূর ও নাজাতের পথ।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক