বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হজের প্রতিবিধান ও কাফফারা

হজ ও ওমরাহ ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এর প্রতিটি কাজ সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও শৃঙ্খলার ওপর নির্ভরশীল।
তবে মানুষ হিসেবে দীর্ঘ এই সফরে হাজিদের পক্ষ থেকে অনিচ্ছাকৃতভাবে বা অসাবধানতাবশত কিছু ভুলত্রুটি হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু, তাই তিনি এই ভুলগুলো সংশোধনের জন্য ‘জরিমানা’ বা ‘কাফফারা’র বিধান রেখেছেন। হজ-ওমরাহর শুদ্ধতা নিশ্চিত করতে এবং ইবাদতকে ত্রুটিমুক্ত রাখতে এই বিধানগুলো জানা প্রত্যেক হাজির জন্য কর্তব্য।
হজ ও ওমরাহে সাধারণত তিন ধরনের ভুল হতে পারে, ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজ করা, ফরজ বা ওয়াজিব আদায়ে ত্রুটি হওয়া এবং হারাম শরিফের মর্যাদাহানি করা।
এই ভুলের মাত্রাভেদে জরিমানা চার প্রকারের হয়—সদকা, দম, বাদানা এবং বিশেষ ক্ষেত্রে আবার হজ পালন।
১. ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজ ও তার প্রতিকার

ইহরাম বাঁধার পর একজন মুমিন নিজেকে সাধারণ জাগতিক অবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করে আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন করেন। এ অবস্থায় কিছু কাজ নিষিদ্ধ হয়ে যায়।

পোশাকসংক্রান্ত ত্রুটি : পুরুষদের জন্য ইহরাম অবস্থায় সেলাই করা কাপড় পরা নাজায়েজ।
যদি কেউ একনাগাড়ে ১২ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় সেলাই করা কাপড় (জামা, পায়জামা, গেঞ্জি ইত্যাদি) পরে থাকে, তবে তাকে ‘দম’ (একটি ছাগল বা দুম্বা জবাই) দিতে হবে। ১২ ঘণ্টার কম সময় পরলে ‘সদকা ফিতর’ পরিমাণ অর্থ দিতে হবে। মাথা বা মুখ ঢেকে রাখার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। ১২ ঘণ্টা মাথা বা মুখ ঢেকে রাখলে দম, অন্যথায় সদকা ওয়াজিব হবে।
সুগন্ধি ব্যবহার : শরীরে বা কাপড়ে সুগন্ধি (আতর, সেন্ট) ব্যবহার করা নিষিদ্ধ।
শরীরের কোনো বড় অঙ্গে সুগন্ধি লাগালে বা কাপড়ে আধা বর্গ হাত পরিমাণ স্থানে বেশি আতর লাগালে দম দিতে হবে। হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করার সময় যদি হাতে বেশি পরিমাণে সুগন্ধি লেগে যায়, তবে সে ক্ষেত্রেও জরিমানা প্রযোজ্য হবে। এমনকি সুগন্ধিযুক্ত সাবান, শ্যাম্পু বা ভেজা টিস্যু ব্যবহার করলেও সদকা ওয়াজিব হয়।
তেল ও প্রসাধন : ঘ্রাণ থাকুক বা না থাকুক, ইহরাম অবস্থায় মাথায় বা শরীরে তেল ব্যবহার করলে জরিমানা আসে। এক অঙ্গে ব্যবহার করলে দম, আর অল্প স্থানে ব্যবহার করলে সদকা ওয়াজিব হবে। তবে ঘ্রাণহীন তেল শুধু ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করলে জরিমানা আসবে না।

চুল ও নখ কাটা : ইহরাম অবস্থায় শরীরের কোনো অংশ থেকে চুল বা দাড়ি কাটা বা ওপড়ানো নিষিদ্ধ। চারটির বেশি চুল কাটলে বা ওঠালে সদকা ফিতর ওয়াজিব হবে। এ ছাড়া এক হাতের সব নখ কাটলে দম এবং এর কম কাটলে প্রতি নখের জন্য সদকা দিতে হবে।

