বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নবজাতকের মৃত্যুকে ঘিরে শেবাচিমে তুলকালাম

বরিশালের শের-এ-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নবজাতক শিশুর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্বজনদের সঙ্গে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের উত্তেজনাকর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় মৃত শিশুর মামাসহ দুজনকে মারধর ও আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে। পরে হাসপাতাল প্রশাসন, মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের হস্তক্ষেপে গভীর রাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

গতকাল মঙ্গলবার (১৯ মে) রাত ১০টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ডে এ উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ সময় মৃত শিশুর মরদেহ আটকে রাখার অভিযোগও ওঠে, যদিও এ বিষয়ে উভয়পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা গেছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার চাখার এলাকার বাসিন্দা উজ্জ্বল দের সাত দিনের কন্যাশিশু অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে শেবাচিম হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শিশুটির মৃত্যু হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, শিশুর মৃত্যুর পর স্বজনরা আবেগাপ্লুত হয়ে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ তোলেন। এ নিয়ে সাদা অ্যাপ্রোন পরা ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে তাদের বাকবিতণ্ডা শুরু হয়।

এক পর্যায়ে মেডিকেল কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী এসে মৃত শিশুর মামা জয়দেবকে মারধর করেন বলে অভিযোগ ওঠে। সেই ঘটনার ভিডিও ধারণ করতে গেলে মামুন নামে আরেক স্বজনও হামলার শিকার হন। পরে তাদের টেনে-হিঁচড়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের নিচতলার একটি কক্ষে আটকে রাখা হয় বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা।

যদিও মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থী শান্ত তালুকদার বলেন, আমাদের সকালে ও বিকেলে ওয়ার্ড থাকে এবং আইটেমও থাকে। আইটেম শেষ করে বের হওয়ার সময় মৃত শিশুর বাবা তার স্বজনদের আমাদের আটকে রাখতে বলেন। তাদের অভিযোগ ছিল ভুল চিকিৎসায় শিশুটির মৃত্যু হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের আটকানোর সময় মেয়ে শিক্ষার্থীদের অ্যাপ্রোন, ওড়না ও ব্যাগ টানাটানি করা হয়। এমনকি ওয়ার্ডে দায়িত্বরত নার্সদেরও হেনস্তা করা হয়েছে।

আরেক শিক্ষার্থী মুনয়াত মুন বলেন, নবজাতক ওয়ার্ডের পাশে আমাদের ক্লাসরুম ছিল। সেখান থেকে বের হওয়ার সময় হট্টগোল শুনতে পাই। এরপর একজন লোক আমাদের কারও হাত, কারও ওড়না কিংবা ব্যাগ ধরে টান দেন এবং অশোভন আচরণ করেন। আত্মরক্ষার্থে আমরা সেবিকাদের সহায়তায় একটি রুমে আশ্রয় নিই। পরে দুই ছেলে ব্যাচমেট তাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলে তাদের মোবাইলও ভাঙচুর করা হয়। এরপর ইউনিফর্ম লুকিয়ে সেখান থেকে বের হয়ে আসি।

অন্য দিকে মৃত শিশুর বাবা উজ্জ্বল দে জানান, সন্ধ্যার পর শিশুটির শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে তারা চিকিৎসকদের ডাকেন। ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা এসে শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করলে তার মামা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তখন তিনি চিকিৎসকদের ওয়ার্ড ছেড়ে যেতে নিষেধ করলে তাকে এবং আরেক ব্যক্তিকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

মৃত শিশুর মা পূজা রানী দাস কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, সন্তান মারা যাওয়ার পর তার মামা হয়তো কিছু বলেছে, কিন্তু কারও গায়ে হাত দেয়নি। তারপরও তাকে মারতে মারতে নিচে নিয়ে গেছে। যদি সে কোনো ভুল করে থাকে, আমি হাতজোড় করে ক্ষমা চাইছি। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত মৃত সন্তানকে নিয়ে বসে আছি। আমাদের যেতে দিন।

এ দিকে শিক্ষার্থীদের হাতে দুজন আটকে থাকার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান হাসপাতাল পরিচালক ও বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশের সদস্যরা। এ সময় শিক্ষার্থীরা আটক দুজনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন বাস্তবায়নের দাবিও জানান তারা।

পরে রাত দেড়টার দিকে মুচলেকা ও ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে মৃত শিশুর মামা জয়দেবকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

ঘটনা প্রসঙ্গে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার অলোক কান্তি শর্মা বলেন, ছাত্র ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে কথা কাটাকাটির সূত্র ধরে অনাকাঙ্ক্ষিত একটি ঘটনা ঘটেছে। যাদের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া যাবে, সে অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. একেএম মাশিউল মুনির বলেন, উভয়পক্ষের সঙ্গে বসে বিষয়টির সমাধান করা হয়েছে। আমরা চাই, শিক্ষার্থীরা যেন স্বাভাবিকভাবে ইউনিফর্ম পরে ক্যাম্পাসে চলাফেরা করতে পারে এবং রোগীরাও যথাযথ চিকিৎসা পায়। আমাদের নানা সমস্যা রয়েছে, ধীরে ধীরে সেগুলোর সমাধান করতে হবে এবং সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

