বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ৩১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পুরুষের অনুপস্থিতিতে গায়রে মাহরামের মেহমানদারি

ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি দিককে সৌন্দর্য, পবিত্রতা ও নিরাপত্তার আবরণে আবৃত করেছে। পারিবারিক জীবনে আত্মীয়তা রক্ষা, মেহমানদারী করা এবং সৌজন্য প্রদর্শন যেমন ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত, তেমনি শালীনতা, পর্দা ও ফিতনা থেকে বেঁচে থাকাও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে ।

কেননা অনেক সময় পরিস্থিতি এমন হয় যে, যখন ঘরের পুরুষ সদস্য উপস্থিত থাকে না; অথচ কোনো গায়রে মাহরাম আত্মীয় বা ব্যক্তি বাড়িতে আসে। তখন একজন নারীর জন্য করণীয় কী? সে কি মেহমানদারী করতে পারবে? কথা বলতে পারবে? নাকি সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ?
ইসলাম নারীর মর্যাদা ও পবিত্রতা রক্ষার জন্য পর্দার নির্দেশ দিয়েছে এবং এমন সকল পথ বন্ধ করতে বলেছে, যা ধীরে ধীরে ফিতনা ও গুনাহের দিকে নিয়ে যায়। তাই প্রয়োজনীয় কথা বলা, পর্দার আড়াল থেকে মেহমানদারী করা বা খাবার পৌঁছে দেওয়া বৈধ হলেও নির্জন পরিবেশ, অপ্রয়োজনীয় আলাপ কিংবা আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা তাআলা ইরশাদ করেন,‘তোমরা তাঁর স্ত্রীদের কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে।

এটি তোমাদের অন্তর এবং তাদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্র।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৫৩)
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, প্রয়োজনীয় কথা বলা বৈধ; তবে তা পর্দার আড়াল থেকে হতে হবে। তাই কোনো গায়রে মাহরাম আত্মীয় বাড়িতে এলে একজন নারী শালীনতা বজায় রেখে সীমিত ও প্রয়োজনীয় কথা বলতে পারবে। যেমন, খাবার কোথায় রাখা হয়েছে তা জানানো, প্রয়োজনীয় কোনো তথ্য প্রদান, দরকারি ব্যবস্থাপনার কথা বলা ইত্যাদি।

তবে অবশ্যই এসব কথা হতে হবে স্বাভাবিক ও সংক্ষিপ্ত; কোমলতা, আকর্ষণ বা অপ্রয়োজনীয় আলাপ থেকে বিরত থাকতে হবে। আল্লাহ তাআলা তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় কর, তবে কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলো না, ফলে যার অন্তরে ব্যাধি আছে সে লালায়িত হয়ে পড়বে। বরং তোমরা স্বাভাবিক কথা বল।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৩২)
তাই কথাবার্তা এমন হতে হবে, যাতে তা ভদ্রতা ও প্রয়োজনের সীমা অতিক্রম না করে এবং কোনো ধরনের মানসিক ফিতনার কারণ না হয়। ইসলাম নারী-পুরুষের নির্জন অবস্থানকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।

কারণ এটি শয়তানের ধোঁকার অন্যতম বড় দরজা। ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, ‘যখন কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে নির্জনে অবস্থান করে, তখন সেখানে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে শয়তান উপস্থিত হয়।’ (তিরমিজি, হাদিস নং : ২১৬৫)
অতএব, যদি কোনো নারী বাড়িতে একা থাকে এবং সেখানে কোনো গায়রে মাহরাম পুরুষ অবস্থান করে, তাহলে এমন পরিবেশ এড়িয়ে চলা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে যদি ফিতনার আশঙ্কা থাকে, তবে সেখানে অবস্থান করা শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ নয়। ইসলাম নারীদের বন্দি করতে চায় না; আবার লাগামহীন মেলামেশার স্বাধীনতাও দেয় না। বরং সম্মান, নিরাপত্তা ও তাকওয়ার ভিত্তিতে জীবন পরিচালনার শিক্ষা দেয়। পরপুরুষের উপস্থিতিতে একজন মুসলিম নারীর আচরণ হওয়া উচিত মার্জিত, সংযত ও শরীয়তসম্মত। মেহমানদারী করা নিঃসন্দেহে উত্তম আমল; তবে তা অবশ্যই পর্দা, শালীনতা ও নিরাপত্তার সীমার মধ্যে হতে হবে। প্রয়োজনীয় কথা বলা, পর্দার আড়াল থেকে খাবার পৌঁছে দেওয়া বা সীমিত ব্যবস্থাপনা করা বৈধ হলেও নির্জন অবস্থান, অপ্রয়োজনীয় আলাপ কিংবা ফিতনার আশঙ্কাজনক পরিবেশ সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাজ্য। আর বর্তমান যুগে পর্দার বিধানকে অনেকেই সংকীর্ণতা মনে করলেও প্রকৃতপক্ষে এটি নারী-পুরুষ উভয়ের হৃদয়ের পবিত্রতা, পারিবারিক নিরাপত্তা এবং সমাজের নৈতিক ভারসাম্য রক্ষার এক মহান ব্যবস্থা। তাই প্রত্যেক মুসলিম পরিবারের উচিত, ইসলামের এই সুন্দর আদর্শকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেদের ঘরকে পবিত্রতার দুর্গে পরিণত করা। (আদ দুররুল মুখতার, রাদ্দুল মহতার, খণ্ড : ৯, পৃষ্ঠা : ৫২৯-৫৩০)

