বুধবার, ০৬ মে ২০২৬, ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভোট গণনা শেষ না হতেই জ্বলল তৃণমূল কার্যালয়, ঘরবাড়িতে হামলা-ভাঙচুর

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনা শেষ না হতেই রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী ও নেতাকর্মীদের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে সংঘাতের আশঙ্কায় তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তার ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির সামনে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশন।

স্থানীয় একাধিক গণমাধ্যম জানায়, আগে থেকেই ওই দুই নেতার বাসভবনের সামনে কড়া নিরাপত্তা ছিল। তবে নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনা বাড়ায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

১০০ আসন লুটের অভিযোগ মমতার

ভোট গণনা প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার দাবি, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ও নির্বাচন কমিশনের একাংশ মিলে ফলাফলে প্রভাব ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, ইচ্ছাকৃতভাবে ধীরগতিতে গণনা করা হচ্ছে এবং প্রাথমিক ধাপে বিভ্রান্তি ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে।

নিজের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, প্রথম কয়েক রাউন্ডে বিজেপির ফলাফল আগে দেখানো হতে পারে, যাতে তৃণমূল কর্মীরা হতাশ হয়ে গণনাকেন্দ্র ছেড়ে চলে যান। তিনি দলীয় কর্মী ও কাউন্টিং এজেন্টদের কেন্দ্রে অবস্থান ধরে রাখার আহ্বান জানান।

গণনার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তার অভিযোগ, রাজ্যের প্রায় ১০০টি স্থানে গণনা প্রক্রিয়া ইচ্ছাকৃতভাবেথামিয়ে রাখা হয়েছে। নদিয়ার কল্যাণীতে কয়েকটি ইভিএমে গরমিল পাওয়া গেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

এছাড়া ১০০টি আসন লুটের অভিযোগও তুলেছেন তিনি।

সংঘর্ষ, হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ

ভোট গণনা শেষ হতে না হতেই রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। তৃণমূলের অভিযোগ, বিজেপি কর্মীরা একাধিক দলীয় কার্যালয়, বাসা-বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালিয়েছে।

বাঁকুড়ার কোতুলপুরে তৃণমূল কার্যালয়ের ছাদে উঠে বিজেপির পতাকা টাঙানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। বরানগরের একটি ওয়ার্ডে দলীয় কার্যালয় দখলের অভিযোগও উঠেছে। জামালপুর ও জামুড়িয়ার চুরুলিয়া এলাকায় তৃণমূল কার্যালয়ে আগুন দেওয়া ও ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে নোয়াপাড়া ও বীজপুরে তৃণমূল প্রার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। ব্যারাকপুরের একটি গণনাকেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থী তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্যকে মারধর এবং তার কাছ থেকে নথি ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। একই ঘটনায় বিজেপি নেতা অর্জুন সিংয়ের অনুসারীদের দিকে অভিযোগের আঙুল তোলা হয়েছে।

তৃণমূল কর্মী অনূপ সবুজ ফেসবুকে পোস্ট করে লেখেন, ‘বিজেপির গুণ্ডারা আমার বাড়িতে হামলা চালাচ্ছে। হে ইশ্বর আমার দুই কন্যা ও স্ত্রীকে রক্ষা করো।’

গণনাকেন্দ্রে উত্তেজনা

গণনাকেন্দ্রগুলোতেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তৃণমূল ও বিজেপি সমর্থকদের পাল্টাপাল্টি স্লোগানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কেন্দ্রীয় বাহিনী লাঠিচার্জ করে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত কয়েকজন আহত হন।কোচবিহারের দিনহাটায় তৃণমূল কার্যালয়ে ভাঙচুরের জেরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

নির্বাচন ও পরবর্তী পরিস্থিতি

২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে গত ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ভোট গ্রহণ হয়। তবে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা আসনে নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগে ভোট বাতিল করে পুনর্নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ওই আসনে ২১ মে পুনরায় ভোট এবং ২৪ মে গণনা অনুষ্ঠিত হবে।

এমন পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, এখনো বহু আসনে তৃণমূল এগিয়ে থাকলেও তা প্রকাশ করা হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘সূর্যাস্তের পর ফলাফল বদলাবে’ এবং শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।

অন্যদিকে বিজেপি ও তৃণমূল—উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ তুলেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া এখনো পাওয়া যায়নি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ভোট গণনা শেষ না হতেই জ্বলল তৃণমূল কার্যালয়, ঘরবাড়িতে হামলা-ভাঙচুর

