১৮০ দিন একটি নতুন সরকারের জন্য শুধু অর্জনের হিসাব দেখানোর সময় নয় বরং ভোটের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও মাঠের বাস্তবতার প্রথম বড় পরীক্ষা। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর দায়িত্ব নিয়ে বিএনপি সরকার বাজার দর নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহ, প্রশাসনিক সংস্কার ও ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দেয়। একই সঙ্গে নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে ১৮০ দিন, এক বছর ও পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সরকারের দাবি, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি ও প্রশাসনিক সংকট সামলে স্থিতিশীলতার ভিত্তি তৈরি হয়েছে। তবে বিরোধীদের মূল্যায়ন ভিন্ন। গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, প্রশাসনে দলীয় প্রভাব, আইনশৃঙ্খলা, বিদ্যুৎ-গ্যাস ও জ্বালানি সংকট এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে সরকার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
সরকারের পক্ষ থেকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে রিজার্ভ বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমা, প্রান্তিক কৃষকদের ঋণ মওকুফ এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বিস্তৃতি বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে। সরকারের ভাষ্য, এগুলো দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের প্রথম ধাপ। তবে বিরোধীদের প্রশ্ন পরিসংখ্যানে উন্নতি হলেও তার প্রভাব সাধারণ মানুষের বাজারের ব্যাগ, বিদ্যুতের বিল কিংবা দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কতটা পড়েছে?
গণভোটের রায় ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নকে ঘিরেই সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়। বিরোধীদের যুক্তি, এটি জনগণের সরাসরি ম্যান্ডেট। তাই সাধারণ সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের বদলে জুলাই সনদে নির্ধারিত কাঠামো অনুসরণ করেই সংস্কার করতে হবে।
অন্যদিকে সরকারের অবস্থান, সংবিধান পরিবর্তনের জন্য বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই এগোতে হবে। সরকার সংবিধান সংশোধনে সংসদের বিশেষ কমিটির মাধ্যমে এগোতে চায়। বিপরীতে জামায়াত, এনসিপিসহ বিরোধীদল সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে জুলাই সনদের সাংবিধানিক প্রস্তাব বাস্তবায়নের দাবি করছে। ফলে বিরোধটি শুধু সংস্কার হবে কি না এমন নয়; প্রশ্ন হচ্ছে, সংস্কার করবে কে, কোন প্রক্রিয়ায় এবং গণভোটের রায়কে কতটা বাধ্যতামূলক হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
জামায়াত আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানও বলেছেন, “জনগণের রায় অগ্রাহ্য করে সরকার বেশি দিন চলতে পারবে না। তিনি সতর্ক করেছেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারকে বেশি সময় দেওয়া হবে না।”
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সরকারকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছেন। তার অভিযোগ, “সরকার গণভোটের ফল ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।” একই সঙ্গে তিনি বিদ্যুৎ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেন জামায়াত জোটের এমপিরা
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা সক্রিয়। জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছেন,“সংসদে বিরোধীদলের সুযোগ সীমিত হওয়ায় জুলাই সনদ বাস্তবায়নে রাজপথে কর্মসূচি নিতে হচ্ছে।”
১১ দলীয় জোটের কর্মসূচিতেও জুলাই সনদ ও গণভোটের পাশাপাশি দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনে দলীয়করণ, বিদ্যুতের দাম, জ্বালানি সংকট, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির মতো ইস্যু সামনে এসেছে।
জুলাই সনদের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা দলীয় প্রভাবমুক্ত থাকবে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে প্রশাসন, পুলিশ ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় আনুগত্যের বদলে সততা, যোগ্যতা, মেধা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নিয়োগের কথা বলা হয়েছিল।
কিন্তু সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১১টি সিটি করপোরেশন ও ৪২টি জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। এসব প্রশাসকের সবাই বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং তাদের কেউ নির্বাচনে পরাজিত বা দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত ছিলেন। এরপর সরকারি বিভিন্ন সংস্থার শীর্ষ পদে বিএনপির নেতা কর্মীদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়।
দলীয় নিয়োগের বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “একটি একনায়কতান্ত্রিক বা স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পতনের পর নতুন রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ক্ষমতাকে নিজেদের মতো করে কুক্ষিগত করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।” একে তিনি ‘ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে সবকিছু একচেটিয়া দখল করার খেলা’ বা ‘Winner-takes-all’ নীতি হিসেবে উল্লেখ করেন।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী এসব নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, “নিয়োগগুলো যথাযথ প্রক্রিয়ায় হয়েছে।”
