রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুদ্ধবিরতির মার্কিন প্রস্তাব নাকচ, বৃহত্তর যুদ্ধের হুঁশিয়ারি ইরানের

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। ইরাকি প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জায়েদির মাধ্যমে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে ভবিষ্যতে সম্ভাব্য আগ্রাসন বন্ধের কার্যকর কোনো নিশ্চয়তা না থাকায় ইরান এটিকে গ্রহণ করেনি বলে জানিয়েছে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ইরানি ও ইরাকি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে পত্রিকাটি জানায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবটি তেহরানে পৌঁছে দেন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জায়েদি।
ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ এবং অতীতে ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ইতিহাসের কারণে এই প্রস্তাব যথেষ্ট নয়।

তেহরানের দৃষ্টিতে, যুক্তরাষ্ট্রের বারবার নেওয়া পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে ওয়াশিংটন দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের পরিবর্তে কৌশলগত কূটনীতি অনুসরণ করে। ইরানি কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন, ২০১৮ সালে ইরান চুক্তির শর্ত মেনে চলার বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে নিশ্চিত হওয়ার পরও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়া স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে মার্কিন প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক মেজাজ-মর্জির  ওপর নির্ভরশীল।

তাদের দাবি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি বারবার বিলম্বিত, সীমিত বা নতুন নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে কার্যত অকার্যকর করা হয়েছে। ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি এমন এক ‘দ্বিমুখী নীতি’, যেখানে কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপও অব্যাহত রাখা হয়। তাই ইরানি নেতাদের মতে, কেবল কূটনৈতিক আশ্বাস নয়, বাস্তব ও যাচাইযোগ্য পদক্ষেপের মাধ্যমেই আস্থা অর্জন করতে হবে।

আলী আল-জায়েদি একটি উচ্চপর্যায়ের ইরাকি প্রতিনিধিদল নিয়ে তেহরান সফর করেন। সফরে তিনি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, প্রধান আলোচক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ বাকের ঘালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে বৈঠক করেন।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে আব্বাস আরাকচি বলেন, মূল সমস্যা বার্তা আদান-প্রদান নয়। তিনি বলেন, ‘সমস্যা বার্তা পৌঁছে দেওয়া নয়। সমস্যা হলো যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি, যা অযৌক্তিক, লোভী এবং আধিপত্যবাদী।’

এই কূটনৈতিক প্রত্যাখ্যানের ঘটনা এমন সময়ে ঘটল, যখন দুই দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইরানের রেলপথ, বিমানবন্দর, সেতু ও সমুদ্রবন্দরসহ বিভিন্ন অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইরান পশ্চিম এশিয়াজুড়ে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

তেহরান বারবার বলেছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব ঘাঁটি থেকে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটানো হয়েছে, হামলা চালানো হয় সেগুলো ইরানের পাল্টা হামলার বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু।

দুই ইরানি কর্মকর্তা দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামোতে হামলার হুমকি বাস্তবায়ন করেন, তাহলে সম্ভাব্য বৃহত্তর যুদ্ধের জন্য দেশটির সশস্ত্র বাহিনী প্রস্তুতি নিচ্ছে।

তারা সতর্ক করে বলেন, পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে ইরান পুরো অঞ্চলে তার সামরিক প্রতিক্রিয়া সম্প্রসারণ করবে। এর মধ্যে তেল আবিবে হামলা এবং ইয়েমেনের মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করে লোহিত সাগরকে আন্তর্জাতিক নৌপথের সঙ্গে সংযুক্তকারী গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালি বন্ধ করার পদক্ষেপও থাকতে পারে।

এদিকে, বৃহস্পতিবার তেহরানের আজাদি স্কয়ারে হাজারো মানুষ সমাবেশ করে দেশের নেতৃত্ব ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি সমর্থন জানান। সমাবেশে ইরানে তৈরি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বহনকারী একটি সামরিক যান প্রদর্শন করা হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত চাপের মুখে দেশের সামরিক প্রস্তুতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়।

