একটি ভিডিওর কথা আমি কিছুতেই ভুলতে পারছি না। একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ, একটি সাধারণ ঘরে, একটি সাধারণ বইয়ের তাকের সামনে বসে আছেন। এমন এক ব্যক্তির ধীর, স্থির ভঙ্গিতে কথা বলছেন, যিনি জীবনের বহু বছর ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের বিষয়টি বুঝিয়ে কাটিয়েছেন।
তিনি যে কথাগুলো বলেন, সেগুলো খুবই সাধারণ: ‘আমি গণহত্যার বিরোধিতা করি, আমি ফিলিস্তিন অ্যাকশন-কে সমর্থন করি।’
কিন্তু এই কথাগুলোই একটি সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
মিডল্যান্ডসের কয়েকটি বাড়িতে সন্ত্রাসবাদবিরোধী কর্মকর্তারা অভিযান চালিয়েছেন। ডিভাইস জব্দ করা হয়েছে, অভিযানের সময় দরজা ভেঙে ঢোকা হয়েছে। বাকিরা এখনও অপেক্ষা করছেন।
আর প্রথমেই যে বিষয়টি চোখে পড়ে তা হলো—তাদের প্রায় সবাই শ্বেতাঙ্গ।
নির্দোষ বলে ধরে নেওয়ার সুবিধা
২৫ বছর ধরে টেররিজম অ্যাক্ট ২০০০ আমার সম্প্রদায়ের সাধারণ জীবনের প্রায় প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে আছে।
এটি প্রিভেন্ট-এর সেই রেফারেল, যেখানে কোনো শিশু একটি শব্দ ভুল উচ্চারণ করার কারণে নজরে পড়ে যায়।
এটি সেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, যা কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই বন্ধ হয়ে যায়।
এটি সেই বন্ধু, যে নয় মাস বেলমার্স কারাগারে কাটায়, তারপর অভিযোগ নিঃশব্দে বাতিল হয়ে যায়—এবং যে সংবাদমাধ্যমগুলো প্রথমে তার বিরুদ্ধে শিরোনাম করেছিল, তাদের কেউ সংশোধনী প্রকাশ করে না।
বৈষম্যের পরিসংখ্যান বহু বছর ধরেই আমাদের সামনে রয়েছে। আমার সংগঠন চেইজ ইন্টারন্যাশনাল দীর্ঘদিন ধরে শিডিউল ৭-এর তল্লাশিতে মুসলিম পটভূমির মানুষের বিরুদ্ধে প্রায় ১৫০:১ অনুপাতের বৈষম্যের কথা তুলে ধরেছে। ক্ষমতাসীনদের কেউ এতে বিচলিত হয়নি।
আজও সেই যন্ত্র চলছে। কিন্তু বদলে গেছে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো।
নির্দোষ বলে ধরে নেওয়ার সুবিধা
একটি কাউন্টার টেররিজম রাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ বিশেষাধিকার বলতে আসলে কী বোঝায়, তা নির্দিষ্ট করে বলা যাক।
এটি এমন জীবন নয় যেখানে কোনো কষ্ট নেই। এটি সম্পদও নয়, স্বাচ্ছন্দ্যও নয়।
এটি আরও নির্দিষ্ট এবং কার্যকর একটি বিষয়: পুলিশের সংস্পর্শে আসার পরও নির্দোষ বলে ধরে নেওয়ার সুবিধাটি টিকে থাকা।
এটি এমন একটি ক্ষমতা, যার মাধ্যমে আপনার গায়ের রং, বিশ্বাস ও আচরণের মধ্যে কোনো পূর্বনির্ধারিত ‘রোগগ্রস্ততা’ খুঁজে না নিয়ে আপনাকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করা হয়।
যখন একজন শ্বেতাঙ্গ বৃদ্ধকে পার্লামেন্ট স্কয়ার থেকে একটি কার্ডবোর্ডের প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন দেশ সেই দৃশ্যকে রাষ্ট্রের অযৌক্তিকতার প্রতীক হিসেবে দেখে।
কিন্তু একই আইনে যখন একজন মুসলিম গ্রেপ্তার হন, তখন দেশ সেই দৃশ্যকে মুসলিম ব্যক্তিটিরই একটি প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখে।
একই কাজ। একই আইন। একই হাতকড়া। অথচ জাতীয় কল্পনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি অর্থ।
এই ব্যবধানটাই বিশেষাধিকার।
আর আমাদের সৎ রাখার মতো বিষয়টি হলো: এই ব্যবধানই এই আন্দোলনকে কার্যকর করে তুলছে।
এই পরিস্থিতিতে সেই বিশেষাধিকারকে একটি সম্মানজনক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে।
যখন ৩০ বছর টেলিকমিউনিকেশন তত্ত্ব পড়ানো একজন মানুষ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করেন—“এসো, আমাকে গ্রেপ্তার করো”—তখন তিনি নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা, তাঁর উচ্চারণ, তাঁর গায়ের রং, তাঁর ‘নির্দোষ’ ভাবমূর্তি, তাঁর নাতি-নাতনিদের—সবকিছুকে এমন এক প্রদর্শনীতে পরিণত করছেন, যা দেখিয়ে দেয় আইনটি কতটা অযৌক্তিক, এবং গণহত্যা কতটা অযৌক্তিক।
একজন মুসলিম তা করতে পারেন না—কারণ একজন মুসলিম একই কাজ করলে তা হয়তো কোনো কেলেঙ্কারি সৃষ্টি করবে না; বরং রাষ্ট্রের সন্দেহকে আরও ‘নিশ্চিত’ করার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
এটাই বিশেষাধিকারের সম্মানজনক ব্যবহার।
এটি প্রদর্শনীর জন্য নয়, একাডেমিক তত্ত্বের জন্যও নয়; বরং নিজের বিশেষাধিকারকে খরচ করে ফেলা। ইচ্ছাকৃতভাবে সেটিকে এমন জায়গায় দাঁড় করানো, যেখানে রাষ্ট্রকে তার জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে—এবং সেই প্রতিক্রিয়ার আলোড়ন ব্যবহার করে গাজায় চলমান গণহত্যা এবং এতে আমাদের সরকারের চলমান জড়িত থাকার বিষয়টি সামনে আনা।
‘চেনা সন্দেহভাজনরা’
বিশেষাধিকার জমিয়ে রাখার চেয়ে ভুলভাবে ব্যবহার করা আরও খারাপ। তাই কোন বিষয়টি আমার কাছে অসম্মানজনক, সেটিও বলা দরকার।
অন্যায় ব্যবস্থাকে বৈধতা দিয়ে একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো অসম্মানজনক।
সংবাদমাধ্যমে একটি জনপ্রিয় বক্তব্য হলো—এরা ‘চেনা সন্দেহভাজন’ নয়; এরা ধর্মযাজক, অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক, দাদি-নানি, এমনকি সাবেক সামরিক সদস্য।
আমি বুঝতে পারি কেন আন্দোলনটি এই ভাষা ব্যবহার করে—এটি কার্যকর।
কিন্তু একটু গভীরভাবে পড়লে বোঝা যায়, এর মধ্যে কী স্বীকার করে নেওয়া হচ্ছে।
যদি এরা ‘চেনা সন্দেহভাজন’ না হন, তাহলে কোথাও নিশ্চয়ই ‘চেনা সন্দেহভাজন’ আছে।
আর তার অন্তর্নিহিত অর্থ হলো—একই আইন যখন তাদের ওপর প্রয়োগ করা হয়েছিল, তখন হয়তো তা মোটামুটি যথাস্থানেই প্রয়োগ করা হয়েছিল।
এই বক্তব্যকে প্রশ্ন না করে প্রতিবার ব্যবহার করা হলে, শ্বেতাঙ্গ প্রতিবাদকারীর খালাস যেন মুসলিম প্রতিবাদকারীর দোষী সাব্যস্ত হওয়ার বিনিময়ে কেনা হয়।
আপনি যদি এই ব্যবস্থার ভেতরে প্রবেশ করতে চান, তাহলে তাদের আপনার সামাজিক মর্যাদাকে এই ব্যবস্থার স্বাভাবিক ন্যায়সংগততার সার্টিফিকেট হিসেবে ব্যবহার করতে দেবেন না।
রাষ্ট্র যে সমঝোতার প্রস্তাব দেবে, সেটিও গ্রহণ করা অসম্মানজনক।
রাষ্ট্র সবসময় একটি আন্দোলনকে ‘যুক্তিসঙ্গত’ ও ‘বিপজ্জনক’, ‘প্রতিবাদকারী’ ও ‘সন্ত্রাসী’, ‘প্ল্যাকার্ডধারী’ ও ফিল্টন-এ বেড়া কেটে ঢোকা ব্যক্তির মধ্যে ভাগ করতে চেয়েছে।
যখন সেই প্রস্তাব আসবে—এবং তা বাস্তববাদ, কৌশল, অথবা ‘বিষয়টিকে আর জটিল না করি’ ধরনের ভাষায় আসবে—উত্তর হতে হবে:
সন্ত্রাসবাদবিরোধী আইনের মাধ্যমে কে নিপীড়িত হবে, তার কোনো শ্রেণিবিন্যাস আমরা মেনে নেব না।
ইতিমধ্যে অ্যামনোস্ট ইন্টার ন্যাশনাল এবং ইন্টার ন্যাশনাল এবং লিবার্টি-এর মতো নিজেদের মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার সংগঠন হিসেবে পরিচয় দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতাদের মধ্যেও আমরা দেখেছি, বৃহত্তর আন্দোলনের দাবিকে সন্ত্রাসবাদবিরোধী আইনকে শুধু কম কঠোর করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে—সম্পূর্ণ বিলুপ্তির দাবি তোলা হচ্ছে না।
