শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আশির দশকে ফেরা না কি বর্তমান থেকে পালানো?

ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে এখন যেন সময়টা ২০২৬ নয়, ১৯৮০ কিংবা ১৯৯০-এর দশক। নিজের বর্তমান ছবিকে এআই দিয়ে পুরোনো দিনের পোশাক, চুলের স্টাইল, রঙ, ক্যামেরার গ্রেইন ও সেই সময়ের পরিবেশে সাজিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। কয়েক দিনের মধ্যেই ‘৮০s লুক’ বা ‘৯০s লুক’ ধরনের ছবি নতুন সামাজিকমাধ্যম ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে।

ছবিটি বাস্তব নয়, কিন্তু অনুভূতিটা অনেকের কাছেই বাস্তব। কেউ নিজেকে দেখছেন আশির দশকের সিনেমার নায়কের মতো, কেউ নব্বইয়ের দশকের পারিবারিক অ্যালবামের চরিত্র হয়ে উঠছেন। মজার বিষয় হলো—যারা এই ছবিগুলো তৈরি করছেন, তাঁদের অনেকেই সেই সময়ের মানুষই নন। তাহলে যে সময় তারা দেখেননি, সেই সময়েই এত টান কেন?

অতীতের ছবি, বর্তমানের অস্থিরতা

এর একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায় ‘নস্টালজিয়া’তে। মনোবিজ্ঞান ও আচরণবিষয়ক গবেষণায় দীর্ঘদিন ধরেই দেখা গেছে, অতীতের সুখকর স্মৃতি মানুষকে সামাজিকভাবে সংযুক্ত অনুভব করতে, একাকিত্ব কমাতে এবং মানসিকভাবে স্বস্তি পেতে সাহায্য করতে পারে। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনও নস্টালজিয়ার এমন ইতিবাচক প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছে। কিন্তু, এ ক্ষেত্রে একটি নতুন শব্দ গুরুত্বপূর্ণ—‘anemoia’। অর্থাৎ এমন একটি সময়ের জন্য নস্টালজিয়া, যে সময় মানুষ নিজে কখনো বেঁচেই দেখেনি।

২০২৬ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, বিশেষ করে জেন-জি প্রজন্মের মধ্যে অতীতের অ্যানালগ প্রযুক্তি, পুরোনো নকশা, ফিল্ম ক্যামেরা, পুরোনো সংগীত ও রেট্রো সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে। সেখানে এই প্রবণতাকে কেবল পুরোনো দিনের প্রতি ভালোবাসা হিসেবে নয়, বরং অতিরিক্ত ডিজিটাল ও এআই-নির্ভর বর্তমানের বিপরীতে এক ধরনের মানসিক প্রতিক্রিয়া হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

অর্থাৎ, ৮০ বা ৯০ দশকের ছবির জনপ্রিয়তা শুধু ‘পুরোনো দেখতে ভালো লাগে’—এত সরল নয়। বর্তমানের দ্রুতগতির, অতিমাত্রায় ডিজিটাল জীবনের বিপরীতে মানুষ এমন এক সময়ের কল্পনা করছে, যেটিকে তুলনামূলকভাবে ধীর, সহজ ও মানবিক বলে মনে হয়।

তাহলে ৮০–৯০-ই কেন?

এর পেছনে সাংস্কৃতিক কারণও আছে। ৮০ ও ৯০ দশক এখনকার ইন্টারনেট-নির্ভর প্রজন্মের কাছে এক ধরনের দৃশ্যমান ‘রেট্রো প্যাকেজ’। পুরোনো টেলিভিশন, ক্যাসেট, ফিল্ম ক্যামেরা, ফ্লেয়ার প্যান্ট, বড় চুল, মোটা ফ্রেমের চশমা, স্টুডিও পোর্ট্রেট, সিনেমার পোস্টার—সবকিছুরই আলাদা ভিজ্যুয়াল পরিচয় আছে। ফলে এআইয়ের জন্যও সেই সময়ের একটি ছবি তৈরি করা তুলনামূলক সহজ—কিছু নির্দিষ্ট পোশাক, রঙ, আলো ও ব্যাকগ্রাউন্ডের নির্দেশ দিলেই পুরো দৃশ্য বদলে যায়।

সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ব্যবহারকারীরা বর্তমান ছবি দিয়ে নিজেদের ৮০ দশকের সিনেমার চরিত্র, পুরোনো ম্যাগাজিনের মডেল কিংবা রেট্রো পারিবারিক ছবির আদলে তৈরি করছেন।

আর সামাজিকমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরো দ্রুত ছড়িয়ে দিচ্ছে। একজন একটি ছবি তৈরি করছেন, অন্যজন সেটি দেখে নিজের ছবি বানাচ্ছেন—এরপর শুরু হচ্ছে পুনরাবৃত্তি। ফলে ব্যক্তিগত কৌতূহল খুব দ্রুত গণ-ট্রেন্ডে পরিণত হচ্ছে।

আসলে কি সবাই অতীতকে মিস করছে?

সবাই যে অতীতকে মিস করছে এটা পুরোপুরি সত্য নয়। এখানেই ট্রেন্ডটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। এআই ব্যবহারকারীকে অতীতে ফিরিয়ে নিচ্ছে না; বরং নিজের একটি বিকল্প অতীত তৈরি করার সুযোগ দিচ্ছে। যে ব্যক্তি ১৯৯০ সালে জন্মাননি, তিনিও দেখতে পারছেন সেই সময়ে তিনি কেমন দেখতে হতে পারতেন। যে তরুণ কখনো ফিল্ম ক্যামেরায় ছবি তোলেননি, তিনিও নিজের জন্য একটি ‘পুরোনো অ্যালবাম’ বানাতে পারছেন।

এটি এক ধরনের ডিজিটাল কল্পনা। নিজের পরিচয়কে সাময়িকভাবে বদলে দেখা—আমি যদি অন্য সময়ে জন্মাতাম, অন্য পোশাক পরতাম, অন্য পরিবেশে বড় হতাম, তাহলে কেমন হতাম? এই জায়গাটিই ট্রেন্ডটিকে শুধু ফিল্টার ব্যবহারের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এআইয়ের জনপ্রিয়তা এই ট্রেন্ডকে আরো সহজ করেছে। আরেকটি বড় কারণ হলো এআই এখন আর কেবল প্রযুক্তি-জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের বিষয় নয়।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সি কিশোরদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কোনো না কোনোভাবে এআই চ্যাটবট ব্যবহার করেছে। তাদের প্রায় চারজনের একজনেরও বেশি ছবি বা ভিডিও তৈরি কিংবা সম্পাদনার কাজে এআই ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ ছবি বানানোর জন্য আলাদা সফটওয়্যার শেখা, জটিল এডিটিং জানা কিংবা ডিজাইনার হওয়া এখন আর বাধ্যতামূলক নয়। একটি ছবি ও কয়েক লাইনের নির্দেশনাই অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট। ফলে ‘আমি যদি ৮০ দশকে থাকতাম?’—এই কৌতূহলকে ছবিতে পরিণত করার খরচ ও শ্রম দুটোই কমে গেছে।

ট্রেন্ডটির ভালো দিক কোথায়?

