শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আফগান নারীদের না বলা দুঃখগাথা

আমার কলম হলো পাখির ডানা; এটি আপনাদের এমন কিছু বলবে যা চিন্তা করাও বারণ, এমন কিছু স্বপ্নের কথা বলবে, যার অনুমোদন নেই।’ এই কথাগুলো সম্মিলিত আফগান নারীদের কণ্ঠস্বর। তাদের লেখা ডায়েরি যুক্তরাজ্যের একটি ওয়েবসাইটে গল্প আকারে প্রকাশ হয়েছে। প্রকাশ হয়েছে বই আকারেও। সেখানে উঠে এসেছে তার না বলা চাপাকষ্টের কথা। গতকাল এ নিয়ে সংবাদমাধ্যম বিবিসি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

২০২১ সালের আগস্ট মাসে তালেবানরা ক্ষমতায় ফিরে আসে। এই সময়ের মধ্যে ১৮ জন আফগান নারী তাদের সত্যিকারের গল্প লেখে যা চলতি বছর শুরুর দিকে বই আকারে প্রকাশ হয়। বইটির নামও রাখা হয়েছে ‘আমার কলম হলো পাখির ডানা’। এই লেখকদের গোপনীয়তা রক্ষা করে চলতে হচ্ছে। গতকালের প্রতিবেদনে প্যারেন্দা ও সাদাফের (ছদ্মনাম) কথা উঠে এসেছে যা আসলে লাখো আফগান নারীরও গল্প।

গোলাপি স্কার্ফ পরা কি পাপ?

প্যারেন্দার পছন্দ গোলাপি রঙ। কিন্তু এখানে নারীদের পছন্দ অনুযায়ী পোশাক পরা রীতিমতো যুদ্ধের শামিল। কেননা তালেবানর জোরপূর্বক কঠোর নির্দেশনা চাপিয়ে দিয়েছে। এটি এই সমাজের প্রচলিত প্রথা, আফগান নারীরা স্কার্ফের বিরুদ্ধে লড়াই করছে না। কেউ কেউ নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী বাছাই করতে চাইছে। আপনি রাস্তায় দেখবেন, কেউ কেউ গোলাপি স্কার্ফ পরছে, কেউবা ডোরাকাটা পরছে কিন্তু গোলাপি স্কার্ফ পরা কি পাপ?

আমরা পেছনে যেতে পারি না

পেছনের দিকে যাত্রা করা মোটেও সহজ না কিন্তু সামনের দিকে যাওয়াও বেশ কঠিন। আমাদের উচিত আশান্বিত হওয়া অথবা না? আমরা পেছনের দিকে যেতে পারি না। এই কথাগুলো লিখেছেন কবি হাফিজউল্লাহ হামিম।

আফগান নারীরা এখন কাবুলের রাস্তায় বিক্ষোভ করছে। অন্য শহরেও ছোট আকারে হলেও সাহসী জনতা রাস্তায় নামছে। তাদের দাবি একটাই ‘রুটি-কাজ আর স্বাধীনতা’। কিন্তু তাদের ওপর নেমে এসেছে নির্যাতন, তাদের আটক করা হয়েছে। অনেকেই নিখোঁজ হয়েছেন। সীমান্তের ওপারে ইরানের নারীরা হিজাবের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছে। আফগান নারীদের উচিত নিজেদের অধিকার রক্ষায় আরও শিক্ষিত হওয়া।

ভয় যখন ক্ষোভে পরিণত হয়

তালেবানের একজন নিরাপত্তারক্ষী আমাদের গাড়ি থামিয়েছে; সে আমার দিকে বন্দুক তাক করেছে… আমার হৃদস্পন্দনের গতি বাড়ছিল, শরীর হিম হয়ে আসছিল। সেই সময় মনে হচ্ছিল, একটা বাতাস আমার ওপর দিয়ে বইছে, যখন আমাদের গাড়ি সরে গেল তখন সেই বাতাস অন্যদিকে চলে গেছে। সেই সময় আমার ভয় রাগে পরিণত হয়েছে।

