সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চতুর্থবারের মতো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হলেন কট্টর ফিলিস্তিনপন্থি লুলা

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোট গণনায় এগিয়ে থেকে আবারও দেশটির রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হয়েছেন বামপন্থি নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। কট্টর ফিলিস্তিনপন্থি হিসেবে পরিচিত এই নেতা অল্প ব্যবধানে হারিয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারোকে। এর মধ্য দিয়ে চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথে এগিয়ে রয়েছেন লুলা।

সোমবার বাংলাদেশ সময় ভোর সোয়া ৬টার দিকে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্রাজিলের নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ততক্ষণে প্রায় ৯৮ শতাংশ ভোট গণনা সম্পন্ন হয়েছে। গণনা করা ভোটের মধ্যে লুলা পেয়েছেন ৫১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অন্যদিকে ফ্লাভিও বলসোনারোর প্রাপ্ত ভোটের হার ৪৮ দশমিক ২৫ শতাংশ।

দুই প্রার্থীর মধ্যে ব্যবধান কম থাকায় ভোটের শেষ পর্যায় পর্যন্ত ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা বজায় ছিল। চূড়ান্ত ফলের অপেক্ষায় উদ্বেগের মধ্যে সময় পার করতে হয়েছে উভয় প্রার্থীর সমর্থকদের।

ফ্লাভিও বলসোনারোর বাবা জাইর বলসোনারো ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট। আগের নির্বাচনে তাকে পরাজিত করেই ক্ষমতায় এসেছিলেন লুলা। এবার বাবার পরিবর্তে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামেন সিনেটর ফ্লাভিও। তবে শেষ পর্যন্ত তিনিও লুলার কাছে পরাজিত হয়েছেন।

জাইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনীর সহায়তায় ক্ষমতা দখলের চেষ্টা এবং নির্বাচনের পর লুলার হাতে দায়িত্ব হস্তান্তরে বিলম্ব করার অভিযোগ উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে আইনি জটিলতার কারণে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। ফলে তার ছেলে ফ্লাভিও এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

গত ৪ অক্টোবর ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট অনুষ্ঠিত হয়। ওই দফায় কোনো প্রার্থীই প্রয়োজনীয় ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পাওয়ায় নির্বাচন দ্বিতীয় পর্যায়ে গড়ায়। দেশটির নির্বাচনী বিধান অনুযায়ী, প্রথম দফায় সর্বাধিক ভোট পাওয়া দুই প্রার্থীই চূড়ান্ত পর্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

প্রথম দফার ভোটে ফ্লাভিও বলসোনারো এগিয়ে থাকলেও দ্বিতীয় দফায় ফল পাল্টে যায়। শেষ পর্যন্ত তাকে পেছনে ফেলে জয় নিশ্চিত করেন লুলা।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৮ সালের পর ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই প্রথম এমন ঘটনা ঘটল, যেখানে প্রথম দফায় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থী দ্বিতীয় দফায় পরাজিত হয়েছেন।

ফিলিস্তিন ইস্যুতে লুলার কঠোর অবস্থান

ব্রাজিলের রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থানের জন্য পরিচিত লুলা। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০ সালে তার আগের শাসনামলে ব্রাজিল ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে ব্রাজিলই প্রথম এ স্বীকৃতি দিয়েছিল।

বর্তমান মেয়াদে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে বারবার কঠোর সমালোচনা করেছেন লুলা। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারকে গাজায় গণহত্যার জন্য সরাসরি দায়ী করেছেন তিনি।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া এক ভাষণে লুলা বলেন, গাজায় চলমান সহিংসতা ও সেখানকার মানুষের মানসিক ক্ষত ফিলিস্তিনিদের পরবর্তী প্রজন্মগুলোকেও বহন করতে হবে। এ ছাড়া ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে নাৎসি জার্মানির হলোকাস্টের সঙ্গে তুলনা করে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেন তিনি।

লুলার এসব মন্তব্যের পর ইসরায়েল তাকে ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ বা অবাঞ্ছিত ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা করে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে তেল আবিব থেকে ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূতকে স্থায়ীভাবে প্রত্যাহার করে নেয় তার সরকার।

নির্বাচনে লুলার এই জয় শুধু ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, ফিলিস্তিন ইস্যুতে তার অবস্থানের কারণেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্ব বহন করছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