প্রথমত, এটি সৃজনশীলতার সহজ দরজা খুলে দিয়েছে। একজন সাধারণ ব্যবহারকারীও এখন নিজের কল্পনার চরিত্র, সময় ও পরিবেশ তৈরি করতে পারছেন। দ্বিতীয়ত, পরিবার ও প্রজন্মের মধ্যে স্মৃতি ভাগাভাগির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বাবা-মায়ের পুরোনো ছবি, দাদা-দাদির সময়ের পোশাক বা পরিবারের পুরোনো অ্যালবামের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের কল্পনাকে মেলানো সম্ভব হচ্ছে। তৃতীয়ত, নস্টালজিয়ার মানসিক দিকটিও একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। গবেষণায় নস্টালজিয়াকে সামাজিক সংযোগ ও মানসিক স্বস্তির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

মজার ছবির আড়ালে বড় ঝুঁকি

এআই দিয়ে ছবি বানানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতার জায়গা হলো নিজের মুখ ও ব্যক্তিগত ছবি কোথায় যাচ্ছে, সেটি জানা। কোনো এআই টুলে ছবি আপলোড করার আগে ব্যবহারকারীর জানা উচিত—সেই ছবির কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, কত দিন সংরক্ষণ করা হচ্ছে, তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে শেয়ার করা হচ্ছে কি না এবং ভবিষ্যতে সেটি মুছে ফেলার সুযোগ আছে কি না। কারণ একবার অনলাইনে ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে গেলে সেটির নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজের হাতে রাখা কঠিন।

আরেকটি বড় সমস্যা হতে পারে পরিচয় বিকৃতি। আজ যে ছবি শুধু ‘৮০ দশকের মজা’, আগামীকাল সেটিই অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার হতে পারে। ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় হাজার হাজার সহজলভ্য ডিপফেক মডেল বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে, ব্যক্তির ছবি ব্যবহার করে কৃত্রিম ছবি তৈরি করার প্রযুক্তি কতটা সহজলভ্য হয়ে উঠেছে।

গবেষণায় প্রায় ৩৫ হাজার পাবলিকলি ডাউনলোডযোগ্য ডিপফেক মডেলের সন্ধান পাওয়া যায়; এসব মডেলের বড় অংশ নারীদের লক্ষ্য করে তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ নিজের সাধারণ ছবি এআইতে দেওয়া মানেই বিপদ ঘটবে—এমন নয়। কিন্তু, ছবিটি যে ভবিষ্যতে অন্যভাবে ব্যবহার করা অসম্ভব, সেটিও বলা যায় না। আরেকটি সমস্যা—কোনটা সত্যি, কোনটা এআই? এখানে সামাজিকমাধ্যমের আরো বড় একটি সমস্যা সামনে আসে—বাস্তব ও কৃত্রিম ছবির সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হচ্ছে।

এখানেই রেট্রো ট্রেন্ডের মজার খেলাটি ভবিষ্যতের বড় প্রশ্নে গিয়ে ঠেকে। আজ কেউ জানেন যে ছবিটি এআই দিয়ে বানানো। কিন্তু, কয়েক মাস পর সেই ছবিই যদি পুরোনো অ্যালবামের ছবি বলে ছড়িয়ে পড়ে? অথবা কোনো ব্যক্তির জীবনের এমন একটি ‘অতীত’ তৈরি করা হয়, যা বাস্তবে কখনো ঘটেনি? সমস্যা তখন আর নান্দনিক থাকে না; সেটি তথ্যের সত্যতা ও ব্যক্তিগত পরিচয়ের প্রশ্ন হয়ে যায়।

‘অতীত’ও এখন অ্যালগরিদমের তৈরি

এই ট্রেন্ডের সবচেয়ে গভীর দিক সম্ভবত এখানেই। আগে মানুষ পুরোনো ছবি বের করে অতীতকে মনে করত। এখন এআই অনেক ক্ষেত্রে ছবি বানিয়ে অতীতের অনুভূতি তৈরি করছে।

গবেষণায় ইতিমধ্যে ‘algorithmic nostalgia’ ধারণাটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে—অর্থাৎ প্রযুক্তি কীভাবে অতীতের স্মৃতি ও নস্টালজিয়াকে তৈরি, সাজানো এবং ব্যবহারযোগ্য করে তুলছে। এটি এক ধরনের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। আমাদের স্মৃতি আর শুধু ক্যামেরায় ধারণ করা বাস্তব মুহূর্তের ওপর নির্ভর করছে না; প্রযুক্তি এখন এমন দৃশ্যও বানাতে পারে, যা কখনো ঘটেনি কিন্তু দেখতে এতটাই বিশ্বাসযোগ্য যে তা স্মৃতির মতো অনুভূত হতে পারে।

তাহলে ট্রেন্ডটি আসলে কী বলছে?

