বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘আমাকে একটু শান্তিতে মরতে দাও’, আত্মহত্যার আগে সাবেক মিস পুনের আকুতি

রীতিমত উড়ন্ত ক্যারিয়ার ছিল ত্বিশা শর্মার। নয়ডার মেয়ে ত্বিশা ক্যারিয়ার গড়তে গিয়েছিলেন পুনেতে।

২০১২ সালে তিনি মিস পুনে নির্বাচিত হন। এরপর তিনি লরিয়াল এবং ডাভের মতো নামী ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনে মডেল হিসেবে কাজ করেছিলেন। এরপর কয়েকটি তেলেগু চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন ত্বিশা। মডেলিং আর অভিনয়ের জগৎ ছেড়ে যোগ দেন একটি সুপ্রতিষ্ঠিত কর্পোরেট সংস্থায়।

সেখানেও দ্রুতই তিনি উচ্চপদে আসীন হন।
গতবছর ফেব্রুয়ারিতে একটি ডেটিং অ্যাপে পরিচয় হয় আইনজীবী সমর্থ সিংএর সাথে। দ্রুতই তারা প্রেমে পড়েন। গতবছর ৯ ডিসেম্বর দিল্লিতে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে বিয়ে করেন ত্বিশা আর সমর্থ।

বিয়ের পর কর্পোরেট চাকরিও ছেড়ে দেন ত্বিশা। মডেলিং, অভিনয়, কর্পোরেট ক্যারিয়ার ছেড়ে থিতু হতে চেয়েছিলেন সংসারে। কিন্তু সমর্থ আর তার মা সাবেক বিচারক গিরিবালা সিং মিলে মাত্র ৫ মাসে ত্বিশার জীবনকে নরক বানিয়ে ফেলেন। সংসার নামের নরক থেকে মুক্তি পেতে বাসার ছাদে জিমন্যাস্টিক বেল্টে ঝুলে পড়েন ত্বিশা।
ঘটনাটি গত ১২ মে রাতে।

ঘটেছিল ভোপালের কাটারা হিলস এলাকার শ্বশুর বাড়িতে। ঘটনার ১০ দিন পর জব্বলপুর থেকে ত্বিশার স্বামী সমর্থ সিং আর ২৮ মে তার নিজ বাড়ি থেকে শ্বাশুড়ী গিরিবাংলা সিংকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা দুজনই এখন কারাগারে আছেন। এ ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব ছিল সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-সিবিআইয়ের হাতে। তারা গত ১৪ আগস্ট ৩০ পৃষ্ঠার চার্জশিট জমা দিয়েছে আদালতে। সাথে ছিল ৬০৬ পৃষ্ঠার নথিপত্র। সিবিআইয়ের চার্জশিটে সমর্থ সিং ও তার মা গিরিবালা সিংএর বিরুদ্ধে ত্বিশাকে ক্রমাগত মানসিক নির্যাতন এবং আত্মহত্যায় প্ররোচণার অভিযোগ আনা হয়েছে। চার্জশিটে ত্বিশার আত্মহত্যার ঘটনা পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে সিবিআইয়ের চার্জশিটটি কেবল একটি রাতের ঘটনার পুনর্গঠন নয়। হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা, ফোন কল, পরিবারের জবানবন্দি, চিকিৎসক, কাউন্সেলিং সেশন, সিসিটিভি ফুটেজ এবং আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগের সূত্র ধরে সিবিআই এমন এক পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরেছে; যেখানে মাত্র পাঁচ মাস স্থায়ী একটি দাম্পত্য জীবনের ভেতর মাসের পর মাস ধরে বাড়তে থাকা মানসিক নির্যাতনের করুণ চিত্র উঠে এসেছে, উঠে এসেছে এক সফল নারীর করুণ পরিণতির ছবি। শেষ বেলায় তিনি শুধু একটু শান্তিতে মরতে চেয়েছিলেন।
শেষ দিনগুলোয় ত্বিশা শর্মার মানসিক সঙ্গী ছিলেন তার ভাবি রাশি অ্যাব্রোল। তার কাছেই মন খুলে সুখ-দুঃখের কথা বলতেন ত্বিশা। ১২ মে রাত ৯টা ৩৬ মিনিটে ত্বিশা তার ভাবিকে হোয়াটসঅ্যাপে একটি ভয়ঙ্কর বার্তা পাঠান, ‘তাকে তার স্ত্রীর অবশিষ্টাংশ সংগ্রহ করতে বলো। তবে আগামীকাল। এখন আমাকে শান্তিতে মরতে দাও।’ সিবিআই-এর উল্লেখ করা সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী এই মেসেজ পাঠানোর চার মিনিট পর ত্বিশাকে বাড়ির নিচতলা থেকে একা একা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ছাদের দিকে হেঁটে যেতে দেখা যায়। রাত ৯টা ৪১ মিনিটে তিনি তার বাবাকে ফোন করেন। কাঁদতে কাঁদতে ত্বিশা তার বাবাকে জানান, তার স্বামী সমর্থ সিং খুবই আক্রমণাত্মক ও হিংস্র হয়ে উঠেছেন, তিনি ভীষণ ভয় পাচ্ছেন এবং তার বাবা-মায়ের উচিত যত দ্রুত সম্ভব তার কাছে আসা। রাত ১০টা ৫ মিনিট নাগাদ তিনি তার মাকে ফোন করেন এবং আবারও বলেন যে সমর্থ আক্রমণাত্মক ও হিংস্র হয়ে উঠেছেন। এরপর ফোনটি কেটে যায়। মায়ের কাছেই ছিল ত্বিশার জীবনের শেষ কল।