ঠিক এখানেই বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত সন্ত্রাসবাদ-সন্দেহভাজন এবং সেই বিশাল মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বৈপরীত্যটি স্পষ্ট হয়, যারা এখনও নজরদারির এই কাঠামোর মধ্যে বসবাস করছে।
একই কারাগার
কিছু দিক থেকে পার্লামেন্ট স্কয়ার-এর প্ল্যাকার্ড-ধারী প্রতিবাদকারীদের গ্রেপ্তারের দৃশ্যটি আন্দোলনের সহজ অংশ।
আমি এটা জানি, কারণ আমি এমন মানুষদের সঙ্গে আমার কর্মজীবন কাটিয়েছি, যাদের ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার ছিল ৩০ বছরের যাত্রার প্রথম বছর মাত্র।
সন্ত্রাসবাদের তকমা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতেই শেষ হয় না।
এটি সীমান্ত পর্যন্ত অনুসরণ করে। অথবা আপনার সন্তানদের স্কুলের মূল্যায়ন পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
এখন যে মানুষগুলো নিজেদের ভিডিও করছেন, তাদের কেউ কেউ ৬৯ বছর বয়সে প্রথমবার আবিষ্কার করতে যাচ্ছেন—স্থায়ীভাবে শ্রেণিবদ্ধ বা চিহ্নিত হয়ে থাকার অর্থ কী।
ক্যামেরা বন্ধ হওয়ার মুহূর্তে যদি সংহতিও শেষ হয়ে যায়, তাহলে Parliament Square-এ যা ঘটেছে তা ছিল কেবল নাটক—আর অংশগ্রহণকারীরা ছিলেন নিজেদের নৈতিকতার গল্পের অতিরিক্ত চরিত্র।
একই কারাগার
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে হিইকোর্ট ফিলিস্তিন অ্যাকশন-কে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে বেআইনি বলে রায় দিয়েছিল। জুন মাসে কোর্ট অব আপিল সেই নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করে। সুপ্রিম কোর্ট শরতে এই বিষয়ে চূড়ান্ত আপিল শুনতে সম্মত হয়েছে।
আইনি লড়াইয়ের প্রতিটি পর্যায়েই গ্রেপ্তার অব্যাহত থেকেছে।
একটি রাষ্ট্র যখন এমন কোনো ক্ষমতা আবিষ্কার করে, যা সে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তৈরি করেছিল কিন্তু এখন অন্যরাও সেই ক্ষমতার শিকার হচ্ছে, তখন দৃশ্যটি এমনই হয়। রাষ্ট্র স্বীকার করতে পারে না যে ক্ষমতাটি আসলে শুরু থেকেই ভুল ছিল।
তাই হাজার হাজার গ্রেপ্তার হওয়া মানুষের সামনে প্রশ্নটি আমার কাছে এই নয় যে তারা সাহসী ছিলেন কি না।
তারা সাহসী ছিলেন।
প্রশ্ন হলো—যখন তারা শেষ পর্যন্ত মামলা ও দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সম্ভাবনার মুখোমুখি হবেন, তখন কী করবেন?
তাদের কর্মকাণ্ড কতটা প্রদর্শনমূলক ছিল?
এবং তারা কি ফিলিস্তিন অ্যাকশন-এর পাশে দাঁড়িয়ে নিষেধাজ্ঞার আইনকে যেভাবে বিবেকবর্জিতভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে প্রস্তুত?
তাদের পেছনে, একই আইনের অধীনে, একই কারাগারে এমন মানুষ রয়েছেন যারা ২০ বছর ধরে এসবের মধ্যে আছেন—এবং যাদের কখনো করতালি দিয়ে বের করে আনা হয়নি।
সম্মান শুধু গ্রেপ্তার হওয়ার মধ্যে নেই।
সম্মান হলো সবাই বের না হওয়া পর্যন্ত ভবন ছেড়ে যেতে অস্বীকার করা।
সম্মান হলো ততক্ষণ পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া, যতক্ষণ না অধিকৃত ফিলিস্তিনে গণহত্যা বন্ধ হয়।
ততক্ষণ পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া, যতক্ষণ না বর্ণবাদী বৈষম্যমূলক শাসনব্যবস্থা বা apartheid-এর অবসান ঘটে।
এবং ততক্ষণ পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া, যতক্ষণ না বসতি স্থাপনকারী ঔপনিবেশিক কাঠামো সম্পূর্ণভাবে ভেঙে ফেলা হয়।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই

রিপোর্টারের নাম 























