বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লণ্ডভণ্ড নেপাল-তিব্বত সীমান্ত, আবারও বন্যার আশঙ্কা

হিমালয়ের বুক চিরে নেমে আসা ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় বিপর্যস্ত নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী অঞ্চল। কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত মুহূর্তের মধ্যে গ্রাম, বাজার, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এখন পর্যন্ত নেপাল ও তিব্বতে অন্তত ১৬৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিখোঁজ রয়েছেন শত শত মানুষ, যাদের মধ্যে বহু বিদেশি পর্যটকও রয়েছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় ভারতের কয়েকটি এলাকাতেও বন্যা সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

চীন ও নেপালের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত লেন্ডে নদীর তীরে কাদা ও বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষের একটি বিশাল অংশ ধসে পড়ার পর এই ভয়াবহ দুর্যোগের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তেই সেই স্রোত নদীপথে ছড়িয়ে পড়ে এবং ভোতে কোসি ও ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী জনপদগুলোতে আছড়ে পড়ে।

প্রবল স্রোতের তোড়ে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ভেসে যায়। সীমান্তের উভয় পাশের কর্মকর্তারা ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন।

দুর্যোগের ভয়াবহতা তুলে ধরে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ ফেডারেশনের (আইএফআরসি) নেপাল প্রধান ডেভিড ফিশার বলেন, পুরো গ্রাম এবং বাজার এলাকা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

আকাশ থেকে ধারণ করা উদ্ধার অভিযানের ফুটেজেও ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। কোথাও শুধু কাদামাখা বাড়ির কঙ্কাল দেখা যাচ্ছে, আবার কোথাও বহুতল ভবনের নিচতলা পুরোপুরি পানিতে ও কাদায় তলিয়ে গেছে।

নেপালি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে অন্তত ১৬২ জন মারা গেছেন। নিখোঁজ রয়েছেন ৪০৩ জন। তাঁদের মধ্যে ১৪২ জন ভারতীয় নাগরিক। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকও নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন।

নেপালি সেনাবাহিনী হেলিকপ্টারে করে দুর্গম এলাকা থেকে জীবিতদের উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছে। নদীর কাছাকাছি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বত অঞ্চলের জিরং এলাকাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, সেখানে তিনজন নিহত এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

সীমান্ত এলাকা থেকে পাওয়া নজরদারি ফুটেজে দেখা গেছে, কয়েক তলা উঁচু কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত একটি ভবনকে মুহূর্তের মধ্যে গ্রাস করছে। নিচে থাকা মানুষজন প্রাণ বাঁচাতে ছুটে পালাচ্ছেন। প্রবল স্রোতে বাস ও গাড়িও খেলনার মতো ভেসে যেতে দেখা গেছে।

দুর্যোগের ভয়াবহতা কাটতে না কাটতেই নতুন শঙ্কার কথা জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী নদীর উজানে এখনো ধ্বংসাবশেষের প্রতিবন্ধকতা আটকে থাকায় সেখান থেকে ফের আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

কাঠমান্ডুভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের (আইসিআইএমওডি) জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান কিয়াংগং ঝাং বলেন, নদীর উজানে প্রতিবন্ধকতা থাকায় কর্তৃপক্ষকে দ্বিতীয় দফার বন্যার আশঙ্কায় সতর্ক থাকতে হচ্ছে।

নেপালের ভয়াবহ বন্যার প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের কিছু এলাকাতেও পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। উত্তর প্রদেশ ও বিহারের কয়েকটি জেলায় ইতোমধ্যে বন্যা সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মৌসুমি বৃষ্টিতে প্রায় প্রতিবছরই বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন এবং তীব্র হয়ে উঠছে।

হিমালয় অঞ্চলের দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিবেশ, ভারী বৃষ্টি, হিমবাহ ও ভূমিধসের ঝুঁকির সঙ্গে আকস্মিক বন্যার এই ভয়াবহতা যুক্ত হয়ে ভবিষ্যতে আরও বড় দুর্যোগের আশঙ্কা তৈরি করছে। এনডিটিভি