৮০–৯০ দশকের ছবি বানানোর এই হিড়িককে শুধু আরেকটি ফেসবুক ট্রেন্ড হিসেবে দেখলে বিষয়টির বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। এটি একইসঙ্গে, নস্টালজিয়া, আত্মপরিচয়, সামাজিক যোগাযোগ এবং এআইয়ের সহজলভ্যতার গল্প। মানুষ হয়তো অতীতে ফিরতে চাইছে না; বরং বর্তমানের দ্রুতগতির পৃথিবীর মধ্যে এমন একটি অনুভূতি খুঁজছে, যেখানে জীবন একটু ধীর, ছবি একটু অসম্পূর্ণ এবং স্মৃতিগুলো একটু বেশি ব্যক্তিগত।

কিন্তু, সেই অনুভূতি যখন এআই তৈরি করে দেয়, তখন প্রশ্নও থেকে যায়—আমরা কি সত্যিই অতীতকে ফিরে পাচ্ছি, নাকি অ্যালগরিদমের বানানো একটি সুন্দর অতীতের প্রেমে পড়ছি?

সম্ভবত এই ট্রেন্ডের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই: ছবিটা যতই পুরোনো হোক, সেটি তৈরি হচ্ছে একেবারে নতুন প্রযুক্তিতে। আর সেই ছবিতে আমরা যে অতীত দেখি, তার কতটা স্মৃতি আর কতটা কৃত্রিম কল্পনা—সেটি জানা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

স্থানীয় নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরাও অংশ নিতে পারবে: আইনমন্ত্রী

আশির দশকে ফেরা না কি বর্তমান থেকে পালানো?

প্রকাশিত সময় : ০৫:৫১:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে এখন যেন সময়টা ২০২৬ নয়, ১৯৮০ কিংবা ১৯৯০-এর দশক। নিজের বর্তমান ছবিকে এআই দিয়ে পুরোনো দিনের পোশাক, চুলের স্টাইল, রঙ, ক্যামেরার গ্রেইন ও সেই সময়ের পরিবেশে সাজিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। কয়েক দিনের মধ্যেই ‘৮০s লুক’ বা ‘৯০s লুক’ ধরনের ছবি নতুন সামাজিকমাধ্যম ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে।

ছবিটি বাস্তব নয়, কিন্তু অনুভূতিটা অনেকের কাছেই বাস্তব। কেউ নিজেকে দেখছেন আশির দশকের সিনেমার নায়কের মতো, কেউ নব্বইয়ের দশকের পারিবারিক অ্যালবামের চরিত্র হয়ে উঠছেন। মজার বিষয় হলো—যারা এই ছবিগুলো তৈরি করছেন, তাঁদের অনেকেই সেই সময়ের মানুষই নন। তাহলে যে সময় তারা দেখেননি, সেই সময়েই এত টান কেন?

অতীতের ছবি, বর্তমানের অস্থিরতা

এর একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায় ‘নস্টালজিয়া’তে। মনোবিজ্ঞান ও আচরণবিষয়ক গবেষণায় দীর্ঘদিন ধরেই দেখা গেছে, অতীতের সুখকর স্মৃতি মানুষকে সামাজিকভাবে সংযুক্ত অনুভব করতে, একাকিত্ব কমাতে এবং মানসিকভাবে স্বস্তি পেতে সাহায্য করতে পারে। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনও নস্টালজিয়ার এমন ইতিবাচক প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছে। কিন্তু, এ ক্ষেত্রে একটি নতুন শব্দ গুরুত্বপূর্ণ—‘anemoia’। অর্থাৎ এমন একটি সময়ের জন্য নস্টালজিয়া, যে সময় মানুষ নিজে কখনো বেঁচেই দেখেনি।