ত্বিশা মৃত্যুর দিন সকালেই তিনি নিজের পরিবারের কাছে ফিরে যেতে ট্রেনের টিকিট বুক করেছিলেন। সিবিআই-এর তথ্য অনুযায়ী বিয়ের পর সমর্থ ত্বিশাকে ক্রমাগত মানসিক নির্যাতন করতেন, তার বিরুদ্ধে যৌন অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করতেন এবং বিয়ের আগে ত্বিশা নিজে থেকে যেসব সম্পর্কের কথা জানিয়েছিলেন, তা নিয়ে তার চরিত্র হরণ করতেন। সিবিআই আরও অভিযোগ করেছে যে, ত্বিশা যখন সমর্থের আচরণ নিয়ে নালিশ করতেন, তখন গিরিবালা সিং বারবার তার ছেলেকে উসকানি দিতেন অথবা ছেলের পক্ষ নিতেন।

চার্জশিটে বর্ণনা করা হয়েছে যে, ২০২৬ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাস নাগাদ তাদের সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটে। ১৬ এপ্রিল ত্বিশা জানতে পারেন যে তিনি গর্ভবতী। সিবিআই-এর তথ্য অনুযায়ী, এই গর্ভধারণটি পূর্বপরিকল্পিত না হওয়ায় এবং সমর্থের নির্যাতনমূলক আচরণের কারণে তিনি সন্তান নেওয়ার ব্যাপারে অনিশ্চিত ছিলেন। ১৭ এপ্রিল তাদের মধ্যে এই নিয়ে তর্কাতর্কি হয়, যেখানে সমর্থ আবারও তাঁর বিরুদ্ধে অত্যন্ত অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করেন। দাম্পত্য কলহের পাশাপাশি এখানে জড়িয়ে ছিল অর্থকড়ির বিষয়ও। চার্জশিটে বলা হয়েছে, শেয়ার বাজারে ত্বিশার প্রায় ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা ছিল। সমর্থ এবং গিরিবালা ওই টাকা ত্বিশা ও সমর্থের যৌথ অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করার জন্য চাপ দিতে থাকেন। ত্বিশা তা করতে অস্বীকৃতি জানান এবং তাদের বলেন যে এই টাকা তার বাবার।

চার্জশিটের পাতার পর পাতা জুড়ে রয়েছে ত্বিশার নিজের পাঠানো বার্তাগুলো। ৩০ এপ্রিল ত্বিশা হোয়াটস্অ্যাপে তার মাকে লিখেছিলেন, ‘আমার জীবনটা নরক হয়ে গেছে, মা।’ সেদিনই তাকে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সিবিআই জানায়, ৬ মে ত্বিশা তার আগের চাকরিতে পুনরায় যোগ দেওয়ার একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেন। একই দিনে, তিনি গর্ভপাত করার জন্য প্রথম ডোজের ওষুধ সেবন করেন। এর কয়েক ঘণ্টা পর, ৭ মে ভোরে, তিনি তার মাকে বেশ কয়েকটি বার্তা পাঠিয়ে তাকে এসে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন। চার্জশিটে উল্লেখ করা একটি বার্তায় লেখা ছিল, ‘মা, দয়া করে আগামীকালই আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও।’

চার্জশিট অনুযায়ী, গিরিবালা চেয়েছিলেন ত্বিশা যেন খোঁজ নিয়ে দেখেন যে প্রথম ডোজের ওষুধ খাওয়ার পরেও গর্ভধারণটি বজায় রাখা সম্ভব কি না। ৭ মে ত্বিশা তার শাশুড়ির সাথে একটি হাসপাতালে যান। কিন্তু চিকিৎসক তাদের জানান যে এই প্রক্রিয়াটি আর ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। গর্ভপাতের কারণে গিরিবালা ত্বিশার ওপর ভয়ঙ্কর ক্ষিপ্ত হন। ত্বিশা তার ভাবিকে জানিয়েছিলেন যে, গর্ভপাতের কারণে গিরিবালা তাকে তিনবার ‘খুনি’ বলে ডেকেছেন। সিবিআই রাশি আব্রোলের কাছে পাঠানো ত্বিশার একটি বার্তাও রেকর্ড করেছে, ‘এই লোকটা উন্মাদ। সে আবার আগের মতো আচরণ শুরু করেছে। আমি এবার ভেঙে পড়ছি, এখানে আমি কোনো ভবিষ্যৎ দেখছি না।’

৮ মে ত্বিশা গর্ভপাতের দ্বিতীয় ডোজের ওষুধ নেন। সিবিআই-এর তথ্য অনুযায়ী, তিনি তীব্র ব্যথা এবং রক্তক্ষরণে ভুগছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন, এর প্রতিক্রিয়ায় সমর্থ তার বিরুদ্ধে ‘নাটক’ করার অভিযোগ তোলেন এবং গিরিবালা তাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করেন। ৯ মে নাগাদ তদন্তকারীদের হাতে আসা হোয়াটস্অ্যাপ মেসেজগুলোর ভাষা আরো খারাপ রূপ নেয়। ত্বিশা তার মায়ের কাছে অভিযোগ করেন যে, তিনি যে গর্ভপাত করেছেন সেই সন্তানটি আদৌ সমর্থের কি না; তা নিয়েও সমর্থ প্রশ্ন তুলেছেন। চার্জশিটে তার একটি উক্তি উল্লেখ করা হয়েছে, ‘আমার এখন এখানে দম আটকে আসছে, মা।’ সেদিনই রাশি আব্রোলের সাথে আরেকটি বার্তায় চার্জশিট অনুযায়ী ত্বিশা তার মরে যাওয়ার এবং হারিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। মৃত্যুর আগের দিনও ত্বিশা তার মাকে মেসেজ পাঠিয়েছিলেন। সিবিআই জানায়, ত্বিশা অভিযোগ করেছিলেন যে তার মানসিক অবস্থার জন্য কেবল তাকেই দোষারোপ করা হচ্ছে। অথচ তার স্বামী যে তাকে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করেছেন; সেটা কেউ দেখছে না।

১২ মে ভয়ঙ্কর দিনটি শুরু হয়েছিল ত্বিশার চলে যাওয়ার একটি প্রচেষ্টার মাধ্যমে। সিবিআই জানায়, ত্বিশা তার মাকে ফোন করে রাজস্থানের নাসিরাবাদের ট্রেনের টিকিট বুক করার জন্য ৩ হাজার রুপি চান। তিনি তার মা ও ভাবিকে জানান যে, সম্পর্কটি বাঁচানোর জন্য তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সমর্থ যেহেতু কাপল কাউন্সেলিংয়ে যেতে রাজি নন, তাই তিনি ফিরে আসতে চান। তার বাবা তাকে ৩ হাজার রুপি পাঠালে তিনি ট্রেনের টিকেট বুক করেন। ত্বিশা চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জানার পরই সমর্থ কাউন্সেলিং সেশনে যেতে রাজি হন। বেলা প্রায় সাড়ে ১১টায় এই দম্পতি ডক্টর কাকলি রায়ের সাথে দেখা করেন। দুপুর ১টা নাগাদ তারা বাড়ি ফিরে আসেন। ত্বিশা বিকেল ৩টা ১১ মিনিটে একটি বিউটি পার্লারে যান এবং সন্ধ্যা ৬টা ১১ মিনিট ফিরে আসেন। চার্জশিট অনুযায়ী, বাড়ি ফিরে ত্বিশা সমর্থ ও গিরিবালাকে বাইরে হাঁটতে দেখেন এবং তাদের সাথে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তার অভিযোগ, তারা দুজনেই তাকে উপেক্ষা করেন। তিনি তার মাকে ফোন করে বলেন যে, তিনি বুঝতে পেরেছেন এই দাম্পত্য জীবনে আর কোনো কিছুই ঠিক হওয়া সম্ভব নয়। রাত প্রায় ৯টা ২০ মিনিটে ত্বিশা রাশি আব্রোলের সাথে ফোনে কথা বলছিলেন। চার্জশিটে বলা হয়েছে, তিনি অনবরত কাঁদছিলেন। রাত ৯টা ২৯ মিনিটে ত্বিশা আরেকটি ফোনের উত্তর দিলেও তিনি এত বেশি কাঁদছিলেন যে কিছুই বোঝা যায়নি।। রাত ৯টা ৩৬ মিনিটে সেই বার্তাটি আসে, ‘এখন আমাকে শান্তিতে মরতে দাও।’ রাত প্রায় ৯টা ৪০ মিনিটে সিসিটিভি ক্যামেরায় তাকে একা একা ছাদের দিকে যেতে দেখা যায়। রাত ৯টা ৪১ মিনিটে তিনি তার বাবার সাথে কথা বলেন; তিনি কাঁদছিলেন এবং তার বাবা-মাকে দ্রুত চলে আসতে বলছিলেন। রাত প্রায় ১০টা ৫ মিনিটে ত্বিশা তার জীবনের শেষ কলটি করেন তার মাকে।

এরপর ত্বিশার মা বারবার তাকে ফোন করার চেষ্টা করেন। চার্জশিট অনুযায়ী, ত্বিশার মা সমর্থকেও ফোন করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু কোনো উত্তর পাননি। রাত ১০টা ১০ মিনিটে তিনি গিরিবালাকে ফোন করেন এবং ত্বিশা প্রচণ্ড কাঁদছিলেন জানিয়ে তাকে একবার ত্বিশাকে দেখতে বলেন। সিবিআই জানায়, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে গিরিবালা রাত প্রায় ১০টা ১৬ মিনিটে তার দোতলার ঘর থেকে বের হয়ে নিচে ত্বিশার শোবার ঘরের দিকে যাচ্ছেন। ত্বিশাকে খুঁজে না পেয়ে তিনি রাত ১০টা ১৮ মিনিটে তাকে ফোন করেন। রাত ১০টা ২১ মিনিটে গিরিবালা সমর্থকে ফোন করেন। রাত ১০টা ২৩ মিনিটে সিসিটিভি ফুটেজে গিরিবালা এবং তার পেছনে পেছনে সমর্থকে ছাদের দিকে যেতে দেখা যায়।

পরবর্তীতে সমর্থ, তার ভাই ও একজন গৃহকর্মী ত্বিশাকে নিচে নামিয়ে আনেন এবং ভোপাল এইমস হাসপাতালে নিয়ে যান। ১০টা ৫৫ মিনিটে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এইমস-এর দ্বিতীয় ময়নাতদন্তে এটিকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়েছে। সিবিআই বলছে, মামলাটি এমন নয় যে ত্বিশাকে শারীরিকভাবে হত্যা করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ হলো, ক্রমাগত মানসিক নির্যাতনই তাকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিয়েছে। সিবিআই শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, সমর্থ সিং এবং গিরিবালা সিং ত্বিশাকে এমন পর্যায়ে মানসিক নির্যাতন করেছিলেন যে নিজের জীবন শেষ করা ছাড়া ত্বিশার কাছে আর কোনো উপায় ছিল না।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

‘আমাকে একটু শান্তিতে মরতে দাও’, আত্মহত্যার আগে সাবেক মিস পুনের আকুতি

প্রকাশিত সময় : ১১:০২:০৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬

রীতিমত উড়ন্ত ক্যারিয়ার ছিল ত্বিশা শর্মার। নয়ডার মেয়ে ত্বিশা ক্যারিয়ার গড়তে গিয়েছিলেন পুনেতে।

২০১২ সালে তিনি মিস পুনে নির্বাচিত হন। এরপর তিনি লরিয়াল এবং ডাভের মতো নামী ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনে মডেল হিসেবে কাজ করেছিলেন। এরপর কয়েকটি তেলেগু চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন ত্বিশা। মডেলিং আর অভিনয়ের জগৎ ছেড়ে যোগ দেন একটি সুপ্রতিষ্ঠিত কর্পোরেট সংস্থায়।

সেখানেও দ্রুতই তিনি উচ্চপদে আসীন হন।
গতবছর ফেব্রুয়ারিতে একটি ডেটিং অ্যাপে পরিচয় হয় আইনজীবী সমর্থ সিংএর সাথে। দ্রুতই তারা প্রেমে পড়েন। গতবছর ৯ ডিসেম্বর দিল্লিতে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে বিয়ে করেন ত্বিশা আর সমর্থ।

বিয়ের পর কর্পোরেট চাকরিও ছেড়ে দেন ত্বিশা। মডেলিং, অভিনয়, কর্পোরেট ক্যারিয়ার ছেড়ে থিতু হতে চেয়েছিলেন সংসারে। কিন্তু সমর্থ আর তার মা সাবেক বিচারক গিরিবালা সিং মিলে মাত্র ৫ মাসে ত্বিশার জীবনকে নরক বানিয়ে ফেলেন। সংসার নামের নরক থেকে মুক্তি পেতে বাসার ছাদে জিমন্যাস্টিক বেল্টে ঝুলে পড়েন ত্বিশা।
ঘটনাটি গত ১২ মে রাতে।

ঘটেছিল ভোপালের কাটারা হিলস এলাকার শ্বশুর বাড়িতে। ঘটনার ১০ দিন পর জব্বলপুর থেকে ত্বিশার স্বামী সমর্থ সিং আর ২৮ মে তার নিজ বাড়ি থেকে শ্বাশুড়ী গিরিবাংলা সিংকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা দুজনই এখন কারাগারে আছেন। এ ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব ছিল সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-সিবিআইয়ের হাতে। তারা গত ১৪ আগস্ট ৩০ পৃষ্ঠার চার্জশিট জমা দিয়েছে আদালতে। সাথে ছিল ৬০৬ পৃষ্ঠার নথিপত্র। সিবিআইয়ের চার্জশিটে সমর্থ সিং ও তার মা গিরিবালা সিংএর বিরুদ্ধে ত্বিশাকে ক্রমাগত মানসিক নির্যাতন এবং আত্মহত্যায় প্ররোচণার অভিযোগ আনা হয়েছে। চার্জশিটে ত্বিশার আত্মহত্যার ঘটনা পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে সিবিআইয়ের চার্জশিটটি কেবল একটি রাতের ঘটনার পুনর্গঠন নয়। হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা, ফোন কল, পরিবারের জবানবন্দি, চিকিৎসক, কাউন্সেলিং সেশন, সিসিটিভি ফুটেজ এবং আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগের সূত্র ধরে সিবিআই এমন এক পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরেছে; যেখানে মাত্র পাঁচ মাস স্থায়ী একটি দাম্পত্য জীবনের ভেতর মাসের পর মাস ধরে বাড়তে থাকা মানসিক নির্যাতনের করুণ চিত্র উঠে এসেছে, উঠে এসেছে এক সফল নারীর করুণ পরিণতির ছবি। শেষ বেলায় তিনি শুধু একটু শান্তিতে মরতে চেয়েছিলেন।
শেষ দিনগুলোয় ত্বিশা শর্মার মানসিক সঙ্গী ছিলেন তার ভাবি রাশি অ্যাব্রোল। তার কাছেই মন খুলে সুখ-দুঃখের কথা বলতেন ত্বিশা। ১২ মে রাত ৯টা ৩৬ মিনিটে ত্বিশা তার ভাবিকে হোয়াটসঅ্যাপে একটি ভয়ঙ্কর বার্তা পাঠান, ‘তাকে তার স্ত্রীর অবশিষ্টাংশ সংগ্রহ করতে বলো। তবে আগামীকাল। এখন আমাকে শান্তিতে মরতে দাও।’ সিবিআই-এর উল্লেখ করা সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী এই মেসেজ পাঠানোর চার মিনিট পর ত্বিশাকে বাড়ির নিচতলা থেকে একা একা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ছাদের দিকে হেঁটে যেতে দেখা যায়। রাত ৯টা ৪১ মিনিটে তিনি তার বাবাকে ফোন করেন। কাঁদতে কাঁদতে ত্বিশা তার বাবাকে জানান, তার স্বামী সমর্থ সিং খুবই আক্রমণাত্মক ও হিংস্র হয়ে উঠেছেন, তিনি ভীষণ ভয় পাচ্ছেন এবং তার বাবা-মায়ের উচিত যত দ্রুত সম্ভব তার কাছে আসা। রাত ১০টা ৫ মিনিট নাগাদ তিনি তার মাকে ফোন করেন এবং আবারও বলেন যে সমর্থ আক্রমণাত্মক ও হিংস্র হয়ে উঠেছেন। এরপর ফোনটি কেটে যায়। মায়ের কাছেই ছিল ত্বিশার জীবনের শেষ কল।

ত্বিশা মৃত্যুর দিন সকালেই তিনি নিজের পরিবারের কাছে ফিরে যেতে ট্রেনের টিকিট বুক করেছিলেন। সিবিআই-এর তথ্য অনুযায়ী বিয়ের পর সমর্থ ত্বিশাকে ক্রমাগত মানসিক নির্যাতন করতেন, তার বিরুদ্ধে যৌন অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করতেন এবং বিয়ের আগে ত্বিশা নিজে থেকে যেসব সম্পর্কের কথা জানিয়েছিলেন, তা নিয়ে তার চরিত্র হরণ করতেন। সিবিআই আরও অভিযোগ করেছে যে, ত্বিশা যখন সমর্থের আচরণ নিয়ে নালিশ করতেন, তখন গিরিবালা সিং বারবার তার ছেলেকে উসকানি দিতেন অথবা ছেলের পক্ষ নিতেন।

চার্জশিটে বর্ণনা করা হয়েছে যে, ২০২৬ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাস নাগাদ তাদের সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটে। ১৬ এপ্রিল ত্বিশা জানতে পারেন যে তিনি গর্ভবতী। সিবিআই-এর তথ্য অনুযায়ী, এই গর্ভধারণটি পূর্বপরিকল্পিত না হওয়ায় এবং সমর্থের নির্যাতনমূলক আচরণের কারণে তিনি সন্তান নেওয়ার ব্যাপারে অনিশ্চিত ছিলেন। ১৭ এপ্রিল তাদের মধ্যে এই নিয়ে তর্কাতর্কি হয়, যেখানে সমর্থ আবারও তাঁর বিরুদ্ধে অত্যন্ত অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করেন। দাম্পত্য কলহের পাশাপাশি এখানে জড়িয়ে ছিল অর্থকড়ির বিষয়ও। চার্জশিটে বলা হয়েছে, শেয়ার বাজারে ত্বিশার প্রায় ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা ছিল। সমর্থ এবং গিরিবালা ওই টাকা ত্বিশা ও সমর্থের যৌথ অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করার জন্য চাপ দিতে থাকেন। ত্বিশা তা করতে অস্বীকৃতি জানান এবং তাদের বলেন যে এই টাকা তার বাবার।

চার্জশিটের পাতার পর পাতা জুড়ে রয়েছে ত্বিশার নিজের পাঠানো বার্তাগুলো। ৩০ এপ্রিল ত্বিশা হোয়াটস্অ্যাপে তার মাকে লিখেছিলেন, ‘আমার জীবনটা নরক হয়ে গেছে, মা।’ সেদিনই তাকে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সিবিআই জানায়, ৬ মে ত্বিশা তার আগের চাকরিতে পুনরায় যোগ দেওয়ার একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেন। একই দিনে, তিনি গর্ভপাত করার জন্য প্রথম ডোজের ওষুধ সেবন করেন। এর কয়েক ঘণ্টা পর, ৭ মে ভোরে, তিনি তার মাকে বেশ কয়েকটি বার্তা পাঠিয়ে তাকে এসে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন। চার্জশিটে উল্লেখ করা একটি বার্তায় লেখা ছিল, ‘মা, দয়া করে আগামীকালই আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও।’

