শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্মৃতির পথে ফিরে দেখা: সিরাজগঞ্জের শৈশবের ঠিকানাগুলো

ষষ্ঠ পর্ব : ফিরে যাওয়া যায় না, তবু ফিরে যাই
সময়ের সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো, সে কখনো কাউকে পেছনে ফিরিয়ে নিয়ে যায় না, অথচ মানুষ সারাজীবন ফিরে বেড়ায় তার ফেলে আসা দিনগুলোর কাছে। আমিও ফিরি। কোনো নির্দিষ্ট বাড়ি, কোনো গাছ কিংবা কোনো পথের কাছে নয়। ফিরে যাই এক টুকরো সময়ের কাছে, যখন স্বপ্ন ছিল সীমাহীন, মানুষের প্রতি বিশ্বাস ছিল সহজ, আর পৃথিবীকে চিনতাম বিস্ময়ের চোখে।
আজ সিরাজগঞ্জ নিশ্চয়ই অনেক বদলে গেছে। বদলে গেছে তার পথঘাট, পরিচিত দৃশ্য, হয়তো অনেক প্রিয় মুখও। সময় তার নিয়মেই সবকিছুকে নতুন করে লিখেছে। কিন্তু স্মৃতির নিজস্ব একটি জগৎ আছে, সেখানে সময়ের কোনো কর্তৃত্ব নেই। সেখানে মানুষ হারিয়ে যায় না, সম্পর্কের রং ফিকে হয় না, ভালোবাসা পুরোনো হয় না।
আমার জীবনের বড় সৌভাগ্য, ছোটবেলাতেই এমন কিছু মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছিলাম, যাঁরা নিজেদের অজান্তেই আমার ভবিষ্যতের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন। মাহবুব ভাই আমাকে শুধু গান শেখাননি, শিখিয়েছেন অনুভব করতে। তিনি বলতেন না, “ভালো গাও”। তিনি শিখিয়েছেন, মন দিয়ে গাও। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। তবু কিছু মানুষ মৃত্যুর পরও থেকে যান, তাঁদের কণ্ঠে নয়, তাঁদের স্পর্শে। তাঁদের উপস্থিতিতে নয়, তাঁদের রেখে যাওয়া আলোয়। আমার ভেতরেও মাহবুব ভাই তেমনই বেঁচে আছেন।
বাবু মামা বুঝিয়েছেন, মঞ্চে ওঠার আগে মানুষ হতে হয়। নজরুল ভাই, ক্ষিতিশ দা, সোহেল ভাই, পান্না ভাই, আমার বড় ভাই বিদ্যুৎ ভাই, প্রত্যেকেই তাঁদের নিজস্ব আলো দিয়ে আমাদের বেড়ে ওঠার পথটুকু আলোকিত করেছেন। তখন বুঝিনি, আজ বুঝি একজন বড় মানুষের একটি আন্তরিক বাক্য, একটি ছোট্ট উৎসাহ কিংবা একটি বিশ্বাসও একটি শিশুর জীবন বদলে দিতে পারে।
আর (সুব্রত বসাক) দুলাল দা… তাঁর কথা আলাদা করেই বলতে হয়। তিনিই প্রথম আমার ভেতরের লেখকটিকে চিনেছিলেন। আমার ছোট্ট কবিতাটি দেয়ালিকায় প্রকাশ করে তিনি শুধু একটি লেখা ছাপেননি, জন্ম দিয়েছিলেন আত্মবিশ্বাসের। আজও নতুন কিছু লিখলে তাঁর কথাই মনে পড়ে। তিনি এখনো পড়েন, মতামত দেন, উৎসাহ দেন। কিছু সম্পর্কের সৌন্দর্য এখানেই—সময় তাদের পুরোনো করে না, আরও গভীর করে।