২০২৬ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, বিশেষ করে জেন-জি প্রজন্মের মধ্যে অতীতের অ্যানালগ প্রযুক্তি, পুরোনো নকশা, ফিল্ম ক্যামেরা, পুরোনো সংগীত ও রেট্রো সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে। সেখানে এই প্রবণতাকে কেবল পুরোনো দিনের প্রতি ভালোবাসা হিসেবে নয়, বরং অতিরিক্ত ডিজিটাল ও এআই-নির্ভর বর্তমানের বিপরীতে এক ধরনের মানসিক প্রতিক্রিয়া হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

অর্থাৎ, ৮০ বা ৯০ দশকের ছবির জনপ্রিয়তা শুধু ‘পুরোনো দেখতে ভালো লাগে’—এত সরল নয়। বর্তমানের দ্রুতগতির, অতিমাত্রায় ডিজিটাল জীবনের বিপরীতে মানুষ এমন এক সময়ের কল্পনা করছে, যেটিকে তুলনামূলকভাবে ধীর, সহজ ও মানবিক বলে মনে হয়।

তাহলে ৮০–৯০-ই কেন?

এর পেছনে সাংস্কৃতিক কারণও আছে। ৮০ ও ৯০ দশক এখনকার ইন্টারনেট-নির্ভর প্রজন্মের কাছে এক ধরনের দৃশ্যমান ‘রেট্রো প্যাকেজ’। পুরোনো টেলিভিশন, ক্যাসেট, ফিল্ম ক্যামেরা, ফ্লেয়ার প্যান্ট, বড় চুল, মোটা ফ্রেমের চশমা, স্টুডিও পোর্ট্রেট, সিনেমার পোস্টার—সবকিছুরই আলাদা ভিজ্যুয়াল পরিচয় আছে। ফলে এআইয়ের জন্যও সেই সময়ের একটি ছবি তৈরি করা তুলনামূলক সহজ—কিছু নির্দিষ্ট পোশাক, রঙ, আলো ও ব্যাকগ্রাউন্ডের নির্দেশ দিলেই পুরো দৃশ্য বদলে যায়।

সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ব্যবহারকারীরা বর্তমান ছবি দিয়ে নিজেদের ৮০ দশকের সিনেমার চরিত্র, পুরোনো ম্যাগাজিনের মডেল কিংবা রেট্রো পারিবারিক ছবির আদলে তৈরি করছেন।

আর সামাজিকমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরো দ্রুত ছড়িয়ে দিচ্ছে। একজন একটি ছবি তৈরি করছেন, অন্যজন সেটি দেখে নিজের ছবি বানাচ্ছেন—এরপর শুরু হচ্ছে পুনরাবৃত্তি। ফলে ব্যক্তিগত কৌতূহল খুব দ্রুত গণ-ট্রেন্ডে পরিণত হচ্ছে।

আসলে কি সবাই অতীতকে মিস করছে?

সবাই যে অতীতকে মিস করছে এটা পুরোপুরি সত্য নয়। এখানেই ট্রেন্ডটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। এআই ব্যবহারকারীকে অতীতে ফিরিয়ে নিচ্ছে না; বরং নিজের একটি বিকল্প অতীত তৈরি করার সুযোগ দিচ্ছে। যে ব্যক্তি ১৯৯০ সালে জন্মাননি, তিনিও দেখতে পারছেন সেই সময়ে তিনি কেমন দেখতে হতে পারতেন। যে তরুণ কখনো ফিল্ম ক্যামেরায় ছবি তোলেননি, তিনিও নিজের জন্য একটি ‘পুরোনো অ্যালবাম’ বানাতে পারছেন।