কিছু তালেবানরক্ষী আক্রমণাত্মক আবার কারও কারও আচরণ গ্রহণযোগ্য। কিন্তু নারীদের জন্য যাতায়াত অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা ৭২ কিমির বেশি যাত্রা করলেই একজন পুরুষ সঙ্গী বাধ্যতামূলক নিতে হবে। তালেবানরা এমন কিছু আইন চালু করেছে যার মাধ্যমে নারীদের ঘরে ফেরত পাঠানো যায়।

১৩তে বিয়ে

‘পাশের বাসার মেয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে। তার বয়স মাত্র ১৩। তার মা বলেছে, তালেবানরা কখনোই স্কুল খুলবে না। তাকে তাদের ভাগ্যের কাছে তুলে দিলাম।’ এটি বেদনাদায়ক পুনরাবৃত্তি। আফগান নারীরা এখনো তালেবানের ৯০ দশকের দুঃখের কথা স্মরণ করেন। সেই সময় অনেক নারীর শিক্ষা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। লেখক প্যারান্দাও তাদের একজন। নতুন প্রজন্মের স্কুলছাত্রীরা স্বপ্ন নিয়ে বড় হচ্ছে কিন্তু তাদের স্কুলও বন্ধ করা হয়েছে।

নারীর বিরুদ্ধে ভাষা

‘আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করি কিন্তু এখন আমি ঠোঁটে তালা দিয়েছি। আমি আমার সমাজ নিয়ে হতাশ। পুরুষরা নারীদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করছে। আমি বিশ^াস করি আফগান নারীদের সমস্যার মূল সরকার নয়, যারা কিনা নতুন নিয়ম বেঁধে দিয়েছে। এই সমস্যার মূলে রয়েছে নারীদের নিয়ে পুরুষের চিন্তাপদ্ধতি।

সুদিন আসবেই

এখন কী হচ্ছে অবশ্যই আমি তা লিখব। এখানে প্রকাশের মাধ্যম অল্প কিন্তু আমি বিশ^াস করি একদিন আফগানিস্তান নারীদের জন্য একটি সুন্দর দেশ হবে। তা হতে সময় লাগবে কিন্তু হবেই।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

আফগান নারীদের না বলা দুঃখগাথা

প্রকাশিত সময় : ১১:১৭:৩৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ ডিসেম্বর ২০২২

আমার কলম হলো পাখির ডানা; এটি আপনাদের এমন কিছু বলবে যা চিন্তা করাও বারণ, এমন কিছু স্বপ্নের কথা বলবে, যার অনুমোদন নেই।’ এই কথাগুলো সম্মিলিত আফগান নারীদের কণ্ঠস্বর। তাদের লেখা ডায়েরি যুক্তরাজ্যের একটি ওয়েবসাইটে গল্প আকারে প্রকাশ হয়েছে। প্রকাশ হয়েছে বই আকারেও। সেখানে উঠে এসেছে তার না বলা চাপাকষ্টের কথা। গতকাল এ নিয়ে সংবাদমাধ্যম বিবিসি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

২০২১ সালের আগস্ট মাসে তালেবানরা ক্ষমতায় ফিরে আসে। এই সময়ের মধ্যে ১৮ জন আফগান নারী তাদের সত্যিকারের গল্প লেখে যা চলতি বছর শুরুর দিকে বই আকারে প্রকাশ হয়। বইটির নামও রাখা হয়েছে ‘আমার কলম হলো পাখির ডানা’। এই লেখকদের গোপনীয়তা রক্ষা করে চলতে হচ্ছে। গতকালের প্রতিবেদনে প্যারেন্দা ও সাদাফের (ছদ্মনাম) কথা উঠে এসেছে যা আসলে লাখো আফগান নারীরও গল্প।

গোলাপি স্কার্ফ পরা কি পাপ?

প্যারেন্দার পছন্দ গোলাপি রঙ। কিন্তু এখানে নারীদের পছন্দ অনুযায়ী পোশাক পরা রীতিমতো যুদ্ধের শামিল। কেননা তালেবানর জোরপূর্বক কঠোর নির্দেশনা চাপিয়ে দিয়েছে। এটি এই সমাজের প্রচলিত প্রথা, আফগান নারীরা স্কার্ফের বিরুদ্ধে লড়াই করছে না। কেউ কেউ নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী বাছাই করতে চাইছে। আপনি রাস্তায় দেখবেন, কেউ কেউ গোলাপি স্কার্ফ পরছে, কেউবা ডোরাকাটা পরছে কিন্তু গোলাপি স্কার্ফ পরা কি পাপ?