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

পুরুষের অনুপস্থিতিতে গায়রে মাহরামের মেহমানদারি

প্রকাশিত সময় : ০৪:৫৭:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি দিককে সৌন্দর্য, পবিত্রতা ও নিরাপত্তার আবরণে আবৃত করেছে। পারিবারিক জীবনে আত্মীয়তা রক্ষা, মেহমানদারী করা এবং সৌজন্য প্রদর্শন যেমন ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত, তেমনি শালীনতা, পর্দা ও ফিতনা থেকে বেঁচে থাকাও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে ।

কেননা অনেক সময় পরিস্থিতি এমন হয় যে, যখন ঘরের পুরুষ সদস্য উপস্থিত থাকে না; অথচ কোনো গায়রে মাহরাম আত্মীয় বা ব্যক্তি বাড়িতে আসে। তখন একজন নারীর জন্য করণীয় কী? সে কি মেহমানদারী করতে পারবে? কথা বলতে পারবে? নাকি সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ?
ইসলাম নারীর মর্যাদা ও পবিত্রতা রক্ষার জন্য পর্দার নির্দেশ দিয়েছে এবং এমন সকল পথ বন্ধ করতে বলেছে, যা ধীরে ধীরে ফিতনা ও গুনাহের দিকে নিয়ে যায়। তাই প্রয়োজনীয় কথা বলা, পর্দার আড়াল থেকে মেহমানদারী করা বা খাবার পৌঁছে দেওয়া বৈধ হলেও নির্জন পরিবেশ, অপ্রয়োজনীয় আলাপ কিংবা আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা তাআলা ইরশাদ করেন,‘তোমরা তাঁর স্ত্রীদের কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে।

এটি তোমাদের অন্তর এবং তাদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্র।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৫৩)
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, প্রয়োজনীয় কথা বলা বৈধ; তবে তা পর্দার আড়াল থেকে হতে হবে। তাই কোনো গায়রে মাহরাম আত্মীয় বাড়িতে এলে একজন নারী শালীনতা বজায় রেখে সীমিত ও প্রয়োজনীয় কথা বলতে পারবে। যেমন, খাবার কোথায় রাখা হয়েছে তা জানানো, প্রয়োজনীয় কোনো তথ্য প্রদান, দরকারি ব্যবস্থাপনার কথা বলা ইত্যাদি।

তবে অবশ্যই এসব কথা হতে হবে স্বাভাবিক ও সংক্ষিপ্ত; কোমলতা, আকর্ষণ বা অপ্রয়োজনীয় আলাপ থেকে বিরত থাকতে হবে। আল্লাহ তাআলা তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় কর, তবে কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলো না, ফলে যার অন্তরে ব্যাধি আছে সে লালায়িত হয়ে পড়বে। বরং তোমরা স্বাভাবিক কথা বল।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৩২)
তাই কথাবার্তা এমন হতে হবে, যাতে তা ভদ্রতা ও প্রয়োজনের সীমা অতিক্রম না করে এবং কোনো ধরনের মানসিক ফিতনার কারণ না হয়। ইসলাম নারী-পুরুষের নির্জন অবস্থানকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।

কারণ এটি শয়তানের ধোঁকার অন্যতম বড় দরজা। ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, ‘যখন কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে নির্জনে অবস্থান করে, তখন সেখানে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে শয়তান উপস্থিত হয়।’ (তিরমিজি, হাদিস নং : ২১৬৫)
অতএব, যদি কোনো নারী বাড়িতে একা থাকে এবং সেখানে কোনো গায়রে মাহরাম পুরুষ অবস্থান করে, তাহলে এমন পরিবেশ এড়িয়ে চলা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে যদি ফিতনার আশঙ্কা থাকে, তবে সেখানে অবস্থান করা শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ নয়। ইসলাম নারীদের বন্দি করতে চায় না; আবার লাগামহীন মেলামেশার স্বাধীনতাও দেয় না। বরং সম্মান, নিরাপত্তা ও তাকওয়ার ভিত্তিতে জীবন পরিচালনার শিক্ষা দেয়। পরপুরুষের উপস্থিতিতে একজন মুসলিম নারীর আচরণ হওয়া উচিত মার্জিত, সংযত ও শরীয়তসম্মত। মেহমানদারী করা নিঃসন্দেহে উত্তম আমল; তবে তা অবশ্যই পর্দা, শালীনতা ও নিরাপত্তার সীমার মধ্যে হতে হবে। প্রয়োজনীয় কথা বলা, পর্দার আড়াল থেকে খাবার পৌঁছে দেওয়া বা সীমিত ব্যবস্থাপনা করা বৈধ হলেও নির্জন অবস্থান, অপ্রয়োজনীয় আলাপ কিংবা ফিতনার আশঙ্কাজনক পরিবেশ সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাজ্য। আর বর্তমান যুগে পর্দার বিধানকে অনেকেই সংকীর্ণতা মনে করলেও প্রকৃতপক্ষে এটি নারী-পুরুষ উভয়ের হৃদয়ের পবিত্রতা, পারিবারিক নিরাপত্তা এবং সমাজের নৈতিক ভারসাম্য রক্ষার এক মহান ব্যবস্থা। তাই প্রত্যেক মুসলিম পরিবারের উচিত, ইসলামের এই সুন্দর আদর্শকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেদের ঘরকে পবিত্রতার দুর্গে পরিণত করা। (আদ দুররুল মুখতার, রাদ্দুল মহতার, খণ্ড : ৯, পৃষ্ঠা : ৫২৯-৫৩০)