কুমিল্লায় ধর্ষণের পর হত্যার শিকার স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনের (১৫) নিখোঁজ হওয়ার আগের কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহে উঠে এসেছে নতুন তথ্য। কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলের রেজিস্টারে নিজের নাম লিখেছিল ‘তানজু আক্তার’, বয়স দেখিয়েছিল ১৮ বছর। পরিচয় দিয়েছিল রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর স্ত্রী হিসেবে।
তাজমিনের কক্সবাজার যাত্রা, সেখানে রাজুর সঙ্গে অবস্থান এবং বাড়ি ফেরার ঘটনাগুলো সামনে আসার পর হত্যাকাণ্ডের আগে তার চলাফেরা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে হোটেলে দেওয়া পরিচয়ের তথ্য এবং তাজমিনের সঙ্গে রাজুর সম্পর্কের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ হওয়ার আগে তাজমিন প্রথমে প্রতিবেশী জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যায়। পরে কুমিল্লায় ফিরে সেখান থেকে কক্সবাজারে যায় বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মাকে জানিয়েছিল, সে এক বান্ধবীর বাসায় যাচ্ছে। তবে ঠিক কবে সে কক্সবাজারে গিয়েছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ফেসবুকে পরিচয়, ১৭ দিনের সম্পর্ক
কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে কর্মরত রাজুর সঙ্গে ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয় হয় তাজমিনের। হোটেলটির এক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ফেসবুকে পরিচয়ের প্রায় ১৭ দিনের মধ্যে তাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এরপর তাজমিন কক্সবাজারে গিয়ে ঘোরাফেরা করে আবার ফিরে যায়।
ওই কর্মীর দাবি, রাজু বারবার তাকে জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তিনি জড়িত নন। নিজেকে বাঁচানোর জন্যও আকুতি জানিয়েছেন তিনি। ঘটনার পর রাজু হোটেল ছেড়ে ছুটিতে রয়েছেন বলে জানান ওই কর্মী।
তবে পুলিশ জানিয়েছে, তাজমিন হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তি একজনই—সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া। রাজুর বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাসের টিকিট কাটতে গিয়েছিল দুজন
কক্সবাজারের কক্সেস প্যানারেমিক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর এজেন্সির কর্মী আবদুল্লাহ জানান, গত মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাত ৮টার পর তাজমিন ও রাজু তাদের কাউন্টারে বাসের টিকিট কাটতে যান। তখন দুজনকে সাধারণ যাত্রী হিসেবেই দেখেছিলেন তিনি।
আবদুল্লাহর ভাষ্য অনুযায়ী, রাজু পরদিন বুধবারের জন্য একটি টিকিট কাটেন। বুধবার দুপুর ১২টার দিকে আইকনিক এক্সপ্রেসের বাসটি কুমিল্লার উদ্দেশে কক্সবাজার ছাড়ে।
পরে তাজমিন হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে বাসে যাওয়া মেয়েটিকে শনাক্ত করার চেষ্টা করেন আবদুল্লাহ। একপর্যায়ে তিনি বুঝতে পারেন, ওই যাত্রীই তাজমিন। পুলিশ তার কাছে তথ্য চাইতে পারে এমন ধারণা থেকে ঘটনার বিষয়ে প্রস্তুতিও নেন তিনি।
সিসিটিভিতে বাস থেকে নামার দৃশ্য
গত বুধবার (৭ অক্টোবর) কক্সবাজার থেকে ফেরার পথে রাত পৌনে ১২টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোড এলাকার হোটেল নূরজাহানের কাছে আইকনিক এক্সপ্রেসের বাস থেকে তাজমিনের নামার দৃশ্য সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাত সাড়ে ১২টার দিকে সেখান থেকে শহরের রেইসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে তাজমিন। ওই অটোরিকশার চালক ছিলেন সুমন মিয়া।
পুলিশের দাবি, সুমন তাজমিনকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করেন। পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মেয়ের শেষ কথোপকথন নিয়ে যা বললেন মা
তাজমিনের মা কেয়া খাতুন জানান, বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেলে মেয়ের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। তখন তাজমিন জানিয়েছিল, সে এক বান্ধবীর সঙ্গে আছে।
মেয়েকে নিয়ে আসার জন্য বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়ার কথাও ভেবেছিলেন তিনি। এ জন্য মেয়ের কাছে বান্ধবীর নাম এবং তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাজমিন কিছু জানায়নি।
কেয়া খাতুন বলেন, মেয়ের বন্ধুবান্ধব ও চলাফেরা নিয়ে আগে থেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন তিনি। কোনো অঘটন ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কায় প্রায় ছয় মাস মেয়েকে স্কুলে যেতে দেননি। মেয়ের চলাফেরা ও বন্ধুত্বের বিষয়ে খোঁজখবর রাখতেন। তারপরও শেষ পর্যন্ত মেয়েকে বাঁচাতে পারেননি।
তাজমিনকে নিয়ে শিক্ষকের স্মৃতিচারণ
তাজমিনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ জানান, দীর্ঘদিন তিনি তাজমিনকে পড়িয়েছেন। তার ভাষায়, তাজমিন ছিল খুবই চঞ্চল স্বভাবের। মা অসুস্থ থাকলে দুই যমজ ছোট ভাইয়ের দেখভাল করত সে।
শিক্ষকের ভাষ্য অনুযায়ী, তাজমিনের বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন। সকালে বাসা থেকে বের হয়ে রাতে ফিরতেন। মেয়েকে তিনি খুব আদর করতেন। তবে বাসায় রাগ হলে তাজমিন হুটহাট করে বের হয়ে যেত বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে, সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুমিল্লার সাবেক সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান বলেন, রাজুর সঙ্গে তাজমিনের পরিচয় ও সম্পর্ক না হলে হয়তো তাকে কক্সবাজার যেতে হতো না এবং এমন বিপদের মুখেও পড়তে হতো না।
এ বিষয়ে রাজুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
তাজমিনের কক্সবাজার যাত্রা, হোটেলে দেওয়া পরিচয় এবং বাড়ি ফেরার পরের ঘটনাগুলো তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে পুলিশ এখন পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডে সুমন মিয়াকেই অভিযুক্ত করেছে। হত্যাকাণ্ডের আগে কী ঘটেছিল, তা নিশ্চিত করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 





