চতুর্থবারের মতো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হলেন কট্টর ফিলিস্তিনপন্থি লুলা

প্রকাশিত সময় : ০৪:২৫:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোট গণনায় এগিয়ে থেকে আবারও দেশটির রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হয়েছেন বামপন্থি নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। কট্টর ফিলিস্তিনপন্থি হিসেবে পরিচিত এই নেতা অল্প ব্যবধানে হারিয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারোকে। এর মধ্য দিয়ে চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথে এগিয়ে রয়েছেন লুলা।

সোমবার বাংলাদেশ সময় ভোর সোয়া ৬টার দিকে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্রাজিলের নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ততক্ষণে প্রায় ৯৮ শতাংশ ভোট গণনা সম্পন্ন হয়েছে। গণনা করা ভোটের মধ্যে লুলা পেয়েছেন ৫১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অন্যদিকে ফ্লাভিও বলসোনারোর প্রাপ্ত ভোটের হার ৪৮ দশমিক ২৫ শতাংশ।

দুই প্রার্থীর মধ্যে ব্যবধান কম থাকায় ভোটের শেষ পর্যায় পর্যন্ত ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা বজায় ছিল। চূড়ান্ত ফলের অপেক্ষায় উদ্বেগের মধ্যে সময় পার করতে হয়েছে উভয় প্রার্থীর সমর্থকদের।

ফ্লাভিও বলসোনারোর বাবা জাইর বলসোনারো ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট। আগের নির্বাচনে তাকে পরাজিত করেই ক্ষমতায় এসেছিলেন লুলা। এবার বাবার পরিবর্তে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামেন সিনেটর ফ্লাভিও। তবে শেষ পর্যন্ত তিনিও লুলার কাছে পরাজিত হয়েছেন।

জাইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনীর সহায়তায় ক্ষমতা দখলের চেষ্টা এবং নির্বাচনের পর লুলার হাতে দায়িত্ব হস্তান্তরে বিলম্ব করার অভিযোগ উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে আইনি জটিলতার কারণে তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। ফলে তার ছেলে ফ্লাভিও এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

গত ৪ অক্টোবর ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট অনুষ্ঠিত হয়। ওই দফায় কোনো প্রার্থীই প্রয়োজনীয় ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পাওয়ায় নির্বাচন দ্বিতীয় পর্যায়ে গড়ায়। দেশটির নির্বাচনী বিধান অনুযায়ী, প্রথম দফায় সর্বাধিক ভোট পাওয়া দুই প্রার্থীই চূড়ান্ত পর্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

প্রথম দফার ভোটে ফ্লাভিও বলসোনারো এগিয়ে থাকলেও দ্বিতীয় দফায় ফল পাল্টে যায়। শেষ পর্যন্ত তাকে পেছনে ফেলে জয় নিশ্চিত করেন লুলা।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৮ সালের পর ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই প্রথম এমন ঘটনা ঘটল, যেখানে প্রথম দফায় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থী দ্বিতীয় দফায় পরাজিত হয়েছেন।

ফিলিস্তিন ইস্যুতে লুলার কঠোর অবস্থান

ব্রাজিলের রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থানের জন্য পরিচিত লুলা। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০ সালে তার আগের শাসনামলে ব্রাজিল ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে ব্রাজিলই প্রথম এ স্বীকৃতি দিয়েছিল।

বর্তমান মেয়াদে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে বারবার কঠোর সমালোচনা করেছেন লুলা। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারকে গাজায় গণহত্যার জন্য সরাসরি দায়ী করেছেন তিনি।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া এক ভাষণে লুলা বলেন, গাজায় চলমান সহিংসতা ও সেখানকার মানুষের মানসিক ক্ষত ফিলিস্তিনিদের পরবর্তী প্রজন্মগুলোকেও বহন করতে হবে। এ ছাড়া ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে নাৎসি জার্মানির হলোকাস্টের সঙ্গে তুলনা করে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেন তিনি।

লুলার এসব মন্তব্যের পর ইসরায়েল তাকে ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ বা অবাঞ্ছিত ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা করে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে তেল আবিব থেকে ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূতকে স্থায়ীভাবে প্রত্যাহার করে নেয় তার সরকার।

নির্বাচনে লুলার এই জয় শুধু ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, ফিলিস্তিন ইস্যুতে তার অবস্থানের কারণেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্ব বহন করছে।