এই ছয়টি পর্ব লিখতে গিয়ে একটি সত্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, কোনো মানুষকে একা কোনো স্থান বা ব্যাক্তি গড়ে তোলে না। একটি শহর, কিছু পথ, কয়েকটি বিকেল, কিছু বই, কিছু গান আর কিছু মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা মিলেই একজন মানুষের ভেতরের পৃথিবী গড়ে ওঠে। আমার জীবনও তারই একটি ছোট্ট উদাহরণ। আজ নিজের দিকে ফিরে তাকালে বুঝি, শৈশব আসলে কোনো বয়সের নাম নয়, এটি আমাদের চরিত্রের প্রথম ভিত্তি। আমরা পরে যত দূরেই যাই, যত বড়ই হই না কেন, আমাদের মানবিকতার অনেকটাই জন্ম নেয় সেই প্রথম দিনগুলোর ভেতরেই।
এই লেখাগুলো পড়ে যদি আপনিও এক মুহূর্তের জন্য আপনার নিজের শৈশবের কোনো মানুষ, কোনো বিকেল কিংবা কোনো প্রিয় স্মৃতির কাছে ফিরে যেতে পারেন, তবে আমার এই দীর্ঘ স্মৃতিযাত্রা সার্থক হবে।
আমার জীবনের গল্প শুধু সিরাজগঞ্জে শেষ হয় না। শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্যের সবচেয়ে মূল্যবান সময় কেটেছে তিনটি শহরে সিরাজগঞ্জ, পাবনা এবং রাজশাহীতে। এই ছয়টি পর্বে তুলে ধরলাম সিরাজগঞ্জের সেই দুটি বছর, যে দুটি বছর জীবনকে প্রথম ভিত্তি দিয়েছিল। এখন কিছুদিন বিরতি নিয়ে লিখব উল্লাপাড়ায় লায়ন্স ক্লাব অব ঢাকা রোজ গার্ডেনের সেবা কার্যক্রমের নানা অজানা গল্প, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গল্প, ভালোবাসা ভাগ করে নেওয়ার গল্প এবং মানবতার গল্প। সেই ধারাবাহিক শেষ হলে আবার ফিরে আসব স্মৃতির পথে। লিখব পাবনার কথা, যে শহর আমাকে কৈশোরের স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে, যেখান থেকে আমি এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি, যেখানে বন্ধুত্ব, সংগ্রাম, শিক্ষা আর বেড়ে ওঠার অসংখ্য স্মৃতি আজও হৃদয়ের ভেতর অমলিন। তারপর আসবে রাজশাহীর গল্প – তারুণ্যের দিনগুলো, নতুন স্বপ্ন আর নিজেকে আবিষ্কারের গল্প।
আপনারা যেমন সিরাজগঞ্জের এই যাত্রায় আমার সঙ্গী ছিলেন, তেমনি আগামী পথচলাতেও পাশে থাকবেন এই বিশ্বাস নিয়েই এগিয়ে যেতে চাই। এই ধারাবাহিকের প্রতিটি পর্বে আপনাদের মন্তব্য, ভালোবাসা, সমালোচনা এবং উৎসাহ আমাকে নতুন করে লিখতে শিখিয়েছে। একজন লেখকের কাছে পাঠকের আন্তরিক সাড়া সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সেই ভালোবাসা আমি গভীর কৃতজ্ঞতায় হৃদয়ে ধারণ করে রাখব।
শেষ করার আগে শুধু একটি কথাই বলতে চাই আমরা সবাই বড় হই। কিন্তু বড় হতে হতে যেন আমাদের ভেতরের ছোট্ট শিশুটিকে হারিয়ে না ফেলি। কারণ সেই শিশুটিই আমাদের ক্ষমা করতে শেখায়, ভালোবাসতে শেখায় এবং মানুষ হয়ে বাঁচতে শেখায়। আমাদের অতীতে ফিরে যাওয়া আর কোনো দিন সম্ভব নয়। কিন্তু শৈশবে যে মানুষটি একদিন আমাদের ভেতরে জন্ম নিয়েছিল, সে যদি বেঁচে থাকে, তবে শৈশবও বেঁচে থাকে। আর হৃদয়ে যদি কৃতজ্ঞতা থাকে, তবে কোনো সুন্দর সময়ই সত্যিকার অর্থে হারিয়ে যায় না।

লেখক : মাহবুব সিদ্দিকী

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

