শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জার্মানিতে পড়তে গিয়ে আবাসনসংকটে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা

জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নতুন করে ভোগাচ্ছে আবাসনসংকট। বাড়তি ভাড়া দিতে রাজি থাকলেও অনেক শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় চেষ্টা করে বাসা পাচ্ছেন না।

ফলে নতুন আসা শিক্ষার্থীদের কেউ হোস্টেলে, আবার কেউ পরিচিতজনের বাসায় অস্থায়ীভাবে অবস্থান করছেন। বাসার বৈধ ঠিকানা না থাকায় শুধু থাকার সমস্যাই নয়, আটকে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজও।

বিশেষ করে সিটি রেজিস্ট্রেশন, ব্যাংক হিসাবসহ প্রয়োজনীয় কিছু প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছেন নতুন শিক্ষার্থীরা। বাংলাদেশ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে জার্মানিতে পড়াশোনার জন্য যাওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী তাদের এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

কেউ কয়েক সপ্তাহ ধরে বাসা খুঁজছেন, আবার কেউ একাধিক বাসা দেখার পরও শেষ পর্যন্ত চুক্তি করতে পারছেন না। শিক্ষার্থীরা জানান, বাড়তি ভাড়া ও জামানতের পাশাপাশি বাসা পাওয়ার জন্য তীব্র প্রতিযোগিতাও পরিস্থিতিকে কঠিন করে তুলেছে।

৬০০-৭০০ ইউরোর বাসার জন্যও প্রতিযোগিতা

হামবুর্গে পড়াশোনা করতে যাওয়া নরসিংদীর ইমামুল ইসলাম ইমন জানান, জার্মানিতে এসে আবাসন পাওয়া যে এত কঠিন হবে, তা আগে ধারণা করেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপে এ বিষয়ে জানতে পারলেও নিজের অভিজ্ঞতার পর সমস্যাটির বাস্তবতা বুঝতে পারছেন তিনি।

তিনি আরও জানান, ছোট আকারের একটি বাসার জন্যও মাসে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ ইউরো ভাড়া গুনতে হতে পারে। এর পাশাপাশি প্রায় এক হাজার ৫শ  ইউরো পর্যন্ত জামানতও চাওয়া হচ্ছে। বাসার বৈধ ঠিকানা না থাকায় নিজের অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সমস্যায় পড়েছেন তিনি।

মিউনিখে ‘সোনার হরিণ’ বাসা

মিউনিখে মাস্টার্স করতে যাওয়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী নাজিবা রওশনও আবাসনসংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। আপাতত বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিত এক শিক্ষার্থীর কক্ষে অবস্থান করছেন তিনি।

নাজিবা বলেন, মিউনিখে বাসা খোঁজা অনেকটা সোনার হরিণের পেছনে ছোটা। কবে নিজের থাকার মতো একটি বাসা পাওয়া যাবে, সেটি নিশ্চিত নয়। বাসা না থাকার কারণে তাঁর বেশ কিছু প্রয়োজনীয় কাজও আটকে আছে। নতুন শিক্ষার্থীদের জার্মানিতে যাওয়ার আগে সম্ভব হলে থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

বাড়ছে শিক্ষার্থীদের আবাসন ব্যয়

শিক্ষার্থীদের আবাসন পরিস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জার্মানির বিভিন্ন শহরে ভাড়া বৃদ্ধির চিত্র উঠে এসেছে।  প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে শিক্ষার্থীদের আবাসনের ভাড়া আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় গড়ে ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে।

ছোট বাসাগুলোর ক্ষেত্রে ভাড়া বৃদ্ধির হার আরও বেশি। ৪০ বর্গমিটারের কম আয়তনের বাসার ভাড়া বেড়েছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। আর শেয়ার্ড ফ্ল্যাট বা যৌথভাবে বসবাসের ব্যবস্থার ভাড়া বেড়েছে ২ দশমিক ৩ শতাংশ।

সবচেয়ে ব্যয়বহুল মিউনিখ

শিক্ষার্থীদের আবাসনের ক্ষেত্রে জার্মানির সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহরগুলোর একটি মিউনিখ। সেখানে প্রায় ৩০ বর্গমিটারের একটি বাসার মাসিক ভাড়া প্রায় ৮৮০ ইউরো।