এটি এক ধরনের ডিজিটাল কল্পনা। নিজের পরিচয়কে সাময়িকভাবে বদলে দেখা—আমি যদি অন্য সময়ে জন্মাতাম, অন্য পোশাক পরতাম, অন্য পরিবেশে বড় হতাম, তাহলে কেমন হতাম? এই জায়গাটিই ট্রেন্ডটিকে শুধু ফিল্টার ব্যবহারের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এআইয়ের জনপ্রিয়তা এই ট্রেন্ডকে আরো সহজ করেছে। আরেকটি বড় কারণ হলো এআই এখন আর কেবল প্রযুক্তি-জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের বিষয় নয়।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সি কিশোরদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কোনো না কোনোভাবে এআই চ্যাটবট ব্যবহার করেছে। তাদের প্রায় চারজনের একজনেরও বেশি ছবি বা ভিডিও তৈরি কিংবা সম্পাদনার কাজে এআই ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ ছবি বানানোর জন্য আলাদা সফটওয়্যার শেখা, জটিল এডিটিং জানা কিংবা ডিজাইনার হওয়া এখন আর বাধ্যতামূলক নয়। একটি ছবি ও কয়েক লাইনের নির্দেশনাই অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট। ফলে ‘আমি যদি ৮০ দশকে থাকতাম?’—এই কৌতূহলকে ছবিতে পরিণত করার খরচ ও শ্রম দুটোই কমে গেছে।

ট্রেন্ডটির ভালো দিক কোথায়?

প্রথমত, এটি সৃজনশীলতার সহজ দরজা খুলে দিয়েছে। একজন সাধারণ ব্যবহারকারীও এখন নিজের কল্পনার চরিত্র, সময় ও পরিবেশ তৈরি করতে পারছেন। দ্বিতীয়ত, পরিবার ও প্রজন্মের মধ্যে স্মৃতি ভাগাভাগির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বাবা-মায়ের পুরোনো ছবি, দাদা-দাদির সময়ের পোশাক বা পরিবারের পুরোনো অ্যালবামের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের কল্পনাকে মেলানো সম্ভব হচ্ছে। তৃতীয়ত, নস্টালজিয়ার মানসিক দিকটিও একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। গবেষণায় নস্টালজিয়াকে সামাজিক সংযোগ ও মানসিক স্বস্তির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

মজার ছবির আড়ালে বড় ঝুঁকি

এআই দিয়ে ছবি বানানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতার জায়গা হলো নিজের মুখ ও ব্যক্তিগত ছবি কোথায় যাচ্ছে, সেটি জানা। কোনো এআই টুলে ছবি আপলোড করার আগে ব্যবহারকারীর জানা উচিত—সেই ছবির কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, কত দিন সংরক্ষণ করা হচ্ছে, তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে শেয়ার করা হচ্ছে কি না এবং ভবিষ্যতে সেটি মুছে ফেলার সুযোগ আছে কি না। কারণ একবার অনলাইনে ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে গেলে সেটির নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজের হাতে রাখা কঠিন।

আরেকটি বড় সমস্যা হতে পারে পরিচয় বিকৃতি। আজ যে ছবি শুধু ‘৮০ দশকের মজা’, আগামীকাল সেটিই অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার হতে পারে। ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় হাজার হাজার সহজলভ্য ডিপফেক মডেল বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে, ব্যক্তির ছবি ব্যবহার করে কৃত্রিম ছবি তৈরি করার প্রযুক্তি কতটা সহজলভ্য হয়ে উঠেছে।