স্মৃতির পথে ফিরে দেখা: সিরাজগঞ্জের শৈশবের ঠিকানাগুলো

প্রকাশিত সময় : ০৫:২৮:০৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ষষ্ঠ পর্ব : ফিরে যাওয়া যায় না, তবু ফিরে যাই
সময়ের সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো, সে কখনো কাউকে পেছনে ফিরিয়ে নিয়ে যায় না, অথচ মানুষ সারাজীবন ফিরে বেড়ায় তার ফেলে আসা দিনগুলোর কাছে। আমিও ফিরি। কোনো নির্দিষ্ট বাড়ি, কোনো গাছ কিংবা কোনো পথের কাছে নয়। ফিরে যাই এক টুকরো সময়ের কাছে, যখন স্বপ্ন ছিল সীমাহীন, মানুষের প্রতি বিশ্বাস ছিল সহজ, আর পৃথিবীকে চিনতাম বিস্ময়ের চোখে।
আজ সিরাজগঞ্জ নিশ্চয়ই অনেক বদলে গেছে। বদলে গেছে তার পথঘাট, পরিচিত দৃশ্য, হয়তো অনেক প্রিয় মুখও। সময় তার নিয়মেই সবকিছুকে নতুন করে লিখেছে। কিন্তু স্মৃতির নিজস্ব একটি জগৎ আছে, সেখানে সময়ের কোনো কর্তৃত্ব নেই। সেখানে মানুষ হারিয়ে যায় না, সম্পর্কের রং ফিকে হয় না, ভালোবাসা পুরোনো হয় না।
আমার জীবনের বড় সৌভাগ্য, ছোটবেলাতেই এমন কিছু মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছিলাম, যাঁরা নিজেদের অজান্তেই আমার ভবিষ্যতের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন। মাহবুব ভাই আমাকে শুধু গান শেখাননি, শিখিয়েছেন অনুভব করতে। তিনি বলতেন না, “ভালো গাও”। তিনি শিখিয়েছেন, মন দিয়ে গাও। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। তবু কিছু মানুষ মৃত্যুর পরও থেকে যান, তাঁদের কণ্ঠে নয়, তাঁদের স্পর্শে। তাঁদের উপস্থিতিতে নয়, তাঁদের রেখে যাওয়া আলোয়। আমার ভেতরেও মাহবুব ভাই তেমনই বেঁচে আছেন।
বাবু মামা বুঝিয়েছেন, মঞ্চে ওঠার আগে মানুষ হতে হয়। নজরুল ভাই, ক্ষিতিশ দা, সোহেল ভাই, পান্না ভাই, আমার বড় ভাই বিদ্যুৎ ভাই, প্রত্যেকেই তাঁদের নিজস্ব আলো দিয়ে আমাদের বেড়ে ওঠার পথটুকু আলোকিত করেছেন। তখন বুঝিনি, আজ বুঝি একজন বড় মানুষের একটি আন্তরিক বাক্য, একটি ছোট্ট উৎসাহ কিংবা একটি বিশ্বাসও একটি শিশুর জীবন বদলে দিতে পারে।
আর (সুব্রত বসাক) দুলাল দা… তাঁর কথা আলাদা করেই বলতে হয়। তিনিই প্রথম আমার ভেতরের লেখকটিকে চিনেছিলেন। আমার ছোট্ট কবিতাটি দেয়ালিকায় প্রকাশ করে তিনি শুধু একটি লেখা ছাপেননি, জন্ম দিয়েছিলেন আত্মবিশ্বাসের। আজও নতুন কিছু লিখলে তাঁর কথাই মনে পড়ে। তিনি এখনো পড়েন, মতামত দেন, উৎসাহ দেন। কিছু সম্পর্কের সৌন্দর্য এখানেই—সময় তাদের পুরোনো করে না, আরও গভীর করে।
এই ছয়টি পর্ব লিখতে গিয়ে একটি সত্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, কোনো মানুষকে একা কোনো স্থান বা ব্যাক্তি গড়ে তোলে না। একটি শহর, কিছু পথ, কয়েকটি বিকেল, কিছু বই, কিছু গান আর কিছু মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা মিলেই একজন মানুষের ভেতরের পৃথিবী গড়ে ওঠে। আমার জীবনও তারই একটি ছোট্ট উদাহরণ। আজ নিজের দিকে ফিরে তাকালে বুঝি, শৈশব আসলে কোনো বয়সের নাম নয়, এটি আমাদের চরিত্রের প্রথম ভিত্তি। আমরা পরে যত দূরেই যাই, যত বড়ই হই না কেন, আমাদের মানবিকতার অনেকটাই জন্ম নেয় সেই প্রথম দিনগুলোর ভেতরেই।
এই লেখাগুলো পড়ে যদি আপনিও এক মুহূর্তের জন্য আপনার নিজের শৈশবের কোনো মানুষ, কোনো বিকেল কিংবা কোনো প্রিয় স্মৃতির কাছে ফিরে যেতে পারেন, তবে আমার এই দীর্ঘ স্মৃতিযাত্রা সার্থক হবে।
আমার জীবনের গল্প শুধু সিরাজগঞ্জে শেষ হয় না। শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্যের সবচেয়ে মূল্যবান সময় কেটেছে তিনটি শহরে সিরাজগঞ্জ, পাবনা এবং রাজশাহীতে। এই ছয়টি পর্বে তুলে ধরলাম সিরাজগঞ্জের সেই দুটি বছর, যে দুটি বছর জীবনকে প্রথম ভিত্তি দিয়েছিল। এখন কিছুদিন বিরতি নিয়ে লিখব উল্লাপাড়ায় লায়ন্স ক্লাব অব ঢাকা রোজ গার্ডেনের সেবা কার্যক্রমের নানা অজানা গল্প, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গল্প, ভালোবাসা ভাগ করে নেওয়ার গল্প এবং মানবতার গল্প। সেই ধারাবাহিক শেষ হলে আবার ফিরে আসব স্মৃতির পথে। লিখব পাবনার কথা, যে শহর আমাকে কৈশোরের স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে, যেখান থেকে আমি এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি, যেখানে বন্ধুত্ব, সংগ্রাম, শিক্ষা আর বেড়ে ওঠার অসংখ্য স্মৃতি আজও হৃদয়ের ভেতর অমলিন। তারপর আসবে রাজশাহীর গল্প – তারুণ্যের দিনগুলো, নতুন স্বপ্ন আর নিজেকে আবিষ্কারের গল্প।
আপনারা যেমন সিরাজগঞ্জের এই যাত্রায় আমার সঙ্গী ছিলেন, তেমনি আগামী পথচলাতেও পাশে থাকবেন এই বিশ্বাস নিয়েই এগিয়ে যেতে চাই। এই ধারাবাহিকের প্রতিটি পর্বে আপনাদের মন্তব্য, ভালোবাসা, সমালোচনা এবং উৎসাহ আমাকে নতুন করে লিখতে শিখিয়েছে। একজন লেখকের কাছে পাঠকের আন্তরিক সাড়া সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সেই ভালোবাসা আমি গভীর কৃতজ্ঞতায় হৃদয়ে ধারণ করে রাখব।
শেষ করার আগে শুধু একটি কথাই বলতে চাই আমরা সবাই বড় হই। কিন্তু বড় হতে হতে যেন আমাদের ভেতরের ছোট্ট শিশুটিকে হারিয়ে না ফেলি। কারণ সেই শিশুটিই আমাদের ক্ষমা করতে শেখায়, ভালোবাসতে শেখায় এবং মানুষ হয়ে বাঁচতে শেখায়। আমাদের অতীতে ফিরে যাওয়া আর কোনো দিন সম্ভব নয়। কিন্তু শৈশবে যে মানুষটি একদিন আমাদের ভেতরে জন্ম নিয়েছিল, সে যদি বেঁচে থাকে, তবে শৈশবও বেঁচে থাকে। আর হৃদয়ে যদি কৃতজ্ঞতা থাকে, তবে কোনো সুন্দর সময়ই সত্যিকার অর্থে হারিয়ে যায় না।

লেখক : মাহবুব সিদ্দিকী