চার্জশিট অনুযায়ী, গিরিবালা চেয়েছিলেন ত্বিশা যেন খোঁজ নিয়ে দেখেন যে প্রথম ডোজের ওষুধ খাওয়ার পরেও গর্ভধারণটি বজায় রাখা সম্ভব কি না। ৭ মে ত্বিশা তার শাশুড়ির সাথে একটি হাসপাতালে যান। কিন্তু চিকিৎসক তাদের জানান যে এই প্রক্রিয়াটি আর ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। গর্ভপাতের কারণে গিরিবালা ত্বিশার ওপর ভয়ঙ্কর ক্ষিপ্ত হন। ত্বিশা তার ভাবিকে জানিয়েছিলেন যে, গর্ভপাতের কারণে গিরিবালা তাকে তিনবার ‘খুনি’ বলে ডেকেছেন। সিবিআই রাশি আব্রোলের কাছে পাঠানো ত্বিশার একটি বার্তাও রেকর্ড করেছে, ‘এই লোকটা উন্মাদ। সে আবার আগের মতো আচরণ শুরু করেছে। আমি এবার ভেঙে পড়ছি, এখানে আমি কোনো ভবিষ্যৎ দেখছি না।’

৮ মে ত্বিশা গর্ভপাতের দ্বিতীয় ডোজের ওষুধ নেন। সিবিআই-এর তথ্য অনুযায়ী, তিনি তীব্র ব্যথা এবং রক্তক্ষরণে ভুগছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন, এর প্রতিক্রিয়ায় সমর্থ তার বিরুদ্ধে ‘নাটক’ করার অভিযোগ তোলেন এবং গিরিবালা তাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করেন। ৯ মে নাগাদ তদন্তকারীদের হাতে আসা হোয়াটস্অ্যাপ মেসেজগুলোর ভাষা আরো খারাপ রূপ নেয়। ত্বিশা তার মায়ের কাছে অভিযোগ করেন যে, তিনি যে গর্ভপাত করেছেন সেই সন্তানটি আদৌ সমর্থের কি না; তা নিয়েও সমর্থ প্রশ্ন তুলেছেন। চার্জশিটে তার একটি উক্তি উল্লেখ করা হয়েছে, ‘আমার এখন এখানে দম আটকে আসছে, মা।’ সেদিনই রাশি আব্রোলের সাথে আরেকটি বার্তায় চার্জশিট অনুযায়ী ত্বিশা তার মরে যাওয়ার এবং হারিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। মৃত্যুর আগের দিনও ত্বিশা তার মাকে মেসেজ পাঠিয়েছিলেন। সিবিআই জানায়, ত্বিশা অভিযোগ করেছিলেন যে তার মানসিক অবস্থার জন্য কেবল তাকেই দোষারোপ করা হচ্ছে। অথচ তার স্বামী যে তাকে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করেছেন; সেটা কেউ দেখছে না।

১২ মে ভয়ঙ্কর দিনটি শুরু হয়েছিল ত্বিশার চলে যাওয়ার একটি প্রচেষ্টার মাধ্যমে। সিবিআই জানায়, ত্বিশা তার মাকে ফোন করে রাজস্থানের নাসিরাবাদের ট্রেনের টিকিট বুক করার জন্য ৩ হাজার রুপি চান। তিনি তার মা ও ভাবিকে জানান যে, সম্পর্কটি বাঁচানোর জন্য তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সমর্থ যেহেতু কাপল কাউন্সেলিংয়ে যেতে রাজি নন, তাই তিনি ফিরে আসতে চান। তার বাবা তাকে ৩ হাজার রুপি পাঠালে তিনি ট্রেনের টিকেট বুক করেন। ত্বিশা চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জানার পরই সমর্থ কাউন্সেলিং সেশনে যেতে রাজি হন। বেলা প্রায় সাড়ে ১১টায় এই দম্পতি ডক্টর কাকলি রায়ের সাথে দেখা করেন। দুপুর ১টা নাগাদ তারা বাড়ি ফিরে আসেন। ত্বিশা বিকেল ৩টা ১১ মিনিটে একটি বিউটি পার্লারে যান এবং সন্ধ্যা ৬টা ১১ মিনিট ফিরে আসেন। চার্জশিট অনুযায়ী, বাড়ি ফিরে ত্বিশা সমর্থ ও গিরিবালাকে বাইরে হাঁটতে দেখেন এবং তাদের সাথে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তার অভিযোগ, তারা দুজনেই তাকে উপেক্ষা করেন। তিনি তার মাকে ফোন করে বলেন যে, তিনি বুঝতে পেরেছেন এই দাম্পত্য জীবনে আর কোনো কিছুই ঠিক হওয়া সম্ভব নয়। রাত প্রায় ৯টা ২০ মিনিটে ত্বিশা রাশি আব্রোলের সাথে ফোনে কথা বলছিলেন। চার্জশিটে বলা হয়েছে, তিনি অনবরত কাঁদছিলেন। রাত ৯টা ২৯ মিনিটে ত্বিশা আরেকটি ফোনের উত্তর দিলেও তিনি এত বেশি কাঁদছিলেন যে কিছুই বোঝা যায়নি।। রাত ৯টা ৩৬ মিনিটে সেই বার্তাটি আসে, ‘এখন আমাকে শান্তিতে মরতে দাও।’ রাত প্রায় ৯টা ৪০ মিনিটে সিসিটিভি ক্যামেরায় তাকে একা একা ছাদের দিকে যেতে দেখা যায়। রাত ৯টা ৪১ মিনিটে তিনি তার বাবার সাথে কথা বলেন; তিনি কাঁদছিলেন এবং তার বাবা-মাকে দ্রুত চলে আসতে বলছিলেন। রাত প্রায় ১০টা ৫ মিনিটে ত্বিশা তার জীবনের শেষ কলটি করেন তার মাকে।

এরপর ত্বিশার মা বারবার তাকে ফোন করার চেষ্টা করেন। চার্জশিট অনুযায়ী, ত্বিশার মা সমর্থকেও ফোন করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু কোনো উত্তর পাননি। রাত ১০টা ১০ মিনিটে তিনি গিরিবালাকে ফোন করেন এবং ত্বিশা প্রচণ্ড কাঁদছিলেন জানিয়ে তাকে একবার ত্বিশাকে দেখতে বলেন। সিবিআই জানায়, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে গিরিবালা রাত প্রায় ১০টা ১৬ মিনিটে তার দোতলার ঘর থেকে বের হয়ে নিচে ত্বিশার শোবার ঘরের দিকে যাচ্ছেন। ত্বিশাকে খুঁজে না পেয়ে তিনি রাত ১০টা ১৮ মিনিটে তাকে ফোন করেন। রাত ১০টা ২১ মিনিটে গিরিবালা সমর্থকে ফোন করেন। রাত ১০টা ২৩ মিনিটে সিসিটিভি ফুটেজে গিরিবালা এবং তার পেছনে পেছনে সমর্থকে ছাদের দিকে যেতে দেখা যায়।

পরবর্তীতে সমর্থ, তার ভাই ও একজন গৃহকর্মী ত্বিশাকে নিচে নামিয়ে আনেন এবং ভোপাল এইমস হাসপাতালে নিয়ে যান। ১০টা ৫৫ মিনিটে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এইমস-এর দ্বিতীয় ময়নাতদন্তে এটিকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়েছে। সিবিআই বলছে, মামলাটি এমন নয় যে ত্বিশাকে শারীরিকভাবে হত্যা করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ হলো, ক্রমাগত মানসিক নির্যাতনই তাকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিয়েছে। সিবিআই শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, সমর্থ সিং এবং গিরিবালা সিং ত্বিশাকে এমন পর্যায়ে মানসিক নির্যাতন করেছিলেন যে নিজের জীবন শেষ করা ছাড়া ত্বিশার কাছে আর কোনো উপায় ছিল না।