প্রকাশিত সময় : ১০:২৯:৩৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৫ মে ২০২৬

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনা শেষ না হতেই রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী ও নেতাকর্মীদের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে সংঘাতের আশঙ্কায় তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তার ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির সামনে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশন।

স্থানীয় একাধিক গণমাধ্যম জানায়, আগে থেকেই ওই দুই নেতার বাসভবনের সামনে কড়া নিরাপত্তা ছিল। তবে নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনা বাড়ায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

১০০ আসন লুটের অভিযোগ মমতার

ভোট গণনা প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার দাবি, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ও নির্বাচন কমিশনের একাংশ মিলে ফলাফলে প্রভাব ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, ইচ্ছাকৃতভাবে ধীরগতিতে গণনা করা হচ্ছে এবং প্রাথমিক ধাপে বিভ্রান্তি ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে।

নিজের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, প্রথম কয়েক রাউন্ডে বিজেপির ফলাফল আগে দেখানো হতে পারে, যাতে তৃণমূল কর্মীরা হতাশ হয়ে গণনাকেন্দ্র ছেড়ে চলে যান। তিনি দলীয় কর্মী ও কাউন্টিং এজেন্টদের কেন্দ্রে অবস্থান ধরে রাখার আহ্বান জানান।

গণনার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তার অভিযোগ, রাজ্যের প্রায় ১০০টি স্থানে গণনা প্রক্রিয়া ইচ্ছাকৃতভাবেথামিয়ে রাখা হয়েছে। নদিয়ার কল্যাণীতে কয়েকটি ইভিএমে গরমিল পাওয়া গেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

এছাড়া ১০০টি আসন লুটের অভিযোগও তুলেছেন তিনি।

সংঘর্ষ, হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ

ভোট গণনা শেষ হতে না হতেই রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। তৃণমূলের অভিযোগ, বিজেপি কর্মীরা একাধিক দলীয় কার্যালয়, বাসা-বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালিয়েছে।

বাঁকুড়ার কোতুলপুরে তৃণমূল কার্যালয়ের ছাদে উঠে বিজেপির পতাকা টাঙানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। বরানগরের একটি ওয়ার্ডে দলীয় কার্যালয় দখলের অভিযোগও উঠেছে। জামালপুর ও জামুড়িয়ার চুরুলিয়া এলাকায় তৃণমূল কার্যালয়ে আগুন দেওয়া ও ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে নোয়াপাড়া ও বীজপুরে তৃণমূল প্রার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। ব্যারাকপুরের একটি গণনাকেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থী তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্যকে মারধর এবং তার কাছ থেকে নথি ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। একই ঘটনায় বিজেপি নেতা অর্জুন সিংয়ের অনুসারীদের দিকে অভিযোগের আঙুল তোলা হয়েছে।

তৃণমূল কর্মী অনূপ সবুজ ফেসবুকে পোস্ট করে লেখেন, ‘বিজেপির গুণ্ডারা আমার বাড়িতে হামলা চালাচ্ছে। হে ইশ্বর আমার দুই কন্যা ও স্ত্রীকে রক্ষা করো।’

গণনাকেন্দ্রে উত্তেজনা

গণনাকেন্দ্রগুলোতেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তৃণমূল ও বিজেপি সমর্থকদের পাল্টাপাল্টি স্লোগানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কেন্দ্রীয় বাহিনী লাঠিচার্জ করে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত কয়েকজন আহত হন।কোচবিহারের দিনহাটায় তৃণমূল কার্যালয়ে ভাঙচুরের জেরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

নির্বাচন ও পরবর্তী পরিস্থিতি

২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে গত ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ভোট গ্রহণ হয়। তবে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা আসনে নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগে ভোট বাতিল করে পুনর্নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ওই আসনে ২১ মে পুনরায় ভোট এবং ২৪ মে গণনা অনুষ্ঠিত হবে।

এমন পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, এখনো বহু আসনে তৃণমূল এগিয়ে থাকলেও তা প্রকাশ করা হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘সূর্যাস্তের পর ফলাফল বদলাবে’ এবং শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।

অন্যদিকে বিজেপি ও তৃণমূল—উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ তুলেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া এখনো পাওয়া যায়নি।