মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আইএইএর রিপোর্টকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানাবেন না: ইরানের হুঁশিয়ারি

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেছে তেহরান। ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে, সংস্থাটি যদি সত্যিই একটি স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধানের অংশ হতে চায়, তবে তাদের কারিগরি প্রতিবেদনগুলোকে রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।

নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে ইরানের আইন ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি এই প্রতিক্রিয়া জানান। আইএইএ-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন এবং সংস্থাটির মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসির দেওয়া কিছু বিবৃতির জবাবে তিনি এই মন্তব্য করেন।

উল্লেখ্য, ওই বিবৃতিতে ইরানের কিছু ক্ষতিগ্রস্ত পরমাণু স্থাপনায় প্রবেশাধিকার না পাওয়া, ইউরেনিয়ামের মজুত পরিস্থিতি এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সম্পর্কে ‘ধারাবাহিক তথ্য পাওয়ার ঘাটতি’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল।

আইএইএ-এর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি গত বৃহস্পতিবার গভর্নিং বোর্ডের কাছে পেশ করা তার সর্বশেষ প্রতিবেদনে দাবি করেন, নিরাপত্তা সুরক্ষার উদ্দেশ্যে স্থাপনার বাইরে থাকা ঘোষিত পরমাণু সামগ্রী, স্থাপনা এবং অবস্থানের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ইরানের কাছ থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তিনি আরও বলেন, ‘বুশেহর বিদ্যুৎ কেন্দ্র ছাড়া অন্য কোনো পরমাণু স্থাপনা বা অবস্থানে সরেজমিনে তথ্য যাচাইয়ের জন্য আইএইএ-এর কোনো প্রবেশাধিকার ছিল না। ফলে পরমাণু অস্ত্র বিস্তাররোধ চুক্তি (এনপিটি)-এর অধীনে ইরানের ঘোষিত পরমাণু স্থাপনাগুলোতে নিরাপত্তা সুরক্ষাজনিত দায়িত্ব পালন এবং পরমাণু সামগ্রীর বর্তমান অবস্থা যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না।’
এই বক্তব্যের জবাবে গারিবাবাদি বলেন, গ্রোসি এখন ‘অস্পষ্টতা’, ‘প্রবেশাধিকারের অভাব’ এবং ‘তথ্যের ধারাবাহিকতা হারানোর’ কথা বলছেন; কিন্তু এই পরিস্থিতি তো এমনি এমনি তৈরি হয়নি। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, ইরানের নিরাপত্তা বলয়ে থাকা পরমাণু স্থাপনাগুলো যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলি সামরিক হামলার শিকার হয়েছিল।

তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, আইএইএ-এর মহাপরিচালক—যিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্বের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন বলে প্রমাণ করেছেন—দুর্ভাগ্যবশত এই হামলাগুলোর বিরুদ্ধে কখনোই কোনো নিন্দা জানাননি।

গারিবাবাদি বলেন, ‘কেউ এই বিশৃঙ্খলা বা ক্ষয়ক্ষতির মূল উৎসকে আড়াল করে, তার ফলে সৃষ্ট পরিণতি বা দায় ইরানের ঘাড়ে চাপাতে পারে না। সংস্থাটি একই সাথে সামরিক হামলার ক্ষয়ক্ষতির কথা বলবে, আবার যারা এই হামলা চালিয়েছে তাদের দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাবে এবং আক্রমণকারীদের তৈরি করা নিরাপত্তাহীনতার কারিগরি ও রাজনৈতিক খেসারত ইরানকে দিতে বলবে—তা হতে পারে না। এটি কোনো তথ্য যাচাইকরণ বা আস্থা তৈরির প্রক্রিয়া নয়।’

ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, সামরিক পদক্ষেপ, হুমকি বা কোনো প্রস্তাব পাসের মাধ্যমে নিরাপত্তা সুরক্ষা জোরদার হয় না। বরং নিরপেক্ষতা, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি এবং সংস্থার তত্ত্বাবধানে থাকা স্থাপনাগুলোতে হামলার স্পষ্ট নিন্দার মাধ্যমেই এটি শক্তিশালী হয়।

গারিবাবাদি তার বক্তব্যের শেষ অংশে বলেন, ‘আপনি নিরাপত্তা সুরক্ষায় থাকা স্থাপনায় বোমা হামলা চালাবেন, পরিদর্শনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রবেশাধিকার ও নিরাপত্তা ধ্বংস করবেন এবং পরবর্তীতে সেই হামলার পরিণতিকেই ইরানের বিরুদ্ধে একটা অস্পষ্টতা হিসেবে ব্যবহার করবেন—তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