গবেষণায় প্রায় ৩৫ হাজার পাবলিকলি ডাউনলোডযোগ্য ডিপফেক মডেলের সন্ধান পাওয়া যায়; এসব মডেলের বড় অংশ নারীদের লক্ষ্য করে তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ নিজের সাধারণ ছবি এআইতে দেওয়া মানেই বিপদ ঘটবে—এমন নয়। কিন্তু, ছবিটি যে ভবিষ্যতে অন্যভাবে ব্যবহার করা অসম্ভব, সেটিও বলা যায় না। আরেকটি সমস্যা—কোনটা সত্যি, কোনটা এআই? এখানে সামাজিকমাধ্যমের আরো বড় একটি সমস্যা সামনে আসে—বাস্তব ও কৃত্রিম ছবির সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হচ্ছে।

এখানেই রেট্রো ট্রেন্ডের মজার খেলাটি ভবিষ্যতের বড় প্রশ্নে গিয়ে ঠেকে। আজ কেউ জানেন যে ছবিটি এআই দিয়ে বানানো। কিন্তু, কয়েক মাস পর সেই ছবিই যদি পুরোনো অ্যালবামের ছবি বলে ছড়িয়ে পড়ে? অথবা কোনো ব্যক্তির জীবনের এমন একটি ‘অতীত’ তৈরি করা হয়, যা বাস্তবে কখনো ঘটেনি? সমস্যা তখন আর নান্দনিক থাকে না; সেটি তথ্যের সত্যতা ও ব্যক্তিগত পরিচয়ের প্রশ্ন হয়ে যায়।

‘অতীত’ও এখন অ্যালগরিদমের তৈরি

এই ট্রেন্ডের সবচেয়ে গভীর দিক সম্ভবত এখানেই। আগে মানুষ পুরোনো ছবি বের করে অতীতকে মনে করত। এখন এআই অনেক ক্ষেত্রে ছবি বানিয়ে অতীতের অনুভূতি তৈরি করছে।

গবেষণায় ইতিমধ্যে ‘algorithmic nostalgia’ ধারণাটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে—অর্থাৎ প্রযুক্তি কীভাবে অতীতের স্মৃতি ও নস্টালজিয়াকে তৈরি, সাজানো এবং ব্যবহারযোগ্য করে তুলছে। এটি এক ধরনের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। আমাদের স্মৃতি আর শুধু ক্যামেরায় ধারণ করা বাস্তব মুহূর্তের ওপর নির্ভর করছে না; প্রযুক্তি এখন এমন দৃশ্যও বানাতে পারে, যা কখনো ঘটেনি কিন্তু দেখতে এতটাই বিশ্বাসযোগ্য যে তা স্মৃতির মতো অনুভূত হতে পারে।

তাহলে ট্রেন্ডটি আসলে কী বলছে?

৮০–৯০ দশকের ছবি বানানোর এই হিড়িককে শুধু আরেকটি ফেসবুক ট্রেন্ড হিসেবে দেখলে বিষয়টির বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। এটি একইসঙ্গে, নস্টালজিয়া, আত্মপরিচয়, সামাজিক যোগাযোগ এবং এআইয়ের সহজলভ্যতার গল্প। মানুষ হয়তো অতীতে ফিরতে চাইছে না; বরং বর্তমানের দ্রুতগতির পৃথিবীর মধ্যে এমন একটি অনুভূতি খুঁজছে, যেখানে জীবন একটু ধীর, ছবি একটু অসম্পূর্ণ এবং স্মৃতিগুলো একটু বেশি ব্যক্তিগত।

কিন্তু, সেই অনুভূতি যখন এআই তৈরি করে দেয়, তখন প্রশ্নও থেকে যায়—আমরা কি সত্যিই অতীতকে ফিরে পাচ্ছি, নাকি অ্যালগরিদমের বানানো একটি সুন্দর অতীতের প্রেমে পড়ছি?

সম্ভবত এই ট্রেন্ডের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই: ছবিটা যতই পুরোনো হোক, সেটি তৈরি হচ্ছে একেবারে নতুন প্রযুক্তিতে। আর সেই ছবিতে আমরা যে অতীত দেখি, তার কতটা স্মৃতি আর কতটা কৃত্রিম কল্পনা—সেটি জানা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি।