বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬, ৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাকসু তহবিলের ১৩ লাখ টাকা নিয়ে ৯৯ হাজারের হিসাব দিয়েছেন ভিপি

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) বর্তমান কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১০ মাসে ৪২টি বিভিন্ন কর্মসূচির বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে প্রায় ১ কোটি ২৯ লাখ ১৪ হাজার টাকা বরাদ্দ নিয়েছে। তবে এই বিশাল অঙ্কের বরাদ্দের বিপরীতে অর্ধেকেরও বেশি অর্থ, অর্থাৎ প্রায় ৬১ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিল-ভাউচার এখনো অফিসে জমা পড়েনি। রাকসুর কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ের সাম্প্রতিক নথি বিশ্লেষণ করে আর্থিক হিসাবের এই অনিয়ম ও অসমাপ্ত বিলের তথ্য পাওয়া গেছে।

নথি অনুযায়ী, বরাদ্দ উত্তোলনে এগিয়ে থাকলেও হিসাব দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছেন রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ। তিনি ছয় ধাপে মোট ১৩ লাখ ৪০ হাজার ৩২৪ টাকা উত্তোলন করেছেন। এর মধ্যে কেবল ঈদুল আজহার একটি কর্মসূচির ৯৯ হাজার ৯২৪ টাকার বিল জমা দিয়েছেন তিনি। বাকি ১২ লাখ ৪০ হাজার টাকার কোনো হিসাব বা ভাউচার এখনও রাকসু দপ্তরে জমা দেওয়া হয়নি।

হিসাবের নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ১৩ এপ্রিল দাপ্তরিক খরচ বাবদ দেড় লাখ টাকা নেন ভিপি। ওই অর্থের হিসাব না দিয়েই চার মাসের মাথায় ১৯ জুলাই দাপ্তরিক খরচ বাবদ পুনরায় ২ লাখ টাকা তোলেন তিনি। এ ছাড়া ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল প্রদর্শনী (৩ লাখ ৮২ হাজার টাকা), ‘ভিক্টরি রান’ (৩ লাখ টাকা) এবং ‘জুলাই জাদুঘর’ স্থাপনের (২ লাখ ৮ হাজার টাকা) মতো বিভিন্ন ইভেন্টের নাম করে টাকা তুললেও কোনো ভাউচার সমন্বয় করা হয়নি।

এ প্রসঙ্গে রাকসু ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, “বিষয়টি এমন নয় যে কোনো বিল দেওয়া হয়নি। মেয়াদের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই সব বিল-ভাউচার জমা দেওয়া হবে। হিসাব অডিট হওয়ার বাকি আছে। যদি কোনো বিলে সমন্বয়হীনতা বা গরমিল থাকে, তবে প্রয়োজনে নিজের পকেটের টাকা দিয়ে তা পূরণ করে দেওয়া হবে।”

অন্যদিকে রাকসু তহবিল থেকে এককভাবে সবচেয়ে বেশি অর্থ উত্তোলন করেছেন সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার। সাত ধাপে তিনি ২৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা বরাদ্দ নেন, যার মধ্যে ১৮ লাখ ৩৯ হাজার টাকার কোনো হিসাব মেলেনি। ভর্তি পরীক্ষার বুথ স্থাপন এবং সদস্যদের দাপ্তরিক খরচের কথা বলে নেওয়া এই অর্থের হিসাব সমন্বয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

জিএস আম্মার বলেন, “ভর্তি পরীক্ষার বাজেট করার সময় ভ্যাটের বিষয় জানা ছিল না, ফলে সমন্বয়ে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। দ্রুতই বাকি হিসাব দিয়ে দেওয়া হবে।”

হিসাব না দেওয়ার এই তালিকায় রয়েছেন অন্যান্য সম্পাদকরাও। তথ্য অনুযায়ী:

ক্রীড়া সম্পাদক মোছা. নার্গিস খাতুন ১৫ লাখ৭১ হাজার টাকার মধ্যে ১৩ লাখ ৯৭ হাজার টাকার বিল জমা দেননি।

বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ইমরান লস্কর ৮ লাখ ৪২ হাজার টাকার মধ্যে প্রায় ৬ লাখ ৯২ হাজার টাকার হিসাব বকেয়া রেখেছেন।

সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক জাহিদ হোসেন জোহার জুলাই গণঅভ্যুত্থান উদযাপনের ৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকার হিসাব এখনও নথিভুক্ত হয়নি।

এ ছাড়া তথ্য ও গবেষণা, মহিলা বিষয়ক, পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদকসহ আরও কয়েকজন প্রতিনিধির নামে নেওয়া লাখ লাখ টাকার ভাউচার এখনো অসম্পূর্ণ রয়েছে।

ছাত্রসংগঠন ও প্রশাসনের সাবেক দায়িত্বশীলদের মতে, সরকারি আর্থিক বিধি অনুযায়ী কোনো অগ্রিম অর্থ নিলে তা নির্দিষ্ট সময়ে সমন্বয় না করে পরবর্তী বরাদ্দ তোলার সুযোগ নেই। রাকসুর সাবেক নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মোস্তফা কামাল আকন্দ বলেন, “পূর্ববর্তী বরাদ্দের হিসাব না দিয়ে নতুন অর্থ উত্তোলন আর্থিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী। ভিপি-জিএসদের ইচ্ছা অনুযায়ী অর্থ খরচে বাধা দেওয়া এবং অডিট সম্পন্ন করা কোষাধ্যক্ষের প্রশাসনিক দায়িত্ব।”

সার্বিক বিষয়ে রাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সেতাউর রহমান নথির সত্যতা স্বীকার করে বলেন, “কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর পরই বিল দেওয়া উচিত। আমরা সবাইকে সঠিক নিয়মে দ্রুত ভাউচার জমা দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছি।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও রাকসু সভাপতি অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান জানিয়ে বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি টাকার হিসাব স্বচ্ছ হতে হবে। রাকসুর প্রতিনিধিরা হিসাব জমা দিতে কিছুটা সময় চেয়েছেন। তবে বিধি অনুযায়ী বিল-ভাউচার জমা দেওয়া ছাড়া এই অর্থ সমন্বয়ের আর কোনো পথ নেই।”

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

রাকসু তহবিলের ১৩ লাখ টাকা নিয়ে ৯৯ হাজারের হিসাব দিয়েছেন ভিপি

প্রকাশিত সময় : ০৬:২২:৫৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) বর্তমান কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১০ মাসে ৪২টি বিভিন্ন কর্মসূচির বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে প্রায় ১ কোটি ২৯ লাখ ১৪ হাজার টাকা বরাদ্দ নিয়েছে। তবে এই বিশাল অঙ্কের বরাদ্দের বিপরীতে অর্ধেকেরও বেশি অর্থ, অর্থাৎ প্রায় ৬১ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিল-ভাউচার এখনো অফিসে জমা পড়েনি। রাকসুর কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ের সাম্প্রতিক নথি বিশ্লেষণ করে আর্থিক হিসাবের এই অনিয়ম ও অসমাপ্ত বিলের তথ্য পাওয়া গেছে।

নথি অনুযায়ী, বরাদ্দ উত্তোলনে এগিয়ে থাকলেও হিসাব দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছেন রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ। তিনি ছয় ধাপে মোট ১৩ লাখ ৪০ হাজার ৩২৪ টাকা উত্তোলন করেছেন। এর মধ্যে কেবল ঈদুল আজহার একটি কর্মসূচির ৯৯ হাজার ৯২৪ টাকার বিল জমা দিয়েছেন তিনি। বাকি ১২ লাখ ৪০ হাজার টাকার কোনো হিসাব বা ভাউচার এখনও রাকসু দপ্তরে জমা দেওয়া হয়নি।

হিসাবের নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ১৩ এপ্রিল দাপ্তরিক খরচ বাবদ দেড় লাখ টাকা নেন ভিপি। ওই অর্থের হিসাব না দিয়েই চার মাসের মাথায় ১৯ জুলাই দাপ্তরিক খরচ বাবদ পুনরায় ২ লাখ টাকা তোলেন তিনি। এ ছাড়া ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল প্রদর্শনী (৩ লাখ ৮২ হাজার টাকা), ‘ভিক্টরি রান’ (৩ লাখ টাকা) এবং ‘জুলাই জাদুঘর’ স্থাপনের (২ লাখ ৮ হাজার টাকা) মতো বিভিন্ন ইভেন্টের নাম করে টাকা তুললেও কোনো ভাউচার সমন্বয় করা হয়নি।

এ প্রসঙ্গে রাকসু ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, “বিষয়টি এমন নয় যে কোনো বিল দেওয়া হয়নি। মেয়াদের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই সব বিল-ভাউচার জমা দেওয়া হবে। হিসাব অডিট হওয়ার বাকি আছে। যদি কোনো বিলে সমন্বয়হীনতা বা গরমিল থাকে, তবে প্রয়োজনে নিজের পকেটের টাকা দিয়ে তা পূরণ করে দেওয়া হবে।”

অন্যদিকে রাকসু তহবিল থেকে এককভাবে সবচেয়ে বেশি অর্থ উত্তোলন করেছেন সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার। সাত ধাপে তিনি ২৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা বরাদ্দ নেন, যার মধ্যে ১৮ লাখ ৩৯ হাজার টাকার কোনো হিসাব মেলেনি। ভর্তি পরীক্ষার বুথ স্থাপন এবং সদস্যদের দাপ্তরিক খরচের কথা বলে নেওয়া এই অর্থের হিসাব সমন্বয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

জিএস আম্মার বলেন, “ভর্তি পরীক্ষার বাজেট করার সময় ভ্যাটের বিষয় জানা ছিল না, ফলে সমন্বয়ে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। দ্রুতই বাকি হিসাব দিয়ে দেওয়া হবে।”

হিসাব না দেওয়ার এই তালিকায় রয়েছেন অন্যান্য সম্পাদকরাও। তথ্য অনুযায়ী:

ক্রীড়া সম্পাদক মোছা. নার্গিস খাতুন ১৫ লাখ৭১ হাজার টাকার মধ্যে ১৩ লাখ ৯৭ হাজার টাকার বিল জমা দেননি।

বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ইমরান লস্কর ৮ লাখ ৪২ হাজার টাকার মধ্যে প্রায় ৬ লাখ ৯২ হাজার টাকার হিসাব বকেয়া রেখেছেন।

সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক জাহিদ হোসেন জোহার জুলাই গণঅভ্যুত্থান উদযাপনের ৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকার হিসাব এখনও নথিভুক্ত হয়নি।

এ ছাড়া তথ্য ও গবেষণা, মহিলা বিষয়ক, পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদকসহ আরও কয়েকজন প্রতিনিধির নামে নেওয়া লাখ লাখ টাকার ভাউচার এখনো অসম্পূর্ণ রয়েছে।

ছাত্রসংগঠন ও প্রশাসনের সাবেক দায়িত্বশীলদের মতে, সরকারি আর্থিক বিধি অনুযায়ী কোনো অগ্রিম অর্থ নিলে তা নির্দিষ্ট সময়ে সমন্বয় না করে পরবর্তী বরাদ্দ তোলার সুযোগ নেই। রাকসুর সাবেক নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মোস্তফা কামাল আকন্দ বলেন, “পূর্ববর্তী বরাদ্দের হিসাব না দিয়ে নতুন অর্থ উত্তোলন আর্থিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী। ভিপি-জিএসদের ইচ্ছা অনুযায়ী অর্থ খরচে বাধা দেওয়া এবং অডিট সম্পন্ন করা কোষাধ্যক্ষের প্রশাসনিক দায়িত্ব।”

সার্বিক বিষয়ে রাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সেতাউর রহমান নথির সত্যতা স্বীকার করে বলেন, “কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর পরই বিল দেওয়া উচিত। আমরা সবাইকে সঠিক নিয়মে দ্রুত ভাউচার জমা দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছি।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও রাকসু সভাপতি অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান জানিয়ে বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি টাকার হিসাব স্বচ্ছ হতে হবে। রাকসুর প্রতিনিধিরা হিসাব জমা দিতে কিছুটা সময় চেয়েছেন। তবে বিধি অনুযায়ী বিল-ভাউচার জমা দেওয়া ছাড়া এই অর্থ সমন্বয়ের আর কোনো পথ নেই।”