আইএইএর রিপোর্টকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানাবেন না: ইরানের হুঁশিয়ারি

প্রকাশিত সময় : ০৬:১৮:৩৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেছে তেহরান। ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে, সংস্থাটি যদি সত্যিই একটি স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধানের অংশ হতে চায়, তবে তাদের কারিগরি প্রতিবেদনগুলোকে রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।

নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে ইরানের আইন ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি এই প্রতিক্রিয়া জানান। আইএইএ-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন এবং সংস্থাটির মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসির দেওয়া কিছু বিবৃতির জবাবে তিনি এই মন্তব্য করেন।

উল্লেখ্য, ওই বিবৃতিতে ইরানের কিছু ক্ষতিগ্রস্ত পরমাণু স্থাপনায় প্রবেশাধিকার না পাওয়া, ইউরেনিয়ামের মজুত পরিস্থিতি এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সম্পর্কে ‘ধারাবাহিক তথ্য পাওয়ার ঘাটতি’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল।

আইএইএ-এর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি গত বৃহস্পতিবার গভর্নিং বোর্ডের কাছে পেশ করা তার সর্বশেষ প্রতিবেদনে দাবি করেন, নিরাপত্তা সুরক্ষার উদ্দেশ্যে স্থাপনার বাইরে থাকা ঘোষিত পরমাণু সামগ্রী, স্থাপনা এবং অবস্থানের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ইরানের কাছ থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তিনি আরও বলেন, ‘বুশেহর বিদ্যুৎ কেন্দ্র ছাড়া অন্য কোনো পরমাণু স্থাপনা বা অবস্থানে সরেজমিনে তথ্য যাচাইয়ের জন্য আইএইএ-এর কোনো প্রবেশাধিকার ছিল না। ফলে পরমাণু অস্ত্র বিস্তাররোধ চুক্তি (এনপিটি)-এর অধীনে ইরানের ঘোষিত পরমাণু স্থাপনাগুলোতে নিরাপত্তা সুরক্ষাজনিত দায়িত্ব পালন এবং পরমাণু সামগ্রীর বর্তমান অবস্থা যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না।’
এই বক্তব্যের জবাবে গারিবাবাদি বলেন, গ্রোসি এখন ‘অস্পষ্টতা’, ‘প্রবেশাধিকারের অভাব’ এবং ‘তথ্যের ধারাবাহিকতা হারানোর’ কথা বলছেন; কিন্তু এই পরিস্থিতি তো এমনি এমনি তৈরি হয়নি। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, ইরানের নিরাপত্তা বলয়ে থাকা পরমাণু স্থাপনাগুলো যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলি সামরিক হামলার শিকার হয়েছিল।

তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, আইএইএ-এর মহাপরিচালক—যিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্বের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন বলে প্রমাণ করেছেন—দুর্ভাগ্যবশত এই হামলাগুলোর বিরুদ্ধে কখনোই কোনো নিন্দা জানাননি।

গারিবাবাদি বলেন, ‘কেউ এই বিশৃঙ্খলা বা ক্ষয়ক্ষতির মূল উৎসকে আড়াল করে, তার ফলে সৃষ্ট পরিণতি বা দায় ইরানের ঘাড়ে চাপাতে পারে না। সংস্থাটি একই সাথে সামরিক হামলার ক্ষয়ক্ষতির কথা বলবে, আবার যারা এই হামলা চালিয়েছে তাদের দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাবে এবং আক্রমণকারীদের তৈরি করা নিরাপত্তাহীনতার কারিগরি ও রাজনৈতিক খেসারত ইরানকে দিতে বলবে—তা হতে পারে না। এটি কোনো তথ্য যাচাইকরণ বা আস্থা তৈরির প্রক্রিয়া নয়।’

ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, সামরিক পদক্ষেপ, হুমকি বা কোনো প্রস্তাব পাসের মাধ্যমে নিরাপত্তা সুরক্ষা জোরদার হয় না। বরং নিরপেক্ষতা, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি এবং সংস্থার তত্ত্বাবধানে থাকা স্থাপনাগুলোতে হামলার স্পষ্ট নিন্দার মাধ্যমেই এটি শক্তিশালী হয়।

গারিবাবাদি তার বক্তব্যের শেষ অংশে বলেন, ‘আপনি নিরাপত্তা সুরক্ষায় থাকা স্থাপনায় বোমা হামলা চালাবেন, পরিদর্শনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রবেশাধিকার ও নিরাপত্তা ধ্বংস করবেন এবং পরবর্তীতে সেই হামলার পরিণতিকেই ইরানের বিরুদ্ধে একটা অস্পষ্টতা হিসেবে ব্যবহার করবেন—তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’