অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের ক্যাম্পবেলটাউন এলাকায় এক বাংলাদেশি পরিবারে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। হৃদয়বিদারক এ ঘটনায় এলাকায় চরম চাঞ্চল্য ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
নিজের স্ত্রী ও দুই ছেলেকে হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া এক বাংলাদেশি কয়েক মাস ধরে এই হামলার পরিকল্পনা করছিলেন বলে তদন্তকারীদের ধারণা। মর্মান্তিক বিষয় হলো, অভিযুক্ত বাবাই তার দুই সন্তানকে সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করতেন।
গ্রেপ্তারকৃত মোহাম্মদ শমন আহামেদের বয়স ৪৭ বছর। পুলিশ জানিয়েছে, তিনিই জরুরি সেবা নম্বরে ফোন করেছিলেন।
পরে ঘটনাস্থল থেকেই তাকে আটক করে ক্যাম্পবেলটাউন পুলিশ স্টেশনে নেওয়া হয়। আজ মঙ্গলবার তার বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতাসংক্রান্ত তিনটি হত্যার অভিযোগ গঠন করা হয়।
সোমবার (১৮ মে) স্থানীয় সময় রাত ৮টার কিছু আগে সিডনির নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ক্যাম্পবেলটাউনের একটি বাড়িতে জরুরি সেবা কর্মীদের ডাকা হয়।
ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ ৪৬ বছর বয়সী এক নারী এবং তার ১২ ও ৪ বছর বয়সী দুই ছেলের মরদেহ উদ্ধার করে।
পুলিশ ঘটনাস্থলকে ‘অত্যন্ত সহিংস’ বলে বর্ণনা করেছে।
পুলিশের সূত্র অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডগুলো সোমবার সকাল ৯টা থেকে রাত ৭টা ৫৫ মিনিটের মধ্যবর্তী কোনো সময়ে সংঘটিত হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে ক্যাম্পবেলটাউন লোকাল কোর্টে মামলাটি সংক্ষেপে উত্থাপন করা হলেও অভিযুক্ত সশরীরে কিংবা ভিডিও লিংকেও আদালতে উপস্থিত হননি। তিনি জামিনের আবেদন না করায় আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে জামিন নামঞ্জুর করেন। আগামী ১৫ জুলাই মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে
অভিযুক্তের আইনজীবী জাওয়াদ হোসেইন আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের বলেন, এই মুহূর্তে শমন অত্যন্ত ভেঙে পড়েছেন ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। পুরো ঘটনাটি ভুক্তভোগী পরিবার, প্রতিবেশী সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট সবার জন্য গভীর বেদনাদায়ক।
এদিকে অস্ট্রেলিয়ান সংবাদমাধ্যম নাইন নিউজ জানিয়েছে, নিহত দুই শিশুর বাবা সন্তানদের সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করতেন। দুই শিশুই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু এবং তারা কথা বলতে পারত না। পরিবারটি প্রায় ১০ বছর আগে বাংলাদেশ থেকে সিডনিতে পাড়ি জমিয়েছিল। অভিযুক্ত ব্যক্তির স্ত্রী পূর্ণকালীন চাকরি করতেন।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি আগে তাদের পরিচিত ছিলেন না এবং তার বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতার কোনো পূর্ব ইতিহাসও ছিল না। তবে আদালতে জমা দেওয়া নথিতে অভিযোগ করা হয়েছে, তিনি কয়েক মাস ধরে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার পরিকল্পনা করছিলেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুতে পার্থে ঘটে যাওয়া এক হত্যা-আত্মহত্যার ঘটনার খবর প্রকাশের পর তিনি এই পরিকল্পনা শুরু করেন। এই ঘটনায় অটিজমে আক্রান্ত দুই কিশোরকে তাদের মা-বাবা হত্যা করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট মাইকেল মোরোনি আজ সকালে জানান, ‘তাদের ঠিক কিভাবে হত্যা করা হয়েছে, এখনই বিস্তারিত বলতে পারছি না। তবে তিনজনের শরীরে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল।’ মরোনি আরো বলেন, বাড়ির ভেতরের দৃশ্য অত্যন্ত মর্মান্তিক ও ভয়াবহ।
পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছু আলামত জব্দ করেছে, যার মধ্যে একটি ছুরিও রয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, এটি হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র হতে পারে। ঘটনাস্থল থেকেই ৪৭ বছর বয়সী শমন আহামেদকে গ্রেপ্তার করে ক্যাম্পবেলটাউন পুলিশ স্টেশনে নেওয়া হয়
পুলিশ জানায়, তার বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতার সঙ্গে সম্পর্কিত তিনটি হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। জামিন না পাওয়ায় তাকে কারাগারে রাখা হয়েছে। তিনি আদালতে হাজির হয়েছেন এবং আগামী জুলাইয়ের মাঝামাঝি আবার আদালতে উপস্থিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বর্তমানে ক্যাম্পবেলটাউন সিটি পুলিশ ডিটেকটিভ ইউনিট ও স্টেট ক্রাইম কমান্ডের হোমিসাইড স্কোয়াড যৌথভাবে ঘটনাটির তদন্ত করছে। তদন্তের স্বার্থে এখনো নিহতদের পূর্ণ পরিচয় আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
প্রতিবেশীরা জানিয়েছে, পরিবারটি ছিল অত্যন্ত নিরিবিলি ও নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। শিশুরা ছিল শান্ত ও ভদ্র স্বভাবের। ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দারা বাড়ির সামনে ফুল রেখে শোক প্রকাশ করে। এক প্রতিবেশী আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, এই ছোট শিশুদের কথা ভাবলেই হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে।
ঘটনার পর রাতভর এলাকায় ব্যাপক পুলিশ উপস্থিতি ছিল। বাড়িটিকে ঘিরে ফেলা হয় এবং রাস্তার দুই পাশে একাধিক পুলিশ যানবাহন রাখা হয়। পুলিশ বাড়ির সামনের উঠানেও কাজ করতে দেখা যায়
ক্যাম্পবেলটাউনের গোয়েন্দারা স্টেট ক্রাইম কমান্ডের হোমিসাইড স্কোয়াডের সহায়তায় তদন্ত চালাচ্ছে। পুলিশ ঘটনাটি সম্পর্কে তথ্য থাকলে তা জানাতে সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক / ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম 