নবজাতকের মৃত্যুকে ঘিরে শেবাচিমে তুলকালাম

প্রকাশিত সময় : ১০:৪১:২৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬
বরিশালের শের-এ-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নবজাতক শিশুর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্বজনদের সঙ্গে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের উত্তেজনাকর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় মৃত শিশুর মামাসহ দুজনকে মারধর ও আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে। পরে হাসপাতাল প্রশাসন, মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের হস্তক্ষেপে গভীর রাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

গতকাল মঙ্গলবার (১৯ মে) রাত ১০টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ডে এ উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ সময় মৃত শিশুর মরদেহ আটকে রাখার অভিযোগও ওঠে, যদিও এ বিষয়ে উভয়পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা গেছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার চাখার এলাকার বাসিন্দা উজ্জ্বল দের সাত দিনের কন্যাশিশু অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে শেবাচিম হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শিশুটির মৃত্যু হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, শিশুর মৃত্যুর পর স্বজনরা আবেগাপ্লুত হয়ে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ তোলেন। এ নিয়ে সাদা অ্যাপ্রোন পরা ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে তাদের বাকবিতণ্ডা শুরু হয়।

এক পর্যায়ে মেডিকেল কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী এসে মৃত শিশুর মামা জয়দেবকে মারধর করেন বলে অভিযোগ ওঠে। সেই ঘটনার ভিডিও ধারণ করতে গেলে মামুন নামে আরেক স্বজনও হামলার শিকার হন। পরে তাদের টেনে-হিঁচড়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের নিচতলার একটি কক্ষে আটকে রাখা হয় বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা।

যদিও মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থী শান্ত তালুকদার বলেন, আমাদের সকালে ও বিকেলে ওয়ার্ড থাকে এবং আইটেমও থাকে। আইটেম শেষ করে বের হওয়ার সময় মৃত শিশুর বাবা তার স্বজনদের আমাদের আটকে রাখতে বলেন। তাদের অভিযোগ ছিল ভুল চিকিৎসায় শিশুটির মৃত্যু হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের আটকানোর সময় মেয়ে শিক্ষার্থীদের অ্যাপ্রোন, ওড়না ও ব্যাগ টানাটানি করা হয়। এমনকি ওয়ার্ডে দায়িত্বরত নার্সদেরও হেনস্তা করা হয়েছে।

আরেক শিক্ষার্থী মুনয়াত মুন বলেন, নবজাতক ওয়ার্ডের পাশে আমাদের ক্লাসরুম ছিল। সেখান থেকে বের হওয়ার সময় হট্টগোল শুনতে পাই। এরপর একজন লোক আমাদের কারও হাত, কারও ওড়না কিংবা ব্যাগ ধরে টান দেন এবং অশোভন আচরণ করেন। আত্মরক্ষার্থে আমরা সেবিকাদের সহায়তায় একটি রুমে আশ্রয় নিই। পরে দুই ছেলে ব্যাচমেট তাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলে তাদের মোবাইলও ভাঙচুর করা হয়। এরপর ইউনিফর্ম লুকিয়ে সেখান থেকে বের হয়ে আসি।

অন্য দিকে মৃত শিশুর বাবা উজ্জ্বল দে জানান, সন্ধ্যার পর শিশুটির শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে তারা চিকিৎসকদের ডাকেন। ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা এসে শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করলে তার মামা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তখন তিনি চিকিৎসকদের ওয়ার্ড ছেড়ে যেতে নিষেধ করলে তাকে এবং আরেক ব্যক্তিকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

মৃত শিশুর মা পূজা রানী দাস কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, সন্তান মারা যাওয়ার পর তার মামা হয়তো কিছু বলেছে, কিন্তু কারও গায়ে হাত দেয়নি। তারপরও তাকে মারতে মারতে নিচে নিয়ে গেছে। যদি সে কোনো ভুল করে থাকে, আমি হাতজোড় করে ক্ষমা চাইছি। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত মৃত সন্তানকে নিয়ে বসে আছি। আমাদের যেতে দিন।

এ দিকে শিক্ষার্থীদের হাতে দুজন আটকে থাকার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান হাসপাতাল পরিচালক ও বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশের সদস্যরা। এ সময় শিক্ষার্থীরা আটক দুজনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন বাস্তবায়নের দাবিও জানান তারা।

পরে রাত দেড়টার দিকে মুচলেকা ও ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে মৃত শিশুর মামা জয়দেবকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

ঘটনা প্রসঙ্গে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার অলোক কান্তি শর্মা বলেন, ছাত্র ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে কথা কাটাকাটির সূত্র ধরে অনাকাঙ্ক্ষিত একটি ঘটনা ঘটেছে। যাদের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া যাবে, সে অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. একেএম মাশিউল মুনির বলেন, উভয়পক্ষের সঙ্গে বসে বিষয়টির সমাধান করা হয়েছে। আমরা চাই, শিক্ষার্থীরা যেন স্বাভাবিকভাবে ইউনিফর্ম পরে ক্যাম্পাসে চলাফেরা করতে পারে এবং রোগীরাও যথাযথ চিকিৎসা পায়। আমাদের নানা সমস্যা রয়েছে, ধীরে ধীরে সেগুলোর সমাধান করতে হবে এবং সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে।