বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের রোমাঞ্চকর মঞ্চে দাঁড়িয়ে ইংল্যান্ড। সামনেই বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার কঠিন চ্যালেঞ্জ। ঠিক এমন এক মহাজাগতিক লড়াইয়ের আবহ তৈরি হলেও, ইংলিশ অধিনায়ক হ্যারি কেইনের কণ্ঠে নেই কোনো বাড়তি উচ্ছ্বাস বা অহংকার। বরং এক পরম বাস্তবতাবোধ থেকে তিনি মনে করিয়ে দিলেন, ইংল্যান্ড এখনো তাদের সেরা ফুটবলটা খেলতেই পারেনি। দলের ভেতরে যে আরও দারুণ কিছু করার সামর্থ্য লুকিয়ে আছে, সেই বিশ্বাসটাই এখন তাতিয়ে তুলছে অধিনায়ককে।
কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের বিপক্ষে রীতিমতো ঘাম ঝরানো এক লড়াই লড়তে হয়েছে ইংল্যান্ডকে। অতিরিক্ত সময়ে ২-১ গোলের নাটকীয় জয় তুলে নিয়ে সেমিফাইনালের টিকিট কাটে থ্রি লায়ন্সরা। ম্যাচ শেষে অবশ্য দলের খেলায় খুব একটা সন্তুষ্ট হতে পারেননি কোচ টমাস টুখেল। প্রকাশ্যে নিজের দলের সমালোচনা করে তিনি মন্তব্য করেন, ইংল্যান্ড মাঠে ছিল এলোমেলো এবং সেমিফাইনালে ওঠার পেছনে কিছুটা ভাগ্যের ছোঁয়াও ছিল। তবে কোচের এই কড়া সমালোচনাকে মোটেও নেতিবাচকভাবে নিচ্ছেন না কেইন।
ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইনের ভাষায়, ‘আমরা জানি যে, আমাদের আরও উন্নতি করতে হবে। এটাও সত্যি যে আমরা এর চেয়েও অনেক ভালো ফুটবল খেলতে পারি। কিন্তু দিনশেষে আমরা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছেছি। আমাদের জাতীয় দলের ইতিহাসে এমন মুহূর্ত তো বারবার আসে না। তাই এই বিশেষ অর্জনটাকে আমাদের উপভোগ করা উচিত।’
এই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের পথচলাটা যে মোটেও মসৃণ ছিল না, সেটিও মনে করিয়ে দেন কেইন। গ্রুপ পর্ব থেকে নকআউট পর্ব, প্রতিটি ম্যাচেই ছিল তীব্র পরীক্ষা। ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দল, মেক্সিকোর বিপক্ষে দীর্ঘ সময় ১০ জন নিয়ে লড়ে যেভাবে জয় ছিনিয়ে এনেছে, কিংবা নরওয়ের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও যেভাবে ম্যাচ বের করেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। কেইনের মতে, এই ম্যাচগুলো শুধু ফুটবলীয় দক্ষতা নয়, বরং দলের ইস্পাতকঠিন চরিত্র ও মানসিকতার প্রমাণ দেয়।
নিজের দলের লড়াকু মনোভাব নিয়ে কেইন বলেন, ‘সফল হওয়ার জন্য যে ধরনের মানসিকতা দরকার, আমরা মাঠে ঠিক সেটাই দেখিয়েছি। সবাই দেশের জার্সির জন্য নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছে। তীব্র গরম আর আর্দ্রতার মধ্যে খেলাটা মোটেও সহজ ছিল না। বল দখলে আমরা আরও নিখুঁত হতে পারি, সেটা আমরা খুব ভালো করেই জানি। তবে এই মুহূর্তে আমরা অর্জনটা উদযাপন করতে চাই। তবে শুরু হবে আর্জেন্টিনা ম্যাচের মহাপ্রস্তুতিও।’
টুখেলের কঠোর মন্তব্য নিয়ে বাইরে যতই আলোচনা আর গুঞ্জন চলুক না কেন, ড্রেসিংরুমের চিত্রটা একদমই ভিন্ন। কেইনের মতে, কোচের এই কড়া সমালোচনার মূল কারণ হলো দলের প্রতি তাঁর আকাশচুম্বী প্রত্যাশা। অনুশীলনে খেলোয়াড়দের অবিশ্বাস্য সামর্থ্য খুব কাছ থেকে দেখেন বলেই তিনি মাঠের পারফরম্যান্সে কোনো ছাড় দিতে রাজি নন।
কোচ টুখেলকে সমর্থন জানিয়ে কেইন বলেন, ‘তিনি প্রতিদিন আমাদের অনুশীলন দেখেন এবং ভালো করেই জানেন আমরা কী করতে পারি। আমাদের আক্রমণভাগ, একের বিরুদ্ধে এক পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষমতা, খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত দক্ষতা, সবকিছুই তাঁর চেনা। তাই তিনি মাঠেও তার শতভাগ প্রতিফলন দেখতে চান। অবশ্য তিনিও বোঝেন যে আন্তর্জাতিক ফুটবল এতটা সহজ নয় এবং প্রতিপক্ষও বেশ শক্তিশালী। তবুও তিনি আমাদের ভেতর থেকে সেরাটা বের করে আনতে চান। আমরাও বিশ্বাস করি, আমাদের খেলার মানকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে।’
হ্যারি কেইনের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে এটি চতুর্থ বড় সেমিফাইনাল। এর আগে ২০১৮ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল থেকে বিদায়ের বেদনা, কিংবা ইউরো ২০২০ ও ইউরো ২০২৪ এর ফাইনালে গিয়ে ট্রফি ছোঁয়ার খুব কাছ থেকে ফিরে আসার আক্ষেপ এখনো পোড়ায় তাঁকে। তাই এবার আর শুধু ভালো খেলা কিংবা সেমিফাইনালে ওঠার সান্ত্বনা পুরস্কারে সন্তুষ্ট নন তিনি। এবার লক্ষ্য একটাই, অধরা সোনালী ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরা।
দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে কেইন যোগ করেন, ‘এই প্রজন্ম ইংল্যান্ড ফুটবলকে দারুণ এক সফল সময় উপহার দিয়েছে। কিন্তু এখন আমাদের শেষ ধাপটা পার করতে হবে। আমরা বারবার সেমিফাইনাল আর ফাইনালে পৌঁছাচ্ছি, এবার আমাদের সেই কাঙ্ক্ষিত দরজাটা খুলতেই হবে। টুর্নামেন্টের আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি। গত ছয় সপ্তাহ ধরে আমরা সবাই একসঙ্গে আছি এবং দেশের জন্য সবকিছু ঢেলে দিয়েছি। শেষ ধাপে এসে আমাদের আরও বড় একটা ধাক্কা দিতে হবে।’
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে হাইভোল্টেজ সেমিফাইনালের আগে হ্যারি কেইনের বার্তাটা তাই একদম পরিষ্কার। ইংল্যান্ড এখনো তাদের সেরা রূপ দেখায়নি। তবে যদি সেই রূপটা ঠিক সময়ে এবং সঠিক মঞ্চে জ্বলে ওঠে, তবে ইংলিশদের বহু প্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ স্বপ্নপূরণের পথ হয়তো আর খুব বেশি দূরে নয়।

রিপোর্টারের নাম 
