বার্লিন, ফ্রাঙ্কফুর্ট ও কোলনেও শিক্ষার্থীদের আবাসনের খরচ তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে হামবুর্গ ও হাইডেলবার্গে একই ধরনের বাসার মাসিক ভাড়া প্রায় ৭০০ থেকে ৭২০ ইউরোর মধ্যে।

শুধু বড় শহরগুলোতেই যে আবাসনসংকট সীমাবদ্ধ, তা নয়। তুলনামূলক কম ভাড়ার শহর কেমনিতসেও শিক্ষার্থীদের আবাসনের চাহিদা বাড়ছে। ফলে শহরভেদে ভাড়ার পার্থক্য থাকলেও বাসা খুঁজতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে।

বাসা না থাকলে আটকে যায় গুরুত্বপূর্ণ কাজ

জার্মানির কমিউনিটি সংগঠক এনআরবি জার্মানির সভাপতি আনোয়ার হোসাইন বলেন, দেশটিতে পৌঁছানোর পর শিক্ষার্থীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো স্থানীয় ঠিকানায় সিটি রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করা। কিন্তু বৈধ ভাড়ার চুক্তি বা গ্রহণযোগ্য ঠিকানা না থাকলে এই প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে ব্যাংক হিসাব পরিচালনা, ব্লক অ্যাকাউন্টের অর্থ ব্যবহারসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে।

আনোয়ার হোসাইন বলেন, আবাসনসংকট এখন শুধু বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সমস্যা নয়, জার্মানিতে আসা বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরাই এর মুখোমুখি হচ্ছেন। তাই বিদেশ থেকে যাওয়ার আগে আবাসনের বাড়তি ব্যয় ও বাসা পাওয়ার অনিশ্চয়তাকে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।

জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিতে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে তাই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও ভিসার পাশাপাশি বাসস্থানের ব্যবস্থা করাও বড় প্রস্তুতির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জার্মানিতে পড়তে গিয়ে আবাসনসংকটে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা

প্রকাশিত সময় : ০৯:৩৮:০৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নতুন করে ভোগাচ্ছে আবাসনসংকট। বাড়তি ভাড়া দিতে রাজি থাকলেও অনেক শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় চেষ্টা করে বাসা পাচ্ছেন না।

ফলে নতুন আসা শিক্ষার্থীদের কেউ হোস্টেলে, আবার কেউ পরিচিতজনের বাসায় অস্থায়ীভাবে অবস্থান করছেন। বাসার বৈধ ঠিকানা না থাকায় শুধু থাকার সমস্যাই নয়, আটকে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজও।

বিশেষ করে সিটি রেজিস্ট্রেশন, ব্যাংক হিসাবসহ প্রয়োজনীয় কিছু প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছেন নতুন শিক্ষার্থীরা। বাংলাদেশ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে জার্মানিতে পড়াশোনার জন্য যাওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী তাদের এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

কেউ কয়েক সপ্তাহ ধরে বাসা খুঁজছেন, আবার কেউ একাধিক বাসা দেখার পরও শেষ পর্যন্ত চুক্তি করতে পারছেন না। শিক্ষার্থীরা জানান, বাড়তি ভাড়া ও জামানতের পাশাপাশি বাসা পাওয়ার জন্য তীব্র প্রতিযোগিতাও পরিস্থিতিকে কঠিন করে তুলেছে।

৬০০-৭০০ ইউরোর বাসার জন্যও প্রতিযোগিতা

হামবুর্গে পড়াশোনা করতে যাওয়া নরসিংদীর ইমামুল ইসলাম ইমন জানান, জার্মানিতে এসে আবাসন পাওয়া যে এত কঠিন হবে, তা আগে ধারণা করেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপে এ বিষয়ে জানতে পারলেও নিজের অভিজ্ঞতার পর সমস্যাটির বাস্তবতা বুঝতে পারছেন তিনি।

তিনি আরও জানান, ছোট আকারের একটি বাসার জন্যও মাসে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ ইউরো ভাড়া গুনতে হতে পারে। এর পাশাপাশি প্রায় এক হাজার ৫শ  ইউরো পর্যন্ত জামানতও চাওয়া হচ্ছে। বাসার বৈধ ঠিকানা না থাকায় নিজের অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সমস্যায় পড়েছেন তিনি।

মিউনিখে ‘সোনার হরিণ’ বাসা

মিউনিখে মাস্টার্স করতে যাওয়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী নাজিবা রওশনও আবাসনসংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। আপাতত বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিত এক শিক্ষার্থীর কক্ষে অবস্থান করছেন তিনি।

নাজিবা বলেন, মিউনিখে বাসা খোঁজা অনেকটা সোনার হরিণের পেছনে ছোটা। কবে নিজের থাকার মতো একটি বাসা পাওয়া যাবে, সেটি নিশ্চিত নয়। বাসা না থাকার কারণে তাঁর বেশ কিছু প্রয়োজনীয় কাজও আটকে আছে। নতুন শিক্ষার্থীদের জার্মানিতে যাওয়ার আগে সম্ভব হলে থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

বাড়ছে শিক্ষার্থীদের আবাসন ব্যয়

শিক্ষার্থীদের আবাসন পরিস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জার্মানির বিভিন্ন শহরে ভাড়া বৃদ্ধির চিত্র উঠে এসেছে।  প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে শিক্ষার্থীদের আবাসনের ভাড়া আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় গড়ে ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে।

ছোট বাসাগুলোর ক্ষেত্রে ভাড়া বৃদ্ধির হার আরও বেশি। ৪০ বর্গমিটারের কম আয়তনের বাসার ভাড়া বেড়েছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। আর শেয়ার্ড ফ্ল্যাট বা যৌথভাবে বসবাসের ব্যবস্থার ভাড়া বেড়েছে ২ দশমিক ৩ শতাংশ।

সবচেয়ে ব্যয়বহুল মিউনিখ

শিক্ষার্থীদের আবাসনের ক্ষেত্রে জার্মানির সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহরগুলোর একটি মিউনিখ। সেখানে প্রায় ৩০ বর্গমিটারের একটি বাসার মাসিক ভাড়া প্রায় ৮৮০ ইউরো।

বার্লিন, ফ্রাঙ্কফুর্ট ও কোলনেও শিক্ষার্থীদের আবাসনের খরচ তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে হামবুর্গ ও হাইডেলবার্গে একই ধরনের বাসার মাসিক ভাড়া প্রায় ৭০০ থেকে ৭২০ ইউরোর মধ্যে।

শুধু বড় শহরগুলোতেই যে আবাসনসংকট সীমাবদ্ধ, তা নয়। তুলনামূলক কম ভাড়ার শহর কেমনিতসেও শিক্ষার্থীদের আবাসনের চাহিদা বাড়ছে। ফলে শহরভেদে ভাড়ার পার্থক্য থাকলেও বাসা খুঁজতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে।

বাসা না থাকলে আটকে যায় গুরুত্বপূর্ণ কাজ

জার্মানির কমিউনিটি সংগঠক এনআরবি জার্মানির সভাপতি আনোয়ার হোসাইন বলেন, দেশটিতে পৌঁছানোর পর শিক্ষার্থীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো স্থানীয় ঠিকানায় সিটি রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করা। কিন্তু বৈধ ভাড়ার চুক্তি বা গ্রহণযোগ্য ঠিকানা না থাকলে এই প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে ব্যাংক হিসাব পরিচালনা, ব্লক অ্যাকাউন্টের অর্থ ব্যবহারসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে।

আনোয়ার হোসাইন বলেন, আবাসনসংকট এখন শুধু বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সমস্যা নয়, জার্মানিতে আসা বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরাই এর মুখোমুখি হচ্ছেন। তাই বিদেশ থেকে যাওয়ার আগে আবাসনের বাড়তি ব্যয় ও বাসা পাওয়ার অনিশ্চয়তাকে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।

জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিতে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে তাই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও ভিসার পাশাপাশি বাসস্থানের ব্যবস্থা করাও বড় প্রস্তুতির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।