আমরা পেছনে যেতে পারি না

পেছনের দিকে যাত্রা করা মোটেও সহজ না কিন্তু সামনের দিকে যাওয়াও বেশ কঠিন। আমাদের উচিত আশান্বিত হওয়া অথবা না? আমরা পেছনের দিকে যেতে পারি না। এই কথাগুলো লিখেছেন কবি হাফিজউল্লাহ হামিম।

আফগান নারীরা এখন কাবুলের রাস্তায় বিক্ষোভ করছে। অন্য শহরেও ছোট আকারে হলেও সাহসী জনতা রাস্তায় নামছে। তাদের দাবি একটাই ‘রুটি-কাজ আর স্বাধীনতা’। কিন্তু তাদের ওপর নেমে এসেছে নির্যাতন, তাদের আটক করা হয়েছে। অনেকেই নিখোঁজ হয়েছেন। সীমান্তের ওপারে ইরানের নারীরা হিজাবের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছে। আফগান নারীদের উচিত নিজেদের অধিকার রক্ষায় আরও শিক্ষিত হওয়া।

ভয় যখন ক্ষোভে পরিণত হয়

তালেবানের একজন নিরাপত্তারক্ষী আমাদের গাড়ি থামিয়েছে; সে আমার দিকে বন্দুক তাক করেছে… আমার হৃদস্পন্দনের গতি বাড়ছিল, শরীর হিম হয়ে আসছিল। সেই সময় মনে হচ্ছিল, একটা বাতাস আমার ওপর দিয়ে বইছে, যখন আমাদের গাড়ি সরে গেল তখন সেই বাতাস অন্যদিকে চলে গেছে। সেই সময় আমার ভয় রাগে পরিণত হয়েছে।

কিছু তালেবানরক্ষী আক্রমণাত্মক আবার কারও কারও আচরণ গ্রহণযোগ্য। কিন্তু নারীদের জন্য যাতায়াত অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা ৭২ কিমির বেশি যাত্রা করলেই একজন পুরুষ সঙ্গী বাধ্যতামূলক নিতে হবে। তালেবানরা এমন কিছু আইন চালু করেছে যার মাধ্যমে নারীদের ঘরে ফেরত পাঠানো যায়।

১৩তে বিয়ে

‘পাশের বাসার মেয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে। তার বয়স মাত্র ১৩। তার মা বলেছে, তালেবানরা কখনোই স্কুল খুলবে না। তাকে তাদের ভাগ্যের কাছে তুলে দিলাম।’ এটি বেদনাদায়ক পুনরাবৃত্তি। আফগান নারীরা এখনো তালেবানের ৯০ দশকের দুঃখের কথা স্মরণ করেন। সেই সময় অনেক নারীর শিক্ষা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। লেখক প্যারান্দাও তাদের একজন। নতুন প্রজন্মের স্কুলছাত্রীরা স্বপ্ন নিয়ে বড় হচ্ছে কিন্তু তাদের স্কুলও বন্ধ করা হয়েছে।

নারীর বিরুদ্ধে ভাষা

‘আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করি কিন্তু এখন আমি ঠোঁটে তালা দিয়েছি। আমি আমার সমাজ নিয়ে হতাশ। পুরুষরা নারীদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করছে। আমি বিশ^াস করি আফগান নারীদের সমস্যার মূল সরকার নয়, যারা কিনা নতুন নিয়ম বেঁধে দিয়েছে। এই সমস্যার মূলে রয়েছে নারীদের নিয়ে পুরুষের চিন্তাপদ্ধতি।

সুদিন আসবেই

এখন কী হচ্ছে অবশ্যই আমি তা লিখব। এখানে প্রকাশের মাধ্যম অল্প কিন্তু আমি বিশ^াস করি একদিন আফগানিস্তান নারীদের জন্য একটি সুন্দর দেশ হবে। তা হতে সময় লাগবে কিন্তু হবেই।