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নও সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকারের অন্যতম ছিল। চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, মাদক, ছিনতাই ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে অভিযান জোরদার এবং পুলিশি নজরদারি বাড়ানোর কথা জানানো হয়। কিন্তু কয়েক মাস পেরোতেই হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও সংঘবদ্ধ সহিংসতার মতো অপরাধের অভিযোগ সামনে আসতে থাকে। পুলিশ সদর দপ্তরের প্রাথমিক তথ্যের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মার্চ-এপ্রিল সময়ে হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধির বিষয়টিও উঠে আসে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ টিআইবির তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, “দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র বুঝতে পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরকারি পরিসংখ্যানকেই ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।”
অন্যদিকে বিএনপির অবস্থান তুলনামূলক ইতিবাচক। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগের সময়ের তুলনায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে এবং চাঁদাবাজি দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিএনপির সংসদ সদস্যদের চাঁদাবাজি, অপরাধ ও মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
সরকারের দাবি, অভিযান, নজরদারি ও রাজনৈতিক নির্দেশনার মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে; বিপরীতে বিরোধীদল ও কিছু স্বাধীন পর্যবেক্ষকের মতে, অপরাধের ধারাবাহিকতা এখনো উদ্বেগের কারণ। ফলে সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ, চাঁদাবাজি ও ছিনতাই কতটা কমেছে এবং অপরাধের পর বিচার কতটা দ্রুত ও কার্যকর হচ্ছে এসব প্রশ্নই আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনার বাস্তব সাফল্যের মাপকাঠি হয়ে উঠেছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতেও সরকারের ১৮০ দিনের অঙ্গীকার বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাবে ১৮ এপ্রিল থেকে জ্বালানি তেলের দাম বড় ধরনের সমন্বয় করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয়ের পাশাপাশি জ্বালানি খাতে আর্থিক চাপ সামাল দিতেই এই সিদ্ধান্ত। তবে এর প্রভাব পরিবহন, কৃষি, শিল্প এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
এ নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও সমালোচনা করে। জামায়াতে ইসলামী জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ হিসেবে তুলে ধরে। তাদের মতে, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যয় বাড়তে থাকলে জীবনযাত্রার ব্যয় যেমন বাড়বে, তেমনি সরকারের উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচিতেও আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।
এরপর জুনে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ বাড়ানো হয়। একই সময়ে পাইকারি বিদ্যুতের গড় মূল্য ইউনিটপ্রতি ৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। সরকারের যুক্তি ছিল উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় সামাল দেওয়া। কিন্তু বাড়তি বিলের পাশাপাশি লোডশেডিং অব্যাহত থাকায় জনভোগান্তি কমেনি।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) পক্ষ থেকে বলা হয়, দাম বাড়ানোর সুফল তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হওয়ার কথা নয়। গ্রাহকের কাছ থেকে বাড়তি অর্থ আদায় করে তা দিয়ে জ্বালানি সংগ্রহ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ধরে রাখতে সময় প্রয়োজন। তবে জুলাইয়ে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, “দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন সাত থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।” তিনি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবি জানান।
জুলাইয়ের শেষ দিকে গ্যাস সংকটে পড়ে দেশ। মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে গ্যাস সংকটের কারণে একপর্যায়ে লোডশেডিং বেড়ে ৯৬২ মেগাওয়াটে দাঁড়ায়। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ১২ কোটি ৫৫ লাখ ইউনিট থেকে কমে ৯ কোটি ৩৯ লাখ ইউনিটে নেমে আসে।
সংকট সামাল দিতে সরকারকে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি করতে হয়। জুলাইয়ের শেষদিকে এক কার্গো এলএনজি কিনতে প্রায় ৯৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়। ফলে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বাড়তি ব্যয়ের পাশাপাশি শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতেও সংকটের চাপ তৈরি হয়। বিরোধীরা এটিকে ১৮০ দিনের অঙ্গীকার পূরণে ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে দেখছে। তবে সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, দেশের গ্যাস সরবরাহের উল্লেখযোগ্য অংশ আমদানি করা এলএনজিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজার, টার্মিনালের সক্ষমতা ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ সরাসরি জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলে।

গত ১২ মার্চ থেকে সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়।
সরকারের সঙ্গে বিরোধীদলের সম্পর্কের আরেকটি দৃশ্যমান দিক ছিল সংসদের ভেতরের বিরোধিতা থেকে রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে ওঠা। এপ্রিল থেকে ১১ দলীয় জোটের কর্মসূচিতে গণমিছিল, বিক্ষোভ, সমাবেশ ও স্মারকলিপি দেওয়ার মতো কর্মসূচি ছিল। মূল দাবি ছিল জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় কার্যকর এবং সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা।