খাদ্য ও পানীয় : জাফরান বা কড়া সুঘ্রাণযুক্ত কোনো মসলা চা বা কফির সঙ্গে মিশিয়ে পান করলে সুঘ্রাণ প্রবল হলে দম এবং কম হলে সদকা ওয়াজিব হবে। পানের সঙ্গে জর্দা বা সুঘ্রাণযুক্ত মসলা খাওয়াও মাকরুহ এবং জরিমানাযোগ্য অপরাধ।

২. হজ ও ওমরাহর ফরজ-ওয়াজিব আদায়ে ত্রুটি

হজ বা ওমরাহর মূল কাজগুলো আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো বিচ্যুতি ঘটলে তা সংশোধনের জন্য বিশেষ জরিমানা দিতে হয়।

পবিত্রতাবিহীন তাওয়াফ : ওমরাহর তাওয়াফ যদি কেউ বিনা অজুতে বা অপবিত্র অবস্থায় (গোসল ফরজ বা মাসিক অবস্থায়) করে, তবে দম দিতে হবে। হজের ফরজ তাওয়াফ (তাওয়াফে জিয়ারত) যদি অপবিত্র অবস্থায় করা হয়, তবে ‘বাদানা’ (একটি পূর্ণ গরু বা উট জবাই) দিতে হবে। তবে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগে পবিত্র হয়ে আবার তাওয়াফ করে নিলে এই জরিমানা মাফ হয়ে যাবে।

কঙ্কর নিক্ষেপ : নিজে সক্ষম থাকাবস্থায় অন্যকে দিয়ে কঙ্কর মারানো ওয়াজিব তরক করার অন্তর্ভুক্ত। কোনো দিনের সব কঙ্কর বা বেশির ভাগ কঙ্কর বাদ পড়লে দম ওয়াজিব হয়। কয়েকটি কঙ্কর বাদ পড়লে প্রতিটির জন্য সদকা দিতে হবে।

ক্রম রক্ষা ও চুল কাটা : হজের কাজগুলোর একটি নির্দিষ্ট ক্রম রয়েছে। যেমন—১০ তারিখে কঙ্কর মারার আগে মাথা মুণ্ডন করলে দম ওয়াজিব হয়। একইভাবে তামাত্তু ও কিরান হজ আদায়কারীরা কোরবানির আগে চুল কাটলে জরিমানা দিতে হবে।

স্ত্রী সহবাস সংক্রান্ত বিধান : উকুফে আরাফার পর কিন্তু ইহরাম থেকে হালাল হওয়ার আগে স্ত্রী সহবাস করলে স্বামী-স্ত্রী প্রত্যেককে একটি করে গরু বা উট জরিমানা দিতে হবে। আর যদি উকুফে আরাফার আগেই এই কাজ হয়ে যায়, তবে হজ নষ্ট হয়ে যাবে এবং আগামী বছর আবার হজ কাজা করতে হবে।

 

৩. জরিমানার ধরন ও প্রদানের স্থান

জরিমানা মূলত তিন প্রকার—

১. দম : হারামের এলাকায় একটি ছাগল বা দুম্বা জবাই করা।

২. বাদানা : হারামের এলাকায় একটি গরু বা উট জবাই করা।

৩. সদকা : এক সদকাতুল ফিতর পরিমাণ (এক কেজি ৬৩৫ গ্রাম গম বা তার সমমূল্য) দান করা।

 

মনে রাখতে হবে, দম ও বাদানা অবশ্যই হারামের সীমানার ভেতরে জবাই করতে হবে এবং এর গোশত শুধু হারাম এলাকার গরিব-মিসকিনদের হক। জরিমানা দাতা বা তার পরিবার এই গোশত খেতে পারবে না। তবে ‘সদকা’ নিজ দেশে বা অন্য কোনো অঞ্চলের গরিবদের দিলেও আদায় হয়ে যাবে।

৪. বিশেষ ওজর ও অসুস্থতার বিধান

যদি কেউ অসুস্থতা বা প্রচণ্ড শীতের মতো কোনো অনিবার্য ওজরের কারণে ইহরামের নিষিদ্ধ কাজ করে ফেলে (যেমন—মাথা ঢেকে রাখা বা সেলাই করা কাপড় পরা), তবে তার জন্য জরিমানা আদায়ের বিকল্প সুযোগ রয়েছে। ওজরের কারণে দম ওয়াজিব হলে সে চাইলে দমের পরিবর্তে তিনটি রোজা রাখতে পারে অথবা ছয়জন মিসকিনকে সদকা দিতে পারে। তবে কোনো ওজর ছাড়া বা ইচ্ছাকৃতভাবে ত্রুটি করলে দমের পরিবর্তে রোজা রাখার সুযোগ নেই; সে ক্ষেত্রে পশুই জবাই করতে হবে।