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

লণ্ডভণ্ড নেপাল-তিব্বত সীমান্ত, আবারও বন্যার আশঙ্কা

প্রকাশিত সময় : ১০:১৬:২২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬
হিমালয়ের বুক চিরে নেমে আসা ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় বিপর্যস্ত নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী অঞ্চল। কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত মুহূর্তের মধ্যে গ্রাম, বাজার, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এখন পর্যন্ত নেপাল ও তিব্বতে অন্তত ১৬৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিখোঁজ রয়েছেন শত শত মানুষ, যাদের মধ্যে বহু বিদেশি পর্যটকও রয়েছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় ভারতের কয়েকটি এলাকাতেও বন্যা সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

চীন ও নেপালের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত লেন্ডে নদীর তীরে কাদা ও বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষের একটি বিশাল অংশ ধসে পড়ার পর এই ভয়াবহ দুর্যোগের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তেই সেই স্রোত নদীপথে ছড়িয়ে পড়ে এবং ভোতে কোসি ও ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী জনপদগুলোতে আছড়ে পড়ে।

প্রবল স্রোতের তোড়ে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ভেসে যায়। সীমান্তের উভয় পাশের কর্মকর্তারা ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন।

দুর্যোগের ভয়াবহতা তুলে ধরে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ ফেডারেশনের (আইএফআরসি) নেপাল প্রধান ডেভিড ফিশার বলেন, পুরো গ্রাম এবং বাজার এলাকা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

আকাশ থেকে ধারণ করা উদ্ধার অভিযানের ফুটেজেও ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। কোথাও শুধু কাদামাখা বাড়ির কঙ্কাল দেখা যাচ্ছে, আবার কোথাও বহুতল ভবনের নিচতলা পুরোপুরি পানিতে ও কাদায় তলিয়ে গেছে।

নেপালি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে অন্তত ১৬২ জন মারা গেছেন। নিখোঁজ রয়েছেন ৪০৩ জন। তাঁদের মধ্যে ১৪২ জন ভারতীয় নাগরিক। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকও নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন।

নেপালি সেনাবাহিনী হেলিকপ্টারে করে দুর্গম এলাকা থেকে জীবিতদের উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছে। নদীর কাছাকাছি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বত অঞ্চলের জিরং এলাকাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, সেখানে তিনজন নিহত এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

সীমান্ত এলাকা থেকে পাওয়া নজরদারি ফুটেজে দেখা গেছে, কয়েক তলা উঁচু কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত একটি ভবনকে মুহূর্তের মধ্যে গ্রাস করছে। নিচে থাকা মানুষজন প্রাণ বাঁচাতে ছুটে পালাচ্ছেন। প্রবল স্রোতে বাস ও গাড়িও খেলনার মতো ভেসে যেতে দেখা গেছে।

দুর্যোগের ভয়াবহতা কাটতে না কাটতেই নতুন শঙ্কার কথা জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী নদীর উজানে এখনো ধ্বংসাবশেষের প্রতিবন্ধকতা আটকে থাকায় সেখান থেকে ফের আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

কাঠমান্ডুভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের (আইসিআইএমওডি) জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান কিয়াংগং ঝাং বলেন, নদীর উজানে প্রতিবন্ধকতা থাকায় কর্তৃপক্ষকে দ্বিতীয় দফার বন্যার আশঙ্কায় সতর্ক থাকতে হচ্ছে।

নেপালের ভয়াবহ বন্যার প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের কিছু এলাকাতেও পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। উত্তর প্রদেশ ও বিহারের কয়েকটি জেলায় ইতোমধ্যে বন্যা সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মৌসুমি বৃষ্টিতে প্রায় প্রতিবছরই বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন এবং তীব্র হয়ে উঠছে।

হিমালয় অঞ্চলের দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিবেশ, ভারী বৃষ্টি, হিমবাহ ও ভূমিধসের ঝুঁকির সঙ্গে আকস্মিক বন্যার এই ভয়াবহতা যুক্ত হয়ে ভবিষ্যতে আরও বড় দুর্যোগের আশঙ্কা তৈরি করছে। এনডিটিভি