জুলাইয়ের শেষ দিকে নাহিদ ইসলাম ঘোষণা দেন, “গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে সরকারকে সহযোগিতা করা হবে না। অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে উঠে আসে শর্তসাপেক্ষ সহযোগিতার অবস্থান। জনস্বার্থে সরকারের ভালো উদ্যোগে সহযোগিতা করা হবে, তবে জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন হলে বিরোধীরা প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটও বিরোধীদের সমালোচনা থেকে রেহাই পায়নি। জামায়াত বাজেটকে ‘জনবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে বিক্ষোভ করে। দলটির অভিযোগ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার যথেষ্ট প্রতিফলন বাজেটে নেই। বাজেট বাস্তবায়ন নিয়েও তারা গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বাড়তি ব্যয়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ঝুঁকি তুলে ধরে।
বিএনপির সরকারের ১৮০ দিনের প্রতিশ্রুত কাজে মূল্যায়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত একটি সরকারকে পাঁচ বছর কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। তবে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন করছে, সেটিই সরকারের সফলতার প্রধান মাপকাঠি।”
তিনি বলেন, “এখনই এই সরকারকে ব্যর্থ বলার সুযোগ নেই। তবে জনগণের সঙ্গে করা কমিটমেন্ট, বিশেষ করে জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার পুরোপুরি অগ্রসর হচ্ছে না।”
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য ও দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “সরকারের ১৮০ দিনের কার্যক্রমে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কোনো ক্ষেত্রেই জনগণের সঙ্গে করা প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। বরং বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতির পরিবর্তে পশ্চাৎগতি দেখা যাচ্ছে।”
সরকারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে সারোয়ার তুষার বলেন, “বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোকজনকে প্রশাসক হিসেবে বসানো হয়েছে। অথচ ইশতেহারে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। সরকারের বর্তমান কর্মকাণ্ড সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন দলীয় লোকজনের পুনর্বাসনকেন্দ্রে পরিণত করা হচ্ছে। এটি সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।”
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রসঙ্গ তুলে সারোয়ার তুষার বলেন, “নতুন করে জ্বালানি ও বিদ্যুতের সংকট এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি তৈরি হয়েছে। এসব সরকারের ব্যর্থতা ও ব্যবস্থাপনার সমস্যার কারণে হয়েছে।”
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কী অবস্থা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেখলেই তা বোঝা যায়।”
বিএনপির সরকারের ১৮০ দিন সম্পর্কে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় জোটের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “১৮০ দিনে বিএনপি সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। বিশেষ করে গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের গড়িমসি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের অভিযোগ, চাঁদাবাজি-দুর্নীতি এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস ও জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করেছে। জনগণ যে পরিবর্তনের জন্য ভোট দিয়েছে, তার প্রতিফলন এখনো দৃশ্যমান নয়। সরকারকে গণভোটের রায় মেনে দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, দলীয়করণ বন্ধ এবং জনজীবনের সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।”
সরকারের ১৮০ দিনের মূল্যায়ন জানতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুম রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “একটি সরকারের প্রথম ১৮০ দিন দিয়ে তার পুরো মেয়াদের সাফল্য-ব্যর্থতার চূড়ান্ত বিচার করা যায় না, তবে এই সময়ের মধ্যেই সরকারের রাজনৈতিক দিক-নির্দেশনা ও অগ্রাধিকার অনেকটা স্পষ্ট হয়ে যায়। বিএনপি সরকার কিছু ক্ষেত্রে উদ্যোগ ও কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে, কিন্তু বড় প্রশ্ন হচ্ছে এসব উদ্যোগের কতটা জনগণের প্রত্যাশিত পরিবর্তনে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে, সেটি শুধু রাজনৈতিক বিরোধ নয়; এর সঙ্গে জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেটের প্রশ্নও জড়িত। তাই এ বিষয়ে দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সমাধানে পৌঁছানো সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
ড. আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, “একইভাবে বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, গ্যাস সংকট, দ্রব্যমূল্য ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মতো বিষয়গুলোতে সরকারের ব্যাখ্যার পাশাপাশি সাধারণ মানুষ বাস্তবে কী সুবিধা পাচ্ছে, সেটিই বড় বিবেচ্য। আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনে দলীয়করণের অভিযোগ যদি ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তাহলে সরকারের প্রতি আস্থার জায়গাটি দুর্বল হতে পারে। আমার মনে হয়, আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান কমানো এবং বিরোধীদলের সঙ্গে সংঘাতের বদলে রাজনৈতিক ঐকমত্যের মাধ্যমে সংস্কার এগিয়ে নেওয়া। সরকারের হাতে এখনো সময় আছে; তবে প্রথম ১৮০ দিনের অভিজ্ঞতা থেকে দ্রুত শিক্ষা নিয়ে দৃশ্যমান ফল দেখাতে না পারলে জনআস্থার সংকট আরো গভীর হতে পারে।”

ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 
