 

৫. কিছু জরুরি মাসআলা

ভুল ইচ্ছাকৃত হোক বা অনিচ্ছাকৃত, জরিমানা উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তবে অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য গুনাহ হবে না।

যদি একই ধরনের ভুল একাধিকবার হয় এবং দণ্ড আদায়ের আগেই তা ঘটে, তবে একটি জরিমানাই যথেষ্ট। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন ভুলের জন্য আলাদা আলাদা জরিমানা দিতে হবে।

নিছক সন্দেহের বশবর্তী হয়ে জরিমানা দেওয়া উচিত নয়। ভুলের বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে বা বিজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নিয়েই জরিমানা আদায় করা উচিত।

 

মনে রাখতে হবে, হজ ও ওমরাহর সফরে হাজিদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত খুশুখুজুর সঙ্গে প্রতিটি আমল সম্পন্ন করা। জরিমানার বিধান থাকলেও মুমিনের চেষ্টা থাকা উচিত যেন কোনো ভুলই না হয়। প্রতিটি কাজ করার আগে আলেমদের থেকে জেনে নেওয়া বা নির্ভরযোগ্য কিতাব অনুসরণ করা উচিত। আর কোনো ত্রুটি হয়ে গেলে তা গোপন না করে বা অবহেলা না করে দ্রুত সংশোধনের ব্যবস্থা করা উচিত। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবার হজ ও ওমরাহকে কবুল করুন এবং ছোট-বড় সব ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দিয়ে ‘হজ্জে মাবরুর’ নসিব করুন।

(তথ্যঋণ : কিতাবুল মানাসেক, মাসায়েলে হজ ও ওমরাহ, মাসিক আলকাউসার, হজ গাইডলাইন)

সূত্র: কালের কণ্ঠ

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

হজের প্রতিবিধান ও কাফফারা

প্রকাশিত সময় : ১০:৪৪:২৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬
হজ ও ওমরাহ ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এর প্রতিটি কাজ সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও শৃঙ্খলার ওপর নির্ভরশীল।
তবে মানুষ হিসেবে দীর্ঘ এই সফরে হাজিদের পক্ষ থেকে অনিচ্ছাকৃতভাবে বা অসাবধানতাবশত কিছু ভুলত্রুটি হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু, তাই তিনি এই ভুলগুলো সংশোধনের জন্য ‘জরিমানা’ বা ‘কাফফারা’র বিধান রেখেছেন। হজ-ওমরাহর শুদ্ধতা নিশ্চিত করতে এবং ইবাদতকে ত্রুটিমুক্ত রাখতে এই বিধানগুলো জানা প্রত্যেক হাজির জন্য কর্তব্য।
হজ ও ওমরাহে সাধারণত তিন ধরনের ভুল হতে পারে, ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজ করা, ফরজ বা ওয়াজিব আদায়ে ত্রুটি হওয়া এবং হারাম শরিফের মর্যাদাহানি করা।
এই ভুলের মাত্রাভেদে জরিমানা চার প্রকারের হয়—সদকা, দম, বাদানা এবং বিশেষ ক্ষেত্রে আবার হজ পালন।
১. ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজ ও তার প্রতিকার

ইহরাম বাঁধার পর একজন মুমিন নিজেকে সাধারণ জাগতিক অবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করে আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন করেন। এ অবস্থায় কিছু কাজ নিষিদ্ধ হয়ে যায়।

পোশাকসংক্রান্ত ত্রুটি : পুরুষদের জন্য ইহরাম অবস্থায় সেলাই করা কাপড় পরা নাজায়েজ।
যদি কেউ একনাগাড়ে ১২ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় সেলাই করা কাপড় (জামা, পায়জামা, গেঞ্জি ইত্যাদি) পরে থাকে, তবে তাকে ‘দম’ (একটি ছাগল বা দুম্বা জবাই) দিতে হবে। ১২ ঘণ্টার কম সময় পরলে ‘সদকা ফিতর’ পরিমাণ অর্থ দিতে হবে। মাথা বা মুখ ঢেকে রাখার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। ১২ ঘণ্টা মাথা বা মুখ ঢেকে রাখলে দম, অন্যথায় সদকা ওয়াজিব হবে।
সুগন্ধি ব্যবহার : শরীরে বা কাপড়ে সুগন্ধি (আতর, সেন্ট) ব্যবহার করা নিষিদ্ধ।
শরীরের কোনো বড় অঙ্গে সুগন্ধি লাগালে বা কাপড়ে আধা বর্গ হাত পরিমাণ স্থানে বেশি আতর লাগালে দম দিতে হবে। হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করার সময় যদি হাতে বেশি পরিমাণে সুগন্ধি লেগে যায়, তবে সে ক্ষেত্রেও জরিমানা প্রযোজ্য হবে। এমনকি সুগন্ধিযুক্ত সাবান, শ্যাম্পু বা ভেজা টিস্যু ব্যবহার করলেও সদকা ওয়াজিব হয়।
তেল ও প্রসাধন : ঘ্রাণ থাকুক বা না থাকুক, ইহরাম অবস্থায় মাথায় বা শরীরে তেল ব্যবহার করলে জরিমানা আসে। এক অঙ্গে ব্যবহার করলে দম, আর অল্প স্থানে ব্যবহার করলে সদকা ওয়াজিব হবে। তবে ঘ্রাণহীন তেল শুধু ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করলে জরিমানা আসবে না।

চুল ও নখ কাটা : ইহরাম অবস্থায় শরীরের কোনো অংশ থেকে চুল বা দাড়ি কাটা বা ওপড়ানো নিষিদ্ধ। চারটির বেশি চুল কাটলে বা ওঠালে সদকা ফিতর ওয়াজিব হবে। এ ছাড়া এক হাতের সব নখ কাটলে দম এবং এর কম কাটলে প্রতি নখের জন্য সদকা দিতে হবে।

খাদ্য ও পানীয় : জাফরান বা কড়া সুঘ্রাণযুক্ত কোনো মসলা চা বা কফির সঙ্গে মিশিয়ে পান করলে সুঘ্রাণ প্রবল হলে দম এবং কম হলে সদকা ওয়াজিব হবে। পানের সঙ্গে জর্দা বা সুঘ্রাণযুক্ত মসলা খাওয়াও মাকরুহ এবং জরিমানাযোগ্য অপরাধ।

২. হজ ও ওমরাহর ফরজ-ওয়াজিব আদায়ে ত্রুটি

হজ বা ওমরাহর মূল কাজগুলো আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো বিচ্যুতি ঘটলে তা সংশোধনের জন্য বিশেষ জরিমানা দিতে হয়।

পবিত্রতাবিহীন তাওয়াফ : ওমরাহর তাওয়াফ যদি কেউ বিনা অজুতে বা অপবিত্র অবস্থায় (গোসল ফরজ বা মাসিক অবস্থায়) করে, তবে দম দিতে হবে। হজের ফরজ তাওয়াফ (তাওয়াফে জিয়ারত) যদি অপবিত্র অবস্থায় করা হয়, তবে ‘বাদানা’ (একটি পূর্ণ গরু বা উট জবাই) দিতে হবে। তবে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগে পবিত্র হয়ে আবার তাওয়াফ করে নিলে এই জরিমানা মাফ হয়ে যাবে।

কঙ্কর নিক্ষেপ : নিজে সক্ষম থাকাবস্থায় অন্যকে দিয়ে কঙ্কর মারানো ওয়াজিব তরক করার অন্তর্ভুক্ত। কোনো দিনের সব কঙ্কর বা বেশির ভাগ কঙ্কর বাদ পড়লে দম ওয়াজিব হয়। কয়েকটি কঙ্কর বাদ পড়লে প্রতিটির জন্য সদকা দিতে হবে।

ক্রম রক্ষা ও চুল কাটা : হজের কাজগুলোর একটি নির্দিষ্ট ক্রম রয়েছে। যেমন—১০ তারিখে কঙ্কর মারার আগে মাথা মুণ্ডন করলে দম ওয়াজিব হয়। একইভাবে তামাত্তু ও কিরান হজ আদায়কারীরা কোরবানির আগে চুল কাটলে জরিমানা দিতে হবে।

স্ত্রী সহবাস সংক্রান্ত বিধান : উকুফে আরাফার পর কিন্তু ইহরাম থেকে হালাল হওয়ার আগে স্ত্রী সহবাস করলে স্বামী-স্ত্রী প্রত্যেককে একটি করে গরু বা উট জরিমানা দিতে হবে। আর যদি উকুফে আরাফার আগেই এই কাজ হয়ে যায়, তবে হজ নষ্ট হয়ে যাবে এবং আগামী বছর আবার হজ কাজা করতে হবে।

 

৩. জরিমানার ধরন ও প্রদানের স্থান

জরিমানা মূলত তিন প্রকার—

১. দম : হারামের এলাকায় একটি ছাগল বা দুম্বা জবাই করা।

২. বাদানা : হারামের এলাকায় একটি গরু বা উট জবাই করা।

৩. সদকা : এক সদকাতুল ফিতর পরিমাণ (এক কেজি ৬৩৫ গ্রাম গম বা তার সমমূল্য) দান করা।

 

মনে রাখতে হবে, দম ও বাদানা অবশ্যই হারামের সীমানার ভেতরে জবাই করতে হবে এবং এর গোশত শুধু হারাম এলাকার গরিব-মিসকিনদের হক। জরিমানা দাতা বা তার পরিবার এই গোশত খেতে পারবে না। তবে ‘সদকা’ নিজ দেশে বা অন্য কোনো অঞ্চলের গরিবদের দিলেও আদায় হয়ে যাবে।

৪. বিশেষ ওজর ও অসুস্থতার বিধান

যদি কেউ অসুস্থতা বা প্রচণ্ড শীতের মতো কোনো অনিবার্য ওজরের কারণে ইহরামের নিষিদ্ধ কাজ করে ফেলে (যেমন—মাথা ঢেকে রাখা বা সেলাই করা কাপড় পরা), তবে তার জন্য জরিমানা আদায়ের বিকল্প সুযোগ রয়েছে। ওজরের কারণে দম ওয়াজিব হলে সে চাইলে দমের পরিবর্তে তিনটি রোজা রাখতে পারে অথবা ছয়জন মিসকিনকে সদকা দিতে পারে। তবে কোনো ওজর ছাড়া বা ইচ্ছাকৃতভাবে ত্রুটি করলে দমের পরিবর্তে রোজা রাখার সুযোগ নেই; সে ক্ষেত্রে পশুই জবাই করতে হবে।

 

৫. কিছু জরুরি মাসআলা

ভুল ইচ্ছাকৃত হোক বা অনিচ্ছাকৃত, জরিমানা উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তবে অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য গুনাহ হবে না।

যদি একই ধরনের ভুল একাধিকবার হয় এবং দণ্ড আদায়ের আগেই তা ঘটে, তবে একটি জরিমানাই যথেষ্ট। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন ভুলের জন্য আলাদা আলাদা জরিমানা দিতে হবে।

নিছক সন্দেহের বশবর্তী হয়ে জরিমানা দেওয়া উচিত নয়। ভুলের বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে বা বিজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নিয়েই জরিমানা আদায় করা উচিত।

 

মনে রাখতে হবে, হজ ও ওমরাহর সফরে হাজিদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত খুশুখুজুর সঙ্গে প্রতিটি আমল সম্পন্ন করা। জরিমানার বিধান থাকলেও মুমিনের চেষ্টা থাকা উচিত যেন কোনো ভুলই না হয়। প্রতিটি কাজ করার আগে আলেমদের থেকে জেনে নেওয়া বা নির্ভরযোগ্য কিতাব অনুসরণ করা উচিত। আর কোনো ত্রুটি হয়ে গেলে তা গোপন না করে বা অবহেলা না করে দ্রুত সংশোধনের ব্যবস্থা করা উচিত। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবার হজ ও ওমরাহকে কবুল করুন এবং ছোট-বড় সব ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দিয়ে ‘হজ্জে মাবরুর’ নসিব করুন।

(তথ্যঋণ : কিতাবুল মানাসেক, মাসায়েলে হজ ও ওমরাহ, মাসিক আলকাউসার, হজ গাইডলাইন)

সূত্র: কালের কণ্ঠ