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস 

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

রংপুর বিভাগের নেতাদের সঙ্গে সাংগঠনিক সভায় তারেক রহমান

যুদ্ধবিরতির মার্কিন প্রস্তাব নাকচ, বৃহত্তর যুদ্ধের হুঁশিয়ারি ইরানের

প্রকাশিত সময় : ০৯:৪০:১১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। ইরাকি প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জায়েদির মাধ্যমে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে ভবিষ্যতে সম্ভাব্য আগ্রাসন বন্ধের কার্যকর কোনো নিশ্চয়তা না থাকায় ইরান এটিকে গ্রহণ করেনি বলে জানিয়েছে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ইরানি ও ইরাকি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে পত্রিকাটি জানায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবটি তেহরানে পৌঁছে দেন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জায়েদি।
ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ এবং অতীতে ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ইতিহাসের কারণে এই প্রস্তাব যথেষ্ট নয়।

তেহরানের দৃষ্টিতে, যুক্তরাষ্ট্রের বারবার নেওয়া পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে ওয়াশিংটন দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের পরিবর্তে কৌশলগত কূটনীতি অনুসরণ করে। ইরানি কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন, ২০১৮ সালে ইরান চুক্তির শর্ত মেনে চলার বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে নিশ্চিত হওয়ার পরও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়া স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে মার্কিন প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক মেজাজ-মর্জির  ওপর নির্ভরশীল।

তাদের দাবি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি বারবার বিলম্বিত, সীমিত বা নতুন নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে কার্যত অকার্যকর করা হয়েছে। ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি এমন এক ‘দ্বিমুখী নীতি’, যেখানে কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপও অব্যাহত রাখা হয়। তাই ইরানি নেতাদের মতে, কেবল কূটনৈতিক আশ্বাস নয়, বাস্তব ও যাচাইযোগ্য পদক্ষেপের মাধ্যমেই আস্থা অর্জন করতে হবে।

আলী আল-জায়েদি একটি উচ্চপর্যায়ের ইরাকি প্রতিনিধিদল নিয়ে তেহরান সফর করেন। সফরে তিনি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, প্রধান আলোচক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ বাকের ঘালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে বৈঠক করেন।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে আব্বাস আরাকচি বলেন, মূল সমস্যা বার্তা আদান-প্রদান নয়। তিনি বলেন, ‘সমস্যা বার্তা পৌঁছে দেওয়া নয়। সমস্যা হলো যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি, যা অযৌক্তিক, লোভী এবং আধিপত্যবাদী।’

এই কূটনৈতিক প্রত্যাখ্যানের ঘটনা এমন সময়ে ঘটল, যখন দুই দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইরানের রেলপথ, বিমানবন্দর, সেতু ও সমুদ্রবন্দরসহ বিভিন্ন অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইরান পশ্চিম এশিয়াজুড়ে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

তেহরান বারবার বলেছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব ঘাঁটি থেকে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটানো হয়েছে, হামলা চালানো হয় সেগুলো ইরানের পাল্টা হামলার বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু।

দুই ইরানি কর্মকর্তা দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামোতে হামলার হুমকি বাস্তবায়ন করেন, তাহলে সম্ভাব্য বৃহত্তর যুদ্ধের জন্য দেশটির সশস্ত্র বাহিনী প্রস্তুতি নিচ্ছে।

তারা সতর্ক করে বলেন, পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে ইরান পুরো অঞ্চলে তার সামরিক প্রতিক্রিয়া সম্প্রসারণ করবে। এর মধ্যে তেল আবিবে হামলা এবং ইয়েমেনের মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করে লোহিত সাগরকে আন্তর্জাতিক নৌপথের সঙ্গে সংযুক্তকারী গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালি বন্ধ করার পদক্ষেপও থাকতে পারে।

এদিকে, বৃহস্পতিবার তেহরানের আজাদি স্কয়ারে হাজারো মানুষ সমাবেশ করে দেশের নেতৃত্ব ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি সমর্থন জানান। সমাবেশে ইরানে তৈরি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বহনকারী একটি সামরিক যান প্রদর্শন করা হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত চাপের মুখে দেশের সামরিক প্রস্তুতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়।

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস